somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা গান: অতীত ও বর্তমান- হৃদয়ে টিকে থাকা সুরের খোঁজে

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাংলা গান: অতীত ও বর্তমান- হৃদয়ে টিকে থাকা সুরের খোঁজে

রেডিওর ক্র্যাকল শব্দ ভেদ করে ভেসে আসা "আমার সোনার বাংলা", কিংবা কোনো বর্ষার সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলামের "কারার ঐ লৌহকপাট" শুনে বুকের ভেতর যে কম্পন জাগে- সেই অনুভূতি আজও অমলিন। অথচ একই সময়ে, গত মাসে ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া কোনো গান আজ আর কারো মনেই নেই। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই আসে- বাংলা গানের কী এমন জাদু ছিল যা আজকের গানে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে?

যে গানগুলো সময়কে হার মানিয়েছে
বাংলা গানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কিছু গান যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে গেছে। রবীন্দ্রসংগীত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। "আমার সোনার বাংলা," "একলা চলো রে," "পুরানো সেই দিনের কথা"- এই গানগুলো একশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও প্রতিটি প্রজন্মের কাছে নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা-গানগুলোও একই রকম শক্তি ধরে রেখেছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে ভাষা তিনি দিয়েছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।

এরপর এলো পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকের আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ। আব্বাসউদ্দীন আহমদের ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, ফিরোজা বেগমের নজরুলগীতি, আর তারপর সত্যিকারের বিপ্লব ঘটালেন যাঁরা- শচীন দেববর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, আর গীতিকার-সুরকার হিসেবে সলিল চৌধুরী। ওপার বাংলার এই শিল্পীদের গান আজও এপার বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সময়টা ছিল সত্যিকারের সোনালি অধ্যায়। আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমান, সৈয়দ আবদুল হাদী থেকে শুরু করে খুরশিদ আলম, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন- প্রত্যেকেই তৈরি করেছেন এমন সব গান যা আজও বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে একলা রাতের ড্রাইভে বেজে ওঠে। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান আর সুরকার আলম খান, আলাউদ্দিন আলীর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল অসংখ্য কালজয়ী গান—"সব সখীরে পার করিতে," "একবার যদি কেউ ভালোবাসিতো," কিংবা "ও পাখি তোর যন্ত্রণা।"

নব্বইয়ের দশকে ব্যান্ড সংগীতের উত্থান এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আজম খানকে বলা হয় বাংলাদেশের পপ সংগীতের জনক। এরপর এলো এলআরবি, ওয়ারফেজ, সোলস, মাইলস, ফিডব্যাক- এই ব্যান্ডগুলোর গান তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠে আজও অমর। আইয়ুব বাচ্চুর "চলো বদলে যাই" বা "সেই তুমি," জেমসের "মা," হাসান-তানিমের "ঘুম ভাঙা শহরে"—এই গানগুলো তিন দশক পরও কনসার্টে বাজলে হাজারো মানুষ একসঙ্গে গলা মেলায়।

কেন এই গানগুলো এত দিন টিকে থাকে?
এই দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে কয়েকটা কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, সেই সময়ের গানে কথা ও সুরের মধ্যে ছিল গভীর মনোযোগ ও পরিশ্রম। একটা গান তৈরি হতে মাসের পর মাস সময় লাগত- গীতিকার শব্দ বেছে নিতেন যত্ন করে, সুরকার সেই শব্দের আবেগকে ধরার চেষ্টা করতেন সুরে, আর শিল্পী নিজের কণ্ঠে ঢেলে দিতেন প্রাণ। দ্বিতীয়ত, সেই গানগুলোর বিষয়বস্তু ছিল সর্বজনীন- প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম, জীবনদর্শন- এমন সব অনুভূতি যা কালোত্তীর্ণ, সময়ের সঙ্গে যার প্রাসঙ্গিকতা কমে না।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও এক অর্থে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন রেকর্ডিং ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিল বলে প্রতিটা গানের পেছনে অনেক বেশি চিন্তাভাবনা ও সম্পাদনা হতো। একটা অ্যালবামে হয়তো আট-দশটা গান থাকত, কিন্তু প্রতিটাই যত্নে তৈরি।

বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনে গান তৈরির প্রক্রিয়া আমূল বদলে গেছে। ইউটিউব, স্পটিফাই, টিকটকের যুগে একটা গান রাতারাতি ভাইরাল হতে পারে, আবার এক সপ্তাহেই হারিয়ে যেতে পারে বিস্মৃতির অতলে। এর পেছনে কয়েকটা কারণ লক্ষণীয়।

প্রথমত, দ্রুত কনটেন্ট তৈরির চাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম প্রতিনিয়ত নতুন কনটেন্ট দাবি করে, ফলে শিল্পী ও প্রযোজকরা দ্রুত গান বানাতে বাধ্য হন- গভীরতার চেয়ে গতিই যেন হয়ে ওঠে মুখ্য। দ্বিতীয়ত, "হুক লাইন" নির্ভরতা বেড়ে গেছে- একটা ক্যাচি লাইন বা রিলস-বান্ধব মুহূর্ত তৈরি করাই যেন এখন লক্ষ্য, পুরো গানের গভীরতা নয়। তৃতীয়ত, একই সুরের পুনরাবৃত্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা- অটো-টিউন আর প্রি-সেট বিটের কারণে অনেক গান একই রকম শোনায়, শিল্পীর নিজস্বতা হারিয়ে যায়।

তবে এটা বলা ভুল হবে যে বর্তমান সময়ে ভালো গান তৈরি হচ্ছে না। কোক স্টুডিও বাংলার মতো প্ল্যাটফর্ম প্রমাণ করেছে, লোকগান আর আধুনিকতার মিশেলে এখনও অসাধারণ কাজ সম্ভব- "মন মাঝি রে" বা অন্যান্য পরিবেশনা তরুণ প্রজন্মকে নতুন করে লোকসংগীতের প্রেমে ফেলেছে। এছাড়া কণা, ইমরান, বালাম, অর্ণব, শায়ানের মতো শিল্পীরা নিয়মিতভাবে মানসম্পন্ন গান উপহার দিয়ে চলেছেন। সমস্যাটা মেধার অভাব নয়- সমস্যাটা তৈরির প্রক্রিয়া ও বাজার-ব্যবস্থার মধ্যে।

ভবিষ্যতের পথ
তাহলে কি পুরনো দিনের সেই জাদু ফিরিয়ে আনা সম্ভব? সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। এর জন্য দরকার শিল্পী-গীতিকার-সুরকারদের মধ্যে সেই একাগ্রতা ফিরিয়ে আনা, যেখানে একটা গানকে সময় দেওয়া হবে, যত্ন করে তৈরি করা হবে। পাশাপাশি শ্রোতাদেরও ভূমিকা আছে- শুধু ট্রেন্ডিং গানের পেছনে না ছুটে, প্রকৃত সৃষ্টিশীল কাজকে সমর্থন দেওয়া, তাদের শুনে-বুঝে গ্রহণ করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- গানের কথায় ও সুরে এমন কিছু থাকা দরকার যা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, যা কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্ত নয়, বরং জীবনের একটা অনুভূতিকে ধরে রাখে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে আইয়ুব বাচ্চু পর্যন্ত—প্রত্যেকেই এই কাজটা করে গেছেন নিজের নিজের সময়ে।

শেষ কথা
বাংলা গানের ইতিহাস আসলে একটা প্রবহমান নদীর মতো- কোথাও তা প্রশস্ত হয়েছে, কোথাও সংকীর্ণ, কিন্তু কখনো থেমে যায়নি। আজকের চ্যালেঞ্জগুলো নতুন হলেও, সৃষ্টিশীলতার সেই মূল সুরটা যদি ধরে রাখা যায়- কথায় আন্তরিকতা, সুরে গভীরতা, আর পরিবেশনায় আত্মনিবেদন- তাহলে আগামী দিনের গানও হয়তো পঞ্চাশ বছর পর কারো হৃদয়ে একইভাবে বেজে উঠবে, যেমন আজও বাজে "আমার ভাঙা কুলের নদী" শুনে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৩২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মুমূর্ষু কবিতা

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১১



আমি আর কবিতা লিখব না বলেও
লিখে ফেলি একটি মুমূর্ষু কবিতা–
জন্ম নেয়ার আগেই যারা অবিরাম
মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, লাথি মারছে
পদ্যের চিরায়ত চোয়ালে !
পঙক্তিতে পঙক্তিতে পথ হেঁটে
প্রচণ্ড পিপাসায় আমি পান করি
কবিতার স্নিগ্ধ জল; আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ এসেছে শরৎ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



শরৎ-প্রাতে শিউলি ঝরা ক্ষণে
দিবাকর ছড়ায় হাসি।
দিঘির জলে রক্তিম পদ্ম
ফুটেছে রাশি রাশি।

ছাতিম গাছের নিভৃত নির্জনে
সবুজ পাতার ঘ্রাণ।
সুখ আহ্লাদে ডাকছে নিসর্গ
উচাটন মন প্রাণ। 

স্নিগ্ধ  বাতাস দোলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইনকা চিপা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬


এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণীকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×