
বালির নীল দিগন্ত
ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের একটি নির্জন পাথুরে সৈকত। ভারত মহাসাগরের বিশাল নীল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। সমুদ্রের ঠিক ওপরের একটি আধুনিক কাঁচের ভিলায় বসে এক রহস্যময় ব্যক্তি ওঁর ট্যাবলেটের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর ঠোঁটের কোণে এক মৃদু, শীতল হাসি। ওঁর স্ক্রিনে তখন সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল হাজার মাইল দূরের কুয়ালালামপুরের রয়্যাল মেরিনা প্লাজা হোটেলের একটি লাইভ ড্রোন ফিড।
সেখানে প্রতিটি মোড়ে কী ঘটছে, আসাফউদ্দৌলা চৌধুরী কীভাবে ওঁর পালানোর ছক কষছেন, আর পিবিআই-এর আরিয়ান কীভাবে ওঁর দিকে এগিয়ে আসছেন—সবকিছু এই ঘরের অন্ধকার থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। টেবিলে রাখা ওঁর কফি কাপের নিচে একটি লোগো জ্বলছিল—একটি নীল রঙের সমুদ্র-তরঙ্গ চিহ্ন। আর ওঁর ট্যাবলেটের স্ক্রিনের কোণায় কোডনেম হিসেবে ভেসে উঠছিল একটিমাত্র ইংরেজি বর্ণ—‘R’।
খেলাটা শুরু হওয়ার আগেই ওঁর মগজে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কুয়ালালামপুর কমান্ড সেন্টার
কুয়ালালামপুরের বুকিত বিন্তাং এলাকার একটি গোপন পিবিআই সেফ হাউসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে বসে ছিলেন স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান এবং ওঁর সহকারী তানভীর। ওঁর চোখে তীব্র ক্লান্তি, কিন্তু চোয়াল শক্ত। আরিয়ানের জন্য এই মিশনটা স্রেফ একটা অফিশিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না; ওঁর বুকের ভেতর জ্বলছিল তিন বছরের পুরনো এক জ্বলন্ত আগুন। তিন বছর আগে ঢাকার একটি অপারেশনে এই একই রহস্যময় ‘R’ নেটওয়ার্কের একটি ফাঁদে পড়ে আরিয়ানের একমাত্র মেন্টর এবং পিবিআই-এর প্রাক্তন প্রধান নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে আরিয়ান এই ছায়া শত্রুর খোঁজ করছেন। আজ উনি ওঁর মেন্টরের খুনির সবচেয়ে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন।
“স্যার, মালয়েশিয়ান রয়্যাল পুলিশ (RMP) আমাদের সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে, কিন্তু একটা বড় পলিটিক্যাল রেস্ট্রিকশন আছে,” তানভীর একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন। “আগামী পরশু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর। মালয়েশিয়া সরকার চাচ্ছে না এই মুহূর্তে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এত বড় দুটি হোটেলে কোনো পুলিশি রেইড হোক। ফলে আমরা সরাসরি কোনো অ্যাকশনে যেতে পারছি না।”
“আসাফউদ্দৌলা ঠিক এই কূটনৈতিক জটিলতার সুযোগটাই নিচ্ছে,” আরিয়ান চশমাটা ঠিক করলেন। “সে ভাবছে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রটোকলের আড়ালে সে ওঁর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের প্রধান দুটি স্তম্ভ বেনামী শেলের মাধ্যমে লিকুইডেট করে টাকাটা ক্যারিবিয়ান অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেবে।”
ঠিক তখনই ঢাকা হেডকোয়ার্টার থেকে বর্ষা ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হলো। ওঁর চোখে এক অভাবনীয় জয়োল্লাস। “স্যার! আপনারা আসাফউদ্দৌলাকে ট্র্যাকিং করছেন ঠিকই, কিন্তু আমি এই গেমের আসল মাস্টারমাইন্ডের হদিস পেয়েছি! আসাফউদ্দৌলা যে ক্রিপ্টো ট্রাস্টের মাধ্যমে এই দুই হোটেলের মালিকানা সরাচ্ছিলেন, তার মূল লেজারটি আমি ভেঙে ফেলেছি। আর সেখানেই সালাহউদ্দিন... থুড়ি, আসাফউদ্দৌলার ফাইলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি বিশাল এনক্রিপ্টেড প্যারেন্ট কোম্পানির সন্ধান পেয়েছি। কোম্পানিটির নাম—‘ব্লু ওশান ট্রাস্ট’!”
আরিয়ান চমকে উঠে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। “ব্লু ওশান ট্রাস্ট? এটা কার কোম্পানি, বর্ষা?”
“আমি এখনো ওটার মালিকের নাম ডিকোড করতে পারিনি স্যার, কারণ ওটা ডার্ক-ওয়েবের একটা সিক্রেট নোড দিয়ে প্রটেক্টেড। কিন্তু এই ট্রাস্টের ডিজিটাল সিগনেচার আর তিন বছর আগে আমাদের মেন্টরের মার্ডারের সময় উদ্ধার করা এনক্রিপ্টেড ভাইরাসের সোর্স কোড ১০০% এক! স্যার, আসাফউদ্দৌলা আসলে একটা ঘুঁটি মাত্র। ওঁর এই মেরিনা প্লাজা হোটেলের বেসমেন্টে থাকা মেইনফ্রেম সার্ভার থেকেই এই ‘ব্লু ওশান ট্রাস্ট’ ওঁর পরবর্তী গ্লোবাল অপারেশনের ডেটা ওয়াইপিং প্রসেস স্টার্ট করেছে। আমাদের এখনই ওই সার্ভার রুম দখল করতে হবে, নইলে তিন বছর আগের সেই খুনের সমস্ত ডিজিটাল এভিডেন্স চিরতরে মুছে যাবে!”
বর্ষার এই আবিষ্কার পুরো অপারেশনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। আরিয়ান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করলেন না। “তানভীর, আমাদের এখনই মুভ করতে হবে। আমরা হোটেলের আইটি কোর-রুমে ব্ল্যাক-অপ্স ট্যাকটিক্যাল এন্ট্রি নেব।”
মেরিনা প্লাজা—বেসমেন্ট অপারেশন
রাত ১২টা ১৫ মিনিট। কুয়ালালামপুরের বুকে তখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।
রয়্যাল মেরিনা প্লাজা হোটেলের পেছনের সার্ভিস ডোর দিয়ে সাধারণ আইটি টেকনিশিয়ানের ছদ্মবেশে ভেতরে ঢুকলেন আরিয়ান এবং তানভীর। ওঁদের সাথে রয়েছে মালয়েশিয়ান পুলিশের চারজন স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল কমান্ডো (UTK)। আরিয়ানের কানে ওয়্যারলেস লুপ, ওঁর ডানহাতে একটি সাইলেন্সারযুক্ত পিস্তল জ্যাকেটের ভেতর লুকানো।
“বর্ষা, আমরা থার্ড বেসমেন্টের আইটি হাবের সামনে। পজিশন বলো,” আরিয়ান ফিসফিস করে বললেন।
“স্যার, মেইনফ্রেমের ডেটা ডিলিশন প্রসেস এখন ৮২ শতাংশে আছে। আপনাদের হাতে মাত্র ৭ মিনিট সময়। এর মধ্যে সার্ভারে একটি ফিজিক্যাল ওটিজি (OTG) বাইপাস ডিভাইস প্লাগ-ইন করতে হবে, যাতে আমি ঢাকা থেকে ডেটা ক্লোনিং শুরু করতে পারি,” বর্ষা রিয়েল-টাইম গাইড করল।
আইটি হাবের দরজার সামনে দুজন সশস্ত্র রাশিয়ান বাউন্সার পাহারা দিচ্ছিল। আসাফউদ্দৌলা ওঁর ব্যাকআপের জন্য এদের রেখেছিলেন।
এক মিলি-সেকেন্ডের নিখুঁত রিফ্লেক্স। আরিয়ান এবং তানভীর একসাথে কাউন্টার থেকে স্লাইড করে সামনে এগিয়ে গেলেন। বাউন্সাররা ওঁদের অস্ত্র উঁচানোর আগেই আরিয়ানের সাইলেন্সারযুক্ত পিস্তল দুবার গর্জে উঠল—ফিস্! ফিস্! বুলেটের আঘাতে একজন বাউন্সারের হাতের অস্ত্র ছিটকে গেল এবং তানভীরের নিখুঁত টেকডাউন প্রসেসে দ্বিতীয় বাউন্সারটি মুহূর্তের মধ্যে মেঝেতে আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
কমান্ডোরা দ্রুত আইটি হাবের মেটালিক ডোরটি হাইড্রোলিক কাটার দিয়ে কেটে ভেতরে ঢুকলেন। আরিয়ান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে ওঁর পকেট থেকে বর্ষার দেওয়া বিশেষ হার্ডড্রাইভটি মেইনফ্রেম সার্ভারের মূল পোর্টে প্লাগ-ইন করে দিলেন।
ঠিক তখনই হোটেলের ৫৮তম তলার পেন্টহাউস থেকে আসাফউদ্দৌলার পালানোর এলার্ম বেজে উঠল। বর্ষার ক্লোনিং প্রসেস যখন কেবল শুরু হয়েছে, তখন হোটেলের ছাদ থেকে একটি প্রাইভেট হেলিকপ্টারের রোটরের তীব্র শব্দ আন্ডারগ্রাউন্ড পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হলো।
“স্যার! আসাফউদ্দৌলা ছাদের হেলিপ্যাডের দিকে পালাচ্ছে!” তানভীর মনিটরের সার্ভেইল্যান্স ফিড দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন।
“তানভীর, তুমি আর কমান্ডোরা ছাদের দিকে যাও! বর্ষা, সার্ভার রুমের ডেটা ক্লোনিং যেন বন্ধ না হয়!” আরিয়ান নির্দেশ দিয়েই মেইন লিফটের দিকে ছুটলেন। কিন্তু লিফটের কন্ট্রোল প্যানেল আচমকা ফ্রিজ হয়ে গেল। স্ক্রিনে একটি লাল রঙের ইংরেজি বর্ণ ভেসে উঠল—‘R’। আরিয়ান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ফায়ার এক্সিট স্কোয়ারের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে স্প্রিন্ট করতে লাগলেন। ৪২ তলার এক্সটার্নাল গ্লাস লিফটের এমার্জেন্সি ব্রেক রিলিজ করে আরিয়ান যখন ছাদের হেলিপ্যাডের দরজা লাথি দিয়ে খুললেন, তখন ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ঝাপটা ওঁর মুখে এসে লাগল।
ছাদের ওপর তখন টুইন-ইঞ্জিনের একটি কালো ইউরোকপ্টার স্টার্ট নিয়ে কাঁপছে। ব্লেডের ঘূর্ণনে চারপাশের বৃষ্টির জল কুয়াশার মতো উড়ছে। তানভীর এবং মালয়েশিয়ান কমান্ডোরা অলরেডি সেখানে পজিশন নিয়েছেন, কিন্তু আসাফউদ্দৌলার সিকিউরিটি চিফ এক কোণ থেকে ভারী সাব-মেশিনগান দিয়ে অবিরাম ফায়ার করে ওঁদের আটকে রেখেছে—তা-তা-তা-তা! বুলেটের আঘাতে ছাদের ফ্লাডলাইটগুলো ভেঙে চারদিক আধা-অন্ধকার হয়ে গেল।
সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আরিয়ান নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল মুভ নিয়ে সরাসরি আসাফউদ্দৌলার পেছনে ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন। আসাফউদ্দৌলা তখন হেলিকপ্টারের খোলা দরজার সিঁড়িতে পা দিয়েছেন। আরিয়ানের পিস্তলের ঠান্ডা নলটা আসাফউদ্দৌলার ঘাড়ের ঠিক পেছনে গিয়ে ঠেকল।
“খেলা শেষ, আসাফউদ্দৌলা। নামুন,” আরিয়ানের কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের চেয়েও ভারী শোনাল।
আসাফউদ্দৌলা জমে গেলেন। কিন্তু উনি ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে ঘুরলেন, ওঁর চোখে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি।
“তুমি আমাকে অপরাধী বলছো, আরিয়ান?” আসাফউদ্দৌলার গলা বৃষ্টির গর্জনেও স্পষ্ট শোনা গেল। “আইন দিয়ে বিচার করছ আমার? কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখেছ? এই যে কুয়ালালামপুরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা চকচকে hotel, এই যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক—এর প্রতিটা ইটের নিচে বাংলাদেশের হাজার হাজার রেমিট্যান্স যোদ্ধা আর শ্রমিকের রক্ত আর ঘাম মিশে আছে। আমি একা চোর নই, আরিয়ান। যে সিস্টেমের ওপর ভর করে তুমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেই সিস্টেমই আমাকে এই সিংহাসনে বসিয়ে রেখেছে। আজ আমাকে সরাবে, কাল আমার জায়গায় অন্য কেউ বসবে। এই চক্র তুমি থামাতে পারবে না।”
আরিয়ান ওঁর পিস্তলের নিশানা স্থির রেখে বললেন, “সিস্টেমের দোহাই দিয়ে আপনি নিজের লোভকে জাস্টিফাই করতে পারেন না, আসাফউদ্দৌলা। হ্যান্ডস আপ।”
ঠিক তখনই এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল। কুয়াশা আর বৃষ্টির বুক চিরে আকাশ থেকে নেমে এলো আরেকটি বিশাল, কোনো লোগো ছাড়া মিলিটারি-গ্রেড ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার। ওই হেলিকপ্টারের সাইড ডোর থেকে একটি অত্যাধুনিক স্নাইপার রাইফেল সরাসরি আরিয়ানের বুক লক্ষ্য করে রেড-ডট লেজার ফেলল।
ধাঁই!
একটি নিখুঁত স্নাইপার শট এসে আসাফউদ্দৌলার আর আরিয়ানের ঠিক মাঝখানের কংক্রিটের মেঝেতে আঘাত করল। তীব্র শকে আরিয়ান দুই পা পেছনে ছিটকে গেলেন। সেই ক্ষণিকের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আসাফউদ্দৌলার সিকিউরিটি চিফ ওঁর হাত ধরে ওঁর নিজস্ব ইউরোকপ্টারের ভেতর টেনে তুলল।
আরিয়ান ছাদ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গুলি করতে গেলেন, কিন্তু রহস্যময় সেই ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টারটি আসাফউদ্দৌলার হেলিকপ্টারকে কাভার দিয়ে কুয়ালালামপুরের মেঘলা আকাশের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। তবে ওটা ঘুরে যাওয়ার সময়, সার্চলাইটের তীব্র আলোয় হেলিকপ্টারের কালো দরজার পাশে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য নীল রঙের একটি সমুদ্র-তরঙ্গ চিহ্ন দেখতে পেল আরিয়ান—যা হুবহু মিলছে বর্ষার খুঁজে পাওয়া সেই ‘ব্লু ওশান ট্রাস্ট’-এর মনোগ্রামের সাথে!
পরদিন সকাল। কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনফারেন্স রুম।
প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফরের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে আরিয়ান ও তানভীর টেবিলে একটি মেমোরি ড্রাইভ রাখলেন। বর্ষা ঢাকা থেকে স্ক্রিনে যুক্ত হলো। ওঁর মুখে একাধারে উত্তেজনা আর হতাশার ছাপ।
“স্যার, ডেটা ওয়াইপিং ভাইরাসের আক্রমণের কারণে আমরা পুরো সার্ভার ব্যাকআপ করতে পারিনি। ডেটার মাত্র ৬০% উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে,” বর্ষা স্ক্রিনে ফাইলগুলো দেখাল।
তানভীর কিছুটা দমে গেলেন, কিন্তু আরিয়ান ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। “হতাশ হওয়ার কিছু নেই বর্ষা। এই ৬০%-এর মধ্যেই রয়েছে আসাফউদ্দৌলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই শেল কোম্পানির নথিপত্র এবং সাইপ্রাস ও সিঙ্গাপুরের ফিন্যান্সিয়াল ট্রেইল। আর সবচেয়ে বড় কথা, তোমার খুঁজে পাওয়া ‘ব্লু ওশান ট্রাস্ট’-এর লকিং ফাইলটাই আমাদের আসল অপরাধীর সদর দরজায় পৌঁছে দিয়েছে। মালয়েশিয়ান সরকার অলরেডি এই ডেটার ভিত্তিতে হোটেল দুটো ক্রোক করার আইনি নোটিশ জারি করেছে।”
তানভীর বললেন, “তার মানে, ওঁর বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য এখন অচল।”
আরিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জানালার বাইরে কুয়ালালামপুরের শান্ত সকালের দিকে তাকালেন। ওঁর মনে এক গভীর ব্যক্তিগত হাহাকার আর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি জেগে উঠল। উনি ভাবলেন—প্রতিবারই আমি একজন পলাতককে ধরি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখি ওরা কেবল বড় খেলাটার ছোট একটা অংশ। আসল মাস্টারমাইন্ড তো পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। কিন্তু এবার আর আমি শুধু অফিসের ডিউটি করছি না, স্যার। আপনার খুনিকে আমি এবার ওঁর নিজের ডেরায় গিয়েই শেষ করব।
ঠিক তখনই আরিয়ানের নিজস্ব এনক্রিপ্টেড ল্যাপটপের কোণে একটি তীক্ষ্ণ বীপ শব্দ হলো। একটি অজানা আইপি অ্যাড্রেস থেকে সরাসরি একটি টেক্সট মেসেজ পুশ করা হয়েছে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আরিয়ানের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। স্ক্রিনে টাইপ করা হচ্ছে একটি চেনা রহস্যময় সিগনেচার:
"ভালো খেলেছ, আরিয়ান। আসাফউদ্দৌলার সময় শেষ হয়েছিল, তাই ওঁর পতন দরকার ছিল। ওঁর এই সাম্রাজ্যের নতুন মালিক কে হচ্ছে, তা দেখতে আগামী সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে চলে এসো। বর্ষা তোমাকে ক্লুটা ঠিকই ধরিয়ে দিয়েছে। জাস্ট লুক ফর দ্য ‘ব্লু ওশান ট্রাস্ট’।"
— R
আরিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সজোরে বন্ধ করলেন। ওঁর চোখে এখন এক অদ্ভুত, তীব্র শিকারী আলো। ওঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক আত্মবিশ্বাসী, ভয়ঙ্কর হাসি। ওঁর মগজ অলরেডি পরবর্তী চালের হিসাব কষে ফেলেছে।
“তানভীর, বর্ষা... ব্যাগ গুছিয়ে নাও,” আরিয়ান ওঁর জ্যাকেটটা কাঁধে তুলে নিলেন। “আসাফউদ্দৌলার চ্যাপ্টার আমরা ক্লোজ করেছি। এবার আমাদের পরবর্তী গন্তব্য—বালি, ইন্দোনেশিয়া। সেই অদৃশ্য শত্রু আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, আর এবার আমি ওঁর তৈরি করা খেলার মাঠেই ওঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস করব। ওঁর কাছ থেকে আমার একটা পুরনো রক্তের ঋণ উসুল করার বাকি আছে।”
কনফারেন্স রুমের বাইরে তখন কুয়ালালামপুরের আকাশে নতুন সূর্য উঠছে, আর আরিয়ানের আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের ক্যানভাসে শুরু হতে যাচ্ছে এক চূড়ান্ত, ব্যক্তিগত ও বিধ্বংসী অধ্যায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


