somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পঙ্গু হাসপাতালে বুলেটবিদ্ধদের ভীড়

১৮ ই মার্চ, ২০১৫ দুপুর ২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে দীর্ঘ হচ্ছে বুলেটবিদ্ধ মানুষের সারি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আহত হয়ে হাসপাতালে আসা অনেকে অভিযোগ করেছেন, পুলিশ হেফাজতে তাদের চোখ বেঁধে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি করা হয়েছে।
পঙ্গু হাসপাতালের (যার দাপ্তরিক নাম ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার) রেকর্ড অনুযায়ী, গত ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে বুলেটবিদ্ধ অন্তত ৪২ জন এবং বিস্ফোরণে আহত আরো ২৭জন লোক এখানে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা নিয়েছেন।
একই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নিবন্ধন তালিকার তথ্যমতে, জানুয়ারির ৩ তারিখ থেকে মার্চের ৯ তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আরো অন্তত ২০০ লোক পুলিশের দ্বারা আহত হয়ে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত নার্সরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বুলেটবিদ্ধ মানুষের যেন ঢল নেমেছে। একজন নার্স বলেন, এ ধরনের মানুষের সংখ্যা বেশি বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ আমাদের শুধু অবরোধ সংক্রান্ত আহতদের জন্য আলাদা একটি নিবন্ধন বই খোলার নির্দেশ দেয়। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় খুবই কাছ থেকে করা গুলিতে আহত বলে অভিযোগ করা অনেকের পা অপারেশন করে কেটে ফেলতে হয়েছে।
সম্প্রতি সরকার এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা ‘অগ্নিসংযোগকারী এবং নাশকতাকারীদের’ দেখামাত্র গুলি করার জন্য বার বার অধীনস্তদের নির্দেশ দিয়েছেন।
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় গুলি করা এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের মতোর বিনা বিচারে হত্যার ঘটনা আশংকাজনকহারে বেড়ে গেছে। এসব ঘটনায় অন্ততপক্ষে ২৮জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণ কর্মী। চিকিৎসাধীন অনেকে অভিযোগ করেছেন, কোনো কারণ ছাড়াই আবার কারো ক্ষেত্রে চাঁদার টাকা না দেয়ায় পুলিশ ধরে নিয়ে তাদের পায়ে গুলি করেছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রাজশাহীর বোয়ালিয়ার মোবাইল ফোন মেকানিক শিহাবুজ্জামান সেতু জানান, ৩ মার্চ সন্ধ্যায় স্থানীয় বালিয়াপুকুর ক্রসিং এলাকা থেকে উঠিয়ে পুলিশ তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পিছমোড়া করে দুই হাত এবং চোখ বেঁধে রাখা হয়।
তিনি বলেন, এই অবস্থায়ই পরদিন ৪ মার্চ রাত আনুমানিক ২টার দিকে তার ডান পায়ে গুলি করা হয়। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকালে সেখান থেকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
তিন দিন পর অপারশেন করে সেতুর ডান পা-টি হাঁটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হয় বলে জানান তিনি।
ট্রাক ড্রাইভার সুমন হোসেন আলমগীরের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায়। তিনি জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছা ব্রিজ এলাকায় তার ট্রাক থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর তার উপর নির্যাতন চালিয়ে ঝিকরগাছা থানায় নিয়ে চোখ বেধে এবং পিছমোড়া করে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রাখা হয়।
সুমন বলেন, সেখানে বাঁশ বা এ জাতীয় কিছুর লাঠি দিয়ে চেপে ধরে তার ডান পা ভেঙে দেয়া হয়। ‘এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ আমাকে সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে ফেলে রাখে।’
পরদিন পুলিশই যশোর মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরে সেখান থেকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর তিন দিন পর ডাক্তাররা ডান পা-টি কেটে ফেলতে বাধ্য হন। ‘এখন আমার সাত সদস্যের পরিবারের কী হবে?- প্রশ্ন সুমনের।
সুমনের স্ত্রী রুমা বেগম জানান, তার স্বামীকে আটকের পর ছেড়ে দেয়ার কথা বলে পুলিশ তার কাছ থেকে একটি ‘বিকাশ’ নম্বরে করে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে।
‘আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে পুলিশ টাকাটা নেয়। কিন্তু ছাড়ার বদলে উল্টো তার পা ভেঙে দিল। সাথে আরেকটা মামলাও দিয়েছে। অথচ, আমার স্বামী জীবনে রাজনীতি করেনি।’ কথাগুলো বলার সময় রুমার গাল বেয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝরছিল।
আরেক আহত মোহাম্মদ নাসিরের বয়স ২৬। গাজীপুরের মুন্সীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাসির বলেন, জয়দেবপুরের শিববাড়ী এলাকায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর পরই বন্ধু রুমনসহ তাকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর নির্যাতন করে চোখ বেঁধে তাকে স্থানীয় বাঁশপট্টি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর আশপাশের মানুষকে সরিয়ে দিতে পুলিশ ফাঁকা গুলি করতে থাকে।
‘এরপর খুব কাছ থেকে হাঁটুতে গুলি করে ফেলে রেখে যায় তারা। এর প্রায় চারদিন পর অপারেশন করে ডান পা-টি কেটে ফেলতে হয়েছে।’ নোয়াখালীর মধুপুরের মোহাম্মদ হোসাইন নামে চার সন্তানের জনক এক রংমিস্ত্রি জানান, ৩ মার্চ সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে তিনি তার বাড়ির সামনে বসে সিগারেট ফুঁকছিলেন। এমন সময় কয়েকজন পুলিশ এসে তাকে ধরে স্থানীয় ডিবি অফিসে নিয়ে গিয়ে চোখ বেঁধে হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখে।
‘এরপর তারা আমাকে মাইজদি হাসপাতল রোডের পাশে একটি মাঠে নিয়ে যায় এবং আমার বাম পায়ে পাঁচটি গুলি করে। এরপর পঙ্গু হাসপাতালে আনার পর ৭ মার্চ পা-টি কেটে ফেলা হয়।’ হোসাইন বলেন, আমি রাজনীতি করি না। গায়েগতরে খেটে কোনো মতে জীবন চালাই।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নাজমুল জানান তার পায়ে গুলি করা হয়েছে। তবে ভয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। বোরহানউদ্দিন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র নোমানের পায়েও গুলি করা হয়। পরে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। তার ভাই পলাশ জানান, অবরোধকারী সন্দেহে ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গুলি করেছে। তারা আটকের পরপরই নোমানকে গুলি করেছে বলে দাবি করেন পলাশ। ‌অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, গত দুই মাসে এখানে ২৫-৩০ জন গুলিবিদ্ধ লোক চিকিৎসা নিয়েছেন। মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মনে করেন, এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, পুলিশের গুলিতে আহত কিংবা নিহত হওয়ার পর পুলিশ যেসব অবাস্তব কল্পকাহিনি বলে তা এখন আর কোনো সাধারণ মানুষই বিশ্বাস করে না। হাতকড়া পরিয়ে পরিকল্পিতভাবে একজনকে গুলি করে তারা একেক সময় একেকরকম গল্প সাজায়। তবে পুলিশের বাড়াবাড়ির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধদের বেশিরভাগই আক্রমণকারী। বোমা নিক্ষেপ ও হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের গুলি করেছে।
গত ৫ জানুয়ারি থেকে অবরোধ শুরু হওয়ার পর ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪ জন পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রী।
এ সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও গাড়িচাপায় মারা গেছেন ৪০ জন, যাদের প্রায় সবাই বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দুই মাসে এখানে ১৬৫ জন অগ্নিদগ্ধ লোক ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন মারা গেছেন। ৯৭ জনকে চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেয়া হয়েছে এবং ৫০ জনের মত লোক এখনো চিকিৎসাধীন আছেন।
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯



ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

বির উনি একজন গোয়ালা (গোয়ালিনী)। তাহার নিজের কোনো গরু(গাভী) নাই। তারপরও তিনি দৈনিক প্রায় একশত লিটার দুধ বিক্রি করেন। নিজের 'কয়েকজন বান্দা কাস্টমার আছে'।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×