[গাঢ়]ঢাকা এয়ারপোর্ট[/গাঢ়]
প্রথম ঝামেলা শুরু হল ঢাকা এয়ারপোর্টেই মালপত্র চেকইনের সময়। পুরো বিশ্বে 32 কেজির দুটো ব্যাগ নিতে দেয়, কিন্তু আমেরিকাতে 23 কেজির বেশী নিতে দেয় না। তাই আমরা প্রতিটা ব্যাগ 23 কেজি এবং সাথের ক্যারি অন ব্যাগটায় ভারী জিনিস ঠেসে নিয়েছি। মালপত্র ওঠাতে গিয়ে দেখি সাথের ব্যাগটা ভারী বলে আপত্তি করছে। তখন ক্যারি অন ব্যাগ থেকে সব বের করে অন্য ব্যাগগুলোতে ভরতে হল। প্রায় আধাঘন্টা লেগে গেল এই করতে। ঘাম ছুটে গেল আমাদের। আমার সাথে আবার একটা গীটার। ওটা টানতে লাগছে বিরক্ত।
ইমিগ্রেশন পার হব, তখন দেখি ডিজএম্বারকেশন কার্ড পূরণ করা হয়নি। কার্ড নিয়ে দেখি মালপত্র দেবার সময় কলম সব চলে গেছে চেক ইন ব্যাগেজে। কলম খুঁজে খুঁজে পাইনা পাইনা, শেষ পর্যন্ত পেলাম এক ভদ্রলোকের কাছে। এই করতে আরো বিশ মিনিট। শেষে সিকিউরিটি চেক পয়েন্ট পার হয়ে আরো ঘন্টা দেড়েক লাগল প্লেনে উঠতে।
[গাঢ়]মাসকাট, ওমান[/গাঢ়]
প্রথম গন্তব্য ওমানের রাজধানী মাসকাটে। সেখানে 14 ঘন্টার বেশী একটা স্টপ ওভার আছে। আগে থেকে ঠিকঠাক, যে ভিসা নেয়া লাগবে না, বরং ওখানে পৌছলেই টেম্পোরারী ভিসা দেবে এবং একটা হোটেল দেবে। গিয়ে ফরম ফিলআপ করে লাইনে আধাঘন্টার উপরে দাঁড়িয়ে যখন ভিসা অফিসারের কাছে পৌছালাম তখন দেখি ব্যাটা আমার কাছে গ্রীন কার্ড চায়। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম আমরা ছাত্র, আমাদের গ্রীন কার্ড নেই। ব্যাটা বলে, 'নো গ্রীন কার্দ, নো বিজা'।
আমাদের তো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমরা আবার গিয়ে ধরলাম গালফ এয়ারের এক মহিলাকে। সে মহিলা দুদুটো ভিসা অফিসারকে ডেকে নিয়ে আসল। তাদের কেউই ভিসা দেবে না। জানা গেলে আমাদের সবুজ পাসপোর্টের সুনামই এর কারন। শেষে তারচেয়েও উধর্্বতন একজন অফিসার আমাদের সব কাগজপত্র দেখে আমাদের সাথে কথা বলে, গালফ এয়ারের মহিলার পাসপোর্ট জমা রেখে আমাদের ভিসা দিলেন মাসকাটে ঢোকার। ততক্ষনে তিন ঘন্টার ওপর পার হয়ে গেছে। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
হোটেলের গাড়িতে যাবার সময় মাসকাট শহরটা দেখে খুব সুন্দর লাগল। ড্রাইভার ছেলেটার বাবা ওমানী আর মা ইন্ডিয়ান আর রুম মেট বাংলাদেশী। তবুও তার সাথে কমিউনিকেট করতে বেশ বেগ পেতে হল। লক্ষ্য করলাম মুসলিম দেশ হলেও প্রচুর ইন্ডিয়ান সেখানে। আরও আছে বিভিন্ন দেশের অদ্ভুত কিসিমের হাজারো লোক। হোটেলে পৌছে গোসল, খাওয়া দাওয়া সেরে ফোন কার্ড কিনে দেশে ফোন করে সবাইকে আশস্ত করলাম যে আমরা ঠিক আছি।
শহর দেখতে বেরুলাম। রাস্তা ঘাট আমেরিকার আদলে তৈরী, বাম দিকে ড্রাইভিং। সবকিছু পরিষ্কার তকতকে, রাস্তায় নতুন মডেলের দামী গাড়ী। রাস্তার বিভিন্ন ক্যাফেতে দেখলাম বড় স্ক্রিনে সবাই টিভিতে ফুটবল খেলা দেখছে। হঠাৎ খেলায় একটা গোল হল আর সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। এর পর দেখি পতাকা হাতে, গাড়ি নিয়ে হইচই করতে করতে পোলাপাইন দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। পরনে সাদা আলখাল্লা থাকলেও উন্মত্ততায় পশ্চিমা তরুনদের চেয়ে কম দেখলাম না।
লুলু শপিং সেন্টার নামে এক শপিং সেন্টারে গেলাম। সোনার গয়নার চাকচিক্যে চোখে আগুন ধরবার উপক্রম। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম যে সোনার গয়না গুলো আসলেও অভিনব ডিজাইনে, খাঁটি ঔজ্জল্যে কাছে ডাকছে। আমরা অল্প কিছু কেনাকাটা করে চলে আসলাম।
[গাঢ়]হিথরো, লন্ডন[/গাঢ়]
রাতে খাওয়া দাওয়া বিশ্রাম শেষে উঠে বসলাম লন্ডন হিথরোগামী বিমানে। সেখানে পৌছে বিমান নামার পর অনেকক্ষন দরজা খোলে না। শেষে জানা গেল বিমানের দরজা খুলছে না। প্রায় দেড় ঘন্টার দেরী করে পরের প্লেনের জন্য বিরাট দেরী করে নামলাম এয়ারপোর্টে। লক্ষ্য করলাম যাত্রীদের অসাধারন ধৈর্য্য আর ভদ্রতা। নেমে ফ্লাইট ধরার জন্য আবার দৌড়।
সিকিউরিটির লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এক অফিসার এসে জানাল একটার বেশী ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢোকা যাবেনা। একেক এয়ারপোর্টের এককে নিয়ম। ধুমধাম ব্যাগ খুলে ল্যাপটপ ঢোকাও, জামাকাপাড় এদিক ওদিক দিয়ে চেপে চুপে ঢোকাও। আবার আমার সাথে গীটার। সিকিউরিটির পর্যন্ত যেতে যেতে জামাকাপড়, জুতা, ঘড়ি, বেলট, পকেটের সব জিনিস বর করে প্রায় নাঙ্গা হয়ে যখন পৌছলাম তখন বেশী চাপাচাপিতে আমার ব্যাগের চেইন ছিড়ে আটকে গেছে এবং আর খুলছে না। ল্যাপটপ বার করি কিভাবে তাহলে? ওটা বার না করলে সিকিউরিটিও পার হতে পারব না।
সিকিউরিটি অফিসার একজন ছিলেন ইন্ডিয়ান। তিনি আমার সাহায্যে এগিয়ে এলেন। পুরোনো কারো ফেলে যাওয়া একটা ব্যাগ এনে দিলেন। আমার ব্যাগের চেইন ছিঁড়ে সব জিনিস পত্র ব্যাগ বদল করে এক্সরে মেশিনে দিয়ে তারপর সেগুলো আবার গুছিয়ে গাছিয়ে যখন পরের ফ্লাইটের জন্য যাচ্ছি তখন আমার ওজন আধা কেজি কমে গেছে।
[গাঢ়]ওহ্যার, শিকাগো[/গাঢ়]
পরের ফ্লাইট হিথরো থেকে শিকাগো। শিকাগো পৌছে দেখি প্লেন নামছে না। কয়েকবার আকাশে চক্কর দিয়ে যখন নামতে গেল তখন মাটির 5 ফুট উপর থেকে আবার প্লেইন উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। ক্যাপ্টেন জানাল ওখানে আরেকটা বিমান নাকি ছিল। বরফ জর্জরিত শিকাগোর স্লিপারী রানওয়েতে নামলে কি হতে পারত সেটা চিন্তা করে আমার শিড়দাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আরও বিশ মিনিট আকাশে ঘুরে একঘন্টা ব্যবধানে আমাদের কানেকটিং ফ্লাইটের জন্য চরম দেরী করিয়ে দিয়ে বিমান নামল। আমরা ধরেই নিলাম পরের ফ্লাইট নির্ঘাত মিস করব।
ইমিগ্রেশনে আমার কাজ দ্রুতই শেষ হয়ে গেল। আমি চলে যেতে শুরু করেছি, আমার ওয়াইফ আরেক বুথ থেকে আমাকে ডাকছে। আমাকে গিয়ে দাবী জানাতে হল সে আমার স্ত্রী। তারপর ব্যাগগুলোর জন্য আরও আধাঘন্টা দাঁড়িয়ে সেগুলো নিয়ে পরে কাস্টমস পার হয়ে লাগেজ চেকইন করলাম। এরমধ্যে আমার গীটার কতবার যে বাড়ি খেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম ওটা শেষ।
লাগেজ চেকইন করতে গিয়ে দেখি আমাদের কানেকটিং ফ্লাইট দেরী করেছে। সুতরাং আমরা সেটা ধরতে পারব। ট্রামে করে অন্য টার্মিনালে গিয়ে হাটতে হাটতে জিহবা বের করে যখন প্লেনের কাছে পৌছলাম তখন জানে পানি নাই। প্লেনের ভিতর বসে মোবাইলে ফোন করে এখানকার বন্ধুদের জানালাম যে পৌছতে দেরী হবে।
[গাঢ়]ফিনিক্স, অ্যারিজোনা[/গাঢ়]
ফিনিক্সে পৌছে ব্যাগ নিয়ে শুনলাম এখানে নাকি বৃষ্টি হচ্ছে আর স্মরন কালের সবচেয়ে ভয়াবহ ঠান্ডা পড়েছে। যাইহোক পৌছলাম শেষ পর্যন্ত চিরপরিচিত টেম্পি শহরে আমাদের দ্্বিতীয় বাড়িতে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






