বনবাতাসীকে চতুর্থ কালের কথা বলাতে সে ভয় পাইয়ে দিল। তার মতে, প্রথম ও দ্্বিতীয় কালের ভুল ছিল মার্জনাযোগ্য, সেজন্য তৃতীয় কালটা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছিল সুযোগ হিসেবে। কিন্তু সে কালেও যে ভুল করেছি তা অপরাধতুল্য। সুতরাং চতুর্থ কালে সংশোধনের সুযোগ হচ্ছে না। এখন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আমি অবশ্য শাস্তিভোগ করছি কিনা, সেটা নিশ্চিত নই। সারাদিন ক্লান্তিময় অফিসের পরে বাসায় জলদি ফেরার তাগাদাকে অগ্রাহ্য করে বনবাতাসী বললো, তুমি কোন অস্তিত্বে বিলীন হবে না। তবে কেউ কেউ অনুভূতির কাছে পরাস্থ হতে পারে। আমি তদ্রুপ। তুমি হারবে না, কিন্তু আমি হেরে যাবো!
আমি বলি, কিছু জয় মনে হয় আসলে হেরে যাওয়া। আজকে আমার মনে হচ্ছে অনুভূতির কাছে পরাস্থ হতে পারতাম যদি!
বনবাতাসী এবার নিশ্চিত যে আমি জয়ী হবই। আমি অবশ্য নিজের বিজয়কে অনিশ্চিত হতে দেখাতে চাই না। চতুর্থ কালের ডিউরেশন নিয়ে কথা হয়, কতটুকু প্রলম্বিত করা সম্ভব। যেখানে সামাজিক ইন্টারপ্রিটেশনে এমন সম্পর্ক ভন্ড, সেখানে আমি এটাকে পবিত্রপাঠ বলে মনে করি। কাল সংকোচন বা সীমাবদ্ধতার আমার কোন দরকার নেই। কিন্তু বনবাতাসী অস্তিত্ব সংকটে পড়বে হয়তো। তাই প্রশ্ন আসে স্থায়ীত্ব জেনে নেয়া বা স্বল্পস্থায়ী করা। আমি জানি ভবিষ্যত জানি না, বাস করি বর্তমানে, এখানে বনবাতাসী পুরোটুকু অস্তিত্বময় আমার হৃদয়ে।
এসে পাঠ থেকে বেড়িয়ে আমরা গিয়ে বসি ধানমন্ডি এম্পোথিয়েটারের মঞ্চে। লেকের দিকের সিড়ির শেষ ধাপটাতে। রাত্র দশটা। হাতে অল্প সময়। ফেরিআলাদের এখনও সরগরম অবস্থা। পাশে একটা টিনগ্রুপ গিটারে রেনেসার আজকের শিশু বাজাচ্ছে। শিক্ষানবিশদের জন্য গানটা সহজ বোধহয়, গায়কদের জন্যও। কারণ এমন আড্ডায় অনেককেই দেখেছি এগানটাকে বেছে নিতে। লেকে কয়েকটা প্যাডেলবোট চলছে। একটা কাপল বেশ ঘনিষ্টভাবে রাতকেলী করছে। প্যাডেলবোটটা চোখের সামনে দিয়ে সরে যেতেই পানি নিস্তরঙ্গ হলো। খানিকপরে একটা দমকা বাতাস। ঐপাড়ের গাছের ফাক গলে নিয়নের আলো এসে পড়েছে পানির উপর। চারিপাশটাতে অন্ধকার কিন্তু এক জায়গায় আলো। সে আলো হঠাৎ বাতাসে আগুণের ফুলকির মত দুলছে। চাঁদের অভাবে নিয়নধোয়া লেকের পানির দিকে তাকিয়ে থাকে বনবাতাসী। আমি তার তাকিয়ে থাকা দেখি।
একটা সময় ছিল দ্্বিতীয় কালে। আমার কলেজের ভেতরে বড় বড় তিনটে দীঘি ছিল। যেখানে ফিলোসফি ক্লাস হতো সেই টিনের ঘরগুলো ছিল মাঝখানের দিঘীর পাড়ে। টিনের ঘরের সিড়ি তখন আমাদের বৈকালিক আসরের জায়গা। কোনকোন দিন আমি তখন একাকী সেখানে গিয়ে বসতাম। সন্ধ্যা হয়ে রাত হয়ে যেত দিঘীর জলের চাঁদের খেলা দেখতে দেখতে। টিনের ঘরগুলোর পাশেই ছিল বনবাতাসীর ফিজিক্সের বিলডিং। সেখানে এক বিকেলে বনবাতাসীকে দেখে আমি তাকিয়ে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা। তারপরে আর চলতে ইচ্ছে করে না। বসে পড়ি টিনের ঘরের সিড়িতে। দ্্বিতীয় কালে আমি ছিলাম বনবাতাসীর ঝড়ো হাওয়া। তোমাকে চাই, তোমাকে চাই আর তোমাকে চাই বিক্ষিপ্ততা তখন সমস্ত সত্ত্বা জুরে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


