
চারিদিকে জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, আধুনিকতার জোয়ার। আর সে জোয়ারে আমরা ও গা ভাসাচ্ছি। আর ভাসাবোই বা না কেন? নতুন যে কোন কিছুর প্রতিই আগ্রহ থাকে সবার। অনেক সময় সমাজের অধিকাংশ মানুষ যখন স্রোতের অনুকূলে চলে তখন স্রোতের প্রতিকুলে চলা গুটি কয়েক মানুষও বাধ্য হয় তাদের দেখাদেখি স্রোতের অনুকূলে চলতে। বাধ্য হয় আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসাতে। তা না হলে যে সেই স্রোতের অনুকূলে চলা মানুষগুলো তাদের আনস্মার্ট বলবে ।
আর এমন অবস্থায় আপনিও আপনার আধুনিক পরিচিত জনের কাছে থেকে যেন ক্ষেত, আন স্মার্ট এসব শুনতে না হয় তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের স্বকীয়তা কে বিসর্জন দিয়ে আধুনিক হতে বাধ্য হন।
হয়ত আধুনিকতার নামে এসব ঢং ফং আপনার কাছে ভালো লাগেনা, আপনার নিজস্ব পছন্দ অপছন্দ সম্পূর্ণই আলাদা তারপরেও আপনি আপনার নিজস্ব স্বকীয়তা কে, ভালো লাগা কে বিসর্জন দেন ভয়ে কিংবা সংকোচে।
**আগে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কাঁচা ফুলের গহনা দিয়ে বিয়ের কনে কে সাজানো হতো। কিন্তু কয়েক বছর আগে থেকে শুকনো ও কৃত্রিম ফুল, জরি ও পুতি দিয়ে বানানো গহনার প্রচলন শুরু হল। কিন্তু আপনার কাছে এসব গহনার চাইতে কাঁচা ফুলের গহনা ভালো লাগে। নিজের গায়ে হলুদে আপনি আপনার পছন্দের গোলাপ ও রজনীগন্ধা ফুলের গহনা দিয়ে সাজাতে চান নিজেকে। আপনি কি করবেন তখন ? আপনার পছন্দ কে প্রাধান্য দিবেন নাকি আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে ওইসব গহনা পরবেন ?
এখানে আরেকটা মজার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। হঠাৎ করেই এক দেড় বছর আগে ফেসবুকে কারও গায়ে হলুদের ছবিতে ক্যাপশন দেখি অমুকের "Body Turmeric” ।
** আপনার বাবা মা পরিবার গ্রামে থাকেন। কৃষিকাজ করেন। নিজেদের ক্ষেত খামারে কাজ করেন গ্রামে। আপনি ঢাকায় নামী দামী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। আপনি চাইলেই ঢাকার যে কোন একটি বড় কোম্পানি তে চাকরী করতে পারেন । কিন্তু তা না করে আপনি গ্রামে ফিরে গিয়ে বাবা দাদার কৃষিকাজে হাত দিতে চান। শহরের ইট কাঠের বন্দী জীবন আপনার ভালো লাগেনা। আপনার গ্রাম ভালো লাগে। মাটি ভালো লাগে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে গিয়ে থাকবেন, কৃষিকাজ করবেন, লোকে কি বলবে এই ভয়ে আপনি নিজের চাওয়া কে বিসর্জন দিবেন ?
** বাবা দিবস, মা দিবস, ভালোবাসা দিবস, এসব দিবসে আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন পোস্ট দেন না। বিশেষ মানুষটি কে নিয়ে বাইরে খেতে যান না। কিন্তু তাই বলে কি আপনি আপনার বাবা, মা কিংবা সেই বিশেষ মানুষ টি কে ভালোবাসেন না ? সবাই যেখানে বাবা দিবসে, মা দিবসে, ভালোবাসা দিবসে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে ফেসবুক ভরে ফেলছে তখন আপনি নিশ্চুপ। আপনি সেখানে ব্যতিক্রম। কিন্তু তাই বলে কি আপনি আধুনিক না ?
** গল্পের বই পড়তে অনেকেই ভালোবাসে । আধুনিক সমাজ এখন আবার গল্পের বই এর পি ডি এফ ভার্শন পড়ে, ল্যাপটপ কিংবা মোবাইল এ। আগে আমরা এর ওর কাছে থেকে গল্পের বই ধার নিতাম আর এখন গান কিংবা সিনেমার মত অনলাইন এ খুজি গল্পের বই এর আধুনিক রূপ।
কিন্তু আপনার গল্পের বই এর ওসব পি ডি এফ ভার্শন পড়তে ভালো লাগেনা। আপনি এখন ও বই এর দোকান থেকে মলাট বাধানো বই কিনেন। এর ওর কাছে থেকে আপনি বই এর পি ডি এফ ভার্শন না খুজে বই ধার নেন কিংবা দোকানে গিয়ে খুজে খুজে নিজের পছন্দের বই টি কিনে আনেন । বই পড়ার মজা তো বই পড়ার মাধ্যমেই, স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ এ পড়ার মাধ্যমে না ।
**আপনি ইংরেজি গান বা সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন না। আপনার কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, নিজের দেশের বাংলা গান ভালো লাগে। আপনার বন্ধুদের আড্ডায় সবাই যখন নতুন আসা ইংরেজি গান বা সিনেমা নিয়ে আলোচনায় মত্ত আপনি তখন বোকার মত চেয়ে থাকেন। তাই বলে কি আপনি আন স্মার্ট ? এখন আপনি কি আপনার ভালো না লাগা সত্ত্বেও ইংরেজি গান বা সিনেমা দেখা শুরু করবেন বন্ধুদের মাঝে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ?
** ইদানিং টিন এইজ ছোট বাচ্চা মেয়েগুলো কে দেখি অনেক সুন্দর করে মেকআপ করে। বর্তমান সময়ে ইউটিউব দেখে দেখে ভালোই শেখা যায় মেকআপের বিভিন্ন কৌশল । আধুনিকতার যুগে এসব আটা ময়দা না মাখলে তো আবার সবাই আনস্মার্ট বলবে। কিন্তু আপনার কাছে ওসব আটা ময়দা মাখতে ভালো লাগেনা। সাজ মানে আপনার কাছে চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। তাই বলে কি আপনি স্মার্ট না? আধুনিক না? আমি তো বলব আপনি সাহসী। আপনি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আপনার নিজস্ব রূপ কে নিয়ে ঘুরে বেরান। আটা ময়দা মেখে মেকআপ করে নিজের তিল চেহারা কে তাল করে না
বিজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিকতা আমাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। যত দিন যাবে আমরা আরও উন্নত হব, আধুনিক হব। তবে কিছু আধুনিকতা আমাদের সমাজের সবার জন্য একইভাবে গ্রহণযোগ্য হয়না। কিন্তু ব্যক্তি থাকে যাদের পছন্দ, অপছন্দ, ভালো লাগা এসকল আধুনিকতার অনেক উর্ধে ।
আপনি যদি তাদের মধ্যে একজন হয়ে থাকেন তাহলে আমি বলব, লোকে কি বলবে এই ভেবে সংকোচে কিংবা ভয়ে নিজেকে বদলে ফেলে আধুনিকতা কে গ্রহন না করে আপনার নিজস্ব ভালো লাগা, নিজস্ব স্বকীয়তা কে প্রাধান্য দিন। আর আধুনিকতার সেই অংশটুকুই গ্রহন করুন যেটি আপনার ভালো লাগে কিংবা আপনার সাথে মানানসই। সবাই স্রোতের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে বলে নিজের ভালো না লাগা সত্ত্বেও আপনাকেও তাই করতে হবে এমন কিছু নয়। আপনার নিজস্ব যে বৈশিষ্ট্য, যে স্বকীয়তা আছে সেটিকে ফুটিয়ে তুলুন আগে সুন্দরভাবে, দেখবেন আপনি হয়ে উঠবেন অন্য সবার থেকে অতুলনীয় ও ইউনিক আর অনেকের মধ্যে একজন। সবচেয়ে বড় কথা আপনি সাহসী, আপনি চালেঞ্জিং । সমাজের সবাই যখন আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে তখন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে নিজস্ব ভালো লাগা, নিজস্ব স্বকীয়তা কে ধরে রাখা চালেঞ্জিংই তো বটে !
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




