somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাঙ্গাল এক টেক্সানের সূর্যগ্রহণ দর্শন

১৫ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ১০:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সূর্যগ্রহণ নিয়ে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল স্কুল জীবনে, কয়েক যুগ আগে, যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। বাংলাদেশে তখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহন ঘটেছিল, তবে সেটা দেখা গিয়েছিল সুন্দরবনের হিরন পয়েন্ট থেকে। আমরা সিলেটে ছিলাম, কাজেই ১০০% সূর্যগ্রহণ দেখার অভিজ্ঞতা সেদিন হয়নি।
হালকা হালকা যেটুকু মনে আছে তা হচ্ছে স্কুলের কিছু ছেলে বাড়ি থেকে কারোর পুরানো এক্সরে রিপোর্ট কেটে এনেছিল। সেটা দিয়েই সূর্যগ্রহন দেখা হয়েছিল। কারন গ্রহণের সময়ে সূর্যের দিকে তাকালে নাকি চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
আর মনে আছে নানান "গুরুত্বপূর্ণ তথ্য" রটানো হয়েছিল। সবাই তখন এক্সপার্ট, সবাই তখন নাসার বিজ্ঞানী। যেমন গ্রহণ চলাকালে কিছু খাওয়া যাবেনা। যদি কেউ খায় তাহলে নাকি পুরো জীবন পেটের অসুখে ভোগে। গ্রহণের সময়ে জ্বিন ভূতেদের উৎসব শুরু হয়। প্রেতলোকের দরজা খুলে যায়। কালো জাদুকররা তন্ত্র সাধনায় মেতে উঠে। তখন একা একা বাইরে থাকলে ভূতগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আরও অনেক গুজব এখানে ওখানে উড়ছিল যার কিছু কিছু আমাদের কানে ধরা পড়ছিল, তার কোনটাই মনে নেই।

এরপরেও জীবনে কয়েকটা সূর্যগ্রহণ দেখেছি। কোনটাই পূর্ণগ্রাস ছিল না, কাজেই এই ব্যাপারে আহামরি কোন আগ্রহও ছিল না। এমনও সময় গিয়েছে যে অফিসে কাজ করছি। দেখলাম বস, টিম মেট এবং বাকিরা সবাই হই হুল্লোড় করতে করতে বাইরে বেরিয়ে বিশেষ সানগ্লাসে সূর্যগ্রহণ দেখছে, আমি ওদের সাথে যোগ দিয়েছি স্রেফ কাজে ফাঁকি দেয়ার নেক নিয়্যতেই।

তাই এইবার যখন সূর্যগ্রহণের সংবাদ পেলাম, এবং আমার বর্তমান অফিসকে অনেক আয়োজন করতে দেখলাম, তেমন কোন উৎসাহ পেলাম না। "এ আর এমন কি?"
খানিকটা বিরক্তও হলাম। মাসের শুরুর দিকে আমার কাজে চাপ থাকে। আধাঘন্টা ফালতু সময় নষ্ট করার কোন মানে হয়না।
দিন এগুতে থাকে, চারিদিকে উৎসাহও বাড়তে থাকে। এইচআর ঘোষণা করে ঐদিন জিন্স টি-শার্ট পরে অফিসে আসা যাবে। কেউ গ্রহ নক্ষত্র আঁকা জামা পরতে চাইলে স্বাগতম! অফিস সেদিন বিশেষ কম্বল উপহার দিবে যাতে আমরা বিল্ডিংয়ের ছাদে শুয়ে শুয়ে উপভোগ করতে পারি। থাকবে গুডি ব্যাগ। সেখানে "সান-চিপস" "মুন-কেক" "মিল্কিওয়ে চকলেট বার" ইত্যাদি সব নামওয়ালা চকলেট বিস্কিট থাকবে। সেই সাথে থাকবে সূর্যগ্রহণের জন্য তৈরী বিশেষ চশমা।
বাচ্চাদের স্কুল প্রিন্সিপাল ইমেইল পাঠালেন। এ নিয়ে তাঁদেরও ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানালেন। প্রতিটা বাচ্চার জন্য চশমার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটা বাচ্চাকে স্কুলের মাঠে টিচারের তত্বাবধানে এই বিশেষ ঘটনার সাক্ষী করা হবে। ওদের স্কুলেও এ নিয়ে নানান আয়োজন রাখা হয়েছে।
ছোট ছেলের ডেকেয়ার অবশ্য বেশ বিরস ছিল। ওদের কোন আয়োজনের ব্যবস্থা ছিল না। ছোট ছোট শিশুদের চার দেয়ালের ভিতরেই রাখা হবে। ঠিক আমার স্কুলের মতন। মনে আছে আমরা নিয়মিত ক্লাসই করছিলাম। শুধু টিফিনের বিরতিতেই ঐ এক্সরে রিপোর্ট দিয়ে আকাশের দিকে কিছুক্ষন তাকাবার সৌভাগ্য হয়েছিল।

সিটি থেকে জানানো হলো যেহেতু পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে বাইরে থেকেও প্রচুর ট্যুরিস্ট শহরে আসছে, আমরা সবাই যেন সাবধান থাকি। ট্রাফিক জ্যাম বাড়বে, একসিডেন্ট হবে, বাসা বাড়ির ছাদের সোলার প্যানেলগুলো কাজ করবে না, নানান জায়গায় নানান অপরাধের ঘটনাও ঘটবে - ইত্যাদি নানান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমি ভেবে পেলাম না, কি এমন ঘোড়ার আন্ডা ঘটতে চলেছে যে মানুষ পয়সা খরচ করে প্লেনে চেপে ফ্লাই করে আসছে?

কৌতূহল থেকেই খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারলাম টেক্সাসে শেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল ১৮৭৮ সালে, এবং পরেরটা ঘটবে ২৩১৭ সালে। মানে হচ্ছে, আমাদের জীবিতাবস্থায় সেটা দেখার সম্ভাবনা শূন্য।
আমেরিকায় পরবর্তী সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৪৪ সালে, তবে সেটাও ক্যানাডা থেকে ভাল দেখা যাবে। ২০ বছর পর। গ্যারান্টি কি যে সেটা দেখার জন্য বেঁচে থাকবো?
সবচেয়ে কাছাকাছি যেটা ঘটবে, সেটাও ২০২৬ সালে, এবং দেখা যাবে উত্তর স্পেন, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং আর্কটিক অঞ্চলে। যদি না আমার প্রচুর টাকা পয়সা হয়ে যায়, এতটাই যে অতিরিক্ত টাকার টেনশনে রাতে ঘুম হয় না, তবেই কেবল ওটা দেখার জন্য আমি ক্রুজ শিপের টিকেট কেটে সূর্যগ্রহণের সময়ে সেই অঞ্চলে অবস্থান করবো।
এইসব তথ্য জেনে খানিকটা আগ্রহ বোধ করলাম। এত মানুষ একটা বিষয় নিয়ে এত মাতামাতি করছে, কিছু একটাতো নিশ্চই আছে।

ঘটনার দিন অফিসে এলাম। কিন্তু আকাশ মেঘলা। আমি ছাড়া মোটামুটি সবাইকে খুবই হতাশ হতে দেখলাম। এত বিপুল উৎসাহ, আগ্রহ, উত্তেজনা, সব নষ্ট করে দিবে চৈত্র সংক্রান্তির কিছু বেরসিক মেঘ?
এদিকে সূর্যও যেন নিজের ভক্তদের হতাশ করতে রাজি নয়। সে সমানে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
আকাশে শুরু হলো ইন্দ্র ও সূর্যের লড়াই। এই মেঘ এই রদ্দুর। মানুষের মনের অবস্থাও তখন তাই। যেই মুহূর্তে আকাশে মেঘ জমে, সবার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়, আবার যেই মুহূর্তে সূর্য হাসে, অমনি সবাই উল্লাস করে উঠে।

আমি কাজে ডুবে রইলাম।
যথা সময়ে আমাদের হাতে গুডি ব্যাগ, কম্বল তুলে দেয়া হলো। দল বেঁধে ছাদের দিকে হন্টন শুরু হলো। জমি দখলের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই সেখানে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে হবে।

সূর্যে গ্রহণ লাগা এরও দুই ঘন্টা আগে শুরু হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে সানগ্লাস পরে আকাশের দিকে তাকাই। গোলাকার সূর্য ঈদের চাঁদের আকৃতি নিতে শুরু করে দিয়েছে। মেঘ তখনও হার মানতে নারাজ। আকাশে আলোর অবস্থাও স্বাভাবিক। আমরা সবাই তখন কাজের ফাঁকের আড্ডা এঞ্জয় করছি।

অবশেষে ১:৪০ মিনিটে যখন সূর্য পুরোপুরি ঢেকে গেল, তখন বুঝলাম কেন মানুষের মনে এত আগ্রহ, কেন মানুষ মহাজাগতিক ঘটনাকে উৎসব বানিয়ে ফেলেছে, কেন মানুষ পকেটের টাকা খরচ করে জরুরি সব কাজ ফেলে ছুটে আসছে দূর দেশে কেবল ঘটনার সাক্ষী হওয়ার উদ্দেশ্যে।
পরম করুণাময় উপরওয়ালা আমাদের উপর করুণা করলেন। পুরো দিনব্যাপী যে মেঘ ও সূর্যের লড়াই চলছিল, তাঁর হস্তক্ষেপে মেঘ ঐ চার মিনিটের জন্য পিছু হটলো। আমরা মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মধ্য দুপুরেও গোটা শহর সান্ধ্য অন্ধকারে ঢেকে গেল। জ্বলে উঠলো অটোম্যাটিক স্ট্রিট লাইট। প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই পোষা কুকুরের দল ডেকে উঠলো। ওদের মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না, হঠাৎ প্রবল প্রতাপশালী সূয্যি মামার কি হয়ে গেল?
চাকতির উপর চাকতি বসে আছে। নিখুঁত, গোলাকার সোনালী একটি আংটি তখন আকাশে জ্বলজ্বল করছে। একটু পরেই আংটির এক কোণে হীরের ঝলকানি দিয়ে উঠলো। কী অবিশ্বাস্য সুন্দর!

ঘটনাটা মাত্র চার মিনিটের জন্য স্থায়ী ছিল।
দুপুরবেলায় সন্ধ্যা তারা দেখার সৌভাগ্য এই প্রথম হলো। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা বের করে প্রচুর ছবি তুললাম, কিন্তু সেই রূপকে ধারণ করে এমন ক্যামেরা কোথায়?
মনে পড়লো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সূরা আন-নাজমের সেই আয়াত, যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের মেরাজ ভ্রমন নিয়ে বলেছেন, "নিশ্চয় সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।"

আমরা অতিক্ষুদ্র সামান্য মানব, আমাদের জন্য পরলোক থেকে বোরাক আসেনা, বেহেস্ত থেকে ফেরেস্তা জিব্রাইল (আঃ) নেমে মেরাজ ভ্রমনে নিয়ে যায় না, তবে আমাদের জন্যও মাঝে মাঝে আমাদের পালনকর্তা তাঁর মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করার সুযোগ দেন। না চাইতেও মহাজাগতিক এই বিস্ময়কর ঘটনা তিনি তাঁর অতি নগন্য দাসকে অবলোকন করার সৌভাগ্য দিয়েছেন, তাঁর প্রতি তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ১০:৫২
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এখনো নদীপারে ঝড় বয়ে যায়

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১২ ই জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৩৭

এ গানটি এর আগে মিউজিক ছাড়া (খালি গলায়) এই পোস্টে এখনো নদীপারে ঝড় বয়ে যায় শেয়ার করা হয়েছিল। এবার মিউজিক যোগ করে শেয়ার দিলাম। আশা করি কারো কারো ভালো লেগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। ২৪ ঘণ্টা পর সাইন ইন করলাম

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১২ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৫৪

সামু বন্ধ থাকলে কি যে যাতনা তা এবারি বুঝতে পারলাম । দুপুরে জাদিদকে ফোন করে জানলাম সমস্যা সার্ভারে এবং তা সহসাই ঠিক হয়ে যাবে । মনের ভিতর কুচিন্তা উকি ঝুকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওয়েলকাম ব্যাক সামু - সামু ফিরে এল :D

লিখেছেন অপু তানভীর, ১২ ই জুন, ২০২৪ রাত ৯:২৩



সামুকে নিয়ে আমি এর আগে কোন দিন স্বপ্ন দেখেছি বলে মনে পড়ে না । তবে অনেক দিন পরে গতকাল আমি সামুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম।তবে সেটাকে আদৌও সামুকে নিয়ে স্বপ্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বয়কটের ব্যবচ্ছেদ

লিখেছেন শূন্য সময়, ১২ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:৪৫

আপনি বয়কটের পক্ষে থাকুন, বিপক্ষে থাকুন- এই বিষয় নিয়ে কনসার্ন্ড থাকলে এই লেখাটা আপনাকে পড়ার অনুরোধ রইলো। ভিন্নমত থাকলে সেটা জানানোর অনুরোধ রইলো। কটাক্ষ করতে চাইলে তাও করতে পারেন। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামে আলেম নয়, ওলামার রেফারেন্স হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ২:৫০



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরাঃ ২৯... ...বাকিটুকু পড়ুন

×