somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ঈশ্বরের স্রষ্টা কে?"

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আপনার হাতে একটা স্মার্টফোন আছে। আপনি চাইলেই রিল/ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে/ইউটিউবে প্রচার করতে পারেন। কন্টেন্ট ভাল হলে আপনি বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়ে যাবেন। কন্টেন্ট অতিরিক্ত খারাপ হলেও ভাইরাল হবেন। মাঝামাঝি কিছু হলে পাত্তা পাবেন না।

তা অনেকেই ইসলামিক ভিডিও তৈরী করেন। আশা করি উনারা নেক নিয়তেই করেন, ভাইরাল হওয়ার ধান্দায় ভিডিও করেন না।
তবে এই সমস্ত ভিডিও/কন্টেন্ট বানাতে গেলে আমার প্রথম পরামর্শ হচ্ছে পড়াশোনা করে তারপরে বানানো উচিত। শুধু মুখস্ত বিদ্যার কথা বলছি না, পড়াশোনা বলতে আমি বুঝাই যা পড়লেন, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেন, আত্মস্থ করলেন, সেটাকে। কম পড়েন, কিন্তু যা পড়েছেন সেটা যেন ভিতরে থাকে। যাতে প্রয়োজনে বের করে আনতে পারেন।

উদাহরণ দেই।
জাকির নায়েকের দৌলতে আমাদের অঞ্চলে ধর্মীয় "ডিবেট" অতি জনপ্রিয় একটি কন্টেন্ট। সবাই খুব আগ্রহের সঙ্গে বসেন, আস্তিকদের আশা এই থাকে যে ডিবেট শেষে প্রশ্নকারী অমুসলিম ব্যক্তিটি ইসলাম কবুল করবেন।
আর নাস্তিক লোকটিকে যতই ডিবেট গুলিয়ে খাওয়ান, কিছুতেই কিছু হবেনা।
আমার মতে, এই ডিবেট করতে এলেও আপনাকে যথেষ্ট প্রিপেয়ার্ড হয়েই নামতে হবে। আপনি সহজ প্রশ্নের জবাব দিতে যদি অপারগ হন, তাহলে কিভাবে চলবে?

দুইটা সহজ উদাহরণ দেই।
১. একটা রিলে দেখলাম দুই ভদ্রলোক তুমুল আলোচনা শুরু করেছেন কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে, যেখানে আমাদের রাব্বুল আলামিন বলছেন, “আর আমি প্রত্যেক বস্তুই সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়—যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।”
সূরা আয-যারিয়াতের (৫১) ৪৯তম আয়াত। পৃথিবীখ্যাত আয়াত। অনেক পন্ডিত নিজের পান্ডিত্য ফলাতে এই আয়াত ব্যবহার করে প্রমানের চেষ্টা করে যে আল্লাহ ভুল তথ্য দিয়েছেন। কারন, আমরা জানি যে পৃথিবীতে কিছু প্রাণী আছে যেগুলি একলিঙ্গের অধিকারী। আবার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু আছে যেগুলোর কোন লিঙ্গই নাই।
এখানে যদি ডিবেটকারী মুসলিম আমতা আমতা করতে থাকেন, তাহলেতো সমস্যা।
উপায়?
যে আয়াতটি ব্যবহার করা সেখানেই কিন্তু উত্তর আছে। আয়াতটির আরবি হচ্ছে وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
এখানে "কুল্লি" শব্দটি লক্ষ্য করেছেন? এটাকেই দূর্বল ট্রান্সলেশনে লেখা হয় "প্রত্যেক" - আসলে কিন্তু তা না। (দুর্বল ট্রান্সলেশনের আরেকটা প্রাইম উদাহরণ হচ্ছে "আউলিয়া"কে লেখা হয় "বন্ধু" - "তোমরা অমুসলিমদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না" যা নিয়ে মূর্খরা বিরাট ক্যাঁচাল লাগায়)
মোটামুটি কাছাকাছি আয়াত আছে সূরা ইয়াসিনের ৩৬ নম্বর আয়াতেও, যেখানে আল্লাহ বলছেন ".....যা তারা জানে না, তার "প্রত্যেককে" জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন।" এবং সেখানেও "কুল্লা" শব্দটি আছে। (কুল্লা/কুল্লু/কুল্লি একই)

এখন আমরা কুরআনেরই আরেকটি আয়াত যদি দেখি, আল আহক্কাফের ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন "তার পালনকর্তার আদেশে সে "সব কিছুকে" ধ্বংস করে দেবে। অতঃপর তারা ভোর বেলায় এমন হয়ে গেল যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হল না। আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে এমনিভাবে শাস্তি দিয়ে থাকি।"
এখানেও আরবি "কুল্লু" শব্দটি আছে, যেখানে দুর্বল ট্রান্সলেটর বলেছেন "সবকিছু/প্রত্যেক" - কিন্তু আয়াতের বর্ণনাতেই আমরা পাচ্ছি "ব্যাপক" ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হলেও "প্রত্যেক বস্তুই" (গোটা দুনিয়া) ধ্বংস হয়ে যায়নি।
তাই এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, আরবিতে শব্দটির "ব্যাপক/বেশিরভাগ" ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
মানে দাঁড়ায় "আল্লাহ বেশিরভাগ প্রাণীই (সংখ্যাগরিষ্ঠ) জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, যাতে আমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারি।"
বুঝাতে পেরেছি?

আরেকটা হাস্যকর পয়েন্টের কথা বলি। মজা পাবেন।
২. নাস্তিকদের সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন হচ্ছে, "তোমরা বলছো আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। মানলাম, কিন্তু উনাকে কে সৃষ্টি করেছেন?"
ব্যস, ডিবেটকারী প্যাঁচে পড়ে যান। তিনি মুখস্ত উত্তর দেন, "এইসব চিন্তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসে/তাফসীরে আছে....." বা এই জাতীয় কিছু।
আমার কথা হচ্ছে আগে দেখতে হবে কুরআনে আল্লাহ কি বলেছেন সেটা। আল্লাহ স্বয়ং নিজের বর্ণনা দিয়ে আস্ত সূরা নাজেল করে ফেলেছেন, আর আপনি কোথাকার কোন মাওলানা কি বলেছে সেটা হাতড়ে বেড়াচ্ছেন?
ঘটনা হচ্ছে, কুরাইশরা একদিন নবীর (সঃ) কাছে এসে জানতে চাইলো "তোমার আল্লাহ কে? কার পুত্র? কার বাপ? পুরুষ নাকি নারী? দেখতে কেমন?" ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা নিজেদের বুদ্ধিতে যা সম্ভব তাই প্রশ্ন করলো।
তখনকার যুগে ওরা সেভাবেই এন্টিটির পূজা করতো। ওদের প্রতিটা দেবতাই কারোর না কারোর পিতা, নাহয় পুত্র। কাজেই ওরা নবীর (সঃ) কাছে এসে জানতে চাইলো, তোমার বলা ঈশ্বরের পরিচয় কি?

আল্লাহ উত্তর দিলেন সূরা ইখলাসের মাধ্যমে, যা অতি সহজ, অতি ছোট এবং আমরা মোটামুটি প্রতিটা ওয়াক্তের নামাজেই এটি পড়ি। উত্তরটা তিনি এমনভাবে দিলেন যে কেয়ামত পর্যন্ত সবপ্রশ্নের জবাব এতেই থাকে।
তিনি বললেন "বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি, এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।"
শেষ আয়াতটি খেয়াল করুন, "আহাদ" শব্দের বর্ণনা করা হয়েছে "সমতুল্য" যা আমাদের বাঙালি ব্রেন প্রসেস করবে উনার "সম মর্যাদার কেউ নেই।" কিন্তু "সমতুল্য" মানেই হচ্ছে তাঁকে যে তুলনা করবেন, এমন কোন কিছুই নেই। আপনি যাই চিন্তা করুন না কেন, কোন কিছুর সাথেই তাঁর তুলনা করতে পারবেন না। কারন আপনি যা চিন্তা করছেন, সবই "সৃষ্টি", এবং তিনি "স্রষ্টা।"
খেয়াল করেছেন? সূরা ইখলাসের মতন অতি সহজ, কমন একটি সূরাতে আছে এই তথ্য, অথচ মুখস্ত বিদ্যা ও চিন্তাভাবনার প্র্যাক্টিসের অভাবে জবাব দিতে হিমশিম খান।
বিগব্যাঙের মাধ্যমে সময়ের সৃষ্টি হলো, সময়ের আগে কি ছিল সেটা ফিজিক্স বহুবছর ধরেই খোঁজার চেষ্টা করছে। ইসলাম ধর্মমতে এই সময়ের স্রষ্টাই আল্লাহ। যখন কিছু ছিল না, এমনকি শূন্যেরও অস্তিত্ব ছিল না, তিনি ছিলেন এবং যখন আবার কিছুই থাকবে না, তখনও তিনিই থাকবেন। তিনি "একক" "অদ্বিতীয়" তাঁর "সমতুল্য" কিছুই নেই।

এনিওয়েজ।
আমার কথা হচ্ছে অমুক মাওলানা তমুক কিতাবে কি বলেছেন সেটা খুঁজে বের করে মুখস্ত কোট করার স্টাইলে পড়াশোনা না করে কি পড়েছেন, সেটা নিয়ে ভাবুন। ভাবতে থাকুন। তখন এইসব প্রশ্নের উত্তর আপনাতেই নিজের সামনে চলে আসবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ২:৩৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পলাশী ১৭৫৭, বাংলাদেশ ২০২৬ঃ সিরাজের বাহিনি ও বিএনপি

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০



সামনের ইলেকশনে যদি ডিপস্টেট, জামাত ও এঞ্চিপির যৌথ প্রচেষ্টায় 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বা 'মেকানিজম' হয় (যেটার সম্ভাবনা নিয়ে অনেকেই আলোচনা করছেন অনলাইন-অফলাইন-দুই জায়গাতেই), তবে কি বিএনপি সেটা ঠেকাতে পারবে? পারবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জালিয়াতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৯



জালিয়াতি -১
কয়েক মাস আগে, লন্ডন থেকে আমার এক আত্মীয় ফেসবুকে ম্যাসেজ করলেন যে, ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের সাথে আমার একটি ফোটোকার্ড ইন্টারনেট দুনিয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমি চমকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

টেস্ট টিউব বেবি (IVF) ও সারোগেসি; ইসলাম কী বলে?

লিখেছেন নতুন নকিব, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১৬

টেস্ট টিউব বেবি (IVF) ও সারোগেসি; ইসলাম কী বলে?

ছবি সংগৃহীত।

ভূমিকা

সন্তান মানুষের জীবনের অন্যতম গভীর আকাঙ্ক্ষা। পরিবার, উত্তরাধিকার, সামাজিক ধারাবাহিকতা ও মানসিক পূর্ণতার সঙ্গে সন্তান প্রত্যাশা ওতপ্রোতভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের কোনো বিকল্প নাই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৩


ঢাকার মিরপুরে পরিচয় গোপন করে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের এক পোড়খাওয়া নেতা টাইম ম্যাগাজিনের তারেক রহমান কে নিয়ে লেখা বাংলা অনুবাদ পড়ছিলেন । প্রচ্ছদে তারেক রহমানের ছবি, নিচে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলঃযাঁর হাত ধরে পাকিস্তানের জন্ম

লিখেছেন কিরকুট, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ভূমিকা একদিকে যুগান্তকারী, অন্যদিকে গভীরভাবে বিতর্কিত। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্র। অথচ কয়েক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×