somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঝর্নার খোজে গহীন অরণ্যে(পর্ব-১)

১৫ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাহাড় পেরিয়ে ঝর্নার পানিতে গা ভেজানোটা নেশার মত হয়ে পড়েছে। সময় পেলেই ভ্রমনবন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ি অজানার পথে। শহুরে বন্দি জীবনের ক্লান্তিদূর করতেই ঈদের পরদিন ১৪ জনের টিম নিয়ে বান্দরবানের মাটিতে পা রাখলাম ।শ্যামলী পরিবহনের বাস থেকে যখন নামলাম তখন ভোর ৬ টা।যদিও শীত কাল না তারপরও হালকা শীতের আমেজ আমাদের শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিল। এবারে টিম বিডি ট্রাভেলারস এর গন্তব্য পাহাড়,ঝর্না,ঝিরি আর বুনো সৌন্দর্য অবলোকন।সেই লক্ষ্যে বান্দরবান শহর থেকে ৭৯ কিমি দূরে অবস্থিত থানচী আমাদের পরবর্তী গন্তব্য।
পরটা ডিম দিয়ে সকালের নাস্তাটা বান্দরবান শহরে সেরে নিলাম। এরপর বাস স্ট্যান্ড থেকেই চান্দের গাড়ীতে করে ছুটে চললাম থানচির উদ্দেশ্যে। বান্দরবানের মোস্ট ভিজিটেড ট্যুরিস্ট স্পট চিম্বুক,শৈলপ্রপাত,নিলগিড়ি কে পাশে রেখে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল থানচির পানে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা আর মেঘের ভেতর দিয়ে ছুটে যেতে লাগল আমাদের গাড়ী।সর্পিল এই পথের বাকে বাকে লুকিয়ে আছে চমক।এর উপর এক সময়কার সর্বোচ্চ রাস্তা পিক ৬৯ ও থানচী যাবার পথেই পড়ে। প্রায় তিন ঘন্টার রোলার কোস্টার রাইড শেষে গন্তব্য থানচিতে এসে পৌঁছলাম।
প্রচন্ড গরম,সূর্যটা মাথার উপর তেতে আছে।গরমে মাথা টা ভো ভো করছে।অস্থির সূর্যটাকে মাথার উপর রেখেই থানচী বাজারটা ঘুরতে বের হলাম।থানচী বাজারটা বেশ একটা বড় না,গুটিকয়েক দোকান নিয়ে বাজারটা গঠিত।কয়েকটা খাবার দোকান আর একটা গেস্ট হাউজ।আর আছে স্থানিয় আদিবাসীদের বেশ কিছু দোকান।তারপরও গহীনে ঘুরতে যাওয়া ভ্রমণকারী দের কাছে এই বাজারের কদর অপরিসীম।কারন শেষমুহূর্তের কেনাকাটা তারা এখান থেকেই সেরে নেয়।দিনটা ঈদের পরপর হওয়ায় অনেক ভ্রমন পিপাসু মানুষের ভীড়,কেউ নাফাখুম,আমিয়াখুম,ব্যাটকেভ কিংবা সাকাহাফং কিংবা আরো ভিতরে ট্রেকিং এর প্রস্তুতি নিচ্ছে।একটা ভয় নিয়েই এমুখ হয়েছিলাম এবং যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হল।এসে শুনি রেমাক্রির দিকে কোন ট্যুরিস্টকে যেতে দিচ্ছে না স্থানিয় প্রশাসন। গাইড দুলাল ভাই এর কাছ থেকে জানা গেল কয়দিন আগে বিজিবির একটি ট্রলার অস্রসহ ডুবে যায় এবং ২ জন বিজিবি সদস্য প্রান হারায়। তাই এই নিষেধাজ্ঞা।যদিও গাইড আমাদের জানিয়েছিল যে নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। ঈদের পরদিন হওয়ায় ভ্রমনপ্রিয় মানুষের মিলনমেলায় পরিনত হয়েছে থানচী।সবাই এসেছে ঈদের বন্ধটাকে কাজে লাগাতে,একটু প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে।সবারই প্রায় এতদিনের প্ল্যান ভেস্তে যেতে বসেছে। কেউ কোন ভাবেই আমরা এতদিনের প্ল্যানকে মাঠে মারা যেতে দেব না।তাই সিন্ধান্ত নেই কেউ ব্যাক করব না । সেখানেই আমরা সহ অনেক ভ্রমনকারী একপ্রকার অবস্থান ধর্মঘট শুরু করলাম।প্রায় ঘন্টা ২ পর স্থানিয় চেয়ারম্যান আসলেন। তিনি আমাদের বোঝালেন আমরা যদি এখন রেমাক্রির দিকে যেতে চাই তবে আমরা কি কি বিপদে পড়তে পারি।পাহাড়ি সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে সাংগু নদীর প্রবল স্রোত আমাদের যে কোন দূর্ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে।এতকিছুর পরও তারা আমাদের দমাতে পারলেন না।পরবর্তীতে ট্যুরিস্টদের প্রবল চাপের মুখে প্রসাশন থানচি রুট খুলতে বাধ্য হয়।
পারমিশন পাওয়ার পর সবার মুখে বিজয়ের হাসি।গাইড দুলাল ভাইকে নিয়ে পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজার করে নৌকায় উঠে পড়লাম। এর আগে অবশ্য সবার নাম রেজিস্টার করতে হল। বোট জার্নি থেকেই শুরু হবে আমাদের আসল অভিযান। গাইড সহ আমরা মোট ১৫ জন।ঢাকা থেকে নিয়ে আসা লাইফ জ্যাকেট পড়ে নৌকায় বসে পড়লাম।শুরু হল বোট জার্নি।১৫ জনকে নিয়ে তিনটি নৌকা সাংগুর বুক চিড়ে এগিয়ে চলল। থানচি থেকে রেমাক্রি যাবার পুরো বোট জার্নিটাই এডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ।এই নদী পথে বহু নৌকা ডুবে যাওয়ার রেকর্ড আছে এবং অনেক মানুষের মৃত্যুও হয়েছে।তার উপর ভরা বর্ষাকাল,সাঙ্গুও উন্মাতাল। তাই আমাদের টিমের প্রত্যেকেরই কিছুটা ভয় কাজ করছিল।আর কিছুদুর যেতেই সাংগুর তীব্র স্রোত চোখের সামনেই দেখতে পেলাম,আর মনে পড়ে গেল স্থানিয়দের সাবধান বা্ণী,ভয় আরো বেড়ে গেল।একের পর এক তীব্র স্রোত আর ঘূর্ণিকে পাশ কাটিয়ে রেমাক্রির পথে চলতে লাগলাম।চারপাশে বিশাল বিশাল পাহাড় আর ঝর্না এর মাঝেই সাংগু নদীপথ ধরে ছুটে চলা।নির্দ্বিধায় বলা যায় বেস্ট জার্নি বাই বোট ইন আওয়ার লাইফ উইথ ফুল অফ এডভেঞ্চার।
ঘন্টা দুই চলার পর সাংগু নদীর সবচেয়ে বিপদজনক স্থান বড় পাথর এরিয়ায় চলে আসলাম।এই নদীতে ঘটা দূর্ঘটনার ৯০% ই এখানেই ঘটে। বিশাল বিশাল পাথরের যে কোন একটিতে ধাক্কা লাগলেই সলিল সমাধি। যাই হোক নৌকা চালক দের দক্ষতায় সে যাত্রায় টিকে গেলাম। রাজা পাথরের উদ্দেশ্যে নৌকার মাঝিদের টাকা ছুড়ে মারার ঘটনা আমাদের কৌতূহলী করে তুলল।পরবর্তীতে জানতে পারলাম রাজা পাথরের সম্মানার্থে আর নদীতে নৌ দূর্ঘটনার হাত থেকে বাচতেই এই প্রথা। রেমাক্রি যখন পৌঁছলাম ততখনে সন্ধ্যা।
পাহাড়ে অন্ধকার নেমে আসে হুট করে,হলও তাই হঠাত করেই অন্ধকার নেমে আসল পাহাড়ের বুকে।নৌকা থেকে নেমে আমাদের নৌ চালক লাল পিয়ান দার কটেজে উঠলাম।রুমে ঢুকে ব্যাগপ্যাকটা রেখে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে সাংগু নদীতে গোসলে নেমে পড়লাম।অনেক সময় নিয়ে গোসল সারলাম।সেদিন আবার ছিল পূর্ণিমা। পাহাড়ী নদীতে পুর্ণিমার আলোতে গলা ডুবিয়ে বসে থাকার কথা মনে থাকবে আজীবন ।রাতের বেলাটা যে যার মত করে কাটাতে লাগলাম। সারাদিনের ধকলে সবাই ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত।কিছুক্ষন পর খাবারের জন্য ডাক পড়ল ।কটেজের মালিকের বাসায় খাবারের আয়োজন ডিম, ডাল,সবজি আর ভাত।খাওয়া শেষে দোকানের পাশেই আড্ডায় বসে পড়লাম।এর মধ্যে দুলাল ভাই বার বি কিউ এর আয়োজন শুরু করে দিয়েছে ডাক পড়ল সেখানেও।সবাই মিলেই সাঙ্গুর পাড়ে দারুন এক বার বি কিউ পার্টি করলাম।ভুরিভোজ শেষে যে যার মত চলে গেল কটেজে।সারা দিনের ধকলে সবাই কিছুটা ক্লান্ত।আমরা কয়েকজন কিছুতেই এই পূর্নিমা রাতটাকে নস্ট করতে চাইছিলাম না, বলা ত যায় না আবার কবে না কবে আসা হয়। তাই জোস্নার আলোয় নৌকায় বসে আড্ডা দিতে লাগলাম।আড্ডা চলল অনেক রাত পর্যন্ত।সারা দিনে অনেক দৌড় ঝাপ গিয়েছে,এবার কটেজে ফিরে গিয়ে শরীরকে রেস্ট দিতে হবে।কালকের মিশন নাফাখুম।

ডে ওয়ান: বান্দরবান>থানচি>রেমাক্রি।
থানচী যাবার পথে

থানচী বাজার

থানচী বাজার নৌ ঘাট

পদ্মমুখ

তিন্দু

রেমাক্রির পথে

বড়পাথর এরিয়া

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০১৬ সকাল ১১:০৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমরা কি তাহলে গুহা যুগে ফেরত যাচ্ছি?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫০



বিশ্ব যেখানে উন্নতির প্রতিযোগিতা করছে, কীভাবে জীবনমান আরও উন্নত এবং সহজ করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে আর আমরা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছি। চারদিকে ভয়াবহ অবস্থা!! চাঁদাবাজি, খুন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Movie-Obsession(2026)

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বিশিদবার রাতে খুব বাজে আর একটা ছিনেমা দেখলাম। ভাই-রে ভাই কি বলবো, ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারি নাই। মানে দেখার পর থেকে এখনো গা শিরশির করছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×