বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আটশো কোটি টাকা এবং পরবর্তিতে আরও ৬ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা যে কায়দায় চুরি হলো সেটিকে হলিউডি 'ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াসের' নকলে বলিউডি 'ধুম' সিনেমার রিহার্সেল হিসেবে দেখুন। পুরোপুরি 'ধুম-4' স্টাইলে নেয়া হয়েছে যেখানে হ্যাকিং এর কোনই সাইন পাওয়া যায়নি। কিছু চেনা চোরের লকলকে জিহ্বার ছাপ পাওয়া গিয়েছে। হালকা ট্রেইলর হিসেবেও দেখতে পারেন।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই বিপুল পরিমানে অর্থ সহি সালামতে পৌঁছে দেবার জন্য আওয়ামী রাজ ফিল্ম কোম্পানিকে অস্কারের জন্য মনোনয়ন করা যেতে পারে। সেখানে শিশু চরিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মাল মুহিত সাহেবকে লালু ভুলু বিস্কুট প্রদানের আহবান জানাচ্ছি।
"ধুম মাচালে... ধুম মাচালে... ধুম" গানের তালে তালে বাঙ্গাল নামের কাঙ্গাল দর্শকদের ঝায় ঝাঁকুনি শেষে ক্লান্ত হয়ে গেলে টিভির রিমোট চেপে ক্রিকেট খেলা প্লে করে দিন। এরপর আজীবন পায়ের উপর পা তুলে আওয়ামিজমের মধুখোর হয়ে থাকতে পারবেন।
এবং মাঝে মাঝে রিকশাওয়ালার শরীরের ঘাম, কড়া পড়ে যাওয়া হাত আর ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট খাওয়া দেশের উত্তর প্রজন্মের ছবি দেখে "কেউ এড়িয়ে যাবেন না" টাইপের স্ট্যাটাসে লাইক দিয়ে চুক চুক করে দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক সাজা যাবে।
আমি আশ্চর্য্যজনকভাবে লক্ষ্য করছি, বিশাল পরিমান টাকা লুটের ঘটনাতে আওয়ামী প্রগতিশীল শাহবাগীদের বিশাল বাঘা বাঘা দেশপ্রেমিক লেখক মহল এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করছেন। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ভুয়া এবং মিথ্যে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের সময় তাদের কলম তুমুল বেগে চলতে থাকে। মিসেস জিয়ার মাথার চুল আর শিফনের শাড়ীতে কত টাকা খরচ হয় এই হিসেব করতে করতে তারা গণনাযন্ত্র ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। এরপর কম্পিউটারের সামনে বসে খিস্তি করতে থাকেন।
বিশাল দেশ্রেমিক উনারা তখন। তারেক রহমান আর খালেদাই সব শেষ করে দিয়েছে। জামাত নেতাদের ফাঁসী দিয়েও তাদের তৃপ্ত মেটেনা। জামায়াতের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবার আইন করেন। তাদের রাবারের উদর হলো একটি বাংলাদেশ আর উদরপূর্তি হলো সেই দেশের সেবা। তারা দেশপ্রেমিক।
.
এই দেশ্রেমিকেরা এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। একজন শাহবাগীকেও সরকারের এই বিশাল টাকা লুটের ঘটনা নিয়ে একটি লেখা লিখতে দেখলাম না। লেখক আনিসুল হক সাহেব প্রধান পত্রিকার সহ সম্পাদক। তিনি নাল পিরান লেখেন। গরীবের দুঃখ। অথচ গরীবের রক্ত পানি করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যে সরকার মেরে দিলো তা নিয়ে চুপ। তিনি তাস্কিনের বল নিয়ে ব্যাস্ত আছেন।
.
আওয়ামিলীগ যারা করেন তাদের ভেতর বিন্দু পরিমাণ দেশপ্রেম আছে বলে মনে করেন? তারা স্রেফ অমানুষ। কেমন করে এত নীরব থাকেন উনারা? এত জঘন্য কিভাবে হতে পারে একট দল? আমি অবাক হয়ে ভাবি। তাদের একটি লেখা, একটি টু শব্দ নেই। একেবারে স্পিকটি নট। দেশের এতবড় ক্ষতিতেও!
.
আমারও কিছু যায় আসেনা। কি লাভ? বাসায় থাকতেন এমন এক চাচাকে ফোন দিয়েছিলাম। তিনি বললেন, শেখের বেটি হাসিনা এত গুলান টাকা নিয়া গেল আর আমার পোলাডারে আমি কতদিন দেখিনা। সেইযে দশ বছর ধইরা সৌদি গেল, আর আইতে পারেনা। আইলে যে আর যাইতে পারবোনা। আমরা খামু কি? বাচুম কেম্নে? অথচ তিনার পোলা কত টাকার মালিক। ভোট দিছিলাম তিনারে। তিনি যে এই কাম করবো কে জানছিলো? আম্মা,আমার পোলাডারে খুব দেখতে ইচ্ছা করে। মরণের সময়ও কি একটু দেখতে পারুম না আমার বাপ জানেরে?
.
আমি বলেছিলাম, উনিই যে টাকা সরিয়েছেন একথা কিভাবে বলেন চাচা? তিনি বলেন, উনিইতো দেশের মালিক। উনার ইচ্ছাতেই সব হয়। উনি থাকতে এই কাম করতে কে সাহস পায়? আপনে শিক্ষিত মানুষ হইয়া এইডা বোঝেন না ?
আপনি হলে কি জবাব দিতেন এই বৃদ্ধকে? কি জবাব দিতেন? হরেশের কথা গুলো মনে পড়ে গেল, “আমার পুরা পরিবারের দেনা আছে এখনো মহাজনের কাছে। মালতি আর আমি কাজ করি ক্ষেতে, আমার ছেলেরা আর তাদের বউয়েরা ইটভাটায়। একদিন আমার নাতিপুতিরা মহাজনের জন্য কাজ করবে। দেনা শোধ করার উপায় নাই কোন। মরণেই মুক্তি আমাদের।” কৃষক মুক্তি চায়, তাই আত্মহত্যা করে। আর আমরা স্ট্যাটাস দেই।
এদেশে মেধাবী এবং সৎ লোকের ইমেজ দাঁড় করানো গেলে তখন তাকে দিয়ে অনেক 'আকাম' করানো যায়। যখন ঘটনা জনগণ সম্পর্কিত তখন এই 'আকাম' ধরা পড়ে গেলে কাউন্টার দেয়া এবং নিজেকে আড়াল রাখা সহজ হয়। সরকার এটি ভালো মতই জানে। ড. আতিউর প্রসঙ্গে আমার কেবল এটিই বলবার আছে।
প্রসংগত, দুই তিন বছর আগে সোনালী ব্যাংক থেকেও এরকম কায়দায় টাকা চুরি হয়েছিলো এবং তাকেও হ্যাকিং এর নাম দেয়া হয়েছিলো। সেই খবর জানি ক'জন? তখনও ড. আতিউর সহ এরাই ছিলেন মন্ত্রী মিনিস্টার, এই সরকারই। কেন তখন প্রচার ও ব্যাবস্থা নেয়া হয়নি? বড় দান মারার আশায় নয় কি?
আতিউর সাহেবের ইমেইজ যখন দাঁড় করানো হচ্ছিলো তখন আমি দেখেছি মানুষ উনার অসততার কিংবা চাঁদেও যে কলংক থাকে এই প্রবাদকে তুলে ধরতেও সাহস পেতেন না। তিনি নিঃসন্দেহে মেধাবী। ড. আতিউর ক্যাডেট কলেজ থেকে পড়েছেন। তিনি এক্ষেত্রে বরঞ্চ অনেকের চাইতে লাকি ছিলেন।
ছাপার অক্ষরে যা লিখা থাকে তা সবসময় সত্য নয়- এই বাক্যকে খুব কম পাঠক ও লেখকেরাই বিশ্বাস করেন। তিনি দেশের জন্য কি করতে পারবেন, এটি আমাদের আগ্রহের বিষয় ছিলোনা, আমরা আগ্রহী হই তার ফাইটিং লাইফের প্রতি।
পরবর্তিতে অনেকেই ড.আতিউরের বিভিন্ন এনজিও কার্যকলাপ থেকে অসৎ পন্থার কথা তুলেছিলেন, এত দামী গাড়ি চালানো নিয়েও কথা উঠেছিলো। কিন্তু সেগুলো আবেগের তোড়ে ভেসে গিয়েছিলো। এই ভেসে যাওয়াটাই আজকের এই পদত্যাগ সম্পর্কিত বিশাল ধামা দিয়ে চাপা দেয়া।
এজন্যই আমি আবেগীয় আনিসুল, আবেগীয় জাফর ইকবাল টাইপ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা আরও প্রকট। টাকা পয়সা ভয়ানক জিনিষ। এখানে সৎ এবং মেধাবীর সাথে অংকের সমীকরণ মেলানো কঠিন।
এখন কথা হলো, ড আতিউর প্রসংগ হাতে ধরিয়ে দিয়ে আওয়ামী সরকার কি নিজেদের এই 'আকাম' ঢেকে ফেলতে পারবে কি'না। কারণ, সরকারের স্থানে যখন আতিউর হয় তখন আমার ভয় হয়। আতিউর একজন হাতিয়ার মাত্র। আর ব্যবহারকারী সরকার তা ব্যবহার করে এসেছে এবং আবার করবে।
একটি কথা আছেনা? 'চাবি থাকনই শেষ কথা না, তালার হদিস রাখতে হইবো।' আমরা চাবি নিয়া ঘুরি কিন্তু তালা থাকে জায়গামত।
Elora Zaman
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



