বাংলাদেশে ‘র’ তৎপরতা (১৯৭৬-'৯০)
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার একটি দৈনিকের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের একটি ভূমিকা রয়েছে” । ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের এই কথায় স্বভাবতই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের এই ‘একটি' ভূমিকা আসলে কি এবং রাজনীতি যেহেতু রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে, তাই ভারতীয় ভূমিকায় সহায়তাকারী সেই রাজনৈতিক দল কোটি?
উপরোক্ত প্রসঙ্গে ২৩ জুলাই '৯৩ সংখ্যা সাপ্তাহিক বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধের উল্লেখ করা যায়। 'বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক' শিরোনামের উক্ত নিবন্ধে প্ৰয়াত সাংবাদিক জনাব শামছুর রহমান উল্লেখ করেছিলেন,
“পঁচাত্তর-পরবর্তীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা তারা (ভারত) গ্রহণ করেছিল তাতে তাদের মৌলনীতি ছিল দু'টি-(১) বাংলাদেশে ভারত অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠিত করা এবং ভারতের স্বার্থের বাহক দল ও ব্যক্তিদেরকে আনুকূল্য প্রদান করা এবং (২) প্রথম কৌশল ব্যর্থ হলে বিভিন্নভাবে চাপ ও প্রভাব বিস্তার করে ক্ষমতাসীন সরকারকে নতজানু করানো, যাতে আর্থিক, রাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে বাংলাদেশ (ভারতের) বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।"

এ দু'টো নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারত কোন সময়ই পিছপা হয়নি। বিশেষ করে ১৯৬২ সালে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিল '৭৫-এর পট পরিবর্তনে তা বেশ খানিকটা হোচট খাওয়ায় তাদের ভিন্ন পথে কিন্তু কৌশলে অগ্রসর হতে হয় । তবে তাই বলে যে ভারত বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ আগ্রাসন চালানোর চিন্তা করেনি তা কিন্তু নয়। বরং এব্যাপারে তদানীন্তন ইন্দিরা সরকারের মনোভাব বোঝা যায় স্বয়ং ভারতীয় লেখকদের কথা থেকে।
এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করায় 'র' খুব সহজেই এদেশের সকল পর্যায়ে এজেন্ট তৈরীতে সক্ষম হয় । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা এসকল এজেন্টদের নিস্ক্রিয় করে দেয়নি। বরং শেখ মুজিব সরকার যাদের সাথে আপাতদৃষ্টিতে ভারতের সুসম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয় সেই মুজিব আমলেও 'র'-তৎপরতা সমান তালে অব্যাহত ছিল। এমনকি “সে সময় 'র' এজেন্টরা নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে নজর রাখা অব্যাহত রাখে”। তবে “স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকেই বাংলাদেশের প্রতি ভারত সরকারের আচরণ ছিলো আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন। ফলে বাংলাদেশের জনগণ ভারতকে সন্দেহ ও ঘৃণার বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই ঘৃণা ও সন্দেহের কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের মৈত্রীর ব্যাপার ছিলো বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন। '৭১-এর পর সোভিয়েত- মার্কিন সম্পর্কে অবনতি ঘটে। সে সময় গোটা বিশ্ব দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরস্পর মুখোমুখি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারত সোভিয়েত 'ইউনিয়নের মিত্রশক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অপরদিকে ভিয়েতনাম ও 'কম্বোডিয়ায় পরাজয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এ অঞ্চলে হ্রাস পেতে থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ে ভারতের আত্ম-অহংকার হঠাৎ করে বেড়ে ঘায়। একই সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন পরাজয়ে ভারতের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। এই দুই ইচ্ছাশক্তির জোরে ভারত নিজেকে এ অঞ্চলের মুরুব্বী হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে। শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশের বিশাল সমরসজ্জা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নিজের বলয়ভুক্ত করার সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়া । ১৯৭১ সালের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সেনা কর্মকর্তারা দক্ষিণ এশিয়াসহ অস্ট্রেলিয়ার জলসীমা পর্যন্ত ভারতের একাধিপত্য কায়েমের মাস্টার প্লান তৈরী করে। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ এই মাস্টার প্লান বাস্তবায়নে ভারতকে সকল প্রকার সহযোগিতা দিতে শুরু করে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করে ভারত অত্যাধুনিক অস্ত্রে নিজেকে সজ্জিত করতে থাকে । এ মাস্টার প্লানের চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্যে তার প্রয়োজন হয় রাজনৈতিক সমর্থনের। এ লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর স্নায়ুবিক চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে ভারত। প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভূটান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করে। মাঠে নামিয়ে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে। উপরোক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ ও ভূটানের কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নেই। এরা ভারতীয় বাজারের ক্রেতা। বাকি দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেব আত্মপ্রকাশ করে ।
স্বাধীনতার পর মুজিব সরকারের ওপর ছিলো ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব। এ প্রভাব বিস্তার করতে ভারত সরকার আশ্রয় নেয় বিভিন্ন কৌশলের। শেখ মুজিব তার স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বের জন্য ভারতের এ ধরনের নাক গলানো নীতিতে প্রায়শঃ বিরক্ত হতেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র' এ কারণে শেখ মুজিবকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতো না। 'র' শেখ মুজিবকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজে উঠে পড়ে লাগে। মুজিব মন্ত্রিসভায় কয়েকজন এ সময় 'র'-এর পক্ষে কাজ করতো। অতঃপর '৭৫-এর ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়” ২। এ অবস্থায় 'র'-খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়লেও '৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর আবার তারা বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে “...যে পরিস্থিতিতে ও যেভাবে ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় (মুজিব হত্যাকান্ডের মাত্র ৮০ দিনের মাথায়), তাতে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ গোপন ভারতীয় সমর্থন ছিল” ।
এ প্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে 'র'-এর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে অন্য কোন শাসক তাঁর মতো রুখে দাঁড়াননি। এবং একারণেই জে. জিয়াকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে ভয়াবহ সব গোপন কার্যক্রম। এমনকি সে সময় বাংলাদেশে 'র' কতোটা তৎপর ছিল তা বোঝা যায় স্বয়ং তাঁর (জিয়ার ) স্বীকারোক্তি থেকে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভারত সফরের সময় ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলাকালীন 'র'-এর তৎকালীন প্রধান আর. এন. কাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। “ইন্দিরা গান্ধীর এক প্রশ্নের জবাবে জিয়া কাওকে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন-যতটুকু না আমি জানি, তার থেকে এই ভদ্রলোক বেশী জানেন আমার দেশ কিভাবে চলছে” -"।
জে. জিয়ার শাসনামলে 'র' এমন কোন কার্যক্রম চালাতে বাকী রাখেনি যার মাধ্যমে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শের পতন ঘটানো যায়। এক্ষেত্রে জে. জিয়ার যেসব পদক্ষেপ ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো হলো-
১। জে. জিয়া পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতীয় বলয়ের বাইরে এসে চীন, পাকিস্তান ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বস্তুতঃ বিদেশনীতির এই কৌশলের কারণেই ভারত প্রস্তুতি নেয়ার পরও বাংলাদেশে সামরিক আগ্রাসন পরিচালনার দ্বারপ্রান্তে এসেও পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয় ।
২। মুক্তিযুদ্ধকালীন তদানীন্তন প্রবাসী সরকার ভারতের সাথে গোপন সাতদফা চুক্তি প্রণয়ন করেন। এর একটি ধারা ছিল যে, বাংলাদেশের স্বতন্ত্র কোন সশস্ত্রবাহিনী থাকবে না । পরবর্তিতে মুজিব আমলে ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতেও অধীনতামূলক বহু ধারা সংযোজিত ছিল। এসব কারণে ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও শেখ মুজিব সশস্ত্রবাহিনীকে সুসজ্জিত করে গড়ে তুলতে পারেননি। কিন্তু জে. জিয়া ভারতীয় চাপকে উপেক্ষা করে একটি শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যে তিনি মুজিব আমলের এক ডিভিশনকে পাঁচ ডিভিশনে উন্নীত করেন। এছাড়া তিনি একটি ছায়া প্রতিরক্ষানীতিও প্রণয়ন করেন যার আলোকে সম্ভাব্য ভারতীয় আগ্রাসন মোকবিলায় কি কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সেজন্য প্রস্তুতিও চলতে থাকে ।
৩। জে. জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শন ভারতকে সবচেয়ে বেশী বিচলিত করে তোলে।
৪। কথিত ভারতীয় সেক্যুলার দর্শন ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের মাত্রা জে. জিয়ার শাসনামলে সংকুচিত হয়ে আসে।
৫। অর্থনৈতিক খাতে ভারত নির্ভরশীলতা হ্রাস পাওয়ায় ভারতীয় নীতি নির্ধারকগণ যারপরনাই চিন্তিত হয়ে পড়েন।
৬। ভারত যে দলটিকে 'বন্ধু' মনে করতো তার রাজনৈতিক অপমৃত্যু ঘটার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় 'র' কর্মকর্তাগণ জে. জিয়ার শাসনামলকে ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী বলে চিহ্নিত করেন ।
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় নীতি নির্ধারকগণ দু'টো উপায় অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। এর একটি হলো- যেকোনভাবে জে. জিয়াকে উৎখাত করা বা সম্ভব হলে হত্যা করা ও দ্বিতীয়টি হচ্ছে যদি বা যতদিন তা করা সম্ভব না হয় ততদিন জিয়া প্রশাসনকে বিভিন্নমুখী চাপে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা যাতে তারা দেশগড়ায় নজর দিতে না পারেন এবং পক্ষান্তরে বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায়।উপরোক্ত সূত্রের আলোকে 'র' প্রথম লক্ষ্যকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরে নিয়ে জিয়া প্রশাসনকে বিশৃংখল করে তোলায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে এধরনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তৎপরতার বিবরণ তুলে ধরা হলো।

কাদেরিয়া বাহিনী সৃষ্টি
শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার পর তদানীন্তন আ'লীগ নেতা কাদের সিদ্দিকী যিনি বাঘা সিদ্দিকী নামে পরিচিত তিনি জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। উল্লেখ্য যে, কাদের সিদ্দিকীর সাথে 'র'-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। 'র'-এর সহযোগিতায় তিনি কিভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তার বিবরণ পাওয়া যায় 'র'-সম্পর্কে লিখিত ভারতীয় লেখক অশোকা রায়নার বইয়ে। 'ইনসাইড 'র'-ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়' শিরোনামের ঐ বইটিতে কাদেরিয়া বাহিনী সৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়— “টাইগার সিদ্দিকী যিনি দেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার সংকল্প ব্যক্ত করেন। তিনি তাঁর সাথে তখনকার ‘ক্ষয়প্রাপ্ত' মুক্তিবাহিনীর ১৬,০০০-২০,০০০ সদস্য নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নেন ।
টাইগার সিদ্দিকী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সমস্ত 'র' সদস্যের সাথে পরিচিত ছিলেন, তিনি পুনরায় সাহায্য ও নিরাপত্তার আশায় তাদের সাথে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশে তিনি ও তাঁর লোকজন তখন গ্রেপ্তারের তালিকায় ছিলেন । প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায় যে, তাড়াহুড়ো করে জড়ো হওয়া মুক্তি ফৌজের উদ্দেশ্য ছিল 'মুজিববাদ'কে পুনর্জীবিত করা। সিদ্দিকী তাঁর তিনজন সঙ্গীসহ দিল্লীতে যেয়ে ধরণা দিতে থাকেন। তাদের চাহিদা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সরল প্রকৃতির, যেমন পূর্বের মত বেসরকারি গোপন সমর্থন প্রদান ও তাদের পুনঃসংগঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থদান। ভারতীয় সরকার তাদের দাবিপূরণে সম্মত হন। কিন্তু এর সাথে একটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয় যে, মুক্তিফৌজ বাংলাদেশের সীমানা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং এ পদক্ষেপ শুধুমাত্র মুজিবের স্বপ্নসাধ পুনর্জীবিত করার জন্য সীমিত সময়ে পরিচালিত হবে। তারা শুধুমাত্র চরম অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতেই ভারতীয় আশ্রয়স্থান ব্যবহার করতে পারবেন। এ শর্তে মুক্তিফৌজ রাজি হয়ে যায় কারণ বাংলাদেশ রাইফেলস্ তাদেরকে ক্বচিৎ কখনো আক্রমণ করতো এবং প্রায় সময় তারা (বিডিআর) নিষ্ক্রিয় থাকত বললেই চলে। শেখ মুজিবের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকার পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ কারণে তারা মুক্তিফৌজকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন, আর তা হচ্ছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে জানতে পারে যে, বাংলদেশ মিজো গেরিলাদের আশ্রয় দিয়ে চীনাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ দিয়েছে এবং কাদের বাহিনীর মুক্তিসেনারা তাদের ধারণায় এ ধরনের তৎপরতাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে । সুতরাং ‘র’-এর মাধ্যমে সিদ্দিকীকে ভারতীয় সরকারের সাহায্য প্রদান অব্যাহত থাকে।”
শান্তিবাহিনী গঠন
শান্তিবাহিনী যে ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট এ নিয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। এক্ষেত্রেও প্রমাণ হিসেবে ইনসাইড 'র'-বইয়ে উদ্ধৃত তথ্যের উল্লেখ করা যায়। এ ব্যাপারে উক্ত বইয়ে বলা হয়েছে -
“বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের একদম শেষ পর্যায়ে যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অবস্থিত সেখানকার চাকমা গেরিলাদেরও মুক্তিবাহিনীর মত 'র' সাহায্য করে যাদেরকে এক সময় 'র'-অপারেটিভ ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাহায্য করেছিল । চাকমারা ইয়াহিয়া খানের সময় বিদ্রোহী হয়ে উঠতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই নদীর উপর একটি বাঁধ তৈরি করে। ফলে ঐ এলাকার চাকমাদের অন্যস্থানে পুনর্বাসন করা হবে বলে সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ঐ পুনর্বাসন কখনো করা হয়নি। বরং এর পরিবর্তে সত্তর দশকে বাঙালি মুসলিম জনগণ দরিদ্র চাকমাদের নিকট হতে সহায় সম্পত্তি ক্রয় আরম্ভ করে এবং এর পরপর ধর্মান্তকরণ প্রক্রিয়াও একই সাথে চলতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর চাকমাদের কিছু সময়ের জন্য সাহায্য করা হয়। কিন্তু মুজিব হত্যাকান্ডের পর আবার সেই ধর্মান্তকরণ পুরোদমে আরম্ভ হয়ে যায়। তাই তারা বাধ্য হয়ে সাহায্যের আশায় ভারতে আসা শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর মতই তারা তাদের পুরনো 'র' কন্টাক্টদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং অবশেষে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয় । আগরতলা অতিক্রম করে এসে তারা দরকষাকষি শুরু করে। তাদের পরিবার-পরিজন ও শিশুদের নিরাপত্তা বিধানের দাবি ভারত সরকার মেনে নেন। তারা তাদের নিজস্ব যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। তারা একটি সংকীর্ণ করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ করে যার মাধ্যমে তাদের পরিবার- পরিজন ভারতে অনুপ্রবেশ করতে পারে। এদিকে মিজো সমস্যার আশংকা রয়ে যায়
কারণ তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে 'আশ্রয়স্থান' হিসাবে ব্যবহার করছিল ও চীনারা তাদের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিল। চাকমা উপজাতিদের আকার, আকৃতি ও চেহারা মিজোদের মত একই রকম থাকায় ও মিজোরা উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চালাবার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়। সুতরাং লালডেঙ্গা, যিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের 'র'-এজেন্টদের সাথে তার আলোচনা সীমিত সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌছে, যেখানে তিনি 'র’-এজেন্টদের সাথে ইউরোপে যেতে সম্মত হন। পরবর্তীতে ‘র’-অপারেটিভদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে তাঁকে দিল্লীতে আনা সম্ভব হয়, যদিও তখন পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যায়ে চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশি মাত্রায় সক্রিয় হওয়ার পরিবর্তে মিজো বিদ্রোহীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় সরকারকে তথ্য সরবরাহের প্রস্তাব দেয় যার পরিবর্তে তারা তাদের পরিবারের জন্য ভারতীয় আশ্রয়ের নিশ্চয়তা চায়। ভারত সরকার এ দাবী মেনে নেন” । ভারতীয় লেখকের দাবী মতে চাকমাদের ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ যদিও তথ্যভিত্তিক নয় তবুও অন্তত এ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, 'র'- শান্তিবাহিনী তৈরী করেছে।
এছাড়া ভারতের নতুন দিল্লীস্থ ইন্সটিটিউশন অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো মি. অশোক. এ. বিশ্বাস তাঁর এক নিবন্ধে শান্তিবাহিনীর সাথে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। গত ৩১-৮-৯৪ তারিখে The New Nation পত্রিকায় প্রকাশিত 'RAW's Role in Furthering India's Foreign Policy' শিরোনামের এক নিবন্ধে জনাব বিশ্বাস বলেন, 'RAW is now involved in training rebels of Chakma tribes and Shanti Bahini who carry oul subversive activities in Bangladesh" অর্থাৎ 'র' এখন চাকমা সম্প্রদায় ও শান্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রকম নাশকতামূলক কাজের সাথে জড়িত।
ঠিক একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির এককালীন সভাপতি উপেন্দ্রলাল চাকমা ১৯৯১ সালে অন্যান্য শান্তিবাহিনী নেতাদের সাথে মতভেদ দেখা দেয়ার পর বলে ফেলেন যে, “শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব মূলতঃ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ন্যস্ত" " ।
ভারত শুধু যে শান্তিবাহিনী সৃষ্টি করেছে তাই নয় বরং প্রথম থেকেই যাবতীয় উপায়ে শান্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ ও সমরাস্ত্র প্রদান করেছে। এব্যাপারে আত্মসমর্পণকারী বেশ ক'জন শান্তিসেনার কাছ থেকে জানা যায় যে, “বেশ কিছু শান্তিবাহিনী সদস্য ১৯৭৬ সালে ভারতের দেরাদুনে গোরিলা যুদ্ধ ও জুনিয়র লিডার কোর্সের প্রশিক্ষণ লাভ করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব শান্তিবাহিনী সদস্য প্রাথমিকভাবে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের পরিত্যক্ত অস্ত্র দিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের কাজ শুরু করে। ১৯৭৫ সালের শেষার্ধে তারা ভারত হতে প্রথম অস্ত্রের চালান পায়। বিভিন্ন সূত্র হতে জানা যায়
কারণ তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে 'আশ্রয়স্থান' হিসাবে ব্যবহার করছিল ও চীনারা তাদের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিল। চাকমা উপজাতিদের আকার, আকৃতি ও চেহারা মিজোদের মত একই রকম থাকায় ও মিজোরা উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চালাবার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়। সুতরাং লালডেঙ্গা, যিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের 'র'-এজেন্টদের সাথে তার আলোচনা সীমিত সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌছে, যেখানে তিনি 'র’-এজেন্টদের সাথে ইউরোপে যেতে সম্মত হন। পরবর্তীতে ‘র’-অপারেটিভদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে তাঁকে দিল্লীতে আনা সম্ভব হয়, যদিও তখন পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যায়ে চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশি মাত্রায় সক্রিয় হওয়ার পরিবর্তে মিজো বিদ্রোহীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় সরকারকে তথ্য সরবরাহের প্রস্তাব দেয় যার পরিবর্তে তারা তাদের পরিবারের জন্য ভারতীয় আশ্রয়ের নিশ্চয়তা চায়। ভারত সরকার এ দাবী মেনে নেন” । ভারতীয় লেখকের দাবী মতে চাকমাদের ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ যদিও তথ্যভিত্তিক নয় তবুও অন্তত এ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, 'র'- শান্তিবাহিনী তৈরী করেছে।

এছাড়া ভারতের নতুন দিল্লীস্থ ইন্সটিটিউশন অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো মি. অশোক. এ. বিশ্বাস তাঁর এক নিবন্ধে শান্তিবাহিনীর সাথে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। গত ৩১-৮-৯৪ তারিখে The New Nation পত্রিকায় প্রকাশিত 'RAW's Role in Furthering India's Foreign Policy' শিরোনামের এক নিবন্ধে জনাব বিশ্বাস বলেন, 'RAW is now involved in training rebels of Chakma tribes and Shanti Bahini who carry oul subversive activities in Bangladesh" অর্থাৎ 'র' এখন চাকমা সম্প্রদায় ও শান্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রকম নাশকতামূলক কাজের সাথে জড়িত।
ঠিক একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির এককালীন সভাপতি উপেন্দ্রলাল চাকমা ১৯৯১ সালে অন্যান্য শান্তিবাহিনী নেতাদের সাথে মতভেদ দেখা দেয়ার পর বলে ফেলেন যে, “শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব মূলতঃ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ন্যস্ত" " ।
ভারত শুধু যে শান্তিবাহিনী সৃষ্টি করেছে তাই নয় বরং প্রথম থেকেই যাবতীয় উপায়ে শান্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ ও সমরাস্ত্র প্রদান করেছে। এব্যাপারে আত্মসমর্পণকারী বেশ ক'জন শান্তিসেনার কাছ থেকে জানা যায় যে, “বেশ কিছু শান্তিবাহিনী সদস্য ১৯৭৬ সালে ভারতের দেরাদুনে গোরিলা যুদ্ধ ও জুনিয়র লিডার কোর্সের প্রশিক্ষণ লাভ করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব শান্তিবাহিনী সদস্য প্রাথমিকভাবে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের পরিত্যক্ত অস্ত্র দিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের কাজ শুরু করে। ১৯৭৫ সালের শেষার্ধে তারা ভারত হতে প্রথম অস্ত্রের চালান পায়। বিভিন্ন সূত্র হতে জানা যায়
পত্রিকায় বলা হয় যে, “সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ও বাইরে উভয়ক্ষেত্রেই মুজিব অনুসারীরা জিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে”১০। এমনকি ৭ নভেম্বর বিপ্লবে খালেদ মোশাররফ নিহত হবার পরও “ভারতীয় প্রচার মাধ্যম দীর্ঘদিন অব্যাহতভাবে প্রচার চালায় যে, বাংলাদেশের সেনানিবাসগুলোয় জিয়াপন্থী সৈনিকদের সাথে মুজিবপন্থীদের সংঘর্ষ চলছে”১১ ।
এভাবে জে. জিয়ার শাসনামলের প্রাথমিক ধাপেই ভারত সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিশৃংখলা সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। পরবর্তিতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীতে সেসব ক্যু বা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় তার পিছনেও ‘র’--এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় এতদসংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর প্রচারণাই এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। এছাড়া জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংঘটিত এসব অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ায় যে 'র' যুক্ত ছিল তার একটি পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতীয় 'সানডে' পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত 'দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন থেকে। ‘সানডে'র ঐ প্রতিবেদনটি '৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক মিল্লাত' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সানডে'তে উল্লেখ করা হয় যে, “'৭৫ সালের পর ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। '৭৭ সালে ভারতে জনতা পার্টি নির্বাচনে জয়ী হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে 'র'-এর প্রথম দফা হত্যার চেষ্টা ভণ্ডুল হয়। যদিও '৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হন। ঐ প্রতিবেদনে ভারতের কংগ্রেস সরকার বিরোধীদের বিরূদ্ধে গোয়েন্দাগিরি, ভিন্ন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব-বিরোধী ও রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রাণনাশের ব্যাপারে 'র'-এর নাশকতামূলক তৎপরতার বিবরণ দেয়া হয়। বলা হয় '৭১ সালে 'র' বাংলাদেশে বৃহত্তর বিজয় সূচিত করলেও শেখ মুজিবের মৃত্যু ঠেকাতে সংস্থার ব্যর্থতা গাধামার্কা ভুলের বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ।
মোরারজী দেশাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জনতা দলীয় এম.পি সুব্রামনিয়াম স্বামীকে উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়, 'র'-এর তৎকালীন প্রধান কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ আর এন কাও ও সহকারী প্রধান শঙ্কর নায়ার মুজিবের মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন এবং জিয়া হত্যার চক্রান্ত করেন। কিন্তু কংগ্রেস সরকারের পতনের পর মোরারজী দেশাইকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। প্রতিবেশী একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যায় 'র'-এর আকাংখা শুনে প্রধানমন্ত্রী দেশাই বিমূঢ় হয়ে পড়েন। তিনি জিয়া হত্যা চক্রান্ত বন্ধের নির্দেশ দেন।
শঙ্কর নায়ার তখন বলেন, এ অবস্থায় ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে পরিত্যক্ত হলে 'র'- এর সম্পদরা (এজেন্ট অর্থে) বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে। দেশাইয়ের অনমনীয়তার মুখে 'র'-জিয়াকে হত্যার চক্রান্ত অবশেষে পরিত্যাগ করে ১২। এখানে জিয়া হত্যা পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করায় যেসব এজেন্ট ধরা পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল মূলত তাই ঘটে বাস্তবে। লক্ষ্যণীয় '৭৭ সালে মোরারজী দেশাই যখন 'র'-কে ‘পরিকল্পনা' স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই 'র'-এর আশঙ্কা অনুযায়ী বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীতে অনুপ্রবিষ্ট 'র'- এজেন্টরা দিশেহারা হয়ে একটির পর একটি অঘটন ঘটাতে থাকে। যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে 'র'- এদের উপর থেকে ছত্রছায়া প্রত্যাহার করে নেয় তাই তারা (এজেন্টরা) বিক্ষিপ্তভাবে অভ্যুত্থান ঘটাতে থাকে এবং এর প্রতিটিই ব্যর্থ হয়, যদিও '৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাসীন হওয়ার পর 'র'-এজেন্টরা জিয়াকে হত্যা করে। এখানে জে. জিয়ার শাসনামলে সংঘটিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অভ্যুত্থান যেগুলোয় ভারতীয় চরদের সংশ্লিষ্টতা আচ করা যায় সেগুলোর বিবরণ দেয়া হলো :
১। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর বিপ্লবের পর '৭৬-এর শুরুতে যখন কর্নেল তাহের অনুসারীরা অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে যায় তখন বিভিন্ন সেনানিবাসে চারমাসের ব্যবধানে বেশকিছু অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে যার একপর্যায়ে জিয়াউর রহমানকে স্বয়ং হস্তক্ষেপ করতে হয়। এরকম একটি ক্যু হয় '৭৬-এর মার্চে যেখানে একটি সেনা ইউনিটে বিদ্রোহ দেখা দেয় ও তাতে তিন জন সৈনিক নিহত হয়। এ ঘটনায় জে. জিয়া নিজে উপস্থিত হয়ে সৈনিকদের শান্ত করেন।
২। '৭৬ সালের জুলাই মাসে বগুড়া সেনানিবাসে একটি অভ্যুত্থান ঘটে। দিনব্যাপী এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা বহুকষ্টে দমন করা সম্ভব হয় এবং এ ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে প্রায়
১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৩। '৭৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে বগুড়ায় ও অক্টোবর মাসের শুরুতে দু'টো বড় ধরনের অভ্যুত্থান ঘটে। ২৯,৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বগুড়ায় একদল সৈনিক হঠাৎ বিদ্রোহ ঘোষণা করে ও অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা শহরেও প্রবেশ করে। কিন্তু ৫০০ জনের মতো অভ্যুত্থানকারী জনগণের সহানুভূতি লাভে ব্যর্থ হওয়ায় অবশেষে এ ক্যুদেতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ ঘটনায় একজন অফিসার নিহত ও তিনজন সৈনিক আহত হন।
এঘটনা যখন ঘটছিল তখন এক রহস্যময় কারণে জাপান এয়ার লাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমানকে ছিনতাই করে জাপানীজ রেড আর্মির সদস্যরা ঢাকায় অবতরণে বাধ্য করে। তদানীন্তন বিমানবাহিনী প্রধানসহ বিমান বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তারা এঘটনায় বিমানবন্দরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একইসাথে সরকারকেও বাধ্য হয়ে ছিনতাই ঘটনায় বেশীরভাগ মনোযোগ প্রদান করতে হয়। তাই স্বভাবতই অন্য কোনদিকে
পর্যাপ্ত নজর দেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঠিক এমনি এক পরিস্থিতিতে বগুড়া অভ্যুত্থানের দু'দিনের মাথায় ২রা অক্টোবর বিমানবাহিনীর নন কমিশন্ড অফিসারদের নেতৃত্বে একটি ব্যাপক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। বিদ্রোহী সৈনিকেরা গুলী করতে করতে সেনা ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে ও সরকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ দখল করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তারা রেডিও স্টেশন ক্ষণিকের জন্য দখলও করে নেয়। এদের সাথে সংঘর্ষে প্রায় ২০০ জন লোক নিহত হয় যাদের মাঝে ছিল ১১ জন বিমান বাহিনীর অফিসার। অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে বিদ্রোহীরা জে. জিয়ার ক্যান্টনমেন্টস্থ বাসভবন আক্রমণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সরকার অনুগত সৈনিকদের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে এই ক্যু'দেতা ব্যর্থ হয়ে যায়। তবে এ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো যে, এতে বিমানবাহিনীর সিনিয়র পাইলটরা নিহত হওয়ায় পুরো বিমানবাহিনীই মূলত অকার্যকর হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, এ অভ্যুত্থান ঢাকায় সংঘটিত হলেও ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার পায় যাতে মনে হয়েছিল দেশের অন্যান্য সেনানিবাসেও অভ্যুত্থান ঘটেছে এবং সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।
এধরনের আরো অনেক ক্যু বা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে জে. জিয়ার শাসনামলে । এর অনেকগুলো জাতীয়ভাবে সেনাবাহিনী বা দেশকে প্রভাবিত করতে না পারলেও এগুলোর ইন্ধনদাতা ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক/ অফিসার। এরা বেতনভাতা, সুযোগ সুবিধা, শ্রেণীহীন সমাজ গঠন ইত্যাদি কথা বলেই মূলত সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করে তুলতো। এরকম একটি অভ্যুত্থান ঘটেছিল রংপুরস্থ ৩ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে 1 তদানীন্তন রংপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে ছিল ৩ সিগ্যাল ব্যাটালিয়নের অবস্থান। '৭৭ সালে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এক বিকেলে হঠাৎ কিছু সৈনিক অস্ত্রাগার ভেঙ্গে অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে বিদ্রোহ করে বসে। ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায় জনৈক অফিসার একজন সৈনিকের সাথে 'খারাপ' ব্যবহার করেছে এ অজুহাতেই ঐ বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে ।

প্রকৃতপক্ষে জে. জিয়ার শাসনামলে সেনাবাহিনীতে অনুপ্রবিষ্ট 'র'-এজেন্টদের বিচ্ছিন্ন তৎপরতাই এসব অভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ। এসব এজেন্টকে স্বাধীনতার পর যেমন 'র' নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিল তেমনি রক্ষিবাহিনীর সদস্যদের বাছ বিচার না করে ‘গণহারে’ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করাতেও 'র'-এর অনেক এজেন্ট সশস্ত্রবাহিনীতে তৎপর হওয়ার সুযোগ পায়। একথা হয়তো কারো অজানা থাকার কথা নয় যে, রক্ষিবাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল ভারতীয় দিকনির্দেশনা মতে। মুজিববাহিনীর স্রষ্টা ভারতীয় মেজর জেনারেল এস.এস. উবান যেভাবে 'র'-এর সক্রিয় উদ্যোগে মুজিববাহিনী তৈরী করেছিলেন তেমনি এই উবানই রক্ষিবাহিনী সৃষ্টির নেপথ্য কারিগর ছিলেন। ফলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, ভারতপন্থী এমনকি সরাসরি 'র'-এর (পরোক্ষ) নিয়োগকৃত অনেকেই ছিলেন রক্ষিবাহিনীতে। এবং এরাই পরে মোরারজী দেশাই 'জিয়া হত্যা পরিকল্পনা' স্থগিত করায় ধরা পড়ার' হাত থেকে বাঁচার জন্য বিক্ষিপ্ত অভ্যুত্থান সংঘটন করেন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


