somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ুন আজাদের- মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ

৩০ শে জুলাই, ২০০৬ সন্ধ্যা ৬:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

1।
বইয়ের প্রচ্ছদে হিশেব- বানান এভাবেই দেয়া আছে। লেখকের নাম যখন হুমায়ুন আজাদ, এ বানান তখন আর অবাক করেনা আমাকে।
আমার পড়া হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই - "সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে'। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লেখা বই। সব রকম সম্পর্ক। বাবা-মা'র সাথে, ভাই বা বোনের সাথে, স্বামী-স্ত্রী বা পুত্র-কন্যাদের সাথে। সে বইয়ের মূল চরিত্র ছিলেন একজন প্রকৌশলী, যিনি সড়ক বানান, আর ব্রিজ। মানে সেতু। ব্রীজ বানাতে বানাতে একসময় মানুষের সম্পর্কগুলোকেও তিনি ব্রীজ বলে ভাবা শুরু করেন। একসময় দেখা যায়, এ সম্পর্কগুলো তার বানানো ব্রীজগুলোর মতই কী অসহায়ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে!
বই পড়ে যে কখোনো যন্ত্রনা পাওয়া যায়, হুমায়ুন আজাদের বই পড়ার আগে আমার এই ধারনাই ছিলো না। অসম্ভব যন্ত্রনা দেয় তাঁর বই,অথবা বলা ভাল- পীড়া দেয়, নিজেকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়, চারপাশের সোজা সরল জগতের ধারনা এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, কেমন করে আমাদের চারপাশের সব কিছু ভেঙ্গে পড়ছে।
মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ- স্বীকারোক্তিমূলক বই। তাঁর প্রায় সব বইয়ের চরিত্ররাই নিজের সাথে নিজে প্রচুর কথা বলে, নিজেকে হাসায়, নিজেকে বুঝায়ে নিজেকে অভিশাপ দেয়ে এই বইয়েও তিনি একজন মানুষকে দিয়ে তাঁর অপরাধের স্বীকারোক্তি করিয়েছেন। খানিকটা অবাক হয়েছি যখন দেখলাম "অপরাধী' হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন একজন আপাত:সৎ সরকারী আমলা-কে। আমাদের দেশের সরকারী বড় আমলাদের অসততা কিংবদন্তীতূল্য, কিন্তু তাঁর গল্পের নায়ক, যার নাম আনিস, একজন সৎ সরকারী আমলা। পুরো বইটা আনিসের মুখ দিয়ে বলানো নিজের গল্প। তার অপরাধ ও অপরাধবোধের বর্ণনা। হুমায়ুন আজাদের বর্ণনাভঙ্গি একান্তই তাঁর নিজস্ব। অন্য কারো সাথে মেলে না তা।
বইয়ের শুরুতে আনিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেলোয়ার ও তার বউ ডলি-র কথা আছে? "" বিয়ের মঞ্চে দেলোয়ারের বউকে দেখে আমি একটু কেঁপে উঠি,সামান্য একটু কাঁপন;- আমার চোখ তার বউয়ের চিবুকের ওপর গিয়ে পড়েছিল, একটি কাঁধের ওপর গিয়ে পড়েছিল; তা আমাকে কম্পিত করে, কিছুটা ঈর্ষারও জন্ম দেয়; এব ংআমি ভয় পাই?''
দেলোয়ার ও ডলি একদিন আনিসকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে ফেরিঘাটের কাছে আসতেই আনিস নেমে পড়ে গাড়ি থেকে, কারন, "" একসময় আমার মনে হয় গাড়ি সুগন্ধে নয়, মাংসের গন্ধে ভরে উঠছে, সোনালি মাংসের ভেতর থেকে গন্ধ উঠে আসছে; তখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পড়তে আমার ইচ্ছে হয়'' আনিস নেমে যাবার পর ডলিকেও নেমে যেতে বলে দেলোয়ার, এব ংডলি নেমে যাবার পর ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় দেলোয়ারের গাড়ি, দেলোয়ার মারা যায়।
মূলত এখান থেকেই আনিসের অপরাধবোধের শুরু।

2।
কিংবা হয়ত এখান থেকে নয়।
আরো আগে দেলোয়ার যেবার আনিসকে নিয়ে ব্রোথেলে গিয়েছিল, দু'জন দু'দিকে চলে যাবার পর, খানিক সময় কাটিয়ে আবার ওরা একসাথে হলে, দেলোয়ার জিজ্ঞেস করেছিল আনিস কিছু ""করেছে কি-না?'' আনিস করেছিল। কিন্তু দেলোয়র জানাল সে কিছু করে নি, সে শুধু দেখতে এসেছিল, করতে নয়ে তখনো আনিসের ভীষন অপরাধবোধ হয়েছিল, "" নিজেকে আমার খুব খারাপ মনে হয়ে আমার আর ভালোদের সাথে মেশা ঠিক হবে না। যে মেয়েটিকে দেখে আমি কেঁপে উঠি, যাকে আমার খুব ভাল মনে হয়, তার দিকে আমি আর তাকাবো না, সে তার মামার সাথে বেবিতে যাক, তার দুলাভাইয়ের সাথে বেবিতে যাক, আমি আর কষ্ট পাবো না। - - - দেলোয়ারকে দেখলেই, তারপর, আমার মনে অপরাধবোধ জেগে উঠতো - - আমি অনেক কিছুই ছোঁয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম; ফুল, আমার কাছে পবিত্র মনে হতো, তাই আমি আর কোন ফুল ছুঁইনি; আমার ভয় হতো ছুঁলেই পবিত্র ফুলটি অপবিত্র হয়ে যাবে''

দেলোয়ার মৃত্যু আনিসকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আর এই মুক্তি তাকে নতুন অপরাধবোধে জড়িয়ে নিয়েছিল।

3।
দেলোয়ারের বাবা-মা আনিসকে জিজ্ঞেস করে কেন দেলোয়ারকে গাড়িতে রেখে ওরা দু'জন নেমে গিয়েছিল? ওরা কি জানত দেলোয়ার পানিতে পড়ে যাবে? আনিস বলেছিল ও লজ্জিত নেমে যাবার জন্যে। কিন্তু তার আসলে লজ্জা পাবার কোন কারন ছিল না। যদিও দেলোয়ার বাবা- মা ওদের দু'জনকে সন্দেহ করেছিলেন।
ডলির বাবা-মা আনিসকে দেখেন ডলির ত্রাণকর্তা হিসেবে। এব ং একসময় আনিস আর ডলির বিয়ে হয়ে কিন্তু বিয়ের পরেও আনিস দেলোয়ারের কথা মনে করে শুধু, প্রতি মূহুর্তে ওর মনে হতে থাকে, ডলি যেন দেলোয়ারেরই বউ, ওর নিজের নয়।
এদিকে ডলি সন্তান নিতে চায়, কিন্তু আনিস চায় না। "" হয়তো আমি মানুষ নই, মানুষ হলে মানুষ জন্ম দিতে হয়; কিন্তু আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না মানুষ জন্ম দিয়ে কী সুখ? - - - মানুষকে কি আমি ঘেন্না করি? কখনো ভেবে দেখি নি। মানুষ প্রজাতিটি টিকিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব আছে আমার- রক্তে আমি তেমন কোন সংকেত পাই নি। ডলি হয়তো পাচ্ছে। প্রকৃতি আর সভ্যতা হয়তো তার রক্তে বেজে চলছে, তাকে নির্দেশ দিয়ে চলছে মানুষ বানানোর - - - আমার ইচ্ছে করে না। মানুষ তৈরি করার কথা ভেবে আমি কোন সুখ পাই না''

একসময় ডলি ছেড়ে যায় আনিসকে। আনিস আরো গভীরভাবে নিজের জীবন কাটাতে থাকে।
তার একসময়কার বন্ধু,স্কুলে পরীক্ষায় খারাপ করা বন্ধু, ওর থেকে সব কিছুতে যে পিছিয়ে থাকতো, যার সাথে তার একমাত্র স্মৃতি হলো কোন এক বস্তিতে দেয়ালের ফুটো দিয়ে মেয়েদের গোসলের দৃশ্য দেখা, সে বন্ধু নানা কাজের আব্দার নিয়ে আসে তার কাছে, বিনিময়ে অনেক টাকার লোভ। আনিস সেই বন্ধুকে নিরাশ করে। না, কোন অপরাধবোধ থেকে নয়, অথবা তার সততা প্রমাণের জন্যে নয়ে শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছের বশবর্তী হয়েই।
কিন্তু এদিকে সে অন্য অনেক আমলার, বিশেষত তার চেয়ে সিনিয়র অনেকের অনেক অন্যায় আব্দার মেনে নিতে বাধ্য হয়, অনেকের স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করে। কিন্তু কোথাও সে শান্তি খুঁজে পায় না। জীবনের প্রতিটি কাজে সে অপরাধবোধ করতে থাকে।
আনিসের বয়স বেড়ে চলে। তার বয়স যখন চুয়ান্ন, তখন সে তার বাড়ির কাজের লোকের বালিকা মেয়েটিকে মুগ্ধ করে নিজের স্বভাব দিয়ে। সেই মুগ্ধ বালিকা নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের সব কিছু আনিসের কাছে সমর্পন করে। সেটুকু গ্রহন করে আনিস, কোন এক সময় তার মনে হয়, হয়ত এটুকুর জন্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়া, হয়ত এটুকুর জন্যেই এত অপেক্ষা। কিন্তু পরমূহুর্তেই সে প্রচন্ড অপরাধবোধ করে।

স্বগত সংলাপের মতন এ বইটি শেষ হয় এভাবে:
" --- অফিসে গিয়ে আমি এক পেয়ালা কফি খাই, কফিটা খেতে আমার অনেক সময় লাগে, সময় লাগাতে আমার ভাল লাগে, কাউকে ঘরে ঢুকতে নিষেধ করে দেই, কোন টেলিফোন ধরি না। আমি পদত্যাগ পত্র লিখি, মাত্র একটি বাক্য; সহকারীর হাতে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। বাইরে এসে রিকশা নিই, রিকশাঅলা জানতে চায় কোথায় যাব, আমি শুধু বলি, "চালাও'। আমার ইচ্ছে করে শহর ছেড়ে যেতে, এখনই ছেড়ে যেতে, আর না ফিরতে। শহরকে আমার অচেনা মনে হয়, চিনতে ইচ্ছে করে না। রিকশাঅলাকে আমি শহরের বাইরে যেতে বলি, সে একটি খেতের পাশে এসে জানতে চায় আমি নামবো কি না? আমার ভালো লাগে, আমার নামতে ইচ্ছে করে, আমি নামি, হাঁটতে থাকি, হেঁটে হেঁতে অনেক দূর যেতে ইচ্ছে করে, অনেক দূরে, আমি হাঁটতে থাকি; আমি হাঁটি,আমি হাঁটতে থাকি, শহর ছেড়ে অনেক দূরে যেতে থাকি, আমি হাঁটতে থাকি। '

বইটি পড়তে পড়তে অনেকবার থামতে হয়েছে আমাকে। একটানা পড়তে পারি নি কখনোই। একটানা পড়ে যাবার যন্ত্রণাটুকু সবসময় আমার জন্যে সহনশীল ছিল না আসলে। এ জন্যে খানিক পর পর নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছি। সেই বিশ্রামের কথা লেখক জানতেন কি না, অথবা ভেবেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু, ঐ সময়টুকুই আসলে পাঠককে নিজের অপরাধগুলোকে ভেবে দেখার সুয়গ করে দেয়ে মানুষ "হিশেবে' নিজের অপরাধগুলোর মুখোমুখি করে দেয়, বড় প্রচন্ডভাবে।

----------------------

[link|http://www.guruchandali.com/|MyiyP
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০০৬ সন্ধ্যা ৬:৪২
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের বিজয় খুব দরকার ...

লিখেছেন অপলক , ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



বিগত সরকারগুলো যে পরিমান ক্ষয়ক্ষতি করে গেছে, তা পুষিয়ে নিতে ১০টা বছর যোগ্য এবং শিক্ষিত শ্রেনীর হাতে সরকার ব্যবস্থা থাকা খুব জরুরী। গোমূর্খ চাঁদাবাজ আর নারী লিপ্সুদের ভীড়ে জামায়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন পলিটিক্স পছন্দ করি না সেটা বলি।

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১৩

আমি পলিটিক্স এবং পলিটিশিয়ান পছন্দ পারি না। কোন দলের প্রতিই আমার আলগা মোহ কাজ করেনা। "দলকানা" "দলদাস" ইত্যাদি গুণাবলী তাই আমার খুবই চোখে লাগে।

কেন পলিটিক্স পছন্দ করি না সেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট : ২০২৬ ইং ।

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:০২

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট : ২০২৬ ইং
(বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে স্হানীয় পর্যবেক্ষণ)




আমরা সবাই অনেক উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে আগত নির্বাচন নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছি,
প্রতিটি মর্হুতে বিভিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

******মায়ের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি******

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৫


মায়ের স্মৃতি কোনো পুরোনো আলমারির তাকে
ভাঁজ করে রাখা শাড়ির গন্ধ নয়
কোনো বিবর্ণ ছবির ফ্রেমে আটকে থাকা
নিস্তব্ধ হাসিও নয়
সে থাকে নিঃশব্দ এক অনুভবে।

অসুস্থ রাতের জ্বরজ্বালা কপালে
যখন আগুনের ঢেউ খেলে
একটি শীতল... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণ এবার কোন দলকে ভোট দিতে পারে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬


আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। সকাল সাতটা থেকেই মানুষ ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিএনপি জোট বনাম এগারো দলীয় জোট (এনসিপি ও জামায়াত)। নির্বাচনের পরপরই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×