বাইরের পৃথিবীতে রাত নেমে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। আব্বা, আম্মার সাথে পরামর্শ করছিল দেশে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে। দেশে যাবে কি যাবে না এই। আম্মা মনে করছে দেশে গিয়ে শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা, আর আব্বারও শরীর ভালো নেই, তার চেয়ে এখানে থেকেই যা করা যায় করলে ভালো হয়। আমার খুব অবাক লাগছিল ওদের কথা শুনে।
- তোমার ভাই মারা গেছে আর তুমি যাবে না?
- কি করবো মা। আমার অফিস থেকে ছুটি যে দেবে না তা না, কিন্তু এটা খুব ব্যস্তসময়। এখন ছুটিতে গেলে একটা ইরেসপনসিবল ব্যাপার হবে।..আর তা ছাড়া ওরা আমার আশা করছে খরচ টরচ সা মলানোর জন্য। এখান থেকে টাকা পাঠিয়ে দিলে বেশী ভালো হবে।
- একজন মানুষ, তোমার ভালোবাসার মানুষ। যে ছিল, আজ নেই। তোমার মা অসুস্থ। এদের সবার থেকে তোমার কাছে দায়িত্ব, টাকা এইগুলি বড় হলো?
আম্মা বললো - ইতি, চুপ কর! যা বুঝিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। এখন তোর আব্বা যেতে পারবে না, তার শরীরে কুলালে তো যাবে। সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পরে থাকলে তাকে কে দেখবে?
- আম্মা তুমি যদি এত দূরে অসুস্থ হয়ে পরে থাকতে, আমি তখন আমার নিজের অসুস্থতা বা চাকরীর কথা ভাবতাম না। আমি যেভাবেই হোক তোমার কাছে যেতাম...'
...আমি বুঝতে পারছিলাম আমার গলা চড়ে যাচ্ছে। আর নিজেকে সামলাতেও পারছিলাম না। ভীষণ রাগ হচ্ছিল, আব্বার উপর, আম্মার উপরও।
আব্বা বললো - যাক। এত কথার দরকার নাই। তোমার সময় আসলে তখন দেখা যাবে তুমি কতটুকু কর। মুখে বড় বড় বুলি সবাই ছাড়তে পারে। তোমার ভেতর প্র্যাকটিকালিটির খুব অভাব। আমার কাছে তো রাজভান্ডার নাই। দেশে না গেলে টিকেটের টাকাটাও পাঠানো যাবে, আর আর্থিক সাহায্যেরই সবার প্রয়োজন এখন...
- আমি শুধু মুখেই বুলি ছাড়ছি না। I mean what I am saying। তোমরা মুখেই শুধু ভালোবাসার কথা বল, অথচ নিজেদের ছাড়া কিছুই ভাবো না। তোমার মা, যার জীবনের একমাত্র অবলম্বন তুমি এবং সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেনও তোমাকে। you are a part of her... আর she's in her death bed now আর তুমি লাভ ক্ষতির হিসাব করে তাকে দেখতে যাবে? it's so damn funny abba! I feel like laughing my head off!
...আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। গলা কেঁপে যাচ্ছিল । আব্বার চোখে রাগের ছায়া গাঢ় হচ্ছিল। আমার দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে আব্বা বললো -
- তুই আমার সামনে থেকে যা। আমাকে ভালোবাসা শেখাতে আসিস না। I have lived longer than yourself, তোর চেয়ে অনেক বেশী জানি আমি। তুই তোর নিজের জীবন নিয়ে ভাব, that would be more than enough!।
- তুমি আমার চেয়ে বেশী দেখেছ হয়তো। কিন্তু তারমানে এই না যে সব ব্যাপারেই তুমি কারেক্ট। কোন কোন ব্যাপারে আমিও ঠিক হতে পারি। আর মানুষ মানসিক ভাবে তখনই ম্যাচিওরড হয় যখন সে এই সত্যটা বুঝতে পারে।
- আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নসিহত দিতে হবে না। তুই যা।
ভীষণ কান্না আসছিল আমার। গলার কাঁপুনিও সামলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। শুধু বললাম - I never expected this of you Abba
আমি আমার ঘরে চলে এলাম। প্রচন্ড একটা কষ্ট জমাট বেঁধে ছিল মনে। কষ্টগুলো গলার কাছে এসে আটকে আছে। আমার আব্বা! তাঁর ভেতর কেন এসব ক্ষুদ্রতা থাকবে? আত্মকেন্দ্রিকতার ছোটর থেকে ছোট ছায়াও কেন তাকে স্পর্শ করবে। আমার আব্বা তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ! এমন কেন হয় তাহলে? আব্বা তোমাকে আমি কত ভালোবাসি, তুমি জানো না? তবু কেন এমন কর? কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
...
ঘুম ভাঙলো চোখের ওপর রোদের আঁচ পড়ায়। বেলা হয়ে গেছে অনেক। বাসায় কেউ নেই মনে হয়। বাড়ীটা লাগছে নির্জনপুরীর মত। এটাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - রেীদ্রময়ী রাতি। মনের ভেতর তখন থেকে একটা গজল ঘুরপাক খাচ্ছে।
..শাব রোজ মাওসাম বাদালতে রাহে
নায়ে গাম পুরানোমে ঢালতে রাহে
মুহাব্বাত, ওয়াফা, দোস্তী, ইনকিলাব
খিলোনে বানায়ে ব্যাহেলতে রাহে..'
চারপাশে অন্য ধরনের বিষন্নতার উপস্থিতি টের পাই। কি যেন হারানোর অনুভুতি আমাকে টেনে নিয়ে যায় তার গভীরে। সময় ঝরে যায়। আমি একাকীত্বকে সঙ্গী করে, শূণ্যতার সাথে চালাই কথোপকথন। কি এক আবিষ্টতা ঘিরে থাকে আমাকে।
(চলবে)
প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


