somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হেলায় অবহেলায় রামাদানের হেতু

১৮ ই জুলাই, ২০১৪ বিকাল ৪:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতি বছর রামাদান আসে, রামাদান যায়। আমরা ঘটা করে সিয়াম পালন করি। সেহরি-ইফতার করি। একমাস নিয়ম মেনে যথাসম্ভব আদাব বজায় রেখে পার করি রামাদান। ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তো বটেই, এ মাসটাতে ধর্মপালনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সাধারণ মুসলিমরাও। সিয়াম তো পালন করলাম, কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন আমরা তা পালন করি? কী তার উদ্দেশ্য?

পৃথিবীতে কোনো কাজই আমরা উদ্দেশ্য ছাড়া করি না; হোক সে উদ্দেশ্য মহৎ কিংবা ক্ষুদ্র। আমি যে এ লেখাটা লিখছি, তার পেছনেও রয়েছে একটা উদ্দেশ্য। পড়া শেষ হলেই তা পরিষ্কার হবে পাঠকের সামনে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানুষ ও জিনকে যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি, তেমনি বিভিন্ন ইসলামিক বিধিবিধানগুলোও বিনা উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করেননি। রামাদানের সিয়ামের পেছনেও আছে উদ্দেশ্য, আছে প্রজ্ঞা। সেটা কী?

মহিমান্বিত কুর’আনে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন,
“হে বিশ্বাসীরা! তোমাদের ওপর সিয়াম পালনকে বাধ্যতামূলক করা হলো, যেমন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারাহ, ২:১৮৩)

কাজেই, সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন।

রোজা রাখা নিয়ে রামাদান মাসের আগে, রামাদানের মধ্যে আমরা অনেক বিষয়েই কথা বলি। সারাবিশ্বে একসাথে রোজা রাখা শুরু হবে কি না, তারাউঈহ ৮ রাকা‘আত না ২০ রাকা‘আত পড়ব ইত্যাদিসহ ফিকহি অন্যান্য মাসআলা নিয়ে আমরা অনেক আলোচনা করি। কিন্তু সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্যটা যেন অবহেলিতই থেকে যায়। এত কষ্ট করে সারাদিন পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থেকে যদি তাকওয়াই অর্জিত না হলো তাহলে সিয়ামের মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হলো।

এখন প্রশ্ন হলো তাকওয়া মানে কী?

এক কথায় তাকওয়ার মানে হচ্ছে আল্লাহর ব্যাপারে সদাসচেতন থাকা। আমাদের প্রতিটা কথা ও কাজের বেলায় নিজেদের মধ্যে এই সচেতনতা গড়ে তোলা যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন সবসময়। কাজেই আমি কী বলছি, কী করছি সে ব্যাপারে সতর্ক হবো। এমন কোনো কথা বলব না, বা এমন কোনো কাজ করব না যাতে করে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। বরং সেসব কাজই করব যা আল্লাহ ভালোবাসেন। এমন কথা বলব যা আল্লাহ পছন্দ করেন।

যারা এই গুণ অর্জন করতে পারেন, তাদের বলা হয় আল-মুত্তাকুন।

কুর’আনের শুরুতে আল্লাহ বলছেন,
“এটা সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই। এটা তাদের জন্য পথপ্রদর্শক যারা আল-মুত্তাকুন।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২)

তো তাকওয়া কীভাবে অর্জন করব?

উবাই বিন কা‘বকে ‘উমার ইবনুল-খাত্তাব তাকওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন উবাই বলেছিলেন, “আপনি কি কখনো দুর্গম কাঁটাযুক্ত পথে হেঁটেছেন?” ‘উমার বললেন, “হ্যাঁ।” উবাই জিজ্ঞেস করলেন, “তখন আপনি কী করেছিলেন?” তিনি বললেন, “কাপড় ও শরীরকে কাঁটা থেকে রক্ষা করার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করেছি।” উবাই বললেন, “এটাই তাকওয়া।” (তাফসীর ইব্‌ন কাসীর)

আমাদের চলার পথেও ছড়িয়ে আছে এরকম অগণিত সূঁচালো কাঁটা। ছড়িয়ে আছে নানা প্রলোভন আর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হাতছানি। কাঁটা ও কাদাযুক্ত পথে আমরা যেভাবে সাবধানে চলি, কাঁটাগুলোকে এড়িয়ে চলি, কাদাপানি এড়িয়ে চলি,
সেভাবে চললেই আমরা অর্জন করতে পারব তাকওয়া। আর সেজন্য রামাদানের চেয়ে উত্তম সময় আর কী হতে পারে?

আমরা যতক্ষণ রোজা রাখি ততক্ষণ কিন্তু পানাহারের মতো হালাল জিনিসগুলো থেকেও আমরা নিজেদের বিরত রাখি। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে যখন রকমারি খাবারের পদ আমাদের সামনে সুন্দর করে সাজানো থাকে, প্রচণ্ড খিদে থাকা সত্তেও আমরা তা মুখে তুলি না। আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি। সময় না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এটা আমাদের জন্য একটা প্রশিক্ষণ। তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ।

রামাদান মাসের দিনে যদি আমরা এভাবে হালাল জিনিসগুলো থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে পারি, তাহলে রামাদান মাসের রাতে এবং রামাদান পরবর্তী এগারো মাস আমরা কেন নিজেদেরকে হারাম ও অপরাধমূলক কাজগুলো থেকে এড়িয়ে চলতে পারব না? সিয়াম পালন করার মাধ্যমে এই শিক্ষাই তো নেওয়ার কথা আমাদের। আমরা যদি সেটা করতে পারি তাহলেই অর্জিত হবে তাকওয়া। আর তা নাহলে কেবল সারাদিন উপোস থাকার মধ্যেই আটকে থাকবে আমাদের সিয়াম। অর্জিত হবে না তাকওয়া। ব্যহত হবে সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তা‘আলা মহাজ্ঞানী। তিনি ভালো করেই জানেন, সারাবছর পার্থিব বিভিন্ন কাজে মশগুল থেকে আমরা একটু একটু করে সরে যেতে থাকি ধর্মীয় বিধান পালন করা থেকে। আর তাই তো প্রতিবছর একমাস সিয়াম পালনের মাধ্যমে আমরা যাতে পুনরায় নিজেদের তরতাজা করতে পারি, শিখতে পারি আত্ম-নিয়ন্ত্রণের কৌশল, অর্জন করতে পারি তাকওয়া—সে জন্যই তিনি এই বিধান দিয়েছেন।

সাধারণত প্রশিক্ষণের সময় অনেক ব্যাপারেই থাকে শিথিলতা। এই যেমন রামাদানে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয় শয়তানকে। রামাদান মাস তাই নিজেদের প্রস্তুত করার মাস। আগত এগারো মাসের কঠিন সংগ্রামে আমরা যেন খেই হারিয়ে না ফেলি, তাকওয়ার ঢাল দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারি সে জন্য রামাদান চমৎকার এক সময়।

তাই আসুন, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে পূরণ করি সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্য। তৈরি হই কাঁটাযুক্ত পথ পাড়ি দেওয়ার দুর্বার সংগ্রামে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×