
জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ট্রাম্পের সাথে করমর্দনের একটা ছবি প্রকাশ করেছেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ছবিটি ঘিরে অনেকে অনেক মন্তব্য করেন। বছরের শুরুতে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে চুক্তিগুলো ইউনূস সরকার করেছিল, সেখানে বাংলাদেশ পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন খলিলুর রহমান। লক্ষনীয় যে, ইউনূস নিজে এসব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেননি। কাজটি তিনি সম্পন্ন করেছেন ঠিকই, কিন্তু স্বাক্ষর করিয়েছেন অন্যদের দিয়ে!
খলিলুর রহমান ছাড়া, ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আরেকজন স্বাক্ষরকারী ছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। খলিলুর রহমানের আরেকটি পরিচয়, তিনি ইউটিউবার পিনাকী রায়ের গুরু!
ইউনূসের এই নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন। তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিএনপির ভেতরে প্রশ্ন ও বিস্ময় ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সফল হয়নি; তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। কয়েক মাস পর বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে তিনি ভোটে জিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।
আমেরিকার সাথে সেই চুক্তির পুরস্কার হিসেবে খলিলুর রহমানকে জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি দেওয়া হতে পারে। ট্রাম্পের সাথে করমর্দনের সময় হয়তো তিনি তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, তিনিই সেই "স্থানীয় এলিট", যিনি বাংলাদেশের স্বার্থের বিনিময়ে আমেরিকার স্বার্থকে এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করেছেন।
আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের যে বিশাল রথের চাকা সেগুলো শুধু কেন্দ্রের শক্তিতে ঘোরে না। বিভিন্ন দেশে থাকা কত মন্ত্রী, কত রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিবিদ, আমলা, সামরিক অফিসার, অভিজাত সমাজের লোকেরা তাকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে!
ঔপনিবেশিকতা এমন একটি অর্থনৈতিক ও শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার প্রভাব শাসন শেষ হওয়ার পরও রয়ে গেছে। সাম্রাজ্য চলে গেছে, কিন্তু ক্ষমতার সাথে স্থানীয় এলিটদের সম্পর্ক রয়ে গেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতায় অন্তত শাসক ও শোষিতের মধ্যে একধরনের যোগাযোগ ছিল। নেটিভদের তারা ঘৃণা করত ঠিকই, কিন্তু সেই ঘৃণার মধ্যেও রুগ্ন, শীর্ণ, অপুষ্ট দেহটির অস্তিত্ব কোনোরকমে টিকে থাকত। ব্রিটিশদের সেখানে প্রশাসন চালাতে হত, সরকারি কাজ করতে হত, আদালতে বিচার করতে হতো।
কিন্তু আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদে সেই রুগ্ন, শীর্ণ, অপুষ্ট দেহটির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে। এর বৈশিষ্ট্য হলো, আধিপত্য বজায় রাখতে সামরিক দখল বা প্রশাসনিক উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। স্থানীয় এলিটরাই সেই আধিপত্যের মধ্যস্থতাকারী এবং নিজেদের দেশে বসে থেকেই তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষা করে।
আওয়ামী লীগের লোকেরা যখন আমাদের বলত যে ইউনূস একজন প্রতারক, দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি তখন আমরা ভাবতাম, আওয়ামী লীগের লোকেরা দুষ্ট বলেই ইউনূসের বদনাম করে। আওয়ামী দুষ্টরা যখন বদনাম করছে তাহলে বোধ হয় ইউনূস ভালো লোকই হবেন! কটুভাষিণী হাসিনা যখন ইউনূসকে কটুক্তি করতেন, তখনও আমরা ভাবতাম, ইউনূস নিশ্চয়ই "সাদা মনের মানুষ", নইলে হাসিনার মতো দজ্জাল তাঁকে কটুক্তি করবেন কেন?
হাসিনার অপপ্রচারগুলোই বিগত আওয়ামী সরকারের পতনের পরে উল্টো ইউনূসের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল। সেই শক্তিশালী ঢালগুলোর ব্যবহার করে ইউনূস কোন প্রকার সমালোচিত না হয়েই আমেরিকার সাথে এই দেশবিরোধী চুক্তিগুলো করে ফেললেন।
২০১৯ সালে আমেরিকা বাংলাদেশকে দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছিল। তার একটি হল, সামরিক সরঞ্জাম ও সেবা সংগ্রহ এবং পারস্পরিক ব্যবহারের চুক্তি (এসিএসএ); আরেকটি সামরিক তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তি (জিএসওএমআইএ)। এই চুক্তিগুলো নিয়ে তখন দুই দেশে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু হাসিনা সরকার শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিগুলো করেনি।
এখন সেই একই চুক্তি আরও বিস্তৃত হয়ে ইউনূসের বাণিজ্য চুক্তির ভেতরে আড়াল হয়ে গেছে। এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর অধীনে বাংলাদেশকে আমেরিকান সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে এবং কিছু দেশ থেকে সেগুলো কেনা বন্ধ করতে হবে। আমেরিকার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বাণিজ্য বা নিষেধাজ্ঞামূলক বিষয়গুলোতে বাংলাদেশকে "পরিপূরক ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ" এর জন্য কাজ করতে হবে। আমেরিকার স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন দেশের সাথে চুক্তি করা যাবে না। এমনকি আমেরিকার স্বার্থবিরোধী দেশ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতেও পারবে না।
হাসিনা যে চুক্তি করেননি, সেটিই আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার অংশ হয়ে ফিরে এসেছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য - যার মধ্যে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পণ্যও রয়েছে - এবং ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনতে হবে।
এই চুক্তিগুলোর পরিণতি শুধু আর্থিক ক্ষতি ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জিএমও ও কৃষি-বায়োটেক পণ্য চুক্তি বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষি ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে। বাংলাদেশের বাজার বিপুল পরিমাণ আমেরিকান কৃষিপণ্য ও কৃষি-বায়োটেক পণ্যের জন্য উন্মুক্ত হবে, যা দেশীয় বীজ, শস্য, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করবে। মাটি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করবে। আজ যেটা ‘বাণিজ্য’, কাল সেটা বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, কৃষি ও কৃষক, জমি ও মাটি, শস্য ও বীজ এবং প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর এমন ধ্বংস নিয়ে আসবে, যার মূল্য বহু প্রজন্ম ধরে দিতে হবে। অবশ্য ততদিনে যদি বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মরুভূমি না হয়ে যায় এবং কোনো একভাবে বাসযোগ্য থাকে।
এই যে ড. ইউনূস, এই যে ড. খলিল - তথাকথিত শিক্ষিত এই মানুষগুলোর মধ্যেই আজকের গণশত্রুর চেহারাটা আমাদের খুঁজে দেখতে হবে। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই শিক্ষিত ও ক্ষমতাবান মানুষের দ্বারাই হয়েছে।
এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক গভীরভাবে ভাবার আছে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা "মানুষ" না তৈরি করে তার চেয়ে বেশি এলিট তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এই শিক্ষিত এলিটেরা আগের দিনের জমিদারদের চেয়ে অনেক বেশি নির্দয়, স্বার্থপর, লোভী এবং পাষণ্ড স্বভাবের। এরা শুধু মানুষের রক্ত চোষে না, শোষণ করেই থেমে থাকে না; সুযোগ পেলে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরও হিংস্র থাবা বসাতে দ্বিধা করে না।
আমাদের শিক্ষা আমাদের শেখায় না কীভাবে প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাঁচতে হয়। শেখায় না কীভাবে জীবনকে ভালোবাসতে হয় এবং তার পরিচর্যা করতে হয়। শুধু শেখায় কীভাবে একটি আরাম-আয়েশের জীবন তৈরি করা যায়। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই আমরা একটি ড. ইউনূস, একটি ড. খলিলকে লালন-পালন করে বড় করে তুলি। আমাদের প্রবল ইগো, আমাদের ভেদবুদ্ধি, আমাদের লোভগুলোই শুধু সময়ের সাথে সাথে পরিপুষ্ট হয়, মনুষ্যত্ব নয়। আমরা শুধু নিজের জন্য বাঁচি, নিজের জন্য করি, নিজেরা খাই, আরাম করি এবং পরিতৃপ্ত বোধ করি। অন্য মানুষ, সমাজ, প্রকৃতি কিংবা বৃহত্তর জীবনের প্রতি আমাদের কোনো দায়বদ্ধতাই নেই।
আমাদের কাছে জীবনের সাফল্য মানে বিসিএস পাস করে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে সাধারণ মানুষ আমাদের "স্যার" বলে সম্বোধন করবে আর তাতেই আমাদের অহংকার তৃপ্ত হবে। আমাদের লক্ষ্য ভালো ভালো খাবার খাওয়া, সরকারি খরচে বিদেশে যাওয়া, ভালো হোটেলের মোটা তোষকে শুয়ে থাকা, ডিনারে স্টেক বা মুরগির রান চিবোনো, আর কোট-প্যান্টালুন-জুতো পরে হয় নিজের দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা, নয়তো বিদ্বান সেজে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্সে গিয়ে মাঝে মাঝে পেপার পড়া। সেই পেপারের কথাগুলোও আবার আমাদের নিজের নয়; সেগুলো অন্য লোকের লেখা বইপুস্তক থেকে ধার করা। মুক্তোগুলো অন্যের, শুধু যে সুতো দিয়ে সেগুলো বাঁধা, সেটাই কেবল আমাদের নিজেদের।
আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এর বাইরে আর যেতে পারে না। আচ্ছা, ঠিক আছে - জ্ঞান-বুদ্ধি না হয় নাইবা হলো; কিন্তু আমাদের নৈতিকতাও কি এতটা বিকশিত হয় না যে নিজের স্বার্থের বাইরে মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি ও দেশের স্বার্থের কথা ভাবতে পারি? এমন একটি ব্যবস্থার জন্য কাজ করি, যার সুফল আমার বা আমার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সব মানুষের কাছে পৌঁছায়? ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়াই আমাদের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মতো, চ্যালেঞ্জ করার মতো নৈতিকতা আমাদের নেই; জ্ঞান-বুদ্ধিও সেখানে গিয়ে যেন একেবারে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে!
প্রত্যেক সমাজেই কিছু মানুষ থাকেন, যাদের কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু একই সাথে সেই সমাজে এমন অনেক মানুষও থাকেন, যাদের নৈতিক বোধ ও দায়িত্বশীলতা ক্ষতিকর মানুষগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্যায়কে প্রশ্ন করার মতো শক্তি, সামর্থ্য ও বুদ্ধি তাদের আছে। সেই সাথে আছে দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়বোধও। নিজেদের সুবিধা না হলেও, কিংবা ক্ষমতাবানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েও, এই মানুষগুলো নিজেদের নীতি থেকে সরে দাঁড়ান না; ক্ষমতার সামনে নিজেদের মেরুদণ্ড সোজা রাখেন।
ক্ষমতার আজ্ঞাবহ নন এবং উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষগুলোই সমাজের জন্য ক্ষতিকর সেই মানুষগুলোকে দড়ি বেঁধে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। আমাদের সমাজে এই উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন, স্বাধীন চিন্তার অধিকারী ও দায়িত্বশীল মানুষগুলো প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের শিক্ষা আমাদের সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারেনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

