somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জননী সর্বংসহা

৩০ শে নভেম্বর, ২০১২ রাত ৯:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

***এক বৃদ্ধা মায়ের আত্মত্যাগের অনন্য ইতিহাস***

ভোলাহাটের নাম শুনেছেন কেউ? উল্লেখযোগ্য কোনো স্থান নয়, তাই আমাদের শোনবার কথাও নয়। কিন্তু এই ভোলাহাটের আছে এক অনন্য বিশেষত্ব, যেখানে আজ থেকে একচল্লিশ বছর আগে বাস করতেন এক মহীয়সি বৃদ্ধা। এদেশের সর্ব পশ্চিমের যে চারটি ইউনিয়ন তা নিয়েই গঠিত উপজেলা এই 'ভোলাহাট'। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হলেও ভৌগলিক দিক দিয়ে ভারতের মালদহ জেলারই যেন নিকটে এই উপজেলাটি। আর এই প্রান্তবর্তীত স্থানটি ছিল একাত্তরে সেক্টর-৭ এর অন্তর্গত। এই স্থানে যুদ্ধ তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ায় কমান্ডার লে. কর্নেল কাজী নূর-উজ্জামান (পরবর্তীতে কর্নেল) নিজে একদিন পরিদর্শনে আসেন ভোলহাটস্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্যােম্প। সারা রাত গাড়ী চালিয়ে প্রত্যুষে ভোলাহাট উপস্থিত হবার পর এই সেক্টরে ঘটে যায় তার জীবনের অন্যতম একটি স্মরণীয় ঘটনা।

ভোলাহাট ক্যাম্পে পৌঁছার পরেই তিনি দেখতে পান এক বৃদ্ধা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছে মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের দিকে। জীর্ণ দেহ, রুক্ষ ত্বক, চোখে পথ চলার ক্লান্তি। কাছে আসবার পরই কমাণ্ডার নূর-উজ্জামান যোদ্ধাদের নির্দেশ দেন বৃদ্ধাটির ঝুড়ির ভেতর কী আছে তা খোঁজ নিতে। নিজেও এগিয়ে যান বৃদ্ধার কাছে। ঝুঁড়ির ভেতরে উঁকি দিয়েই লাফিয়ে দূরে সরে পড়েন কমাণ্ডার কাজী নূর-উজ্জামান। নির্দেশ দেন এই ঝুঁড়ি যেন সরিয়ে নিয়ে রাখা হয় বহুদূর। কারণ সেই ঝুঁড়ি ভর্তি ছিল এন্টি-পার্সোনাল মাইন, যার বিষ্ফোরণে মৃত্যু নেমে আসতে পারতো উপস্থিত সবার।


ছবিঃ ১৮৬০ সালে তোলা এক বৃদ্ধার

বৃদ্ধাটির কাছ থেকে জানা যায় মুক্তিযোদ্ধারা যে পথ দিয়ে দলদলিয়া নামক একটি ছোট্ট গ্রামের পাশ দিয়ে বোয়ালিয়া যাবার চেষ্টা করতো ঠিক সেই পথেই এক রাতে বুড়ির মনে হলো শত্রুরা কিছু যেন পুঁতে রাখছে। গ্রামের বয়স্ক এই বৃদ্ধা তার স্বল্প বুদ্ধিতে ভেবেছিল এই জিনিসগুলো লোহা, পেরেক বা কাঁটা জাতীয় কিছু হবে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ে ফুটলে ব্যাথা হতে পারে। এই কারণেই এই নির্বংশা পৌড়া নিজের টুকড়ি নিয়ে একে একে সব মাইনগুলো তুলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আনে তা জমা দিতে। সমরবিদ্যায় বলা হয়ে থাকে, "Bombs & Explosives can't differentiate friends and foes." অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা এবং বারুদ চিনেনা শত্রু-মিত্র । তাই মাইন উত্তোলনকে বিবেচনা করা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে। কিন্তু নিজের ঝুঁপড়িতে বসেই এই বৃদ্ধা চিনেছিলেন দেশের শত্রুদের এবং নিজের অজান্তেই বড় একটি ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন দেশের সূর্যসন্তানদের প্রাণ।

দেশ অর্থ কি? দেশ সেই বৃদ্ধাকে কী দিয়েছে জানিনা? কিন্তু সেই বৃদ্ধা নিজের অজান্তেই দেশের যোদ্ধাদের প্রাণ বাঁচাতে যে ঝুঁকিটি নিয়েছেন তা বিশ্বের অন্য কোথাও হলে লেখা থাকতো স্বর্ণাক্ষরে। ভোলাহাট গ্রামটিও আমাদের কাছে অপরিচিত থাকতো না মোটেও। বৃটেনে যেকোনো বেসামরিক ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় অবদান রাখলে তাকে দেওয়া হয় জর্জ ক্রস। কিন্তু আমরা আমাদের সাত কোটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতায় একনিষ্ঠভাবে সহানুভূতি প্রকাশকে সম্মান জানাতে পারিনি কোন ভাবেই। এখনো ফুরিয়ে যায় নি সময়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ইতিহাসবিমুখতা এবং অতীত থেকে শিক্ষা না নেওয়া যে এই দীর্ঘশ্বাসকে প্রলম্বিত করবে তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?

সূত্রঃ এক সেক্টর কমাণ্ডারের স্মৃতিকথা ( কর্নেল কাজী নূর-উজ্জামান)
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ম্যাজিস্ট্রেট

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



আমাদের এলাকায় নতুন একটা ওষুধের দোকান হয়েছে।
অনেক বড় দোকান। মডেল ফার্মেসী। ওষুধ ছাড়াও কনজ্যুমার আইটেম সব পাওয়া যায়। আমি খুশি এক দোকানেই সব পাওয়া যায়। আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে জুলাইযোদ্ধাদের উপর পুলিশের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১৪

জুলাই যারা ঘটিয়েছে, তাদের উপর পুলিশের কী পরিমাণে ক্ষোভ, এটা ইলেকশনে যাস্ট বিএনপি জেতার পরই টের পাবেন।
আমি বলছি না, বিএনপির ক্ষোভ আছে।
বিএনপি দল হিসেবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ের উপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাশা : বাংলাদেশের নতুন জাতীয় খেলা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


"ও শ্যামরে, তোমার সনে একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম, এই নিঠুর বনে। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।" প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির কণ্ঠে ছবিতে যখন এই গান শুনেছিলাম ,তখন কেউ ভাবেনি যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহার এবং আমার পর্যবেক্ষণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

বিএনপির প্রতি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা কাজ করে, এবং ভালোবাসা আছে বলেই আমি তার প্রতিটি ভুল নিয়েই কথা বলতে চাই, যাতে সে শোধরাতে পারে। আপনিও যদি সঠিক সমালোচনা করেন, সত্যকে সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×