১.
বর্ষার সাথে মেঘের অনেক দিন দেখা নেই। দু'জনের গলায় গলায় মিতালী। মেঘ যেখানে বৃষ্টি সেখানে থাকতোই। কিন্তু বাধ সেধেছে আকাশ। বর্ষা আকাশকে ভালবাসে। আকাশ মেঘকে। মেঘ বিষয়টা জানতো না। বর্ষা যখন মেঘকে ঘটনাটা জানালো তখন মেঘ ঘটা করে আনন্দ প্রকাশ করলো। কেএফসিতে খেয়ে রাতভর ধানমন্ডি-গুলশান ড্রাইভ করলো। সংসদের সামনে এক জিপ ভর্তী ডিজুস পাংকদের সাথে রেসিং করলো। তারপরে মাঝরাত্রিতে ঠিক হলো আকাশকে চমকে দেবে। ধানমন্ডিতে আকাশের বাসার সামনে গিয়ে ফোন দিল। মেঘ ফোনে বললো, ঐ ছ্যারা, তুই তো গেছিস! তোর প্রেম হয়ে গেছে।
২.
আকাশ ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে সোজা হয়। মেঘ তাকে ফোন করেছে! ক'দিন যাবত এ বিষয়টা নিয়ে সে অস্থির ছিল। কিভাবে তাকে জানানো যায়! ফোন পেয়ে এবার সাহস বাড়লো। জিজ্ঞেস করলো, কিভাবে তুই জানলি?
আরে ব্যাটা, তুই কি মনে করিস? বর্ষা আমাকে বলেছে!
বর্ষা কিভাবে জানবে? আকাশ আকাশ থেকে পড়ে!
জানবে না বর্ষা! শোন, তোর বাসার সামনে আমরা, এখনই চলে আয়!
আকাশ চশমাটা নাকে ঝুলিয়ে লাফিয়ে নামে। লিফটের বোতাম জি তে না চেপে একে চাপে। তারপরে এক এ নেমে দৌড়ে গ্যারেজে নামতে গিয়ে সিড়ি দেখে অবাক হয়। ধুসসালা, এটা কোন ফ্লোর! তারপরে তিনসিড়ি একধাপে পার হতে হতে সিকিউরিটির গেট গলে সোজা রাস্তায়।
৩.
মেঘ গাড়ীর বনেটে। বর্ষা ড্রাইভিং সিটে। আকাশ গিয়ে মেঘের সামনে দাড়িয়ে কথা গুলিয়ে ফেলে।
এত রাত্রে?
প্রেমের কথা জানাতে দেরী করতে হয় না!
আকাশ কাচুমুচু হয়ে যায়। এতটা সাহসী ভাবতে পারে নি মেঘকে।
তোমার জন্য একটা স্বেত পাথরের হাতী কিনেছি। হাতির শুরে একটা হার্ট লটকে আছে। প্রথম যেদিন তোমাকে ভালোবাসার কথা জানাবো সেদিন সেটা তোমাকে দেব বলে। ভুলে গেছি নিয়ে আসতে।
মেঘ বনেট থেকে লাফিয়ে নামে। আরে ব্যাটা, আমি মেঘ! তুই চশমাটা ঠিক করে পড়!
আকাশ চশমা খুলে চোখ রগরিয়ে মেঘকে দেখে।
তুই মেঘই তো! বর্ষা তো গাড়ীর ভেতরে!
তাহলে আমাকে দিবি কেন বলছিস! যা নিয়ে আয়, বর্ষাকে দে গিয়ে, আমি একটা ছবি তুলে রাখবো!
আকাশ চশমা ঠিক করে। তার মাথা ঘুরতে থাকে।
বর্ষাকে কেন? আমি তো তোকে ভালবাসি!
৪.
বর্ষা উইন্ডো দিয়ে মাথা বের করে ছিল। এবার সেটা ভেতরে সেঁধিয়ে যায়। মেঘের মাথা ঘোরে, আকাশের মাথা ঘোরে। মেঘ রাস্তায় বসে পড়ে। নিশ্চুপ তিনটা প্রানী রাতের নিস্তব্ধতায় পাথর হয়ে থাকে। বর্ষা দরজা খুলে বের হয়ে আসে। দুজনের মাঝখানে দাড়িয়ে বলে, একটু ভুলবোঝাবুঝি হয়ে গেছে। অসুবিধা নাই। তারপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, মেঘকে যখন ভালবাসিস তখন হাতিটা নিয়ে আয়!
মেঘ ঝাটকা মের ওঠে। হাতি নিয়ে আসবে মানে? আমি কি ওকে ভালবাসি নাকি?
আকাশে মেঘ গর্জন করে ওঠে। সে হুংকার ছাড়ে, তুই আমাকে ভালবাসিস না?
না, মেঘের মাথায় কিছু ঢোকে না। সে বুঝতে পারে না, আকাশের ভালাবাসা জেনে সে খুশি হয়েছে নাকি মেঘের আশা ভেঙে যাওয়াতে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এখন সে তা বুঝতে চায় না। সে বলে, না, আমি আকাশকে ভালবাসি না!
৫.
বর্ষা, মেঘ আর আকাশ তিনজনেরই ক'দিন যাবত মুখ দেখাদেখি নেই। নেই কোন ফোন। আকাশের স্বেতপাথরের হাতি তার বিছানায় শুয়ে থাকে। শুধু শুরের মাথায় হার্টচিন্থ তার বুক খাবলে খাচ্ছে। বর্ষা মেঘকে ফোন করেছিল, কিন্তু মেঘ কেমন কাটা কাটা কথা বলেছে। আকাশকে ফোন করতে গিয়েও করে নি। তার মনে হচ্ছে মেঘের নীরবতাই তার গভীরে আকাশের জন্য ভালবাসা তৈরী হবার লক্ষণ। বৃষ্টির হৃদয়ে একটা ক্ষত, কিন্তু মেঘের হৃদয়ে দুইটা ক্ষত। সে বৃষ্টির কাছে নিজেকে অপরাধী মনে করে। একটা ফোন করলে সব ঠিক হয়ে যেত। ফোন তুলে বৃষ্টির নম্বর ঘুরায়। ওপাশে বৃষ্টির স্বর ধ্বনিত হয়। বৃষ্টি বলে, ফোন তাহলে করলি! বুঝতে পারছি তুই আকাশের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিস!
মেঘ নিশ্চুপ। বৃষ্টি বলে, সেটাতো খারাপ কিছু নয়, আমি তা মেনে নিয়েছি। তুই আকাশকে জানিয়ে দে!
বৃষ্টি, বেশী ভাল হবার চেষ্টা করিস না। অত উদারতা দেখাতে হবে না। আমি জানি তোর মনে কি ঝড় বইছে! আমি তোকে মুখ দেখাতে পারছি না!
বৃষ্টি হেসে ওঠে হা হা করে। দেখ জীবন একটা নদী। এটাকে আগলে রাখতে নেই। তুই আকাশকে বল! ভেবে দেখ বেচারার উপর দিয়ে কি বইছে?
৬.
আকাশ, মেঘ ও বৃষ্টি আবার এক হয়েছে। একটু আগে আকাশ মেঘকে স্বেতপাথরের হাতিটা দিয়েছে। আইসক্রীমের দোকানের ছেলেগুলো হাত তালি দিয়ে আয়োজনটাকে আনুষ্ঠানিক করে দিয়েছে। মেঘ আকাশের জন্য তার একটা ছবি সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে এসেছে। সে ছবি দেখে আকাশের চোখ সরতেই চায় না। বৃষ্টি বলে, এখন থেকে এ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকবি সবসময়!
আকাশ বলে, তাতো বটেই! তবে বৃষ্টি তুই একটা ভালমেয়ে।
বৃষ্টির চোখে বরষা নাই। আনন্দে নেচে ওঠে। জড়তাহীন। বলে, হইছে আর বেশী অয়েল দিতে হবে না! এখন যা, তোরা একটু ঘুরে আয়, এরপরের পর্বে আমি থাকলে জমবে না!
মেঘ ও আকাশ তাই ভাবছিল।
৭.
আকাশের গাড়ী চালানোটা ভীতিকর। কিন্তু ইস্টার্ন বাইপাসের রাস্তা পর্যন্ত আসতে সে কোন কথা বলেনি। মেঘও নিশ্চুপ। রাস্তার পাশে গাড়ী রেখে দুজন গিয়ে ঘাসের উপরে বসে। দূরে ঢাকার বড় বড় বিল্ডিংগুলোর চুড়া দেখা যাচ্ছে। কোন এক অজানা কারণে তাদের কোন কথা হচ্ছে না। দূরের নগরীর মাচায় হালকা কিছু মেঘ দেখা যাচ্ছে।
মেঘ উসখুশ করে। ঢাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ খুটছে নখ, মেঘ ছিড়ছে ঘাস।
তখনও ঢাকার আকাশে বৃষ্টি হচ্ছে।
আর নতুন এক প্রেমিকজোড়ার জীবনে মেঘের আছড় পড়েছে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






