somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৭১ : বীরাঙ্গনা অধ্যায়

২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(৪০০,০০০ বীরাঙ্গনাদের মধ্যে একজন; ছবি : Naib Uddin Ahmed/Autograph ABP & Guardian UK)

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অজির্ত হয়েছে স্বাধীনতা, একথাটুকু বলতে খুব বেশী সময় লাগেনা । অথচ সেসময়ে বাস্তবতা যে কতটা ভয়াবহ ছিল! যে কোন যুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি অন্য যে ঘটনাটি দেদারসে হয়ে থাকে তা হলো নারী-ধর্ষণ । আমাদের নয় মাসের অর্জিত স্বাধীনতার সংগ্রামের পেছনে রয়েছে পাকসেনা আর রাজাকারদের সেরকমই কিছু কু-কীর্তি ।
***

’ইস্ট পাকিস্তান: দ্য এন্ড গেম’ বইটিতে লেখক ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর একটি বির্তর্কিত উক্তি ফাঁস করেন যেখানে একাত্তরে সংগঠিত ধর্ষণ কীর্তিগুলোর সাফাই গাইতে জেনারেল নিয়াজী বলেন - ”আপনি এরূপ আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মুত্যু বরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর যৌন চাহিদা নিবারন করতে যাবে ঝিলামে(ঝিলাম পাঞ্জাব প্রদেশের সর্ববৃহৎ নদ)” !

***


Brownmiller লিখেছিলেন, একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোন ঘটনা ছিলনা আদৌ; আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে পঁচাত্তর বছরের নানী-দাদীর বয়সী বৃদ্ধাও স্বীকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাকসেনারা কেবল ঘটনাস্থলে তাদের পৈশাচিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য। রাতে চলতো আরেক দফা নারকীয়তা । কেউ কেউ হয়ত আশিবারেও বেশী সংখ্যক ধর্ষিত হয়েছেন ! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা কল্পনাও করা যাবে না । (Brownmiller, p. 83)

***

নয় মাসের যুদ্ধে সংগঠিত ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বাঙালি মা-বোনদের লাঞ্ছনার কেবল প্রাথমিক ধাপ ছিল যেন। প্রধামন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নির্যাতিতা বাঙালি মা-বোনদের যথাবিহীত সন্মানপূর্বক বীরাঙ্গনা উপাধি প্রদান ছিল সমাজে তাদের পূনর্বাসন প্রকল্পের একটি সূচনা । এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, বিবাহিত মহিলাদের তাদের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং অবিবাহিতা ও বিধবাদের বিবাহ সম্পন্ন করা । তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে মেয়েদের পর্দানশীলতা এবং শুদ্ধতাই প্রধান সেখানে এসব ধর্ষিত মেয়েদের বিবাহের প্রকল্পটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্য দিকে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও তারা সরকারের কাছে এর বিনিময়ে যৌতুক দাবী করে বসে। (Brownmiller, Against Our Will, p. 84)

***

যদিও হাজার হাজার হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণের পর পরই হত্যা করা হয়েছিল, তবে কিছু সংখ্যক সুশ্রী রমণীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে । যদি কেউ পরনের কাপড় ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করত, তাহলে তাদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা হতো । কেউ যদি তাদের লম্বা চুল পেঁচিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করত, তবে তাদেরকে ন্যাড়া করে দেয়া হতো । এসব নির্যাতিতারা যখন পাঁচ-ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা হলে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে উপহাস করা হতো, ”যখন আমার পুত্র ভূমিষ্ট হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে” । (Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen).

***

পাঁচ সেনা সহ মেজর আসলাম ৩রা অক্টোবরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির রোকেয়া হলের মহিলা সুপারিনটেনডেন্টকে তেজগাঁও ক্যান্টনমেন্টে নাচ-গান করার জন্য কিছু মেয়ে পাঠাতে বলেন। সুপারিনটেনডেন্ট জানান যে বেশীর ভাগ মেয়েই হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে এবং মাত্র চল্লিশ জন ছাত্রীই অবস্থান করছে; হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে তিনি মেয়েদেরকে এধরনের কাজে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান । রুষ্ঠ হয়ে মেজর আসলাম সেদিন ফিরে যায় এবং পরবর্তীতে ৭ই অক্টোবর, প্রায় রাত্রি প্রায় আট ঘটিকার সময় মেজর আসলাম এবং তার বাহিনী হোস্টেলের দরজা ভেঙে ফেলে মেয়েদেরকে টেনে-হিচঁড়ে বার করে এনে অসহায় সুপারিনটেনডেন্টের সামনে নির্যাতন করে। এই পৈশাচিকতা এতটাই উন্মুক্তভাবে করা হয়েছিল যে এই সংবাদ করাচীর একটি পত্রিকাতেও (Dawn) প্রকাশিত হয়।



স্বাধীনতার সাত দিনের মধ্যে পাকসেনা কর্তৃক অপহরিত প্রায় তিনশত মেয়েদের ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৬শে ডিসেম্বর, মুক্তি বাহিনী এবং যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং ঢাকার আশেপাশের অন্যান্য ছোট শহরগুলো থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রায় ৫৫ জন অস্বাভাবিক অসুস্থ এবং অর্ধ-মৃত মেয়েদের উদ্ধার করে রেড ক্রস (Red Cross) । (Genocide in Bangladesh (1972) by Kalayan Chaudhury, Orient Longman, pp 157-158)

***


”আমরা বাঙালি নারীদের উপর পাকসেনাদের ধর্ষণ, নির্যাতনের বহু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি । পাহাড়তলী, চট্রগ্রামের শহীদ আকবর আলী’র পুত্র রাউফুল হোসেইন সুজা ফয়জ লেকে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞে তার পিতার লাশ খুঁজতে যান। তারা সেখানে প্রায় দশ হাজার(১০,০০০) বাঙালির লাশ দেখতে পান যার বেশীর ভাগই নির্মমভাবে জবাইকৃত । তারা প্রায় চুরাশি (৮৪) জন অন্ত:স্বত্তা রমনীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন যাদের উদর ছিন্নভিন্ন ছিল। এই রকম নির্মমতার প্রতিচ্ছবি ছিল প্রায় সারা বাংলাদেশে। ” (The Rape of 71: The Dark Phase of History -Dr. M A Hassan)

***

”ডিসেম্বর এবং মার্চ এখন যেন একটি উৎসব পালনের মাসে পরিণত হয়েছে, এসময় আমরা অনুতাপ করি কেন ১৯৭১ এ ঘটে যাওয়া গনহত্যা এবং গন-ধর্ষণের বিচার আজো হলোনা ! বিচারের এই ব্যর্থতা কিন্তু প্রমাণের অভাব নয় কোনক্রমেই ”। (The Lessons We Never Learn - By: Hameeda Hossain )

***

"একাত্তরে মা-বোনদের সম্ভ্রম নষ্টকারী, হত্যাকারী সেইসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই"

***

সূত্র : জেনোসাইড বাংলাদেশ

কৃতজ্ঞতা : এই পোস্টে অনেক ব্লগার বীরাঙ্গনাদের উপর বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের ভিডিও লিংক দিয়ে যাচ্ছেন, যা পোস্টের অনুভূতিকে আরো জোরালো করে তুলেছে । পাঠকদের কাছে অনুরোধ ভিডিওগুলো দেখুন । লিংক দেয়ার জন্য ব্লগারদেরকে অশেষ ধন্যবাদ ।


-------------------------------------------------
এই লেখাটি ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত নারী বিষয়ক কাগজ ”নারী”র চতুর্থ সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০১১) -এ প্রকাশিত হয়েছে
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১২:৩৯
২২৪টি মন্তব্য ১২৬টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই তো আছি বেশ

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১২:২১




বেশ হয়েছে বেশ করেছি
কানে দিয়েছি তুলো
জগত সংসার গোল্লায় যাক
আমি বেড়াল হুলো

আরাম করে হাই তুলে
রোজই দেখি পেপার
দেশ ভর্তি অরাজকতা
আচ্ছা!! এই ব্যাপার

কার ঘরেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবনিক~২য় পর্ব (তৃতীয় খন্ড)

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:৩৯


আগের পর্বের জন্যঃ Click This Link
ভোরের শুরু থেকে রাতের দ্বি-প্রহর পুরোটা সময় আমার এলিনার কাছে পিঠে থাকতে হয়। অল্প বয়সীরা যা হোক আকার ইঙ্গিত আর অতি ভাঙ্গা ইংরেজি বুঝে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্বিষ্ট

লিখেছেন শিখা রহমান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৪:৫৮


আজকাল কোন কিছুই আর অবাক করে না।
রাজপথে ফুটপাতে হেঁটে যাওয়া অগণিত মানুষের গল্প
খুব সাদামাটা মনে হয়;
কোন কবিতাই অবাক করে না আর,
উপমা-উৎপ্রেক্ষা শব্দের ব্যাঞ্জনা আশ্চর্য করে না আজকাল।

মহামারীতে উজাড় হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথায় কথায় ধর্মকে গালি ও উপহাস করবেন না.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৫:১২

কথায় কথায় ধর্মকে গালি ও উপহাস করবেন না.........

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘুদের উপর অনাকাংখিত হামলার জন্য যে কোন ধর্মকে গালাগালি করা বা ধর্মকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন।

১। মুসলমানদের মধ্যে একদল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মীয়গ্রন্হ কে কিনতে পারবে, বহন করতে পারবে, কোথায় রাখতে পারবে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২১



কে ধর্মীয় বই কিনতে পারবেন, পড়তে পারবেন, কোথায় রাখতে পারবেন, কোথায় ফেলে দিতে পারবেন, এই নিয়ে কোন নিয়ম কানুন আছে?

আমি বাংলাদেশের কথা জানি না, নিউইয়র্কের কথা বলি;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×