
ট্রয় নগরের চারদিক ছিলো উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যাকে নগর প্রাচীর বলে আখ্যা দিয়েছিলো গ্রীক সৈন্যরা। প্রাচীরের বাইরে থেকেই দিনের পর দিন শহর অবরোধ রেখেছিলো তারা।
ট্রোজানরাও যুদ্ধবিদ্যায় কম যায় না। গ্রীকদের সঙ্গে সমানে তারা লড়াই করেছিলো তারাও। কোনদিন ট্রোজানরা যুদ্ধে জেতে, আবার কোনদিন জেতে গ্রীকরা। কোন নিষ্পত্তি আর হয় না। এইভাবে পুরো ন'টি বছর চলে যুদ্ধ। জয় – পরাজয় নেই কোনো পক্ষেই। শেষ অব্দি গ্রীক সৈন্যরা আটকে ছিলো নগর প্রাচীরের কাছেই। দূর্ভেদ্য নগর প্রাচীর পেরিয়ে নগরীতে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। যদিও বা গ্রীকদের কৌশলের কাছে শেষ রক্ষা পায়নি ট্রয়বাসী।

সে গল্পে কিছুক্ষণ পরে আসছি। আপাতত একটি শহরের কথা বলি; নারায়ণগঞ্জ। গুম-খুন আর ত্রাসের এই শহরেও একটি নগর প্রাচীর আছে। যার নাম ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। গুন্ডাতন্ত্র আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই শহর আর শহরবাসীর লড়াইটা দীর্ঘদিনের। সেই লড়াইয়ে আমি তাকে সম্মুখ সাড়ির যোদ্ধা বলছি না। তবে যোদ্ধা আর নগরীর সাধারণ মানুষকে আগলে রাখা নগর প্রাচীরের উপাধীটা তাকে দেয়াই যায়। যে প্রাচীর দীর্ঘ ১৮ বছর, এ নগরকে আগলে রেখেছে- গডফাদারদের একচেটিয়া রাজত্বের থেকে। তা ২০০৩ সালের আগে ও পরের নারায়ণগঞ্জের দিকে তাকালেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
এবার পরের গল্পে আসি। ৯ বছর যুদ্ধ শেষেও যখন গ্রীকরা নগর প্রাচীর ভেদ করতে পারেনি। অস্ত্র যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলো সেখানেই ট্রাম কার্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তাঁদের এক ভয়ংকর কৌশল। এক রাতে হঠাৎ করেই ট্রয় নগরী ছেড়ে যায় গ্রীক সৈন্যরা। রেখে যায় একটি বিশাল কাঠের ঘোড়া। ট্রোজানরা ভাবতে থাকে, গ্রীকরা বুঝি যুদ্ধে হার মেনে নিয়ে উপহার স্বরূপ রেখে গেছে এই ঘোড়া। তাই নগর প্রাচীরের ফটক খুলে সেই ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয় শহরের ভিতরে। বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন রকম। গ্রীক সৈন্যরা তখনও চলে যায়নি। তারা ট্রয়ের বন্দর ছেড়ে জাহাজ নিয়ে নিকটস্থ কোনো দ্বীপে অবস্থান নিয়েছিলো। অন্যদিকে বিশাল ঘোড়ার পেটে লুকিয়েছিলো অর্ধশত গ্রীক যোদ্ধা। ট্রোজানরা ঘুমিয়ে পরার পর রাতের আধাঁরে যারা ঘোড়ার পেট থেকে বেরিয়ে আসে। খুলে দেয় নগর প্রাচীরের ফটক। এমন পরিস্থিতির জন্য অপ্রস্তুত ট্রোজানদের উপর আকষ্মিকভাবে হামলা করে তারা। ফলাফল স্বরূপ একটি নাটকীয়, মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে ট্রয়।

প্রায় একই কৌশলের সাক্ষী হচ্ছে নারায়নগঞ্জ। গডফাদার খ্যাত ওসমান পরিবার ও তাঁদের অনুসারীরা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে যে আইভী নামক নগর প্রাচীর অতিক্রম করতে না পারলে নারায়ণগঞ্জে তাঁদের গুন্ডাতন্ত্র কিনবা মাফিয়াতন্ত্রের জৌলুস টিকবে না বেশি দিন। সাধারণ মানুষের মনে তাঁদের প্রতি যে আতঙ্কের আগাছা জড়িয়ে ছিলো তাও সড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলাফল ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরাসরি মুখোমুখি হয় ওসমান পরিবারের সন্তান শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াৎ আইভী। সে নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে পরাজিত করেন আইভী।
এরপর ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনের আগেও শামীম ওসমানের অনুসারীদের অনেকেই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হতে চায়। কিন্তু আইভীর জনপ্রিয়তার কাছে তারা কেউই মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে নি। ২০২২ সালের নাসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেও প্রায় একই ঘটনার মুখোমুখি হয় নারায়ণগঞ্জবাসী। কিছুতেই সুবিধা করে উঠতে পারেনি প্রতিপক্ষ।
এবার শেষ ট্রাম কার্ডে দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে গডফাদার গং। ওসমান পরিবারের নিকটস্থ অনুসারীদের কাউকেই সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী মাঠে নামায়নি তারা। এনেছে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা তৈমুর আলম খন্দকারকে। যাকে বিএনপি নির্বাচনী মাঠে নামার পর পরই তার পদ থেকে অব্যহতি প্রদাণ করেছে।
হাতি মার্কা নিয়ে সতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর মেয়র পদের জন্য নির্বাচন করছে সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে। যে হাতির পেটে লুকিয়ে আছে মাফিয়াগড, নারায়ণগঞ্জের গুন্ডাতন্ত্রের সেনাপতি শামীম ওসমান ও তার সৈনিকেরা। শুধুমাত্র নারায়ণগঞ্জবাসীর একটি ভুলের জন্য তাঁদের অপেক্ষা।
ট্রয় নগরীর মতোই কী এক মর্মন্তিক পরিনতির দিকে এগুচ্ছে নারায়ণগঞ্জ!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৫:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


