somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প : রূপবতীদের হৃদয় থাকতে নেই

২১ শে আগস্ট, ২০১৪ রাত ১০:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তোমাকে ঠিক কবে প্রথম দেখেছি মনে নেই, তবে সেদিন ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। প্রথম দেখায় প্রেম - এ দর্শন আমার কাছে তখনো সস্তা আবেগ মনে হতো। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার গভীর মায়াভরা চোখে যখন তাকিয়েছিলাম আমার মনে হলো এ জগতে আর কেউ নেই। কারো থাকবার অধিকারও নেই শুধু তুমি ছাড়া। তুমি আনমনা হয়ে দূরে কোথাও তাকিয়েছিলে আর আমি স্রেফ মরে গিয়েছিলাম তোমার চোখের গভীরতায়। খুব করে চেয়েছিলাম থেমে যাক সময়, এভাবেই চলতে থাকুক সহস্র বছর।

আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার নাম সাইফুল আলম, আমি ঢাকা কলেজে পড়ি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার পকেটে মাত্র দুটি ছেঁড়া দশ টাকার নোট আর আমার আব্বা হাঁপানির কারণে মৃত্যু শয্যায়। আমার মনে ছিলো না গত সপ্তাহে আমার শেষ টিউশনিটাও ছুটে গেছে।

আমার হাতের লেখা কোনকালেই ভালো ছিলো না, জীবনে ক্লাসনোট ছাড়া আর কিছুই লিখিনি। অথচ তোমার জন্য আস্ত একটা চিঠি লিখে ফেললাম। লিখলাম আর ছিঁড়লাম, তোমাকে প্রথম দেখার পর পুরো রাতটি ছিলো আমার এমনই অসহ্য যন্ত্রণাময়।

অহনা জানো সেই রাতে আমার একফোঁটা ঘুম হয়নি। আমি তখনো জানি না তুমি আমাদের মহল্লায় থাকো। তখনো বুঝিনি তুমি বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। আমি জানি না তোমার প্রিয় হিরো কে? তোমার পছন্দের রং ...প্রিয় গান কিচ্ছু জানি না। জানার প্রয়োজনও বোধ করিনি। আমি কেবল জানতাম পাড়ার ছেলেদের কাছে শোনা তিনটি শ্রেষ্ঠ অক্ষর ...অ হ না। তোমার নাম।

এরপর আমি বদলে গেলাম। সেদিন থেকে আমার জীবন হলো তুমিময়। তোমার দুটি চোখের বিনিময়ে আমি সারা পৃথিবী বিলিয়ে দিতে পারতাম। আমার রাগ -অভিমান সব নষ্ট হয়ে গেল। গতকাল যে কলেজের বড় ভাইদের হাতে মার খেয়েছি, তা ভুলে গেলাম। আগে নিজের জন্য বাঁচতাম এখন তোমার জন্য বাঁচতে শিখলাম।

আমি জানি আমার মধ্যে কোন বৈশিষ্ট্য নেই, আর অন্য দশটা ছেলের মতোই স্বাভাবিক সিম্পল। আমি সেকেন্ডহ্যান্ড শার্ট পরি, টিউশনি করে মাস চালাই। তাই আমি কোনদিন তোমার কাছে গিয়ে বলতে পারবো না তোমার চোখজোড়া আমার দেখা সবচেয়ে প্রিয় জলপ্রপাত। আমার এই দুঃসাহস নেই যে আমি তোমার সামনে বলবো - এই যে বনলতা সেন! তুমি কি আমার জন্য একটুখানি মেঘ এনে দেবে আকাশ থেকে?

আমি তোমাকে আমার ভালোলাগার কথা জানাবো না কারণ তোমার অবজ্ঞা আমি সইতে পারবো না, স্রেফ মরে যাবো।
কলেজে যাওয়া ছেড়ে দিলাম, বন্ধুদের আড্ডা আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠলো। আমার একমাত্র কাজ ছিলো তোমার বাসার আশেপাশে ঘুরঘুর করা, আর সস্তা সিগারেটের ধোঁয়ায় ডুব দিয়ে তোমায় কল্পনা করা। যেন তুমি আমার ব্যক্তিগত শিউলি।

তোমার নীল রঙের গাড়িটা, তোমাদের বিশাল ছয়তলা বাড়ির সাদা রেলিং আমার কাছে নিজের জীবনের চাইতেও প্রিয় হয়ে উঠলো। বিরক্তিকর বৃষ্টি আমার কাছে অনেক রোমান্টিক মনে হলো। ভালো লাগলো পড়ন্ত বিকেল আর ভাঙা জানালার গায়ে একফালি রোদ।

আর হ্যাঁ, আরো একটা জিনিস করতাম। তোমাকে চিঠি লিখতাম খুব। কিন্তু কখনোই তা তোমার হাতে যেতে দেইনি। কারণ লিখেই ছিঁড়ে ফেলতাম। অহনা ..অহনা ..অহনা এভাবে কতবার যে তোমার নাম আমার ক্লাসের খাতায় লিখেছি তার ইয়ত্তা নেই। তোমার নাম যেন আমার নিত্য অনুষঙ্গ।

অবশেষে এলো সেইদিন।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমি তোমাদের বাসার সামনে বসেছিলাম, অপেক্ষায় ছিলাম কখন কলেজ থেকে ফিরবে। আর আমি দেখবো তোমাকে।

তুমি এলে শেষ পর্যন্ত। একি তুমি আমার দিকেই আসছো। আমার বুকটা ছ্যাত্ করে উঠছে।

- আপনার নাম সাইফুল?
তুমি তোমার বকুল ফুলের মতো মুখ দিয়ে আমার নাম উচ্চারণ করলে আর আমি তাকিয়ে থাকলাম।

-এই চিঠি কে লিখেছে?
তোমার হাতে আমার একটি চিঠি, কিন্তু আমি তো তোমায় চিঠি দেইনি, আমার কোন বন্ধু বোধহয় পাঠিয়ে দিয়েছিল তোমার ঠিকানায় মজা দেখার জন্য।

আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু দেখলাম আমার লেখা চিঠি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে রাস্তায় ছড়িয়ে দিলে। তুমি প্রচণ্ড রাগছিলে, নাকের ওপর দু ফোঁটা ঘাম যেন মুক্তোর মতো। আমার মনে হলো কে যেন বিবস্ত্র করে তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমায়।

আমাকে বললে - মেয়েদের দেখলে মাথা ঠিক থাকে না?

বাহ কি সুন্দর পরিসমাপ্তি টেনে দিলে আমার ভালোবাসার! জানি আমার হাতের লেখা ভালো না, চিঠিতে অজস্র ভুল। কিন্তু কাগজটা টুকরো করে যেন আমার কলিজা ফালিফালি করে কাটলে।

আমি সাইফুল আলম। ঢাকা কলেজের বখে যাওয়া ছেলে। আমার পকেটে ছেঁড়া দুটি দশ টাকার নোট, আর আব্বা হাঁপানির যন্ত্রণায় এখন মৃত্যুশয্যায়। আর এই হলো আমার অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেঁচে থাকাই পরম বিস্ময়

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৩


পথেঘাটে ঘুরিফিরি, যেকোনো সময়
পটল তুলতে পারি গাড়ির ধাক্কায়।
মাঝেমধ্যে থাকি এমনও আশঙ্কায়,
নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে
মাথা ফেটে রক্তক্ষরণে প্রাণটা যায়!
এমন পরিণতিতে লোকে দুঃখ করে।
গাড়ি, ট্রেন, প্লেন, হয়তোবা ইস্টিমার
দুর্ঘটনায় প্রাণটা চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মা'কে লেখা প্রীতিলতার শেষ চিঠি

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৯




আমায় তুমি পিছু ডেকো না'গো মা
আমার ফেরা সম্ভব  না।
দেশ মাতৃকায় উৎসর্গিতা আমি
আমি তো সেই ক্ষণজন্মা! 

আমায় তুমি আশীর্বাদ করো মা,
মোছো তোমার চোখের জল।
নিপীড়িতদের আর্তনাদ শুনছো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-২)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ২:০৮



সূরাঃ ২ বাকারা, ২১ নং আয়াতের অনুবাদ-
২১। হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমোদের সেই রবের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা মোত্তাকী হও।

সূরাঃ ২... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসী - সাইন্স ফিকশন

লিখেছেন আরাফাত৫২৯, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১০




১/
বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ মহামতি গ্রাহাম উনার অফিসের বিশাল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সময়টা প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যার রক্তিম আভা দূর আকাশে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশটাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৪

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মসজিদে ইমামতি করা, আযান দেয়া, কুরআন শিক্ষাদান করা কিংবা সাধারণভাবে দ্বীন প্রচারের কাজে বিনিময়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×