
শ্রদ্ধেয় মান্না দের কণ্ঠে, গীতিকার জহর মজুমদারের “সবাই তো সুখী হতে চায় তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয়না” গানটি শুনলে মনটা কেমন কেমন যেন হয়ে যায় ।
“সুখ” পৃথিবীর সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত কিছু । এমন একজন মানুষও খুজে পাওয়া যাবেনা যিনি বলবেন যে আমি সুখ চাইনা ।
আমি একদিন সুখের সন্ধানে বেরিয়েছিলাম ।
সুখের সন্ধানে
সন্ধান করতে করতে শেষ পর্যন্ত দেখলাম এ পৃথিবীতে কেউই সুখী নয়।
হ্যাঁ, কথা সত্যি। পৃথিবীতে কেউই সুখী নয়। সবারই কিছু না কিছু অপূর্ণতা আছে যেগুলো আমাদেরকে সুখী হতে দেয়না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, সন্ধান করতে করতে অবশেষে যেন পেয়েই গেলাম জীবনে সুখে থাকার একটি সহজ উপায়। আজকে আমি সেটি নিয়েই দুটি কথা বলবো।
আমাদের সব কষ্ট, অপূর্ণতা, অশান্তি সবকিছুর মাঝেও আমরা চাইলেই পারি সুখে থাকতে । আমি পেয়েছি জীবনে সুখে থাকার একটি সহজ উপায়। সেটি হচ্ছে “শুকরিয়া”। জীবনে যখন যেখানে যে পরিস্থিতিতিতেই থাকিনা কেন তার জন্য সন্তুষ্ট থাকা, তার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানানো।
আমাদের সবারই সমস্যা আছে কিন্তু তারপরেও সৃষ্টিকর্তা কিন্তু আমাদের সবাইকেই কিছু না কিছু দিয়েছেন । আপনার যা আছে তা কিন্তু অন্য কারও কাছে নেই । আপনার অনেক কষ্ট, অনেক বিপদ কিন্তু আপনার চেয়েও বিপদে ও কষ্টে এ পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন । তাদের চাইতেতো আপনি ভালো আছেন। তাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন আপনাকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন । আজকে তো আপনিও তাদের জায়গায়ও থাকতে পারতেন ।
আপনার টাকা পয়সা তেমন নেই, চাকরী নেই ? পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যাদের মাথার উপরে ছাঁদটা পর্যন্ত নেই । অনেক মানুষ আছে যারা দুবেলা পেট ভরে খেতে পায়না। তাদের চাইতে কি আপনি ভালো নেই ?
আপনার গায়ের রঙ কালো। অনেকে অনেক কটু কথা বলেছে আপনাকে যেগুলো মনে করে করে আপনি মানসিক যন্ত্রণা পান, কষ্ট পান । আপনার তো শুধু গায়ের রঙ কালো । এমন অনেকে আছেন যাদের নাক বোঁচা, অনেক খাটো, কেউ অনেক বেশী লম্বা কিংবা কোন শারীরিক ডিফেক্ট । আপনি একবার নিজের গায়ের রঙটা বাদ দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখুন, দেখবেন সৃষ্টিকর্তা আপনাকে অনেক সুন্দর বানিয়েছেন। হয়তো আপনার চোখ অনেক সুন্দর, আপনার নাক সুন্দর, আপনার ঠোঁট সুন্দর, আপনার স্বভাব সুন্দর । এই সৌন্দর্যের কাছে গায়ের রঙ তো কিছুইনা ।
আপনার বিয়ের অনেক বছর হয়ে গেল কিন্তু সন্তান হচ্ছেনা । অনেক দম্পতি আছেন যাদের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার পর কয়েক মাস, বছর এমন কি সাথে সাথেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে । সন্তান হবার পর তার মুখটা দেখার পরে, তাকে একটু কোলে নেবার পরে, তাকে হারানোর যে কষ্ট তার চাইতে কি আপনার কষ্ট কম না ?
আপনার ব্রেক আপ হয়েছে । যাকে অনেক ভালোবেসেছেন সে আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে । এমন অনেক আছেন যাদের স্বামী/ স্ত্রী দিনের পর দিন তাদের সাথে প্রতারনা করে যাচ্ছেন। কেউ তা জেনেও মেনে নিচ্ছেন সন্তান কিংবা সংসারের খাতিরে, কেউ দিচ্ছেন ডিভোর্স । বিয়ের পরে আপনাকে পাশে রেখে প্রতারনা করা কিংবা আপনাকে নিজের সাথে আরও অনেক বেশী জড়িয়ে নিয়ে ছেড়ে যাওয়া তার চাইতে কি এটা ভালো হয়নি যে বিয়ের আগেই সে আপনাকে ছেড়ে গিয়েছে ।
বিয়ের আগেই প্রেমিকের সংগে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরেছেন আপনি । কিন্তু সে আপনাকে তার স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছেনা । আপনি না পারছেন অন্য কাউকে বিয়ে করতে আর না পাচ্ছেন তার কাছে থেকে স্বীকৃতি । আপনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার, পুরোই অন্ধকার । সম্মান হারানোর ভয়, ভালোবাসার মানুষের কাছে থেকে অস্বীকৃতি, অসম্মান সব মিলিয়ে দুঃখ কষ্টের যন্ত্রণায় আপনি ভেতরে ভেতরে আগুনে পুড়ছেন । তারপরেও আল্লাহ এর কাছে শুকরিয়া জানান যে কষ্টটা শুধুমাত্র আপনার একার । যা বিপদ, অসম্মান, যন্ত্রণা সব আপনার একার উপর দিয়েই যাচ্ছে। আপনার পরিবারের নয় । আজকে আপনি যেমন কাঁদছেন বিষয়টি জানাজানি হলে আপনার সাথে আপনার বাবা মাও কাদবে, আপনার সাথে সাথে তাদেরও মান সম্মান নষ্ট হবে। তার চাইতে ভালো একা একাই কষ্ট পান আর নিজের পাপের সাঁজা ভোগ করুন নিজেই। পরিবার ভালো থাকুক ।
আপনার সংসারে অশান্তি । বউ আর মা এর মধ্যে বনিবনা হচ্ছেনা । আজকে এই অশান্তি কাল আরেকটি । পেরেশান না হয়ে সমাধান করার চেষ্টা করুন । মা যেমন আপনার, বউ ও আপনারই, তাই সমাধান আপনারই হাতে। কত বেকার ছেলে আছে ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করলে মা বউ নিয়ে সুখের একটা সংসার হত। কিন্তু সময়মত একটা চাকরীর অভাবে সেই সুখ থেকে সে বঞ্চিত । আপনার সবকিছু আছে । আপনি চেষ্টা করুন সেগুলো কে আরও সুন্দর করতে।
আপনি যদি মেয়ে হন, শ্বশুরবাড়িতে অশান্তি । শাশুড়ি, ননদ, ননাস আপনাকে অনেক কথা শোনায়, অনেক কাজ, আরও কত অশান্তি। তাদেরকে নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই আপনার । আমাদের আশে পাশেই অনেক মেয়ে আছে যারা ভালোবাসা দিয়ে শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলো কে আপন করে নিতে প্রস্তুত অথচ ঘর বাঁধতে পারছেনা তারা। একটা পরিবার একটা সংসারের জন্য ভেতরে ভেতরে কাতরাচ্ছে।
এমন আরও অনেক উদাহরন আছে আমাদের আশে পাশেই ।
সবসময় মনে রাখবেন, অনেক কষ্টে থাকার পরেও অবশ্যই আপনার কিছু না কিছু আছে যার জন্য আপনি আপনার সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাতে পারেন । আপনি এখন যেমন আছেন তার চাইতেও খারাপ অবস্থা আপনার হতে পারতো বা হতে পারে যে কোন সময় । তাই জীবনের যে কোন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করুন আর আল্লাহ কে ডাকুন । তিনি সবসময় আপনার পাশে আছেন।
আরও একটি কথা মনে রাখবেন । আল্লাহ যা করবেন সবসময় তা আপনার ভালোর জন্য করবেন। হয়তো ইনস্ট্যান্ট আপনি তা বুঝতে পারছেন না কিন্তু কাল পরশু অবশ্যই তা অনুধাবন করবেন। এ নিয়ে আমার নানুর কাছে নিচের গল্পটি শুনেছি
এক দেশে এক অত্যাচারী রাজা ছিল । কোন কারনে সে সেনাপতির হাতের একটি আঙ্গুল কেটে নিলো। আল্লাহর কাছে সেনাপতির অভিযোগের সীমা রইলো না । কেন অত্যাচারী রাজার বিচার তিনি করলেন না, কেন কোন অপরাধ না করেও তার আঙ্গুল খোয়া গেল ।
একদিন রাজা সেনাপতি আর বাকীদের নিয়ে শিকারে বের হল। পথ হারিয়ে রাজা আর সেনাপতি গিয়ে পড়লো এক উপজাতিদের খপ্পরে । উপজাতিরা তখন তাদের দেবীর কাছে বলি দেবার জন্য কাউকে খুজছিল। রাজা আর সেনাপতিকে পেয়েতো তারা বেজায় খুশী । তারা সিদ্ধান্ত নিলো রাজাকে বন্দী করে রেখে সেনাপতি কে বলী দিবে। সব বন্দোবস্ত করে যখন সেনাপতি কে বলী দিতে যাবে তখন দেখলো তার হাতের একটি আঙ্গুল নেই। একজন অঙ্গহীন মানুষকে বলী দেওয়া যাবেনা বিধায় তারা সেনাপতি কে মুক্ত করে দিল ও তার বদলে রাজাকে বলী দিল । তখন সেনাপতি অনুধাবন করলো যে আল্লাহ তার হাতের একটি আঙ্গুলের বিনিময়ে তাকে তার জীবন দিয়েছেন ।
একটি প্রবাদ আছে "সুখে থাকলে ভুতে কিলায়"
আসলেই অনেক মানুষকে সুখে থাকলে ভুতে কিলায়। সৌভাগ্য, সুযোগ মানুষের জীবনে বার বার আসেনা । তাই যখন সৌভাগ্য ও সুযোগ আসবে তখন ভুল করবেন না । ভুল করে পরবর্তীতে পস্তানোর চাইতে আগেই সাবধান হোন। আল্লাহ কে ভালোবাসুন, সৎ থাকুন ও সঠিক পথে চলুন। আর এই কথাটিও মনে রাখবেন " ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না"।
তবে সবকিছুর পরে একটি কথা কিন্তু সত্যি । মুখে কিংবা কলমে বড় বড় কথা বলা খুব সহজ। বাস্তব অনেক কঠিন । দিন শেষে রাতে ঘুমোতে যাবার সময় হিসেব পুরোপুরি উল্টো । অনেক কিছু যেটা আপনার বা আমার সাদ্ধের মধ্যে নেই, যেটা হলে হয়তো আমি বা আপনি পরিপূর্ণ সুখী হতে পারতাম তার জন্য অবশ্যই কষ্ট হবে কিন্তু তারপরেও এটা ভাবুন যে, এখন যে অবস্থায় আছেন তার চাইতেও অনেক খারাপ অবস্থায় আপনি থাকতে পারতেন, পৃথিবীতে অনেকের চাইতে আপনি অনেক ভালো আছেন, তাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন আপনাকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তাদের জায়গায় তো আপনিও থাকতে পারতেন । তাই যখন যেখানে যে অবস্থায় থাকুন আল্লাহ এর কাছে শুকরিয়া জানান । বলুন "আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি" । দেখবেন এ জীবনের দুঃখ, কষ্ট, বিপদ সবকিছুর পরেও আপনি মনের মধ্যে এক ধরনের শান্তি অনুভব করছেন, কারন আপনি এমন একজনকে পেয়েছেন আপনার পাশে যিনি কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবেন না, আপনার সৃষ্টিকর্তা । আর দুঃখ, কষ্ট যাই থাকুক এ জীবন কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়ে তো অনেক চিন্তা কিন্তু মৃত্যুর পরে যে জীবন তা তো কখনো শেষ হবেনা। সে জীবনে যেন সুখী হতে পারেন, ভালো থাকতে পারেন তার জন্য কিছু করছেন তো ?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




