তখন বেশ ছোট। ক্লাস ফাইভ বা তার নীচে পড়ি। এক বর্ষায় হঠাৎ ঘুরতে যাবার সুযোগ হল। আমার মায়ের এক খালার বাসায়, বগুড়ার নন্দীগ্রামে। কয়দিন থাকব জানা নেই। হুট করেই মা আর নানীর সাথে গেলাম। গ্রামের পথ ধরে অনেকটা ভেতরে ভ্যানে করে যেতে হয়েছে বাস থেকে নামার পর।
যাই হোক, বাসার পরিধি বিশাল। ২০ টার মত মহিষ আর ১০ টার মতো গাই বাছুর। কারেন্ট আছে কিন্তু হেরিকেন বেশি ব্যবহার হয়। ১৯৯৪ সালের দিকে কারেন্ট খুব কমই থাকত।
বর্ষাকাল হওয়ায় যখন তখন বৃষ্টি। ডোবা পুকুর সব জায়গায় পানি। কাঁচা রাস্তা কাদায় মাখা মাখি। এর মধ্যে সেই নানা বাসার এক রাখাল ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়ে গেছে। সে আমার চেয়ে একটু বড়। কিন্তু যখন তখন লুঙ্গি খুলে ফেলে, আবার পড়ে। মাঝে মাঝে বিষ নেংটি মারে। মানে পুরো পাছা দেখা যায় আর কি। পরের দিন সকালে নাস্তা করে ওর সাথে যাবার অনুমতি মিলল। বাসায় দুটা রাখাল। বড়জন সব গরু মহিষ নীয়ে যায় নিয়ে আসে। পিচ্চিটা সাথে থাকে আর মাঝের সময়টা পাহাড়া দেয়।
আমি তখন হাফ প্যান্ট পড়ি। কাঁদায় পঞ্জের সেন্ডেল বারে বারে আটকে যাওয়ায় এক সময় খুলে হাতে নিয়ে হাটা শুরু করলাম। যেতে যেতে পায়ে ব্যাথা শুরু হল। এক সময় মাঠে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে আরও পিচ্চি পিচ্চি রাখাল বালকের সাথে দেখা হল। সবার হাতে বাঁশের লাঠি। আমাকে পরিচয়ের পর দলে ভিরে গেলাম।
ওদের সবার লাঠির মাথা চোকা। সেটা দিয়ে ওরা বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মাটির ভেতরে পুতে ফেলে। আমিও অনেক বার ট্রাই করে শিখে ফেলাম। এরপর ওদের কাছে ডান্ডাগুটি খেলা শিখলাম। দুপুরের দিকে ওরা মহিষ গুলোকে একটা একটা করে পানিতে নামিয়ে গোসল করালো। পানি থেকে ওঠার পর বেশির ভাগ মহিষের গায়ে অনেক জোঁক দেখলাম। সেগুলো খুঁজে খুঁজে ওরা মারল। জীবনে সেবারই প্রথম জোঁক দেখলাম।
আমার পানিতে নামার সখ ছিল। কিন্তু জোঁকের ভয়ে আর সাহসে কুলালো না। এর ভেতরে বাসা থেকে খারাবেরর জন্যে মানুষ এসে আমাকে নিয়ে গেল।

পরের দিন আবারও বেরিয়ে পড়লাম। এবার যাবার সময় এক গাঁই মহিষের পিঠে আমাকে ঠেলে ঠুলে চড়িয়ে দিল। নাদুস নুদুস শরীর হেলে দুলে চলছিল। পিঠে বসে যাওয়া কি যে মজা !!! আহা...
সারাদিন আমি মহিষের পিঠে চড়েই বেড়ালাম। শুয়ে থাকলাম। এর ভেতরে আমি শিখে গেলাম, ডান পা দিয়ে বুকের কাছে ঘুতা দিলে সে ডানে যায়, বামে দিলে বামে যায়। আর দুপা দিয়ে এক সাথে চাপ দিলে হাটা শুরু করে। চু চু থাম বললে থেমে যায়। এই এতটুকু কন্ট্রোলে আমার যে কি খুশি মনে মনে। নিজেকে অনেক কিছু মনে হচ্ছিল।
আমি দুপুরে খেতে গেলাম না। হঠাৎ কড়া রোদের ভেতরে বৃষ্টি শুরু হল। আমার মহিষ, আমার ঘুতা ঘাতি আর শোনে না। মজা করে ঘাস খেতেই থাকল। আমি তখন নিজেই নেমে দৌঁড়ে কোন এক বড় গাছের নীচে গেলাম। সেখানে শুরু হল, লাঠি ফেকা খেলা। বৃষ্টি থামার নাম নেই। একজন পকেট থেকে ৩ টা মার্বেল বের করল। দুজন খেলা শুরু করল। বাকিরা চুপচাপ বসে থাকল। আজ ওদের মাহিষ গুলাকে গোসল করানো লাগল না।
আমি বিস্তীর্ন মাঠে এভাবে মুষলধারে বৃষ্টি কখনও দেখিনি। কি যে ভাল লাগছিল, বলে বোঝানো যাবে না। ঘন মেঘের কারনে বেলা কত হয়েছে বোঝা যাচ্ছিল না।
এরপর কান ফাটানো কয়েকটা বাজ পড়ে বৃষ্টি থেমে গেল। তখন যে যার গরু বাছুর মহিষ খুঁজে খুঁজে রওনা দিল। ঝিরঝির বৃষ্টির ভেতরে আমি আবার মহিষের পীঠে চড়ে রওনা দিলাম। কেবল মনে পড়ল, মহিষটার নাম ছিল লালী।
পরের দিন আমার জ্বর .... মাঠে যাওয়া মানা। ৬দিনের মাথায় আবার বাসায় ফেরা হল। কিন্তু মহিষের পীঠে চড়ে বেড়ান শৈশবের এক মহেন্দ্রক্ষণের বিলাষিতা আজও মনের ভেতরে এক তৃপ্তি এনে দেয়। এরপর আর কখনও যাওয়া হয়নি সেই গ্রামে। আর কখনও চড়া হয়নি কোন মহিষের পীঠে। আর কখনও খোলা আকাশের নীচে রাখাল বালক সাজা হয়নি। শহর বা নগরের জীবন বড়ই নিষ্ঠুর। মু্ক্তির স্বাদ পাওয়া যায় না। চোখ ভোলানো মন জুড়ানো দ্বীগন্ত জুড়ে বৃষ্টি নামা দেখা হয় না...
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




