somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপ্রকাশিত প্রেম

০৩ রা অক্টোবর, ২০২৫ দুপুর ১২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(একটি নিটোল গল্প, স্মৃতির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা এক যামিনীকে নিয়ে)


কিছু গল্প কখনও শেষ হয় না, শুধু সময়ের ভাঁজে ভাঁজে থেকে যায়।
প্রেম সবসময় উচ্চারণ করা যায় না—তবু তার রেশ বয়ে চলে জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত।
আজ শেয়ার করছি এমনই এক গল্প—যার শুরু হয়েছিল কৈশোরে, আর শেষ হয়নি কখনও।



আমার নাম আজিজুল হক। বয়স অনেক, এতটাই যে এখন পায়ের ব্যথা বলে দেয় ঋতুর পরিবর্তন। আমি লন্ডনে থাকি।
বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়াচ্ছে—মনে হচ্ছে সময় গলে যাচ্ছে।
এমন রাতগুলোতেই পুরনো স্মৃতি এসে দরজায় কড়া নাড়ে।

প্রথম দেখা

আমার কৈশোর কেটেছিল নোয়াখালীর এক গ্রামে—সবুজে ঢাকা, কুয়াশার চাদরে মোড়া।
সেই গ্রামে এক গ্রীষ্মে এসেছিল এক মেয়ে।

যামিনী সুধা রায়।
কোলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়ে। ছুটিতে ফিরেছিল তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িতে।

তখন সে ছিল এক অলীক দৃশ্য—জলপাই রঙের পালকিতে, হাতে মলাটছেঁড়া রবীন্দ্রনাথের বই, চোখে উদাস দৃষ্টি।
আমি ছিলাম গ্রামের সাধারণ ছেলে, গ্রামের স্কুলে পড়তাম। সাহস ছিল না, কিন্তু কৌতূহল ছিল পাগলের মতো।

প্রতিদিন দুপুরে পালকি যখন যেত, আমি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম।
একদিন হঠাৎ পালকি থেমে গেল...

মিষ্টির বাক্স


সে জানালার কাপড় সরিয়ে বলল—
“তুই এতদিন ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিস, আজ কিছু বলবি না?”

আমি জবাব দিতে পারিনি। কেবল তাকিয়ে ছিলাম—স্তব্ধ, বোকা হয়ে।
সে নেমে এলো। হাতে ছোট টিনের বাক্স।

বলল, “এটা রাখ। আমার প্রিয় মিষ্টি। ভাগ করে খাস।”

হাত কাঁপছিল আমার। হৃদয় যেন বুক ভেঙে বেড়িয়ে আসবে।
আমি বাক্সটা হাতে নিয়েই দৌড়ে পালালাম।
সেই দৌড়—মনে হয় আজও থামেনি।

জীবনের বাঁক

তারপর? জীবন ছুটলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর বিদেশে উচ্চশিক্ষা, পিএইচডি।
বিয়ে, সন্তান, অধ্যাপনার ব্যস্ততা—সবই ছিল।

তবে মাঝে মাঝে... ঠিক যেন কুয়াশার আড়াল থেকে কেউ ডাকতো।
যামিনী।

কোলকাতায় খোঁজ

বিয়ের অনেক বছর পর, একবার কোলকাতায় গিয়েছিলাম এক সেমিনারে।
হঠাৎ মনে হলো—যদি একবার দেখা যেতো তাকে?

খুঁজতে বেরোলাম পুরনো ঠিকানা নিয়ে।
বাড়িটা ছিল চিৎপুরের এক গলিতে, জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ তখন ঝড়ে ভেঙে পড়ছে।

এক বৃদ্ধ বললেন,
“রায় পরিবারের মেয়েটা অনেক বছর আগে হারিয়ে গেছিল। শুনেছি বাড়ির চিঠিপত্র বিক্রি হয়ে গেছে এক পুরনো বইয়ের দোকানে।”

খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়লাম এক বইয়ের দোকানে।
এক পুরনো রবীন্দ্রনাথের বইয়ের ভাঁজে পেয়ে গেলাম হলুদ হয়ে যাওয়া একটা কাগজ।

লিখা ছিল—

“তুই যে পালিয়ে গেছিস, আমি তো তা জানি।
কিন্তু মিষ্টিগুলো খেয়েছিস তো?
জানিস, আমি তখনই বুঝেছিলাম—ভালোবাসা মানে বুক কাঁপা।
আমারও কাঁপছিল।”


— যামিনী সুধা


আজকের আমি

এখন, দূর প্রবাসে আমার বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকি।
মাঝেমাঝে কুয়াশা ভেদ করে দেখি—একটা পালকি যাচ্ছে।
একজোড়া চোখ জানালা থেকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

সে কি যামিনী?
নাকি আমার স্মৃতির তৈরি ছায়া?
আমি জানি না।

তবে এটুকু জানি—সব প্রেম প্রকাশ পায় না।
কিছু প্রেম থেকে যায় অপ্রকাশিত, তবু তারা হারায় না।
তারা রয়ে যায়—একটা বাক্সে রাখা মিষ্টির মতো,
যার স্বাদ আজও মন ছুঁয়ে যায়, রাত্রির শেষ প্রহরে।


গল্পের শেষ নেই।
শুধু আছে অনন্ত প্রতিধ্বনি।
প্রেম যতই অপ্রকাশিত থাকুক—সে থেকেই যায়,
একটা বাক্সে রাখা মিষ্টির মতো,
একটা নামহীন স্মৃতির মতো।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৫ দুপুর ১২:৩২
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রচারণার বেলুন যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সূচের সামনে তা এক মুহূর্তেই চুপসে যায়।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৯

প্রচারণার বেলুন যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সূচের সামনে তা এক মুহূর্তেই চুপসে যায়।
=======================================
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ও অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি নামের ব্রিটেনের কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের ছোট সংগঠন থেকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪০



নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলেছি।
ঊর্ধ্বলোক আর নিম্নের অতল অন্ধকার কোন জায়গায়,
সে নিয়ে আর চিন্তা কি!

প্রিয়ার আহবানে আমরা কতো কিছুই না করি!
এবারে প্রিয়ার আহবানে দিক-শূন্যই নাহয় হলাম!... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাকাজার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×