কবিতা আমার মনের কোঠায়
আমি একটা উপন্যাস পড়ছি । মোড়ের মাথার সাইবার কাফেতে রফিক সকাল বিকাল নিয়ম করিয়া যায় কমপিউটারে টাইপিং স্পিড বাড়ানোর অনুশীলণে । চাকুরির পরীক্ষায় যা যা আসে সেগুলি পাঠ করে নিয়মিত , ঘড়ি ধরিয়া । যত পড়ে ততোই উদ্যম বাড়ে । একটা আত্মবিশ্বাস গড়িয়া ওঠে । চাকুরি সে পাইবেই । নুতন নুতন উদ্যমে সে প্রতিদিন নুতন করিয়া বাঁচিবার রসদ পায় । ভবিষ্যতের এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাধনায় রফিক অবিচল , কিছুতেই তাকে থামানো যাইবে না
থামাও তোমার রফিককে । কে তোমাকে এই সাহিত্যবাসরে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ? আস্তো একখানা ঊপন্যাস নিয়ে এসেছো এই পাঁচ মিনিটে গেলানোর জন্য ? নাকি জানোইনা তোমার জন্য সময় বরাদ্দ মাত্র পাঁচ মিনিট ; গুটোও তোমার জাবেদা খাতা । তার চেয়ে বরং একটা কবিতা টবিতা কিছু পড়ো ।
কবিতা ? কবিতা তো আমি লিখিনা , মানে আমার কথা আমার ভাবনা ভাব গতিক ঠিক কবিতায় আমি ধরতে পারিনা । উপন্যাসই আমি লিখি । তা না হলে বড়ো জোর বড়ো গল্প লিখি , নইলে আমার মাথার এলোমেলো চিন্তাগুলো ছবির মতো সাজে না , সাজানো যায় না । উপন্যস আর বড়ো গল্প , এই দুটোই শুধু আমি লিখতে পারি ।
বড়ো গল্প ? কত বড়ো ? মানে ক'পাতার ?
ধরুন না কেন বিশ তিরিশ পাতা ।
তিরিশ পাতা , ছাপা , না পান্ডুলিপির ?
পান্ডুলিপির , মানে ছাপা তো হয়নি একটাও ,লিখেছি লিখেই গেছি । গল্পগুলো তিরিশ -চল্লিশ পাতার আর উপন্যাস গুলো ? তা মোটামুটি এক খাতা ।
এক খাতা ? এটাএকটা হিসেব হোলো ? বলি ক;পাতার খাতা ? ক' নম্বর খাতা ?
তা তো জানা নেই , মানে অতোশতো দেখিনা তো , রফিক যার সাইবার কাফেতে যায় তারই একটা স্টেশনারি দোকানও আছে , টাইপিং-এর ফাঁকে ওখান থেকেই এটা সেটা কিনি আমি ।।
রফিক তো বললে তোমার উপন্যাসের চরিত্র , তাই না ? তুমি বাস্তবে কি করে রফিকের সাইবার কাফের মালিকের স্টেশনারি দোকানে যাবে ? আর শোনো বাপু , এটা কোনো উপন্যাস টুপন্যাস পড়ার জায়গা নয় । কবিতাও লিখতে পারোনা , তাহলে কি করবে তুমি এখন ?
তাহলে আমার মনের কথাগুলো এমনিই বলে যাই ?
বলো , বলতে পারো তবে খুব সংক্ষেপে , অতি সংক্ষেপে ,মানে সংক্ষেপের সংক্ষেপ , ওই ইংরাজিতে যাকে বলে প্রেসির সামারি ।
প্রেসির সামারি ? তাহলে দু নিঃশ্বাসে বলে দিই ?
বাবা মারা যাবার আগে .... । মানে বাবা ভারী অসুখে ভুগছিলেন , তবুও জমি তিনটে বিক্রি করলেন না , মাকে বোঝালেন , ডাক্তার তো বলছে এ রোগে বাঁচার আশা খুব কম । টাকা লাগবে কাঁড়ি কাড়ি । আরামের গ্যারেন্টি নেই ।জমিবিক্রি করবো না । কিছুতেই না । জমি তিনটে বিক্রি করলে বাবা মা খাবে কি ! তুমি খাবে কি / সংসার চালাবে কি করে ? খোকার পড়াশুনা চালাবে কি করে ? মেয়ে দুটোর বিয়ে দিতে হবে না ?
বাবা মারা গেলেন । টাকার অভাবে । চিকিৎসা ঠিকঠাক হলে বাঁচতোই , আমরা সবাই জানতাম । বাবা মারা গেলেন , তবুও জমি বেচলেন না , অথচ সে জমিই বেচতে হোলো দিদিদের বিয়ের জন্য । কতো সুন্দর সুন্দর সেই জমির নাম । বৈঁচি তলা , কুসুম পুকুর , ঊনো বীজ ! নামগুলোতেই কতো মায়া , তাই না ? মা একা একা থাকলেই কাঁদতো । আচ্ছা মা কাঁদতো কেন ? মা তো জমি গুলো কখনো দেখেই নি । জানেন জমি হোল চাষি ঘরের একটা মায়া । শুনেছি ঐ আবেগে নাকি যুগ যুগের জগদ্দল সাম্রাজ্যও তাসের ঘরের মতো ধ্বংস হয়ে যায় , বালির বাঁধ দিয়েও তাকে আটকানো যায় না ।
শোনো ! এটা কি হচ্ছে ? এখানে রাজনীতিটা কি না করলেই নয় ? দেখো বাপু তুমি কবিতা যদি এনে থাকো তো পড়ো নইলে মান থাকতে থাকতে বিদেয় হও ।
জানেন কবিতা আমিও লিখেছিলাম । আমার কলেজ জীবনে । মানে ফার্স্ট ঈয়ারে যখন পড়তাম । বাকি টা পড়া হয়নি ।
ওকে দেখেছিলাম লাইব্রেরীতে । আমি যে বইটা খুঁজছিলাম সেটা ছিলো ওর হাতে । পড়ছিলো । আমি বুঝতে পারছিলাম না ও নেবে নাকি ফেরৎ দেবে । যদি ফেরৎ দেয় আমি নেবো । বইটা ও ফেরৎ দিয়েছিলো । আমি নিয়ে বাইরে আসতে লক্ষ্য করেছিলাম ও তখনও দাঁড়িয়ে ছিলো , কার জন্য অপেক্ষা করছিলো ?
আমি অবাক হয়ে যেতাম যখন দেখতাম ও আমার জন্যই অপেক্ষা করে । ওর অল্টো এসে গেলেও ও বাড়ি যেতে চায় না । ড্রাইভারকে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়েই রাখে । সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে , অধৈর্য হয় । আমি বাসে উঠে লক্ষ্য করতাম বাস ছাড়ার পরেও ও আমার নিরাপদ যাত্রা যতটা পারে দেখে তবেই কারে উঠতো ।
ওর জন্যই কবিতা লিখেছিলাম ।
ওঃ ! এতোক্ষণ তাহলে কেন ভ্যানতাড়া কেন করছিলে ? তোমার সেই প্রেমের কবিতাটাই শোনাও । অবশ্য তোমার পাঁচ মিনিট অনেক ক্ষণ আগেই শেষ হয়ে গেছে ।তবুও প্রেমের কবিতা হলে শুনতে আমাদের আপত্তি নেই ।
সে কবিতা টা । সেতো এখন একটা কাব্য । সেই কবিতাকে আমি এ্যাতো দিন লালন করেছি । আমি পালন করেছি ।একটু একটু করে তাকে গড়েছি । ভেঙেছি । সযত্নে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছি । সে কবিতা তো এই জন সমাগমে প্রকাশ করা যায়না । সে যে আমার একান্ত নিজস্ব । আমার গভীর গোপনীয় । আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে পড়ি । পড়ে কাঁদি , কেঁদে দুঃখ ভুলি । ওই কবিতা যে আমার সকল দুখের সান্ত্বনা । তাকে তো আমি বাজারে দেখাতে পারি না । সে কবিতা শুধু আমার নিজের , আমাদের নিজের । আমি জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি । যেদিন তার অবসর হবে সেদিন তাকে শোনাবো ।
আমার এ কবিতা শুধু ওরই জন্য ........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

