somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলায় ইসলামিক জ্ঞানের চর্চা কি কেবল ব্লগভিত্তিক?

০৯ ই জুলাই, ২০১২ রাত ১০:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিছুদিন আগের ঘটনা। কী একটা ইসলামিক টপিক নিয়ে যেন গুগলে বাংলায় সার্চ দিয়েছিলাম। তার মধ্যে প্রথম দশটি ফলাফলের মধ্যে ছয়/সাতটি আসলো বিভিন্ন ব্লগ ওয়েবসাইট থেকে। বাকি যে দু/একটা ছিল তার মধ্যে একটি পেলাম ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। অপরটি ছিল একটি পিউর ওয়েবসাইট। মানে এটা কোন ব্লগ ছিল না। যদিও এটা ছিল একটি অনলাইন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের পেজ।

আমি ব্লগ লেখালেখিতে খুব একট নিয়মিত না হলেও, মাঝে মাঝে ফেসবুক শেয়ারিং-এর কল্যাণে অনেক ব্লগই পড়ার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া একসময় আমি নাস্তিক নিধার্মিকদের নিকট জনপ্রিয় এক ওয়েবসাইটের নিয়মিত পাঠক ছিলাম। ব্লগে ইসলামকে নিয়ে সাধারণত তিনি ধরণের লেখক পাওয়া যায়:

১. ইসলাম বিদ্বেষী। ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান না রেখেই যারা ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজস্ব গবেষণা লব্ধ ধ্যান-ধারণা প্রচার করেন।
২. মাজহাব পন্থী। এরা মূলত শারী’আহ দ্বারা প্রমাণিত না এমন সব জিনিষ প্রমাণের প্রয়াসের মাধ্যমে নিজের মাজহাবকে তুলে ধরতেই ব্যস্ত থাকেন।
৩. চিন্তাশীল মুসলিম। এদের সংখ্যা খুবই কম। যারা প্রচলিত গণ্ডীর বাইরে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক বিষয় আলোচনার মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে ইসলামকে উপস্থাপন করেন। ইসলাম যে শুধু নামায, রোজা, দাঁড়ি, টুপি নয় এর পরিসর যে অত্যন্ত ব্যাপক তা এদের লেখায় ফুটে আসে। এদের আরেকটি যে জিনিস আমাকে আকর্ষণ করে তা হচ্ছে এরা সবাই কিছু পরিমাণে হলেও ইসলামকে সিস্টেমেটিক ওয়েতে শিখে আসে।

মূল প্রসঙ্গে আসি, ব্লগে যারা লেখালেখি করেন তারা মূলত আমার আপনার মতই। কোন বিশেষজ্ঞ না। হ্যাঁ কেউ কেউ কোন বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন। তবে ব্লগে বাঙ্গালী বা বাংলাদেশী ইসলামিক বিশেষজ্ঞের সংখ্যা নেই বললেই চলে।

আমরা যখন গুগলে বাংলায় ইসলামিক কোন বিষয় নিয়ে সার্চ দেই, তখন আমরা মূলত আমার লেখায় উল্লেখিত প্রথম দুই দলের কচলাকচলিই দেখতে পাই। ফলস্বরূপ আমরা সঠিক জ্ঞান থেকে হড়কে যাই। আর যেহেতু আমাদের নিজেদের ইসলামিক জ্ঞানও পরিপূর্ণ না, সুতরাং কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল অধিকাংশ সময়েই তা নির্ণয় করতে পারি না। শুধু ক্বুর'আন আরবীতে পড়তে জানা, কিংবা ক্বুর'আনের অনুবাদ জানা, কয়েকটি হাদীসের অর্থ জানা মানেই ইসলামকে জানা নয়। এসএসসি, এইচএসসিতে গণিতে এ+ পাওয়া মানেই সে কোন গণিতবিদ নয়।


ব্লগভিত্তিক না হয়ে এসব ইসলামিক টপিকের স্থান হওয়া উচিত ছিল বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যার মূল তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পিত হওয়া উচিত ছিল এমন একজনের যিনি প্রকৃত অর্থেই ইসলামকে সঠিকভাবে জানেন। যেমনটা আমরা ইংরেজি বেশকিছু নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে পাই।


ঈশ্বর কে? ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ কি? ইসলাম মানে কি? মসুলিম মানে কি? ইসলাম কি নতুন কোন ধর্ম? ক্বুর’আন কি ঈশ্বরের বাণী? ঈশ্বরের প্রকৃত ধর্ম আসলে কোন্‌টি? ঈশ্বর কি মানুষের রূপ ধারণ করতে পারেন? এ ধরণের অনেক ক্রিটিকাল প্রশ্নের উত্তরই বাংলায় পাওয়া যায় না।


সার্চ দিলে সেই “শাইখ গুগল” আমাদেরকে কিছু ব্লগের ফলাফল এনে হাজির করে, যার লেখক আমার আপনার মতই ইসলামিকভাবে অর্ধশিক্ষিত কিংবা মূর্খ। দু’একজন হয়তো আছেন যারা প্রকৃত অর্থেই ইসলাম শিখেছেন, তবে তাদের মূল পেশা ইসলামকে নিয়ে না। তারা পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফাঁকফোকরে ইসলাম সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের চিন্তাভাবনা শেয়ার করেন।


আমি বলছিনা যে ব্লগে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু অধিকাংশ তথ্যই ভিত্তিহীন, বানানো, ধার করা, কিংবা অন্ধবিশ্বাসের (আস্তিক নাস্তিক উভয় ক্ষেত্রেই) দোষে দুষ্ট।


আমার মতে বাংলায় ইসলামিক ওয়েবসাইটের অভাবের মূল কারণগুলো হচ্ছেঃ

১. আমাদের দেশীয় ‘আলিমদের প্রযুক্তি বিমুখতা কিংবা অজ্ঞতা। সময়ের সাথে নিজেদের আপডেট করতে ব্যর্থ হওয়া।

২. আমাদের দেশে ‘হুজুরের’ সংখ্যা অনেক হলেও এদের মধ্যে “প্রকৃত ঈমান” কিংবা “অথেন্টিক নলেজ” খুবই দুর্বল। যে নিজেই ঠিকমত জানে না, সে অন্যকে কি জানাবে!

৩. বাঙ্গালী ও বাংলাদেশী রিভার্টেড মসুলিমের হার খুবই নগণ্য। সাধারণত যারা অন্য ধর্ম থেকে পুনরায় ইসলামিক জীবন ব্যবস্থায় ফিরে আসেন তারাই ইসলাম প্রচার ও পালনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন।
বর্তমানে সহীহ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক আল-ক্বুর’আনের ইংরেজিতে যে অনুবাদ পাওয়া যায়, তার অনুবাদক একজন আমেরিকান বংশোদ্ভূত রিভার্টেড নারী— উম্ম মুহাম্মাদ।


বলাবাহুল্য ইসলামের প্রাথমিক যুগের সকল সহাবী (নাবীর সহচরগণ) সবাই অমুসলিম অবস্থা থেকে ইসলামের পরিচয় পেয়ে মুসলিম হয়েছিলেন। তারা তাদের বাপ-দাদাদের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে না রেখে নিজেরা সঠিকভাবে ইসলামকে জেনেছেন ও চর্চা করেছেন। তাদের ছাত্ররা এবং পরবর্তী প্রজন্মের যারাই সঠিকভাবে ইসলামকে জেনেছেন তারাই পরিপূর্ণভাবে এর চর্চা করেছেন, এবং বিভিন্ন অমুসলিম কর্তৃক উত্থাপিত চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নের লজিক এবং রিযন (logic and reason) ভিত্তিক উত্তর দিতে পেরেছিলেন।

বলাবাহুল্য বর্তমান সময়ের তুলনায় নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সময়ে ঈশ্বরকে নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা এবং জিঘাংসা সবচেয়ে বেশী ছিল। ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দিহান কিংবা মূর্তিপূজকদের অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। যেমন মূসা [(মোসেস) আলাইহিস সালাম] -এর সময়ে ফির'আউন একজন নাস্তিক ছিলেন। ইব্রহীম [(আব্রাহাম) আলাইহিস সালাম] -এর বাবা মূর্তিপূজক ছিলেন। নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সময়ে ঈশ্বরের সাথে অংশীদার সহযোগকারীদের ভিত্তি সবচেয়ে মজবুত ছিল। তথাপি তাঁরা সবাই তাঁদের প্রতি অবতীর্ণ ওয়াহীর (প্রত্যাদেশ) মাধ্যমেই সবার ভ্রান্ত এবং বিচ্যুত ধারণা দূর করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই ওয়াহীর প্রকৃত শিক্ষার চর্চা নেই বলেই মানুষের মনে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য এবং সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হচ্ছি।


এর থেকে সমাধানের উপায় কী?


আসলে উপায় বের করা সহজ। কিন্তু তা বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন। যারা বিভিন্ন জাতীয় (জাতীয় ভাবে আধুনিক ইসলামিক জ্ঞান চর্চার স্থানের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য) ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঠিকভাবে ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করছেন তাদের ওপরই মূল দায়িত্ব বর্তায়। ইসলামিক বিজ্ঞানের কিছু বিষয় খুবই সহজ (যেমন নামায, সিয়াম, দান ইত্যাদি) আবার কিছু বিষয় খুবই জটিল (ক্রয় বিক্রয়, ধার দেনার ক্ষেত্রে সুদের ব্যাপারটা। আদতে সুদের ধারণা সহজ মনে হলেও ইসলামিক ফিন্যান্স সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে সুদ ও মুনাফার ব্যাপারে মতিভ্রম হওয়া খুবই স্বাভাবিক) , কিছু আছে স্পর্শকাতর (যেমন জিহাদ কিংবা নারী সম্পর্কিত ব্যাপারগুলি, অমুসলিম, নাস্তিকদের প্রধান টার্গেট থাকে এধরণের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোই)।


ব্লগে এধরণের জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আংশিক সঠিক কিংবা ভ্রান্ত ধারণা পাওয়া গেলেও পরিপূর্ণ সঠিক জ্ঞান পাওয়া যায় না।


ব্যাপারটা অনেকটা অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে না যেয়ে কম্পাউন্ডারের কাছ থেকে চিকিৎসা নেয়া। হ্যাঁ কম্পাউন্ডার হয়তো সাধারণ রোগের ওষুধ দিতে সক্ষম। কিন্তু জটিল রোগের সমস্যা একজন যেন তেন ডাক্তারের কর্ম নয়। এখান থেকে একটা হাদীছ ওখান থেকে একটা ক্বুর’আনের আইয়াত দিয়ে ইসলামিক শারী’আহ ডিরাইভ করা হয় না। ইসলামিক প্রতিটা আদেশ নিষেধের পেছনে কিছু কারণ এবং যুক্তি থাকে। আমরা অনেকেই এগুলো সম্পর্কে সচেতন নই।

আশা করি ব্যাপারটা সবাই বুঝতে পারবেন, এবং যাদেরকে আল্লাহ এ সমস্যা সমাধান করার মত ক্ষমতা দিয়েছেন, তাঁরা তার সঠিক ব্যবহার করবেন।


ঈশ্বর আমাদের সঠিক জ্ঞান অর্জন করার, তা চর্চা করার ও প্রচার করার সামর্থ দিক।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×