somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খুঁজে বেড়াই জীবনের উদ্দেশ্য- মানুষ

০২ রা মার্চ, ২০১৬ রাত ১২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রাচ্যের একটা কথা আছে- “জগতের সব কিছুই ভ্রম, মায়া মোহের জাল।”
আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমরা কোথায় আছি? আমরা কোথায় যাব? মানুষ পৃথিবীর একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী যে জন্মনোর পরে প্রশ্ন করে জীবনের। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন। ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে ভিন্নভাবে। আবার বিভিন্ন মানুষের কাছে জীবনের বিভিন্ন মানে রয়েছে।

বিজ্ঞান কী বলে?-
আমরা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফলে আমরা আজকের মানুষ। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান মহাবিশ্বের অংশ হয়ে এবং মহাবিশ্বকে জানার পথে আছি বলে। কোন স্রষ্টা ছাড়াই মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্ভব। বিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং বলেন-
“স্রষ্টার অনস্তিত্বকে প্রমাণ করা অসম্ভব। কিন্তু, বিজ্ঞান স্রষ্টাকে অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে।” আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে মৃত্যুর সাথে সাথে। আমাদের শরীরের অনু পরমানুগুলো মিশে যাবে পৃথিবীর সাথে। আমাদের বেঁচে থাকাটাই যেন আমাদের উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে।

ধর্মমত-
পৃথিবীতে প্রায় ৪২০০ ধর্ম রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে জীবন সম্পর্কে। তবে মূল বিষয় প্রায় একই। আমাদের জীবনের পেছনে রয়েছেন এক মহান সত্ত্বা। যিনি আমাদের উদ্দেশ্য ঠিক করে দিয়েছেন। আমাদের কাজ হল মহান সত্ত্বার উপাসনা করা। জীবনের শেষে আমাদের পুনরুদ্ধান হবে। একক সত্ত্বার জন্যই আমাদের জীবন। উজবেক কবি ইব্রাহিম আলাউদ্দিনের উক্তি- “তুমি একখানা কিতাব পড় আর কিতাবের লেখকের খোঁজ কর।বিরাট অট্টালিকা দেখে নির্মাতার নাম জানতে চাও। তবে জমিন ও আসমানের কোন মালিক নেই?
হে মানুষ চিন্তা কর, বুঝে দেখ আমাদের কাছে সব জিনিসই নিশানা দিচ্ছে।
মহান সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর।”

দর্শনে আমাদের জীবন-
দর্শন যুক্তির (Argument) খেলা।জীবনের উদ্দেশ্য থাকা না থাকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি আছে দর্শনে। যুগে যুগে দার্শনিকেরা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন আঙ্গিকে জীবনকে দেখার চেষ্টা করেছেন।
বিজ্ঞান আমাদের আত্নার অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। দর্শন কি পেয়েছে?
হেমলক পানের আগে সক্রেটিস বলেন-
“তোমরা দুঃখ করো না। কারণ, এই মৃত্যু কেবল আমার দেহটাকেই বিনাশ করবে, আত্মাকে নয়।” উনারা স্রষ্টার মাধ্যমে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজতেন।

এগুলো তো আগেকার চিন্তাভাবনা। বর্তমান দর্শনে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে, যার মধ্যে ধ্বংসবাদ (Nihilism) উল্লেখযোগ্য। ধ্বংসবাদ অস্তিত্ববাদের(existential) ধ্বংসবাদ আকারে প্রকাশ পায়। এই মতবাদের যুক্তিতে জীবন উদ্দেশ্যহীন এবং জীবনের অন্তর্নিহিত মূল্য নেই।

আবার বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় দার্শনিক তত্ত্বের একটি অস্তিত্ববাদ ।
মুলত প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর যুগে জার্মানি এবং ফরাসি দেশে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের বিপর্যস্ত বুদ্ধিজীবী দের মধ্যে এই চিন্তার উদ্ভব এবং বিস্তার দেখা দেয়। অস্তিত্ববাদ বলতে ব্যাক্তির অস্তিত্ব কেই বুঝানো হয়। যদিও প্রথম কিয়েরকেগারড অস্তিত্ববাদ নিয়ে কথা বলেন তিনি existentialism ব্যবহার করেন নি। উনার মতে ব্যাক্তি তার সংকটে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে তার অস্তিত্ব এর জানান দেয়। এরপরে আলবেয়ার ক্যামো, জ্যা পল সাত্রের কল্যানে অস্তিত্ববাদ আরো জনপ্রিয় হয়। যেহেতু ততদিনে বিজ্ঞানের চরম উন্নতি হওয়ার কারনে এবং সাত্রে নিজে বস্তুবাদী, নিরিশ্বরবাদী হওয়ার কারনে তিনি বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি তার বই “বিয়িং এন্ড নাথিংনেস ” লিখেন।
যেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন ব্যাক্তির চরম এবং কিছু ক্ষেত্রে উগ্র ব্যাক্তি স্বাধীনতার কথা । তিনি বিশ্বাস করতেন “এবসলিউট ফ্রিডম অব চয়েস “এই ধারনায়, মানে চিন্তা বস্তু থেকে মানুষের চিন্তা কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং এই স্বাধীনতার উপর কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যাকে বলা যায় স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি।
যেহেতু ব্যাক্তির উপর সমাজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না সেখানে ব্যাক্তির সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও থাকে না। ফলে ব্যাক্তির পক্ষে পলায়ন বাদী হওয়া সহজসাধ্য হয়। তাই অস্তিত্ববাদ ব্যাক্তিবাদেরই অন্য রুপ ।
মুলত বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর হতাশাজনক পরিস্থিতি বুদ্ধিজীবীদের অস্তিত্ববাদ এর দিকে ধাবিত করেছিল ।


যুগে যুগে মানুষেরা উদ্দেশ্য খুঁজে গেছে, জীবনের উদ্দেশ্য।গৌতম বুদ্ধ, লালন শাহ্‌ এর মত মত মানুষেরা সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজতে খুঁজতে।

যারা জীবনের অর্থহীনতায়(Absurdity) ভুগেন তাদের জন্য
সরেন এবং কামু এই অর্থহীনতা কাটিয়ে ওঠার ৩টি সমাধান দিয়েছেন।
১। আত্মহত্যা – নিজেকে শেষ করে দেয়া।
২। ধর্মে বিশ্বাস – অলৌকিকতায় বিশ্বাস করা।
৩। এই অর্থহীনতার মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়া।


মানুষ যতদিন থাকবে, খুঁজে যাবে জীবনকে, খুঁজে যাবে জীবনের উদ্দেশ্যকে। মানুষ স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে। আস্তিক-নাস্তিক-সংশয়বাদী, আমরা সবাই মানুষ। আমরা স্বপ্ন দেখি, আশা করি জীবনের বেঁচে থাকায়।

আমেরিকান লেখক কার্ট ভোনেগাটের (Kurt Vonnegut) উক্তি,Cat’s Cradle থেকে- একদম শুরুতে ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করলেন এবং তার নিজের মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার দিকে তাকালেন। এরপর ঈশ্বর বললেন, এই পৃথিবীর কাদামাটি থেকে জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করা যাক। সুতরাং, মাটি দেখতে পারবে আমি কী সৃষ্টি করেছি। এবং, ঈশ্বর প্রত্যকটি জীবন্ত প্রাণীকে সৃষ্টি করলেন, যারা বর্তমান পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে একজন ছিল মানুষ। কাঁদামাটি একমাত্র মানুষ হিসেবে, যে কথা বলতে পারত।
মানুষটির যেখানে বসে ছিল, ঈশ্বর সে দিকে ঝুঁকে তাকলেন।

মানুষ বলল, এই সবকিছুর উদ্দেশ্য কী?

ঈশ্বর বললেন- সবকিছুর কি উদ্দেশ্য থাকতে হবে?
মানুষ বলল- নিশ্চয়ই।

ঈশ্বর- তাহলে আমি এই সবকিছু তোমার চিন্তা করার জন্য ছেড়ে দিলাম।

এরপর ঈশ্বর চলে গেলেন।

অনেকেই মনে করেন জীবন মাঝি ছাড়া একটা নৌকা, আপনি সেই নৌকার যাত্রী।
তাহলে আপনিই মাঝি হয়ে গেলে দোষ কোথায়।

আরও একটা কথা- আমার প্রিয় মিউজিক ব্র্যান্ড ক্রিডের একটা গান আছে – হুয়াট’স দিস লাইভ ফর?
শুনুন- https://youtu.be/8lKBro5YkPs

পরিশেষে, আমার প্রিয় একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-
“আমাদের মত এতো ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য মহাশূন্যের এই বিশালতা সহ্য করার একমাত্র উপায় হলো ভালোবাসা”।
- কার্ল সেগান।

ভালো থাকবেন।
তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০১৬ রাত ১:৩৭
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছবি ব্লগ -৯ নিশীথে ফুটেছে ফুল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৪

বাইরের জানালার পাশে গভীর রাতে ফুটে ওঠা ফুলের সৌন্দর্য রহস্যময়, আকর্ষণীয় মনে হলো বলেই থমকে দাঁড়ালাম। ক্যামেরায় ধরলাম। ফুল আর কলি যেন কথা বলে উঠলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×