আমার দরজায় কড়া নেড়ে আব্বা ভেতরে ঢুকলো। কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। আমি টের পেয়েছি কিন্তু অন্যদিনের মত তাকে দরজার কাছ থেকে এগিয়ে আনতে যাইনি।
- কিরে সন্ধ্যাবেলা শুয়ে পড়েছিস কেন?
- এমনি।
- শরীর খারাপ লাগছে?
- না। - বাহ ! সুন্দর তো বাজনাটা! কে বাজাচ্ছে?
- ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ।
- তুই রেগে আছিস, না?
- রাগ করার কি আছে? -
শোন, I have been thinking, you are right, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আজকে আমি টিকেট বুক করেছি। পরশু যাচ্ছি।
আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। আমি অনেক্ষণ আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তাঁর চোখ পানিতে ভরে যাচ্ছিল। কান্না কি সংক্রামক? আমি তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বল্ললাম
- thank you আব্বা।
এখন খেতে চল ।সারাদিন তো কিছু খাস নাই।
আব্বা আর আমি খাওয়ার ঘরে আসলাম। সবাই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য।
----------
রাত অনেক হয়েছে। প্রায় তিনটা বাজে। আব্বা আম্মা ঘুমিয়ে পড়েছে এর মধ্যে। আমরা তিনজন বসে কথা বলছি। এরকম অনেকদিন হয় না। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে সাগর সেনের গলায়
'ঝরোঝরো বারি ঝরে বনো মাঝে, আমারো মনের সুর ওই বাজে...
" আমরা মৃদু গলায় কথা বলছি। রাজ্যের সংলাপ। হাসিকান্না মেশানো, ছোট ছোট মুহুর্ত, অনন্ত লুকিয়ে আছে এরই মধ্যে।
...
সকাল হচ্ছে ধীরে ধীরে। প্রায় সারা রাত অনিদ্রার পরে ইরা,ইলা এখন ঘুমে অচেতন। কিছুক্ষণ আগে আমি ওদের গায়ে লেপ তুলে দিয়ে এসেছি।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি বেশ একটু শীত শীত। অন্ধকার কেটে গেছে অনেকটা। কিন্তু সূর্যউঠতে এখনও বেশ দেরী। অনেকদিন এরকম সকাল হতে দেখিনা। কেমন পবিত্র চারপাশ। আমি যে সময় ঘুম থেকে জেগে উঠি, ততক্ষণে পৃথিবী এগিয়ে যায় অনেকখানি। মানুষ হারিয়ে ফেলে তার নমনীয়তা আর কোমলতা। যান্ত্রিকতার মুখোশ আঁটা হয়ে যায় ততক্ষণে। আর ওদের মুখ দেখা হয় না।
আজ অন্যরকম। আজ আমি জানবো পৃথিবী অনেক সুন্দর। আকাশে মেঘ জমেছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণ পর । নতুন সূর্যের লাল আর মেঘের ছাইরঙ মিলেমিশে আকাশটাকে অদ্ভুত লাগছে। কিছুক্ষণ আগে আমি সাদা শাড়ী পড়েছি। চুল ছড়িয়ে দিয়েছি পিঠময়। আজ আমি বৃষ্টিতে ভিজবো।
আমি ঘাসের ওপর নেমে এলাম। সকালটা খুব সুন্দর মনে হলো। পাতার ওপর শিশির বিন্দুর স্পর্শ পেতে পেতে মনে হলো বহুদিন পর পবিত্রতা আমাকে ছুঁয়ে গেলো। আমি নতুন হলাম । বাতাসে একটা পরিচিত সুগন্ধ, যা মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা কিছুস্মৃতি, প্রায় পূর্বজন্মের মত। এরকম সকালে অনেক কিছুই ক্ষমা করা যায় হয়তো।
আব্বা তুমি আমাকে কখনো বুঝতে চেষ্টা করোনি আমার মতো করে । কখনোই বলোনি শুধু আমার জন্যই আমি চাইবার মতো দামী। সায়ন তুমি যে কোথায়, তাও এখন আর জানি না। অনেক কথা জমা ছিল তোমাকে বলার, কথাগুলি বলা হবে না। কতদির বৃষ্টিতে একা একা ভিজতে ভিজতে ভেবেছি একদিন তুমিও আমার সাথে থাকবে, অথবা ভীড়ের ভেতর একা একা হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে একদির তোমার হাত ধরে হাঁটবো। আমি জানি এরকম কিছুই হবে না। ভীড়ের ভেতর সবসময় একাই থাকবো। যেমন ছিলাম। তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম।
বৃষ্টি নামতেই নেমে পড়লাম রাস্তায়। আজ আমি নিরুদ্দেশে যাবো। আমাকে যে খুব সুন্দর লাগছিল, তা বুঝতে পারছিলাম পথচারীদের দৃষ্টিতে। যে দৃষ্টি সুন্দরকে সুন্দরের মত করে দেখে। যে দৃষ্টি পবিত্র কে আরো পবিত্র করে। আমার খুব গর্ব হচ্ছিল।
স্টেশানে বাস এসে থামতেই উঠে পড়লাম। ড্রাইভার হেসে জানতে চাইলো - তুমি কোথায় যাবে সিনোরিতা?
..বোধহয় স্প্যানিশ শব্দ, আমার জানা নেই। তবে এই মুহুর্তে শব্দটা শুনে নিজেকে খুব রূপসী আর দামী মনে হচ্ছিল।
আমি হেসে জবাব দিলাম, আমি জানি না, আজ আমি সারাদিন তোমার সাথে ঘুরবো।
ও কি বুঝলো কে জানে। হেসে জায়গা দেখিয়ে দিল।
সকালের গাড়ি, ভীড় তেমন নেই। আমি জানালার পাশে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে। আর আমি গাড়ির মানুষগুলিকে অবাক করে দিয়ে গেয়ে উঠলাম
- 'আমি কান পেতে রই, আমার আপন হূদয় গহন দ্্বারে, বারে বারে...'
-----------
এপ্রিল 1994
প্রকাশ: পরবাস
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ বিকাল ৫:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


