আমার ছেলেবেলা কেটেছে বিভিন্ন স্কুল ঘুরে ঘুরে। মোটামুটি রকমের ছাত্র ছিলাম। প্রথম স্কুল পাড়ার ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আদর্শ বিদ্যাপীঠে আমার বিদ্যা শিক্ষার হাতে খড়ি। এখন মনে পড়ে মায়ের হাত ধরে টিনের ছাদের একটা স্কুলে গিয়ে বসেছিলাম আমি। সেই শুরু।
তৃতীয় শ্রেনীতে থাকতে বাবার বগুড়া পোস্টিংয়ের কল্যানে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হল বগুড়া জেলা স্কুলে। সেখানে টিকে গেলেও বগুড়া শহরে থাকা হল না আমাদের। ফিরে আসলাম ঢাকা শহরে।
চতর্ুথ শ্রেনীর পর থেকে রেজালট একটু একটু করে ভাল করতে শুরু করলাম। আর আমার মা-বাবার মাথায় ভুত চাপল। ক্যাডেট ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন আমাকে। সানরাইজ কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে আমাকে মগবাজার যেতে হত। একটা মাইক্রোবাস এসে আমাকে নিয়ে যেত। সবচেয়ে দুরে আমাকে বাসা। সেই পাপে সবার শেষে আমাকে নামিয়ে দিতে আসত। আমারও পুরো ঢাকা শহর ঘোরা হয়ে যেত। ভীষন যন্ত্রনা লাগত সেই ঢাকা শহর ভ্রমন। ধুলাবালির মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুরে বেড়ানো।
একবার তেজগাও পৌছে সেই মাইক্রেবাসের টায়ার পাংচার হয়ে গেল। মগবাজার থেকে গাড়ির টায়ার আসতে আসতে আমি ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর। তখন তো মোবাইল ছিল না। আর যেখানে আমরা আটকে ছিলাম সেখানে কোন ফোনের দোকানও ছিল না যে মাকে ফোন করব। ভীষন কষ্ট হয়েছিল সেদিন।
ক্যাডেট কলেজে আমার ভর্তির যোগ্যতা হয়নি। মেডিক্যাল + ভাইভায় বাদ পড়ে গেলাম। কিন্তু সেই সুত্রে বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হল। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলাম মতিঝিল মডেল হাইস্কুলে। ছোট্ট একটা স্কুল থেকে গিয়ে পড়লাম বড় একটা স্কুলের গন্ডিতে। ক্লাসের ক্লাশ-টিচার ছিলেন এক খন্ডারনি মহিলা। বাবারে কি মাইরটাই না দিতেন। প্রচন্ড আতঙ্ক নিয়ে ক্লাস করতে যেতাম প্রতিদিন।
সমস্যা ছিল যাতায়াত। বাবা তখন বগুড়ায় থাকতেন। আমার এক চাচা সোনালী ব্যাঙ্কের মতিঝিল শাখায় চাকুরী করতেন। তিনি আমাকে নিয়ে আসতেন কখনও কখনও। কিংবা আমার এক খালু যিনি টিএন্ডটিতে চাকুরী করতেন। পুরোটা দিন নষ্ট হয়ে যেত। তখন মনে হত শালার মিরপুরে থেকে কি অপরাধই না করেছি!
মাস খানেক পর সেখান থেকে বেরিয়ে ভর্তি হলাম রেসিডেনিসয়াল মডেল, মোহাম্মদপুর, এবং সপ্তাহখানেক পর মিরপুরের আরেকটা স্কুলে (নাম মনে পড়ছে না)। এই স্কুলে সপ্তম শ্রেনীটা শেষ করতে না করতে বাবার বদলী হল চিটাগাং। আর তাই তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেলাম চিটাগাং। ভর্তি হলাম মুসলিম হাই স্কুলে।
মুসলিম হাই স্কুল ছিল চিটাগাংয়ের শিবির অধু্যষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। আমার তখনকার খুব ভাল একজন বন্ধুকে চোখের সামনে শিবির কমর্ী হয়ে যেতে দেখেছি। ভীষন ভয় পেয়েছিলাম। সে আমাকে শেষের দিকে খুব চেষ্টা করত শিবির ভুক্ত করার। প্রিয় একজন বন্ধুকে তখন কিভাবেই না এড়িয়ে চলতাম।
বাধ্যতামূলকভাবে টুপী পরা, দুপুরের খাবারের সময় জোহরের নামাজ পড়া, অদ্ভুত সব নিয়ম কানুন এইসব মেনে নিয়ে চলা এবং পান থেকে চুন খসলে প্রচন্ড মাইর এসব বাবার কাছে খুব অনুনয় বিনয় করে বলতাম। তাই পরের বছর ক্লাশ নাইনে ভর্তি পরীক্ষা দিতে বসলাম চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলে।
এখানেই কাটলা আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটো বছর। দেখা মিলল অসাধারন কিছু বন্ধুর।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

