ইথিকার এনজাইম
মামুন মাহফুজ।
আমি সারাদিন পড়ে থাকি আমার ল্যাবে। একটা সামান্য গবেষণা নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করি। ফলাফল কী হবে সে আমি জানি; কিছুই না।গবেষণাটা নিয়ে কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারছি না আইডিয়া চুরি হবার ভয়ে। স্বয়ং টীচাররা পর্যন্ত ছাত্রদের আইডিয়া চুরি করে নিজের নামযশ বাড়ানোর পায়তারা করে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফার্স্টকাস ফার্স্ট হয়েছিল লায়েক। লায়েক গিয়েছিল স্যারের কাছে; ওর মাথায় একটা নতুন আইডিয়া এসছে, এর উপর কাজ করা যায় কিনা পরামর্শ করতো।
স্যার সবশুনে বললেন-দেখো লায়েক তুমি ডিপার্টমেন্টের মেধাবী একজন ছাত্র! আমরা তোমার কাছে কতবেশি প্রত্যাশা করি আর তুমি কিনা খুঁেজে খুজে বের করলে এমন একটা বিষয়? এতো সিলি! তুমি এর ইমপ্যাক্টটা একবার ভেবে দেখবা না?
লায়েক সিনপসিসটা তখনও লিকিতভাবে উপস্থাপন করেনি। স্যারের মন্তব্য শুনে আর সাহস হলো না এগুনোর। পরে অন্য একটা বিষয় নিয়ে ‘সিগেলা ডিসেন্ট্রিয়া’র উপর গবেষণা করে, যা এখনও শেষ হয়নি- আলোর মুখ দেখেনি।
ঠিক এর কয়েকমাস পরই দেখা গেলো লায়েকের সেই থিমটা মার্কেটে চলে এসছে। আর এর কৃতিত্ব সম্পূর্ণই স্যারের। লায়েক যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। কীভাবে প্রমাণ করবে যে আইডিয়াটা ওর ছিল! ওতো কোনও ফর্মাল সিনপসিসও নেয়নি! গিয়েছিল জাস্ট স্যারের পরামর্শ নিতে। সেই ঘটনা থেকে শিা নিয়ে একা একা চালিয়ে যাচ্ছি গবেষণাটা। ফলাফল শূন্য জেনেও থেমে যেতে পারছি না। আসলে আমাদের দেশে উচ্চতর কোনও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্টস আসছে না। যে কোনও খসড়া পেটেন্ট তৈরী করে সেটাকে পরীার জন্য পাঠাতে হয় ইউএসএ-তে। যেতে আসতে প্রচুর সময়, প্রচুর খরচও যায়। তবু প্রতিদিনই কিছু ই¤প্র“ভ চোখে পড়ে, যা দেখে আর থামতে পারি না। ভাবি- দেখি না আরেকটু চেষ্টা করে।
এদিকে বাড়ির অন্যান্যদের কার কি অবস্থা তা একদমই খোঁজ নেওয়া হয় না। কয়দিন আগে আমার এক কাজিন ইথিকারা এসেছিল। ছাত্রজীবনে যে ইথিকার জন্য“কতরাত করেছি ফজর জাতীয়” কবিতা লিখতে বাধ্য হয়েছি। বাসা থেকে বেরিয়ে উ™£ান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় হেঁেটছি আর চাঁদের সাথে চ্যাটিং করেছি। সেই ইথিকা এসে ১৫দিন থেকে গেলো। ওর সঙ্গে বসে একত্রে দুটো কথা বলার সময় পর্যন্ত আমার হলো না। ইথিকা আমার ল্যাবের গ্লাস দরজায় এসে দাঁড়ালো, আমি ওকে দুইমিনিট আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে ভুলেগেছি দরজা খুলতে। কতসময়পর খেয়ার হলো বলতে পারব না, পরে খুলে দেখি ও নেই। ও হয়ত আশা করেছিল আমি পরে যাবো। তাও আর হয়ে ওঠেনি। আরওও আর আমার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। খুব অভিমানিনী মেয়ে ইথিকা। খুব মেধাবী। মেধাবীরা একটু জেদি এবং অভিমানী হয় বোধয়।
ইথিকারা চলে যাবার পর আম্মু একদিন বলে ইথিকা এবার যাবার সময় খুব কান্নাকাটি করেছে। কেন ঠিক বুঝলাম না, তুই কি কোনও...
- ও গেছে কখন?
- ত্ ুজানিস না? যাওয়ার সময় তোকে না বলতে গেলো!
আমার মনে পড়লো! হ্যাঁ ও আমার দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি খুলবো খুলবো ভেবে হাতের ইলিমেন্টটা সামলাতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম, আর ও চলে গেলো- আর এই অপমানেই যাওয়ার সময় কেঁদে ভাসিয়েছে।
হঠাৎকরেই বাসায় একটা অরাজক পরিস্থিতি শুরু হলো। আমার বোন এসেছে বেড়াতে। ওর ছোট মেয়েটাকে সামলানোর জন্য। তিনচারদিন আগে খাঁচা খুলে খাবার দিতে গিয়ে পাখিটা উড় যায়। তারপর থেকে ওর সেকি কান্না! আপু বলে তুই চালাকি করে খাঁচা খুলতে গেলি ক্যান? ও বলে –কুরব নাতো কী করবো? আমার পাখি আমাকে ছেড়ে যাবে কেন? পরদিনই আবার একটা পাখি এনে দেওয়া হলো ১৫০০টাকা দিয়ে। পাখিটার ঝুটিটা খুব সুন্দর। এটাকে নিে য়দুদিন খা৭চায় আটকে খাওয়ানোর পর বের করে আনল নিজের সঙ্গে খেলা করার জন্য। পাখি কি আর ওর সঙ্গে খেলতে বসে আছে? সেতো ছাড়া পেয়েই দৌড়! এখন আবার কান্নাকাটি করছে।
আমার ভাগ্নিটার নাম তন্বি। ওর কথা হলো পাখিটাকে সারাদিন খাঁচায় আটকে রাকতে ওর খারাপ লাগে। ওর দুঃখ হলো-ও পাখিটাকে এতা ভালোবাসে তবু পাখিটা ওকে ছেড়ে যায় কেন? ওর আম্মু বলে- বেশি ভালোবাসরে সেতো দুঃখ দেবেই। তন্বি তবু পাখিটাকেই বেশি বিশ্বাস করে। ওর ধারণা পাখিটাও একদিন ওকে ভালোবাসবে, সেদিন আর ওকে চেড়ে যাবে না।
অবশেষে আমি ল্যাব ছেড়ে পথে নামলাম ওর জন্য পাখি কিনে আনতে। একাই গেলাম। ওর মতো পিচ্চিদের সামাল দেওয়া আমার মতো বিজ্ঞানীর স¤ভব না। আর আপু আম্মু কেউ ভরসাও পান না। একবার বাড়িতে মেহমান এলা, কেউ নেই তখন্ বাধ্য হয়ে আমাকে যেতে হল্ োবাজারে গিয়ে হঠাৎ হাত-পা কিছু নেই একলোক রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পয়সা তুলতে তুলতে যাচ্ছে। শুধু মুখটা দিয়ে আজব এক সাউন্ড তুলে সে যাচ্ছে। আর লোকজন যে যা পারচে নিজেদের সৌভাগ্যের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ থালায় পয়সা ফেলছে। লোকটা বিশেষ কায়দায় থালাটাকেও গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার চিন্তা হলো এই লোকটা কায় কি করে, প্রাকৃতিক কাজ সারে কী করে, ইত্যাদি। দেখার জন্য আমিও লোকটার সঙ্গেসঙ্গে আমিও আগাতে লাগলাম, ফলাফল যা হবার তাই হলো। বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা। ততণে মেহমান গিয়ে হয়ত আবার নতুন কোথাও যেতে রওনা দিয়েছে। এ কারণেই কেউ আমাকে কোনও কাজ দিতে ভরসা পান না। তন্বি যদিও একবার বলেছিল আমার সঙ্গে যেতে চায়। কিন্তু আপু নিশ্চিত আমি ওকে মনের ভুলে ফেলে চলে আসবো।
পাখি কিনতে গিয়ে মার্কেটে দেকা হলো ইথিকার সঙ্গে। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম
-ইথিকা তুমি?
-ওও অবাক! বলে আপনি? এখানে কোথায় এসেছেন?
-মার্কেটে
-এতোদূর! আপনাদের বাসার কাছেইতো বড় মার্কেট!
তখন আমার খেয়াল হলো আমি হাঁটতে হাঁটতে সাড়ে তিন কিলো দূরে ইথিকাদের বাড়ির কাছের মার্কেটে চলে এসেছি।
ইথিকা বলল কী কিনতে এসেছেন?
- পাখি
- গিনিপিগ?
- না , তন্বি কাঁদছে। ওর দুটি পাখি চলে গেছে।তারপর আবার কিনে আনছে যেগুলো সেগুলোও চলেগেছে।
- অবশেষে তন্বি পারল আপনাকে বাড়ির বাইর করতে! চলেন বাসায় চলেন,
- চলো!
- আমাদের বাসায়
- ওহ! আজ না, তন্বি কাঁদছে, আমি পাখি নিয়ে যাবো তারপর থামবে।
- কই পাখিতো এখনও কিনলেন না?
- চলোতো একসঙ্গে কিনি!
মার্কেট ঘুরতে ঘুরতে ওর সঙ্গে কথা বলছি, কিন্তু বেশিরভাগ কথাই আমি শুনতে পাচ্ছি ন্ ামাঝেমাঝে এমনিতে হু হ্যাঁ করি। মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছে কেমন করে পাখিকে ছেড়েও ধরে রাখা যায় এই চিন্তা। ইথিকা কথা বলে মজা পাচ্ছে না। বলে
-কী হলো?
Ñকই কি?
আপনি আমার কথা শোনেননি?
শুনছিতো!
বলেনতো আমি কী বলেছি?
আমি বলতে পারলাম না। ও ােভের সঙ্গে বলল-কলাগাছ! একটা কলাগাছের পাল্লায় পড়লাম।
আমার ধারণা ইথিকা আমাকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসে না, আমাকে ওর জীবনের সঙ্গী ভাবতে চায়। যে কারণে আমার অনেক ব্যবহার ওকে কষ্ট দিলেও মেনে নেয় একসময়। আমি ওকে বিয়ে করবো কি করবো না , ভাবছি না, আমি ভাবছি টঝঅ থেকে কখন রিপোর্টটা আসবে। কখন আমি চমকে উঠবো নিজের আবিষ্কারে। আমার কাচে ার্থহীন মনে হয় যারা মেয়েদের ভালোবাসা পাবার জন্য যাখুশি করে। অথচ ওরা যদি একটু বুদ্ধি করে ফিরোমিন বা পিটুইটারি, অথবা মস্তিষ্কের দুটো অংশকে একটু এদিক ওদিক করে দেয় তাহলেইতো ঘৃণাটা ভালোবাসায় পরিণত হয়ে যেতে পারে। আমার ধারণা আমি আরেকটু পরিশ্রম করলে ঔষধ বা পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলতে পারবো। প্রয়োজনে ল্যাপারোস্কোপিক মেশিনের মতো কোনও মেশিন দিয়ে দূর নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে ব্রেইনে একটা অদলবদল করে দেয়া যেতে পারে। এতে অবশ্য ডানহাতি বাহাতি হয়ে যেতে পারে।। তাতে কি?
-কী হলো উঠছেন না?
ইথিকা সি.এনজি নিল। সম্ভবত আমার সঙ্গে যাবে।আপু এসছে এটা শুনে ও কি আর না যেয়ে পারে? আর তন্বিতো ওর দ্বিতীয় কলিজা। ও বলে ওর কলিজা দুটো। একটা পেটের ভিতর আর একটা বাইরে। সিএনজিতে উঠে আমার খুব ঘুম পেল। ঘুম ভাঙর ইথিকা যখন ওর মুখের এনজাইমগুলো আমার মুখে ছড়িয়ে দিচ্ছির তখন।
বাসায় এসে আবার ল্যাবে ঢুকলাম। ইথিকা বলল ঘুমাতে। আমি নাকি গাড়িতে ওর গায়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমি ইথিকাকে বললাম আমি ল্যাবথেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তুমি কোথাও যেও না! ওর পাখিটাকে একটু দেখে রেখো। ও বলল- আমি রাতে থাকব কিন্তু আপনি যদি কথা দেন ল্যাবছেড়ে আমাদের সঙ্গে কাটাবেন। আমি আচ্ছা বলে র্যাবে ঢুকলাম। তাড়াতাড়ি বেরুবো বলে। নয়টায় ইথিকা দরজায় দাঁড়ালো। সঙ্গেসঙ্গে খুলে দিলাম। ও বলে আমার কিচু ভাললাগছে না, একটু আসেন না। অথবা আমি আসি ভিতরে? বলে ও ভিতরে ঢুকে পড়ল; ঢুকেই বলছে-বাপরে এতোসব মেডিসিন? আমার কেমন লাগছে বলে ও আমার গায়ে পড়ে গেল। তারপর সেই গাড়ির মতো এনজাইম বিনিময় করল। আমি ভাবলাম তীব্র ভালোবসার প্রতিক্রিয়া বোধহয়। ওকে দাঁড় করিয়ে কাজ শুরু করলাম। একটা নতুন কাজ করছিÑ একটা নতুন আইটেমের ফুড বানাচ্ছি।যেটা খেলে পাখি আর কোনওদিন ফাঁকি দেবে না। উড়ে গিয়েও আবার এই খাবারের টানে চলে আসবে। যেমনিভাবে নেশাখোররা নেশার আস্তানায় ছুটে যায়।
খাবারটা একটা পাখিকে পরীামূলকভাবে খাওয়ানো দরকার। কিন্তু এতরাতে পাখি পাবো কোথায়? দিন হলে একটা কাককে খাইয়ে দেখা যেত। কিন্তু রাতে কী করা যায়? তন্বির পাখিটাকে দিলে যদি কিছু হয়?
সারারাত আমি আর ল্যাবে ঢুকতে পারলাম না। সকালের অপো করলাম। রাতে ইথিকা মনের সাধ মিটিয়ে আমাকে নিয়ে ফুর্তি করেছে। আর আমি কখনও তন্দ্রাচ্ছন্ন, কখনও ঘুমে অচেতন। ভোরে কাকের ডাকে ঘুম থেকে উঠেই খাবারটা ছিটিয়ে দিলাম। তারপর হাঁটতে বেরুলাম। ইথিকা এলা পেছন পেছন ব্রাশ নিয়ে। বলছে আবার হাঁটতে শুরু করলেন? এবার নিশ্চই সৌদি আরব চলে যাবেন! ওর ধারণা বাংলাদেশ থেকে সৌদিআরব সবচে দূরে। দূর বোঝাতে ও সবসময় সৌদিআরব বলে। আবার এও হতে পারে ওর ধারণা বাংলাদেশ থেকে সৌদি পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায়।
খাবার শেষহলে কাকগুলো তাড়িয়ে দিলাম, উড়ে গেলো। আমি গেলাম গোসলে। তারপর ইথিকাকে নিয়ে একটু বের হতে হবে। ও নাকি কী কিনবে তন্বির জন্য। তন্বি বোধয় উসিলা, ও জানে তন্বির কথা বললে আমি না করতে পারব না। ল্যাবটাকে একনজর দেখেই চলে আসবো ভেবে একটু ভিতরে গেলাম। কিছুতেই কাজে জড়াবো না ইচ্ছা থাকলেও কেমনকরে যেন জড়িয়ে গেলাম! একটুপর ইথিকা এসে আমাকে টানতে টানতে ল্যাব থেকে বের করলো কী একটা জিনিস দেখাবে!
দুয়ারে অনেকগুলো কাক এস কা কা করছে। নিশ্চই খাবারের লোভে? আমি বুঝেগেছি এ নিশ্চই খাবারের প্রভাব। সাহস করে একটু খাবার তন্বির পাখিটাকেও খাইয়ে দিলাম তারপর মোটমুটি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখে ছেড়ে দিলাম। পাখিটা এঘর ও ঘর ঘুড়ে বেড়ালো আর বারবার খাবারের কাছে ফিরে এল । আমিতো অবাক! সফল হলো তবে আমার আবিষ্কার?
এরপর থেকে তন্বি তার ইচ্ছেমতো পাখিটিকে নিয়ে খেলা করে। পাখি আর তাকে ছেড়ে যায় না। হায়রে পাখি তুইও বুঝলি নেশা কাকে বলে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

