somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"সবকটা জানালা খুলে দাও না" - একটি প্রহসনমূলক গান

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ ভোর ৫:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাসা বাড়িতে ঠিকা ঝি খাটা শেফালী বেগমের বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ নেই। তাঁর মতন সাংসারিক কাজে দক্ষ ঝি পাওয়া এই যুগে অসম্ভব একটি ব্যপার। সব কাজ অত্যন্ত নিখুঁত। সেই সাথে আরেকটি গুণ তাঁর আছে। অসম্ভব রকমের সৎ! এই মহিলাকে দিয়ে বাজার করালে বাজার থেকে ফিরে সে প্রতিটা পাই পয়সা মালিককে বুঝিয়ে দেয়। একটা টাকাও এদিক সেদিক হয়না।
তবু কেউ তাঁকে বাড়িতে পাকাপাকি চাকরি দিতে সাহস পায় না। কারন মাঝে মাঝেই তাঁর মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। পাগলকে বাড়িতে চাকরি দিবে কোন পাগলে?
তাঁর মাথা এমনিতে সুস্থ্য স্বাভাবিক। শুধু তাঁর সামনে একটা গান ছাড়লেই তিনি ভীষণ খেপে উঠেন। একেবারে পাগলিনীর মতন তেড়েফুড়ে মারতে আসেন।
ধমকের সাথে মুখ দিয়ে থুথু বেরোয়। আর ছুটে গালাগালি।
এই দেখে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খুব মজা পায়। হাতে তালি বাজাতে বাজাতে তাঁর সামনেই গানটা বারবার গায়। বড়রা বাঁধা দেন না। নাগরিক শিশুদের এমনিতেই বিনোদনের বড্ড অভাব। একটা পাগল ক্ষেপিয়ে যদি মজা নিতে চায়, ক্ষতি কী?
গানটা শুনলেই শেফালী বেগম ক্ষেপে গিয়ে বলেন, "সব মিছা কথা! সব মিছা কথা! গান বন্ধ কর তোরা বান্দির পুতেরা! গান বন্ধ কর!"
বাচ্চারা দ্বিগুন উৎসাহে গেয়ে উঠে, "সব কটা জানালা খুলে দাও না!"
অবশ্যই গানের প্রতিটা কথা মিথ্যা। যে যায়, সে কখনই ফিরে আসেনা। তাঁর স্বামীকে যখন ওরা বাস থেকে নামিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, মানুষটা তখন কেবল একবার পিছন ফিরে বলতে পেরেছিলেন, "যাই!"
ঠিক যেমনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ও দেশসেরা নাট্যকার মুনির চৌধুরী ছোট ভাইয়ের দিকে ফিরে শেষবারের মতন বলেছিলেন, "যাইরে ভাই!"
ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল শহীদুল্লাহ কায়সারকে। মিরপুরের বধ্যভূমিতে একের পর এক লাশ উল্টে উল্টেও যার স্ত্রী স্বামীর লাশ শনাক্ত করতে পারেননি। শেফালী বেগমও গিয়েছিলেন সেসব জায়গায়। যেখানেই খবর পেয়েছেন লাশের স্তূপ আবিষ্কার হয়েছে, সেখানেই তিনি ছুটে গিয়েছেন।
নিজ হাতে পঁচে যাওয়া, গলে যাওয়া লাশ হাতড়ে হাতড়ে দেখেছেন। সেলিনা পারভিনকে তাঁর আত্মীয়রা পায়ের মোজা দেখে সনাক্ত করতে পেরেছিল। মানুষটার গলায় সদা ঝুলন্ত তাবিজ দেখে শেফালী বেগমের সনাক্ত করতে কোন অসুবিধা হবার কথা না। ন্যাংটা বাবার তাবিজ! সবধরণের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করার অব্যর্থ কবজ!
তাঁর স্বামীকে তিনি চিনতে পারেন নি। তাঁর ছেলেকেও না।
শেফালী বেগমের ছেলে আলমগীর বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল। যেভাবে আরও হাজার খানেক ছেলে পালিয়েছিল। যুদ্ধের মাঝে একদিনের জন্য মায়ের সাথে দেখা করতে সেও এসেছিল। বলেছিল দলে দলে মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা শহরে ঢুকে পড়ছে। সারা দেশ মোটামুটি স্বাধীন হয়ে গেছে, এখন কেবল ঢাকা শহর বাকি। তিনি বলেছিলেন তার আর যুদ্ধে যাবার দরকার নেই। বাকি কাজটা অন্যরাই করুক।
ছেলে হেসে বলেছিল, আর মাত্র কয়েকদিন! তারপরেই সে আবার মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাবে। আবার ভাত খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে মায়ের শাড়ির আঁচলে হাত মুছবে।
কই! এর তিনদিন পরেইতো দেশ স্বাধীন হয়েছিল। দলে দলে মানুষ রাস্তায় মিছিল বের করেছিল। ফাঁকা গুলি ফুটিয়েছিল। মিলিটারির গাড়ি যেতে দেখে থুথু ছিটিয়েছিল। ফিরে এসেছিল আসাদ, আজম, বাচ্চু। কমলাপুর বস্তির রিকশাওয়ালা ফরিদের ছেলে মুরাদ, সেও স্বগর্বে শত্রুহনন শেষে ফিরে এসেছিল। কিন্তু তাঁর আলমতো ফিরে এলো না।
বাড়ির দরজার কড়া নড়তেই তিনি ছুটে যেতেন আলম এসেছে বলে। রাতের বাতাসে গাছের পাতা নড়ে উঠলে তিনি খুশি খুশি গলায় জানতে চাইতেন, "বাবা ফিরা আইয়েছিস? এত দেরী করলি তুই?"
তেতাল্লিশবার বিজয় দিবস ফিরে এলো, আলম তবু ফিরল না। তাঁর বাবাও না!
আর সবাই কিনা প্রতিবার একই গান গায়,
".....ওরা আসবে,
চুপি চুপি,
যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ!....."
তাই গানটি শুনলেই শেফালী বেগমের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ধমক দিয়ে মিথ্যা গান বন্ধ করতে বলেন। ধমকের সাথে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে থুথু। বাচ্চারা এই দৃশ্য দেখে খুব মজা পায়।
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:১৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের এই সুযোগ কি আরেকবার আসবে? বা তারাই-কি এটা হাত ছাড়া করবে???

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০

ইরানী নেতা খামেনি শহীদ হওয়ার পরে ইরান কি বলেছিল মনে আছে???

ইরান কইছিলো, ইরানের এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী সেই বেবাক দেশকে রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হবে।
প্যান্ট খুলে ছেড়ে দিবে-(এটা আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খাবেন সবাই সমকামী হয়ে যাবেন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×