somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাউল আব্দুল মজিদ তালুকদার

১১ ই অক্টোবর, ২০১৬ সকাল ৮:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাউল আব্দুল মজিদ তালুকদার (১৫ জানু ১৮৯৮- ৮ জুন ১৯৮৮) (ইটাউতা ,দলপা ইউনিয়ন, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা), তিনি ছিলেন মরমী বাউল শিল্পী, গীতিকবি ও সুরকার। তিনি ১৯৪২ সালে প্রথম অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তালিকাভুক্ত হন। তখনকার সময়ে পূর্ব বাংলার ৪ জন শিল্পীর মধ্যে আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন ১ জন। জন্ম ও পরিবার : তার জন্ম ১৮৯৮ সালের ১৫ জানুয়ারী নেত্রকোনা জেলার কেন্দূয়া উপজেলার দলপা ইউনিয়নের ইটাউতা গ্রামে এক সভ্রানত মুসলিম পরিবারে ৷তাঁর পিতা মরহুম হাজী মোঃ আমছর তালুকদার ও মাতা মঘলের মা ৷ তিনি বিবাহিত ছিলেন। তাঁদের ৪ ছেলে ৩ মেয়ে। তাঁর ছেলে আবুল বাশার তালুকদার একজন গীতি কবি ও কণ্ঠ শিল্পী। তিনি রেডিও-টিভির তালিকা ভুক্ত নিয়মিত শিল্পী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : তিনি মাদ্রাসায় ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন এবং ঐ সময়ে মসজিদে আযান দিতেন।

তাঁর মধুর কন্ঠে আযান শুনে সকলেই মুগ্ধ হতেন। তাঁর মাদ্রাসার প্রধান তাঁর মধুর কন্ঠের প্রশংসা করতে গিয়ে মন্তব্য করেচেলিনে, “মজিদ যদি গান গায় তবে সারাজীবন গানের ভুবনে অমর হয়ে থাকবে।” পরে একদিন সত্যি তিনি মাদ্রাসা ছেড়ে যোগদেন গ্রাম্য গানের দলে, সেখানে অন্যদের সাথে তিনিও গান গাইতেন ।তিনি পুনরায় নেত্রকোনা চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ও সেখান থেকে এসএসসি পাশ করেন। গান চর্চা : তখনকার সময়ে কেন্দুয়ার মরমী কবি জালাল উদ্দিন খাঁর (১৮৯৪-১৯৭২) বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর হত, সেখানে বালক আব্দুল মজিদ এর ছিল অবাধ যাতায়াত। গ্রামে অনুষ্ঠিত পালাগানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নিয়মিত যাওয়া-আসা করতো। প্রথম জীবনে আব্দুল মজিদ লেঠুর দলে রাধা-কৃষ্ণের অভিনয় ও গান করেন। সেদিন থেকেই গানের যাত্রা শুরু হয় এবং উদাসী ভাবের জন্ম নেয়।তাঁর গান পাটেশ্বরী নদীর কুল কুল স্রোতে ধ্বনিত হয়ে সমবেত জনতার হৃদয় হরণ করে নিয়েছিল। অবশ্য তাঁর পরিবার ছিল গানের ঘোর বিরোধী কারন তাঁর পিতা ছিলেন হাজী। পরিবারের সকল বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি গানকে করে নেন আপন সঙ্গী।নিজের বাড়িতে বৈরী অবস্থার কারণে বিভিন্ন জায়গায় রাতে গান করে, দিনের বেলায় বিভিন্ন জনের বাড়িতে অবস্থান করে বিশ্রাম নিতেন। এভাবেই চলতে থাকে গানের জীবন । প্রথম জীবনে দলপা গ্রামের বাউল সাধক গোবর দনের কাছেই গানের হাতে কড়ি ৷পরে ওস্তাদ জালাল উদ্দিন , রশিদ উদ্দিন ও কবি জসিম উদ্দিনের কাছে তালিম নেন ৷শিল্পী ষোল বছর বয়সে প্রথম বায়াত হন পীরে কামেল সৈয়দ আব্দুল্লাহর কাছে ৷তাঁর ইন্তেকালের পর পঁচিশ বছর বয়সে বায়াত হন মৌলানা আব্দুল কুদ্দুছ হাওলাপুরীর কাছে ৷তাঁর ইন্তেকালের পর ৫৫ বছর বয়সে বায়াত হন শেরে মস্তানের কাছে ৷

পীর মুর্শিদের কাছে আধ্যাতিক বিষয় বস্তু শুনে দিওয়ানা হালে স্বপনে রূহানি ছুরতে পীরকামেলদের আদেশ মোতাবেক খাজা বাবার পবিত্র রুহি দরবার শরীফ স্থাপন করেন নিজ বাড়ীতে এবং প্রতি বছর ওরশ শরীফ পালন করতে থাকেন ৷তাঁর পীরকেবলা মৌলানা আব্দুল কুদ্দুছ হাওলাপুরী সাহেব ভক্ত আব্দুল মজিদ কে বললেন-‘তুমি আমার কাছে কি চাও ?’ আব্দুল মজিদ বললেন , ‘ আমি গান গাইতে চাই’ ৷পীর সাহেব বললেন ‘হা কর’ ও আব্দুল মজিদের মুখে একটা ফুঁ দিয়ে বললেন -‘যাও’ ৷ তখন থেকে আল্লাহর রহমতে তাঁর আর পিছনে তাকাতে হয়নি৷তাঁর গানের সুনাম চারদিকে দেশ বিদেশে প্রচার হতে থাকে ৷ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান গেয়ে সুনাম অর্জন করতে থাকেন। এমন অবস্থায় নেত্রকোনা মহকুমা সদরে এক গানের অনুষ্ঠানে এসডিও সাহেব প্রধান অতিথী ছিলেন এবং তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ভূয়সী প্রসংশা করেন এবং তাঁর বিস্তারিত জেনে এসডিও সাহেব এর বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং সেখানে থেকেই তিনি গান করতেন আর এসডিও সাহেব এর দুই মেয়েকে গান শিখাতেন। তিনি ১৯৪২ সালে প্রথম অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তালিকাভুক্ত হন। তখনকার সময়ে পূর্ব বাংলার ৪ জন শিল্পীর মধ্যে আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন ১ জন। তিনি বাউল আব্দুল করিম সহ দেশের খ্যাতনামা অনেক শিল্পীর সাথে পালা গান করেছেন। আব্দুল মজিদ একতারা বাজিয়ে গান করা শুরু করলেও পরবর্তীতে বেহালা, দু-তারা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদান : স্বাধীনতা উত্তর ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন সমাবেশে তিনি স্ব-রচিত দূটি গান গেয়ে সবার কাছে প্রসংসিত হয়েছিলেন , গান দুটি হলো ১. ঐ দেখ কে যায়রে মজিব, নিশান টাংগাইয়া নাও বাইয়া——– এবং ২. রঙিন কাষ্ঠের রঙিন নাও রঙিন নায়ের ছইয়া , বঙ্গবন্ধূ হাল ধইরাছেন নায়ের পাছায় বইয়ারে ——— ৷এই সব গান শুনে বঙ্গবন্ধু নিজেও শিল্পীকে ভূয়সী প্রশংসা করেন।তখন তিনি মুজিবকোট পরতেন। তিনি স্বাধীনতা যূদ্ধে জীবন এর উপর ঝুঁকি নিয়ে গান গেয়ে মূক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন। জীবনাবসান: এই মহান শিল্পী ১৯৮৮ সালের ৮ ই জুন অসুস্থ অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

প্রকাশিত গ্রন্থ: তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭ টি। ‘শেষ নবী’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর কিছু বিখ্যাত গান: তিনি প্রায় দুই হাজার গান লিখেছেন।আব্দুল আলিম তাঁর ১২ টি গান গেয়েছেন, নিনা হামিদ , মিনাবড়ূয়া , রহমান বয়াতী, মোস্তুফা জামান আব্বাছী , হাজেরা বিবি, আবুল বাসার তালুকদার সহ অসংখ্য শিল্পী তাঁর লেখা গান গেয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গান হলো- ১. আরে ও ভারতবাসি ভাই, কলের লাংগল নিমের জোয়াল, চল মাঠে চল হাল বাইতে যাই ৷(সর্ব ভারতীয় কৃষক সম্মেলনে স্বরচিত এই গানটি গেয়ে তিনি গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন ) ২.ঐ দেখ কে যায়রে মজিব, নিশান টাংগাইয়া নাও বাইয়া ৷ ৩. রঙিন কাষ্ঠের রঙিন নাও রঙিন নায়ের ছইয়া , বঙ্গবন্ধূ হাল ধইরাছেন নায়ের পাছায় বইয়ারে ৷ (১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনের বিভিন্ন সমাবেশে তিনি স্ব-রচিত এই দূটি গান গেয়ে সবার কাছে প্রসংসিত হয়েছিলেন ) ৪.হীরামন মানিকির দেশে আমার মূর্শিদ অছে ৷৷ সাতসমুদুর পাড়ি দিয়া কেমনে যাই তার কাছে ৷৷ সাত সমুদ্দূর তের নদী পাড় হইতে পারি যদি আমি দেখব সেই রূপনিরবধি যদ্দিন পরান বাঁচে ৷৷ ৫.হরদমে রাছুলের নাম বল দিন গেল. হরদমে রাছূলের নাম বল ৷৷ মোহাম্দমোসতুফা নবী নুরের কায়া নূরে

লেখক : আমিরুল ইসলাম:
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৬ সকাল ৮:১৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×