somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: অচেনা: 7ম পর্ব

১১ ই আগস্ট, ২০০৬ বিকাল ৫:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেশ ঘন ঘন ফোন আসছে। এরমধ্যে আমার বড় চাচার মৃত্যু সংবাদ মেলবোর্নের বাঙালী সমাজে জানাজানি হয়েছে। সবাই ফোন করে তাদের দুঃখ প্রকাশ করছে। আব্বা সবার সাথেই আবেগ শূণ্য গলায় কথা বলছে। বাহ্যিকভাবে মনে হয় আব্বা অনেকটাই সামলে উঠেছে। তাকে হয়তো দেশে যেতে হবে শীগগীরই কারণ দাদীও খুব অসুস্থ।

বাইরের পৃথিবীতে রাত নেমে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। আব্বা, আম্মার সাথে পরামর্শ করছিল দেশে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে। দেশে যাবে কি যাবে না এই। আম্মা মনে করছে দেশে গিয়ে শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা, আর আব্বারও শরীর ভালো নেই, তার চেয়ে এখানে থেকেই যা করা যায় করলে ভালো হয়। আমার খুব অবাক লাগছিল ওদের কথা শুনে।

- তোমার ভাই মারা গেছে আর তুমি যাবে না?

- কি করবো মা। আমার অফিস থেকে ছুটি যে দেবে না তা না, কিন্তু এটা খুব ব্যস্তসময়। এখন ছুটিতে গেলে একটা ইরেসপনসিবল ব্যাপার হবে।..আর তা ছাড়া ওরা আমার আশা করছে খরচ টরচ সা মলানোর জন্য। এখান থেকে টাকা পাঠিয়ে দিলে বেশী ভালো হবে।

- একজন মানুষ, তোমার ভালোবাসার মানুষ। যে ছিল, আজ নেই। তোমার মা অসুস্থ। এদের সবার থেকে তোমার কাছে দায়িত্ব, টাকা এইগুলি বড় হলো?

আম্মা বললো - ইতি, চুপ কর! যা বুঝিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। এখন তোর আব্বা যেতে পারবে না, তার শরীরে কুলালে তো যাবে। সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পরে থাকলে তাকে কে দেখবে?

- আম্মা তুমি যদি এত দূরে অসুস্থ হয়ে পরে থাকতে, আমি তখন আমার নিজের অসুস্থতা বা চাকরীর কথা ভাবতাম না। আমি যেভাবেই হোক তোমার কাছে যেতাম...'

...আমি বুঝতে পারছিলাম আমার গলা চড়ে যাচ্ছে। আর নিজেকে সামলাতেও পারছিলাম না। ভীষণ রাগ হচ্ছিল, আব্বার উপর, আম্মার উপরও।

আব্বা বললো - যাক। এত কথার দরকার নাই। তোমার সময় আসলে তখন দেখা যাবে তুমি কতটুকু কর। মুখে বড় বড় বুলি সবাই ছাড়তে পারে। তোমার ভেতর প্র্যাকটিকালিটির খুব অভাব। আমার কাছে তো রাজভান্ডার নাই। দেশে না গেলে টিকেটের টাকাটাও পাঠানো যাবে, আর আর্থিক সাহায্যেরই সবার প্রয়োজন এখন...

- আমি শুধু মুখেই বুলি ছাড়ছি না। I mean what I am saying। তোমরা মুখেই শুধু ভালোবাসার কথা বল, অথচ নিজেদের ছাড়া কিছুই ভাবো না। তোমার মা, যার জীবনের একমাত্র অবলম্বন তুমি এবং সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেনও তোমাকে। you are a part of her... আর she's in her death bed now আর তুমি লাভ ক্ষতির হিসাব করে তাকে দেখতে যাবে? it's so damn funny abba! I feel like laughing my head off!

...আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। গলা কেঁপে যাচ্ছিল । আব্বার চোখে রাগের ছায়া গাঢ় হচ্ছিল। আমার দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে আব্বা বললো -

- তুই আমার সামনে থেকে যা। আমাকে ভালোবাসা শেখাতে আসিস না। I have lived longer than yourself, তোর চেয়ে অনেক বেশী জানি আমি। তুই তোর নিজের জীবন নিয়ে ভাব, that would be more than enough!।

- তুমি আমার চেয়ে বেশী দেখেছ হয়তো। কিন্তু তারমানে এই না যে সব ব্যাপারেই তুমি কারেক্ট। কোন কোন ব্যাপারে আমিও ঠিক হতে পারি। আর মানুষ মানসিক ভাবে তখনই ম্যাচিওরড হয় যখন সে এই সত্যটা বুঝতে পারে।

- আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নসিহত দিতে হবে না। তুই যা।

ভীষণ কান্না আসছিল আমার। গলার কাঁপুনিও সামলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। শুধু বললাম - I never expected this of you Abba

আমি আমার ঘরে চলে এলাম। প্রচন্ড একটা কষ্ট জমাট বেঁধে ছিল মনে। কষ্টগুলো গলার কাছে এসে আটকে আছে। আমার আব্বা! তাঁর ভেতর কেন এসব ক্ষুদ্রতা থাকবে? আত্মকেন্দ্রিকতার ছোটর থেকে ছোট ছায়াও কেন তাকে স্পর্শ করবে। আমার আব্বা তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ! এমন কেন হয় তাহলে? আব্বা তোমাকে আমি কত ভালোবাসি, তুমি জানো না? তবু কেন এমন কর? কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

...

ঘুম ভাঙলো চোখের ওপর রোদের আঁচ পড়ায়। বেলা হয়ে গেছে অনেক। বাসায় কেউ নেই মনে হয়। বাড়ীটা লাগছে নির্জনপুরীর মত। এটাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - রেীদ্রময়ী রাতি। মনের ভেতর তখন থেকে একটা গজল ঘুরপাক খাচ্ছে।
..শাব রোজ মাওসাম বাদালতে রাহে
নায়ে গাম পুরানোমে ঢালতে রাহে
মুহাব্বাত, ওয়াফা, দোস্তী, ইনকিলাব
খিলোনে বানায়ে ব্যাহেলতে রাহে..'

চারপাশে অন্য ধরনের বিষন্নতার উপস্থিতি টের পাই। কি যেন হারানোর অনুভুতি আমাকে টেনে নিয়ে যায় তার গভীরে। সময় ঝরে যায়। আমি একাকীত্বকে সঙ্গী করে, শূণ্যতার সাথে চালাই কথোপকথন। কি এক আবিষ্টতা ঘিরে থাকে আমাকে।

(চলবে)

প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান





সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ দহনবেলার কহন কথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:১৫




বুকের অভিমান, ক্ষত লুকিয়েছি মনে


নিঝুম রাতের সঙ্গী তারা গভীর গোপনে।


অচেনা নক্ষত্র জ্বলে নেভে দুরে একাকী 


বিচ্ছিন্নতার উপমা হিসেবে নিজেকেই রাখি। 


আসমুদ্রহিমাচল জ্বালা বুকে তবু দায়িত্ববান 


হাজার দহনে পুড়ে খাঁটি শিখা অনির্বাণ।


© রফিকুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০০১ সালেও বিএনপিকে ডোবানোর দায়িত্ব নিয়েছিল টুকু!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৫১


ভয়াবহ লোডশেডিং। মধ্যরাতে ঢাকবাসীর হাঁসফাঁস। হঠাৎ করে এতো লোডশেডিং হওয়ার কোন কারণ নেই অথচ মধ্যরাতে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকেনা বললেই চলে। গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ার সময় আছে কিন্তু আসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বাষ্ট্রপতি নির্বাচন নাকি রাষ্ট্রীয় খরচে তামাশা!!!

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


বাংলাদেশে সম্মানিত রাষ্ট্রপতি (হবু)


নির্বাচন, এই শব্দটি শুনা মাত্র যে বিষয়টি আমাদের মাথায় আসে তা হচ্ছে ভোট প্রদানের যোগ্য ভোটারদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে একজন যোগ্য ব্যাক্তিকে দায়িত্ব অর্পণের জন্য নির্বাচিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভাড়াটে কান্নাকারী

লিখেছেন রাজসোহান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



লোকে ভাবে আমরা কান্না বিক্রি করি। আমরা কান্না বিক্রি করি না। আমরা শব্দ বিক্রি করি।

শোকসভায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নীরবতা। বক্তা বক্তৃতা শেষ করে বসে পড়লেন, পরের বক্তা এখনো মাইকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের টিভি তে কি দেখতে চাই না

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৭




ওপার বাংলা আর এপার বাংলা মানে কোন দেশের কোন অঞ্চল বোঝায়, সেটা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু দু'বাংলার সংস্কৃতি বেশির ভাগটাই আলাদা। শব্দ উচ্চারন থেকে শুরু করে মন মানসিকতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×