
দুবাইয়ের জুমেইরাহ বিচের বিলাসবহুল পেন্টহাউসের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের কৃত্রিম দ্বীপগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন সায়েম চৌধুরী। একসময় ঢাকার পুলিশ কমিশনার এবং পরবর্তীতে পুলিশের বিশেষ বাহিনীর শীর্ষ প্রধান হিসেবে ওঁর দাপটে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেত। আজ সেই ক্ষমতা নেই, নেই সেই প্রটোকল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক আগে নিজের এবং পরিবারের নামে থাকা শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, রিসোর্ট আর ফ্ল্যাট ফেলে উনি দেশ ছেড়েছিলেন। ওঁর বিরুদ্ধে দেশের আদালতে প্রায় ৮০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন চারটি পৃথক মামলা করে এবং ওঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও জমি ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু সায়েম চৌধুরী ভেবেছিলেন ওঁর গড়া সিন্ডিকেট, আন্তর্জাতিক লবি আর মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অর্থের সাম্রাজ্য ওঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। উনি সাধারণ কোনো পলাতক আসামি নন; উনি নিজে একজন প্রাক্তন হাই-প্রোফাইল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা। ওঁর কাছে এমন কিছু ফাইল এবং নথিপত্র রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে ঢাকার ক্ষমতার অলিন্দের অনেক বড় রাঘববোয়ালের চেয়ার নড়ে যাবে। আর এই ব্ল্যাকমেইলিং ক্ষমতাকেই সে ওঁর সবচেয়ে বড় ঢাল বানিয়ে রেখেছিল।
উনি জানতেন না, ২০২৬ সালের জুনের এই তপ্ত দুপুরে ওঁর সেই সুরক্ষিত দুর্গের দেয়ালে ফাটল ধরাতে ওঁরই দেশের একজন স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর দুবাইয়ের মাটিতে পা রেখেছেন। পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান এবং ওঁর বিশ্বস্ত সহকারী পরিদর্শক তানভীর।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে আরিয়ান ও তানভীর সোজা চলে এলেন দুবাই পুলিশের সদর দপ্তরে। ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (NCB) এবং ঢাকার হেডকোয়ার্টারের টানা তিন মাসের কূটনৈতিক ও আইনি প্রচেষ্টার পর গত সপ্তাহে সায়েম চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়েছে।
দুবাই পুলিশের ড্রাগ অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ক্যাপ্টেন আহমেদ আল-মনসুরি ওঁর ডেস্কে আরিয়ানদের স্বাগত জানালেন। কিন্তু ওঁর মুখে আজ কিছুটা চিন্তার রেখা।
“মিস্টার আরিয়ান, আপনাদের মিশন কিন্তু বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়েছে,” মনসুরি ডেস্কে একটি ফাইল রাখলেন। “সায়েম চৌধুরী অত্যন্ত চতুর। দুবাই পৌঁছানোর পরপরই ওঁর আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। ওঁর দাবি, বাংলাদেশে ওঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শুধু তাই নয়, উনি ওঁর কাছে থাকা কিছু সংবেদনশীল সরকারি নথির ভয় দেখিয়ে পর্দার আড়ালে ঢাকার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ওখান থেকে ওঁর রেড নোটিশ স্থগিত করার জন্য একটি লবিং টিম কাজ শুরু করেছে।”
তানভীর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন, “তার মানে উনি আবারও পার পেয়ে যাবেন?”
“সহজে নয়,” আরিয়ান শান্ত গলায় বললেন। “মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সায়েম এখন কর্নারড। উনি যখনই বুঝবেন ওঁর ব্ল্যাকমেইল কাজ করছে না, উনি প্যানিক করবেন এবং দেশ ছাড়ার শেষ চেষ্টা করবেন। বর্ষা, ঢাকা থেকে কোনো আপডেট?”
সদর দপ্তরের স্ক্রিনে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হলো পিবিআই-এর সাইবার ইউনিটের প্রধান বর্ষা। ওঁর চোখ জ্বলজ্বল করছে। “স্যার, আমি একটা বড় ব্রেকথ্রু পেয়েছি। সায়েম চৌধুরীর অফিসিয়াল সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রেডিট কার্ড ফ্রিজ থাকায় উনি একটি বেনামী কোল্ড ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করছিলেন। আমি গত ৭২ ঘণ্টার ব্লকচেইন ট্রাফিক ট্র্যাক করে একটি সন্দেহজনক ডার্ক-ওয়েব ট্রানজেকশন আইডেন্টিফাই করেছি। সেই এনক্রিপ্টেড ওয়ালেট থেকে আজ ভোরে দুবাইয়ের একটি প্রাইভেট এভিয়েশন কোম্পানিকে ৪ বিটকয়েন পেমেন্ট করা হয়েছে। আমি ওই কোম্পানির সিস্টেম হ্যাক করে নিশ্চিত হয়েছি, আজ রাত ১২টা ৩০ মিনিটে আল-মাকতুম এয়ারপোর্টের পেছনের রানওয়ে থেকে একটি চার্টার্ড ফ্লাইট বুক করা হয়েছে। প্যাসেঞ্জার লিস্টে সায়েমের নাম নেই, কিন্তু ওঁর জাল ইউরোপীয় পাসপোর্টের মেটাডেটা মিলে গেছে।”
আরিয়ান ওঁর চশমাটা ঠিক করে ক্যাপ্টেন মনসুরির দিকে তাকালেন। “ফ্লাইট বুকিং প্রমাণ করে উনি পালাচ্ছেন, যা ওঁর আইনি দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্যাপ্টেন, সায়েম চৌধুরীকে সরানোর আগেই ওঁর পেন্টহাউস থেকে ওঁর সেই ব্ল্যাকমেইল ফাইলগুলো রিকভার করতে হবে, নইলে উনি ওগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত সার্ভার থেকে ডিলিট করে দেবেন।”
ক্যাপ্টেন মনসুরি ওঁর ওয়াকিটকি অন করলেন। “গ্রেট জব, মিস বর্ষা। সোয়াত (SWAT) টিম, মুভ ইন!”
রাত ১১টা ৪৫ মিনিট। দুবাইয়ের আল-বারশা এলাকার একটি বাণিজ্যিক ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং লট।
সায়েম চৌধুরীর তিনটি কালো রঙের মার্সিডিজ জিপ স্টার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওঁর প্রাইভেট সিকিউরিটিতে নিয়োজিত চারজন রুশ এবং দুজন স্থানীয় বাউন্সার চারপাশে কড়া নজর রাখছিল। সায়েম চৌধুরী একটি বুলেটপ্রুফ জিপের পেছনের সিটে এসে বসে ওঁর ট্যাবলেটের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল চালাচ্ছিলেন। ওঁর কাউন্টার-প্ল্যান শেষ পর্যায়ে—উনি ওঁর তৈরি করা সেই ব্ল্যাকমেইল ফাইলগুলো একটি ক্লাউড সার্ভারে আপলোড করে ওঁর লোকাল ডিভাইসের হার্ডডিস্ক সম্পূর্ণ ওয়াইপ (wipe) করে দেওয়ার কমান্ড দিচ্ছিলেন, যাতে পুলিশের হাতে কোনো প্রমাণ না থাকে।
ঠিক তখনই পার্কিং লটের প্রধান প্রবেশপথ এবং এক্সিট পয়েন্ট ব্লক করে তীব্র গতিতে ঢুকে পড়ল দুবাই পুলিশের সোয়াত টিমের সাঁজোয়া যান।
“দুবাই পুলিশ! ড্রপ ইয়োর উইপনস!” লাউডস্পিকারে ঘোষণা করা হলো।
সায়েম চৌধুরীর সিকিউরিটি চিফ, একজন প্রাক্তন কেজিবি এজেন্ট, আত্মসমর্পণের পাত্র ছিল না। সে ওঁর ট্যাকটিক্যাল বেল্ট থেকে সাব-মেশিনগান বের করে সোয়াত টিমের গাড়ি লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার শুরু করল—তা-তা-তা-তা!
শুরু হলো এক বিধ্বংসী আন্ডারগ্রাউন্ড বন্দুকযুদ্ধ। পার্কিং লটের কংক্রিটের পিলারে বুলেটের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধুলো উড়তে লাগল। স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম চালু হয়ে চারদিকে কৃত্রিম বৃষ্টি শুরু হলো। দুবাই সোয়াত টিম অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে দুজন বাউন্সারকে নিস্তেজ করে দিল। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সায়েম চৌধুরীর চালক জিপটিকে রিভার্স করে পার্কিং লটের একটি জরুরি এক্সিট গেটের লোহার ব্যারিকেড ভেঙে মেইন রোডে বের করে নিয়ে গেল। ওঁর সাথে ওঁর সিকিউরিটি চিফের গাড়িটিও ব্যাকআপ হিসেবে ছুটে চলল।
“টার্গেট ভেহিকল শেখ জায়েদ রোডের দিকে যাচ্ছে!” কমান্ড সেন্টারের অপারেটর চিৎকার করে উঠলেন।
ক্যাপ্টেন মনসুরি ওঁর টিমকে হাই-টেক ট্র্যাকিংয়ের নির্দেশ দিলেন। “এয়ারবোর্ন ইউনিটকে অ্যালার্ট করো। ড্রোন স্কোয়াড্রন এবং হেলিকপ্টার দিয়ে টার্গেটের ওপর লক ধরে রাখো।”
কমান্ড সেন্টারের বড় স্ক্রিনে দেখা গেল, দুবাই পুলিশের একটি এয়ারবোর্ন হেলিকপ্টার এবং দুটি হাই-স্পিড নজরদারি ড্রোন উপর থেকে সায়েম চৌধুরীর গাড়ির ওপর লেজার ট্র্যাকিং লক করেছে। শেখ জায়েদ রোডের ১২ লেনের হাইওয়ের প্রতিটি মোড়ে থাকা এআই (AI) চালিত ট্রাফিক ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সায়েম চৌধুরীর জিপের লাইসেন্স প্লেট ট্র্যাক করতে লাগল।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আরিয়ানের মনস্তাত্ত্বিক মগজ দ্রুত কাজ করছিল। “ক্যাপ্টেন, ও মেইন হাইওয়ে দিয়ে যাবে না। ও ডানের আল-খাইল রোডের দিকে ডাইভারশন নেবে, কারণ ওখানে ট্রাফিক কম। তাছাড়া ও ওঁর ট্যাবলেটের মাধ্যমে ফাইল ডিলিট করার প্রসেস শেষ করার জন্য সময় চাইছে।”
বর্ষা ওঁর ল্যাপটপ থেকে ইন্টারফেয়ার করল, “স্যার, আমি সায়েম চৌধুরীর ট্যাবলেটের লোকাল আইপি ট্র্যাক করে ওঁর ডেটা ওয়াইপিং প্রসেসটা মাঝপথে জ্যাম (jam) করে দিয়েছি। ও এখন ফাইল মুছতে পারছে না!”
“এক্সিলেন্ট, বর্ষা!” আরিয়ান বললেন। “ক্যাপ্টেন, আল-খাইল রোডের এক্সিট কর্ডন করুন!”
সায়েম চৌধুরীর জিপটি যখন ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে ফ্লাইওভার থেকে নামল, তখন ওঁর সামনে দেখা গেল এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। দুবাই পুলিশের চারটে ভারী ইন্টারসেপ্টর যান আড়াআড়িভাবে রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে চর্তুদিক থেকে সার্চলাইট ফেলছে পুলিশের হেলিকপ্টার। পালানোর আর কোনো পথ নেই।
সায়েম চৌধুরীর চালক প্রচণ্ড গতিতে ব্রেক কষল। টায়ারের তীব্র ঘর্ষণের শব্দে গাড়িটি রাস্তার পাশে একটি বালির সেফটি জোনে গিয়ে আটকে গেল। ওঁর ব্যাকআপ গাড়িটি অলরেডি সোয়াত টিম ঘিরে ফেলেছে।
ক্যাপ্টেন মনসুরির সাথে আরিয়ান এবং তানভীর একটি police convoy-তে করে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন। দুবাই পুলিশের সোয়াত কমান্ডোরা ততক্ষণে গাড়িটি ঘিরে ধরে সায়েম চৌধুরীকে বের করে এনেছে।
সায়েম চৌধুরীর সাধের দামী সুট আজ কুঁচকে গেছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। ওঁর হাত থেকে ওঁর সেই সিক্রেট ট্যাবলেটটি ততক্ষণে দুবাই পুলিশের একজন আইটি অফিসার উদ্ধার করে আরিয়ানের হাতে দিয়েছেন। আরিয়ানকে পুলিশ বহরের মাঝখান থেকে হেঁটে আসতে দেখে সায়েম চৌধুরীর ঠোঁটে এক তিক্ত, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
“আরিয়ান... তুমি এদ্দূর চলে এসেছ?” সায়েম চৌধুরী ওঁর চশমাটা ঠিক করলেন। ওঁর চোখে ভয়ের চেয়ে এক গভীর অবসাদ। “তুমি আমাকে দুর্নীতিবাজ বলছো, আরিয়ান। কিন্তু আমি যে সিস্টেমে বড় হয়েছি, সেই সিস্টেমই আমাকে তৈরি করেছে। তুমি আজ আমাকে ধরছ, কিন্তু এই সিস্টেমের ভেতরের আসল মাথাগুলোকে কি তুমি কখনো ছুঁতে পারবে? এই ট্যাবলেটের ফাইলগুলো যদি ডিলিট না হয়ে থাকে, তবে ওগুলো খুলো না। ওটা একটা প্যান্ডোরাস বক্স, পুরো দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আরিয়ান সায়েম চৌধুরীর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ওঁর চোখ বরফের মতো ঠাণ্ডা, কন্ঠস্বর শান্ত ও গম্ভীর। “সিস্টেম কোনো রোবট নয়, সায়েম চৌধুরী। সিস্টেম তৈরি হয় মানুষের সিদ্ধান্ত দিয়ে। আপনি যখন ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন, তখন সিস্টেমকে বদলানোর সুযোগ আপনার ছিল। কিন্তু আপনি বেছে নিয়েছেন নিজের পকেট ভরার রাস্তা। আর প্যান্ডোরাস বক্স খোলার ভয় আমাকে দেখাবেন না, আমার কাজই হচ্ছে সত্যকে সামনে আনা। আজ আপনি কোনো ডিপার্টমেন্টের প্রধান নন, আপনি শুধুই একজন ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল।”
সায়েম চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওঁর দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন। ওঁর চোখের ধূসর চাউনিতে পরাজয়ের গ্লানি স্পষ্ট। দুবাই পুলিশের অফিসার এগিয়ে এসে ওঁর কবজিতে মেটালিক হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলেন।
ক্যাপ্টেন মনসুরি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। “চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং অসাধারণ টিমওয়ার্ক, মিস্টার আরিয়ান। এক্সট্রাডিশন পেপার রেডি। কাল সকালের প্রথম ফ্লাইটেই একে ঢাকা পাঠানো হচ্ছে।”
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিমানের এক্সিট গেট খুলতেই প্রথমে বেরিয়ে এলেন স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান। ওঁর চোখে কালো সানগ্লাস, মুখে এক সপ্তাহের ক্লান্তি কিন্তু চোয়াল শক্ত। ওঁর ঠিক পেছনেই দুবাই পুলিশের প্রটোকল শেষে কড়া পাহারায় নামিয়ে আনা হচ্ছে হাতকড়া পরা, মাথা নিচু করা সায়েম চৌধুরীকে। বিমানবন্দরের টার্মিনালে অপেক্ষারত শত শত সাংবাদিকের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলে উঠল একসাথে।
টার্মিনালের বাইরে এসে আরিয়ান ও তানভীর জিপে উঠলেন। বর্ষা অলরেডি জিপের পেছনের সিটে ওঁর ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। ওঁর মুখে বিজয়ের হাসি।
“কঙ্গ্রাচুলেশনস স্যার! পুরো দেশ কাঁপছে এই নিউজে। দুদকের টিম অলরেডি সায়েম চৌধুরীকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য কোর্টে পেপারস সাবমিট করেছে,” তানভীর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন। “স্যার, আন্তর্জাতিক কেস সলভ করার ফিলিংটা কিন্তু আলাদা। সরাসরি অ্যাকশন না করেও যে অপরাধীকে এভাবে জালের মতো ঘিরে ফেলা যায়, সেটা দুবাই পুলিশের টেকনোলজি আর বর্ষার ক্রিপ্টো ট্র্যাকিং না থাকলে হতো না।”
আরিয়ান ওঁর সানগ্লাসটা খুলে একটু হাসলেন। জিপের ইঞ্জিন স্টার্ট নিলো। ঢাকার চেনা ট্রাফিকের মধ্য দিয়ে জিপটি সাইরেন বাজিয়ে পিবিআই সদর দপ্তর-এর দিকে চলতে শুরু করল।
ঠিক তখনই বর্ষার ল্যাপটপে একটি অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ নোটিফিকেশন সাউন্ড হলো। পুরো স্ক্রিনজুড়ে একটি এনক্রিপ্টেড পপ-আপ উইন্ডো ভেসে উঠল। বর্ষার হাসিমুখ পলকে গম্ভীর হয়ে গেল।
“স্যার... একটা সমস্যা হয়েছে,” বর্ষার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। “আমাদের মেইনফ্রেমের সিকিউরিটি প্রোটোকল বাইপাস করে একটা অজানা সোর্স থেকে সরাসরি একটি মেসেজ পুশ করা হয়েছে।”
আরিয়ান জিপের রিয়ার-ভিউ মিরর দিয়ে বর্ষার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। সেখানে রক্তলাল ফন্টে একটি সংক্ষিপ্ত মেসেজ জ্বলজ্বল করছে:
Sender: Unknown
Message:
"ভালো খেলেছ, আরিয়ান।
কিন্তু তুমি ভুল মানুষটাকে ধরতে ব্যস্ত ছিলে।"
— R
জিপের ভেতরের স্বস্তির আবহাওয়া এক সেকেন্ডে বরফ হয়ে গেল। তানভীর আরিয়ানের দিকে তাকালেন, ওঁর কপালে উদ্বেগের ভাঁজ। আরিয়ান জানালার বাইরে তাকালেন। ওঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ভয়ঙ্কর, চ্যালেঞ্জিং হাসি। ড্রাগ সাম্রাজ্যের পতনের পর সায়েম চৌধুরীকে ধরে উনি ভেবেছিলেন নেটওয়ার্ক শেষ, কিন্তু অধ্যাপক রেহান আশরাফ এখনো ওঁর মগজের সুতো দিয়ে পুরো খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করছে।
লড়াইটা শেষ তো হয়ইনি, বরং এক নতুন, আরও বিপজ্জনক স্তরে প্রবেশ করল।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



