25 বছর ধরে বরুণ চৌধুরী নিজেকে কোকুনের মধ্যে আটকে রেখেছেন। উইদড্রন ফ্রম সোসাইটি। কারন জার্মান সমাজের বিশুদ্ধতা আত্মম্ভরিতা অথবা ইন্টিগ্রেশন বিমুখতার কারনে আজো তার কাছে মনে হয় দিলী থেকে যে এয়ার ইন্ডিয়া বিমানে তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে এসে নেমেছিলেন, তিনি যেন এখনো সেই বিমানেই বসে আছেন। অথবা বন শহরের একটা হোটেলে 25টা বছর একজন মুসাফির বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করলেন। জার্মানরা নাৎসী সময়ের অন্ধকার ইতিহাস পিছে ফেলে এলেও সমাজের বিনাৎসীকরণ কিংবা নাৎসী মনোজগতের অপনোদন এখনো যেন সম্ভব হয়নি। ফলে একটা অভিবাসী বিমুখ আবদ্ধ সমাজ। পোলিশ বউ নিয়েও এ সমাজে একজন বাঙালীর মিথষ্ক্রিয়া যে সম্ভব নয়, বরুণ তা টের পেয়েছেন 25 বছরে।
'জেনারেল আনসাইগার' পত্রিকার দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের প্রধান মাইকেল পমাস যাকে ক্রমাগত আমাশয় জনিত কারণে আদর করে 'হাগেন' বলা হয়। আর পমেস শব্দের অর্থ আলু'। লোকটির ঐ সংক্রান্ত সমস্যা থাকায় বাপ মায়ের দেয়া নামের সার্থকতা প্রতিপণ্ন করতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। এই পমাস যখন কোন ভারতীয়, পাকিস্তানী বা বাংলাদেশীর দিকে তাকায় তখন সে মনে মনে ইউরোকে রুপি অথবা টাকায় কনভার্ট করতে থাকে।
বরুনের ইংরেজী পড়ে পমাসকে হীনমন্যতা পেয়ে বসে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য যেসব সাংবাদিক আছে তাদের মধ্যে যোগ্য লোকগুলোকে দেখলেই যেন পমাসের মধ্যে একজন টিনড্রাম হিটলার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ভাবতে অবাক লাগে জার্মানীর মত একটা দেশ যেখানে দ্্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাৎসী নিধনযজ্ঞকে অসবীকার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেখানে পমাস নিজের মধ্যে কিভাবে এই নাৎসী সত্ত্বাকে লালন করে একজন আধুনিক শিতি মানুষ হয়েও! অবশ্য এই পমাসকে তার মধ্যে বেড়ে ওঠা কর্তৃত্ব অথবা বামন প্রভুত্বের বিকৃতিকে লালন করে দক্ষিণ এশিয়রাই।
বরুণ যেখানে পমাসের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলে জামালপুরের আবদুস সাজ্জাদ অথবা বাঁকুড়ার উপাঙ্গ তখন পমাসের পদলেহন করে। কিংবা লাহোরের নায়রা বেগম পমাসের জন্য ল্যামব বিরিয়ানী আর জালি কাবাব নিয়ে হাজির হয় প্রতিদিন। পমাসের পাকস্থলীর দুর্বলতার কথা দক্ষিণ এশিয় খাবার দেখলে আর মনে থাকেনা। ইন্ডোলজি পড়ে ভারতীয় সংস্কৃতিকে পমাস এতটা বুঝতে পারেনি যতটা বুঝেছে বিরিয়ানী, রোস্ট কিংবা কাবাবের মজা।
ফলে পমাসকে নিউকিয়াস ভেবে যেসব ইলেকট্রন প্রোটনেরা চারপাশে ঘুরছে তাদের সেই স্তাবক কিংবা চাকরস্য চাকর মনোভাবের সঙ্গে বরুণ কখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। আব্দুস সাজ্জাদ একটা অর্ধশিক্ষিত লোক। ভাগ্যগুনে এই চাকরীতে ঝুলে জার্মানীতে থেকে গেছে। তার তিনতলা বাংলো। লোকজন কেউ বেড়াতে গেলে পুরো হাভেলী তাদের ঘুরে দেখতে হয়। এমনকি তাদের কন্যার বেডরুম এবং ওয়াশরুম দেখতে বাধ্য করা হয় তাদের। লিভিং রুমের বুক শেলফে হাসান আজিজুল হকের অটোগ্রাফ দেয়া বই। সাজ্জাদকে সু্যট-টাই-চশমা পড়ে সাংবাদিক পরিচয়ে কেবল মুখ না খুললে শিতিই মনে হয়। হয়তো সে মুখ খুলবার আগেই হাসান আজিজুল হক অটোগ্রাফটি দিয়ে ফেলেছিলেন।
এই জাঢ্য জরদগব হাফ ইডিয়েট সাজ্জাদও নিজেকে বরুণের চেয়ে বেশী সফল মনে করে। কারণ তার দুটো গাড়ি রয়েছে, আলমারী ভরা সু্যট কোট, ব্যাংকে ইউরো। তার পৌঢ় বন্ধু উপাঙ্গ-র সঙ্গে সাজ্জাদ বরুণের উপন্যাস প্রকাশ না পাওয়া নিয়ে রগড় করে। কারণ উপাঙ্গ জার্মানীতে এসে টের পেল তার মধ্যে বাংলা সংগীতের এক বিরাট প্রতিভা লুকিয়ে আছে।
উপাঙ্গ রাতারাতি গায়ক বনে গেল। কলকাতা থেকে আসা ফ্রিলোডার অসহায় দরিদ্্রকবি-সাহিত্যিকদের বাসায় রেখে আলুর দম আর ঘি-ভাত খাইয়ে কলকাতার সাংস্কৃতিক মহলে একটা জায়গা করে নিল। উপাঙ্গ-র প্রকাশিত প্রথম সিডির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে হাজির হলেন স্বনাম ধন্য ব্যক্তিরা। যে উপাঙ্গ প্রতিটি ইউরো খরচ করে হিসেব করে, তাকে বিখ্যাত হবার ভূতে পাওয়ায় লাখ লাখ রুপি খরচ করে স্কচ এবং দেবযানীদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মহলের প্রবাদ পুরুষদের জমপেশ সিডি প্রকাশনা উৎসবে শামিল করলো। পেটে ফ্রিতে স্কচ পড়লে ক্রিটিকেরা আবেগপ্রবন হয়ে রিভিউ এর অঙ্গীকার করে ফেলে। উপাঙ্গের তখন সারা শরীরে শিহরণ, কে একজন সমালোচক টলতে টলতে এসে বলে-
- - - - - - - - - - - - দা-দা মাইরি বলছি
- - - - - - - - - - - - আপনার নৌকোখানি
- - - - - - - - - - - - বাংলা সংগীতের ঘাটে বাঁধা হয়ে গেছে।
- - - - সম্ভবত সে বলতে চেয়েছিল-
- - - - - - - - - - - - দা-দা মাইরি বলছি
- - - - - - - - - - - - আপনার গরুখানি
- - - - - - - - - - - - বাংলা সংগীতের গোয়ালে বাঁধা হয়ে গেছে।
---------------------------
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






