ইউনিভার্সিটির হলে থাকার সময় এক বন্ধুর কাছ থেকে কয়েকটি মুভি আনতে গেলাম। সাদাকালো আর নির্বাক ছবি বলে যেটাকে সবার আগে এড়িয়ে গেলাম বন্ধু সেটাই জোর করে দিয়ে দিল আর মাত্র ১০ মিনিট দেখার অনুরোধ করল। সেই শুরু ছবিটা এই পর্যন্ত অনেকবার দেখা হয়েছে আজ আবারও দেখলাম। মন খারাপ হলেই এই ছবি দেখিটি দেখি এই ছবির প্রচণ্ড হাসি আর প্রেমের অভিনয় মনটাকে আনন্দে ভরিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। আর এই ছবিটি হল অসাধারণ চমৎকার গল্পের চার্লি চ্যাপলিনের “সিটি লাইট”।
সিটি লাইট ১৯৩১ সালে নির্মিত একটি নির্বাক হাস্যরসাত্মক প্রেমের ছবি। এই ছবিটি চার্লি চ্যাপলিন কাহিনী লেখা, পরিচালনা, প্রযোজনায় নির্মিত। প্রায় সপ্ত-যুগ আগে নির্মিত এই ছবিটা এখনো তুমুল ভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে তার জনপ্রিয়তা বজায় রেখে চলেছে। এটি কমেডি-রোমান্টিক ছবির ক্যাটাগরিতে আজো এক নম্বর স্থান দখল করে আছে।
কাহিনী সংক্ষেপ:
একটি ভাস্কর্য উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ভাস্কর্যের উন্মোচন করার পর দেখা যায় এক ভবঘুরে সেখানে শুয়ে আছে। পুলিশের তাড়া খেয়ে সে পালায় এবং এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের দেখা পায় যে রাস্তার পাশে ফুল বিক্রি করছিল। সে তার পকেটের শেষ পয়সাটা দিয়ে ফুল কিনতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফুলের চেয়েও অনেক বেশী সুন্দর এই ফুল বিক্রেতা মেয়েটি অন্ধ। ভবঘুরে সারাদিন মেয়েটির পাশে বসে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত-না মেয়েটি ফুল বিক্রি শেষ করে বাসায় চলে যায়। সন্ধ্যায় মেয়েটি চলে যাবার পর সে মেয়েটির কাছ থেকে কিনা ফুলটি নিয়ে এক ঘাটে বসে থাকে। এক অদ্ভুত মাতাল লোক আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নিজেকে ডুবিয়ে মারার জন্য পাথর আর রশি নিয়ে সেই ঘাটে এসে হাজির হয় ভবঘুরে তাকে বাঁচায়। মাতাল লোকটি আসলে অনেক বড়লোক এবং সে তার জীবন বাঁচানোয় ভবঘুরে লোকটাকে তার বন্ধু বানিয়ে তার প্রসাদে নিয়ে যায় ও মদ্যপান করে বন্ধুত্ব উৎযাপন করে। এই নতুন বন্ধুত্ব উৎযাপনের আনন্দ উৎসব চলে নাইট ক্লাব পর্যন্ত। সকালে ভবঘুরের মাতাল বন্ধু তাকে গাড়ি চড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়।
ভবঘুরে হটাত দেখতে পায় গতকালের সেই অন্ধ রূপসীকে যে ফুল বিক্রি করতে যাচ্ছে এবং তাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বড়লোক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা এনে মেয়েটির সব ফুল কিনে নেয় এমনকি বন্ধুর গাড়ি দিয়ে মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। মেয়েটি অন্ধ বলে ভবঘুরের জীর্ণ পোশাক আর হত-দরিদ্র চেহারা দেখতে পায়না আর সাহায্য ও গাড়ির জন্য মনে করে এক বড়লোক তাকে সাহায্য করছে । ভবঘুরে গাড়ি নিয়ে আবার বড়লোক বন্ধুর কাছে গেলে সে আর তাকে চিনতে পারেনা কারণ তার নেশার ঘোর কেটে গেছে।
ভবঘুরের অন্ধ ফুল-বিক্রেতা মেয়েটির বাড়ি গিয়ে দেখে সে অসুস্থ তাকে দ্রুত সাহায্য করার জন্য সে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ নেয় । রাস্তা পরিষ্কার করে সেই টাকা দিয়ে মেয়েটির জন্য অনেক উপহার ও খাবার কিনে নিয়ে যায়। সে মেয়েটিকে এক ডাক্তারের কথা বলে যেখানে অনেক টাকা দিয়ে অপারেশন করে চোখের চিকিৎসা করানো যায় এবং তাকে কথা দেয় মেয়েটির চোখ ভাল কারার অপারেশনের সব টাকা সে দিবে। এদিকে বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করার নোটিশ শোনে টাকার চিন্তায় অস্থির মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পরে। ভবঘুরে ছেলেটি এই ভাড়া পরিশোধেরও আশ্বাস দেয়। এমন ভালবাসা, সাহায্য ও আচরণে মেয়েটিও ছেলেটির প্রেমে পরে যায় হাতে ধরে ও হাতে চুম্বন করে। কিন্তু পরেরদিন কাজে দেরিতে আসায় ছেলেটির চাকরিটি চলে যায়। চাকরি হারিয়ে সে এক ধান্ধাবাজের সাথে বক্সিঙয়ের টাকা ভাগাভাগি করার পরিকল্পনা করে। কিন্তু প্রতিযোগী পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় সে হেরে যায় টাকা ও পায় না।
রাস্তায় হটাত আবার সেই ইউরোপ ফেরত বড়লোক মাতাল বন্ধুর তাকে দেখে চিনে ফেলেও তাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায় কিন্তু মন খারাপ দেখে মেয়েটিকে সাহায্য করার জন্য তাকে অনেক টাকা দেয়। কিন্তু সেই বাড়িতে আগে থেকেই দুই চোর ঢুকে ছিল এবং তারা বড়লোকটিকে আহত ও অজ্ঞান করে পালিয়ে যায়। পুলিশ এসে তাকেই সন্দেহ করে ও তার কাছে টাকা পাওয়ায় তাকে আটক করে । বন্ধু তাকে টাকা দিয়েছে বললেও মাতাল বন্ধুর জ্ঞান ফিরে নেশা কেটে যাওয়ায় তাকে চিনতে না পেরে অস্বীকার করে। পুলিশ তাকে জেলে নিয়ে যেতে চাইলে সে কৌশলে টাকা সহ পালায় এবং মেয়েটিকে তার বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও দোকান করার জন্য সব টাকা দিয়ে দেয়। মেয়েটি খুব খুশি হয় কিন্তু ভবঘুরে পুলিশের হাতে ধরা পরে জেলে যায়।
অন্ধ মেয়েটি তার টাকা পেয়ে চক্ষু অপারেশন করে সুস্থ হয়। সে এখন চোখে দেখতে পায় এবং ফুলের একটি বড় দোকান দেয় আর প্রতিদিন অপেক্ষা করতে থাকে তার ভালবাসার মানুষটির জন্য দিনের পর দিন। একটি গাড়ি তার দোকানে এসে থামলেই সে ভাবে এই বুজি সে এলো কারণ সে জানত তাকে যে সাহায্য ও ভালবেসেছিল সে গাড়ির মালিক ও বড়লোক। কিন্তু ভালবাসার মানুষ ভবঘুরে তখন টাকা চুরির অপরাধে জেল খাটছে। একদিন জেল থেকে মুক্তি পায়, মেয়েটি যেখানে ফুল বিক্রি করত সেই রাস্তার ধারে গিয়ে তাকে খুঁজে কিন্তু পায় না। হাটতে হাটতে অজান্তে মেয়েটির সেই ফুলের দোকানের সামনে আসে তার ছিন্ন পোশাক আরও বেশী ছিন্ন চেহারায় আরও হত-দরিদ্রের ছাপ, রাস্তার ছেলেরা পাগল মনে করে বিরক্ত করেও ঢিল ছুড়ে। দোকানের মেয়েটি ও তার দাদী তা দেখে হাসে। হটাত মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে ভবঘুরে ছেলেটি চিনতে পেরে থমকে দাঁড়ায় মেয়েটি তাকে ভিক্ষা দেবার জন্য একটি কয়েন এগিয়ে দেয় সে সরে যায় মেয়েটি ফুল এগিয়ে দিলে সে কাছে যায়। হাতে ফুল গুজে দিতে মেয়েটি গিয়ে সেই মানুষটির হাতের স্পর্শের অনুভূতি পায় যার জন্য সে অপেক্ষা করছে বহুদিন ধরে। চিনতে পারে এই তার সেই ভালবাসার মানুষ। ভালবাসার মিলন হয়। প্রচণ্ড হাসির এই ছবির শেষ দৃশ্যে চোখে কিন্তু ঠিকিই পানি এসে যায়।
এক নজরে “সিটি লাইট”
মুক্তি প্রাপ্ত: মার্চ ৭, ১৯৩১
সময় স্থায়িতঃ ৮৭ মিনিট
মূল অভিনেতা/অভিনেত্রী:
চার্লি চ্যাপলিন (ভবঘুরে)
ভার্জিনিয়া চিরিল (অন্ধ বালিকা)
হ্যারি মেয়ার্স (মাতাল বড়লোক)
কাহিনী রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনা: চার্লি চ্যাপলিন
ইউটিউব লিংক:
পার্ট ১
পার্ট ২
পার্ট ৩
পার্ট ৪
পার্ট ৫
পার্ট ৬
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



