২ দিন হল রিমার বিয়ের।অথচ এই সময়ে কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল চারপাশে।বিয়ের পরদিন সকালেই গলির মোড়ে একটা লাশ পাওয়া গেল।এমনিতেই মনের অবস্থা বিশেষ একটা ভালো না।তার উপর এ ধরনের ঘটনা এই বিয়ে বাড়ির পরিবেশটাও কেমন যেন গুমোট করে তুলেছে।আজ আবার বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান।যাক,দুটো দিন সেই পুরনো জীবনে ফিরে যাওয়া যাবে।এসব কথা ভাবতে ভাবতেই পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালো সে।আজকাল পত্রিকা পড়াই বিরক্তিকর হয়ে গেছে।আসল খবরের চেয়ে বিজ্ঞাপনই বেশি।শেষ পাতায় এসেই একটি খবরে চোখ আটকে গেল তার।শিরোনাম “গভীর রাতে ছাত্রনেতা খুন”।পাশেই একটা ছবি। নীল চাদরে ঢাকা লাশ।সেই নীল চাদরটা...।কাঁপা কাঁপা হাতে পত্রিকাটা চোখের সামনে ধরল ভাল করে।এক নিঃশ্বাসে পুরো খবরটা পড়ে ফেলল।যা ভেবেছিল তাই।বিশ্বাস হচ্ছেনা এখনো।তার পৃথিবীটা যেন দুলছে।যে চেয়ারটাতে বসে ছিল ঠিক সেখানেই ঠায় বসে রইল কিছুক্ষণ।
সেই প্রথম দিন থেকেই ছেলেটা একটু কেমন যেন।ঠিক নিজের মধ্যে থাকতনা।বন্ধুমহলের বাইরে খুব একটা কারো সাথে মিশতও না।শুধু এটুকুই খেয়াল করেছিল রিমা।ছেলেদের প্রতি তার তেমন আগ্রহ নেই।সে ছিল নিজের মত করেই।বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিত,ক্যাম্পাসের এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করত।ভালই চলছিল দিনগুলি।এর মধ্যেই একদিন ওই ছেলেটা তাকে প্রেম নিবেদন করে বসল।কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ এই ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেল সে।তখনই কিছু না বলে পরে ভেবে দেখবে বলে জানিয়ে দিল।ছেলেটাও আর জোর করেনি।তারপর কয়েকদিন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবল সে।কাছের বান্ধবীদের সাথে শলা পরামর্শ করে শেষ পর্যন্ত প্রেমের ব্যাপারে রাজি হয়ে গেল।কারন ছেলে হিসেবে নাহিদ আসলেই ভাল।তাকে ফিরিয়ে দেয়ার কোন কারণও নেই।আর প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হওয়া মানেই তো আর সারাজীবনের জন্য তাকে আপন করে নেয়া নয়।এমনও মূহুর্ত আসতে পারে যে নাহিদ নিজেই সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিবে।এখনকার দিনে যা হয় আর কি।তারপর যদি ভালোভাবে সবকিছু চলে তাহলে উপযুক্ত সময়ে সব কথা পরিবারে জানিয়ে দেয়া হবে।আপাতত এতসব ভেবেই শেষ পর্যন্ত নাহিদকে হ্যা বলে দিল।এর মধ্যে কোন নাটকীয়তা ছিলনা।আবেগের আতিশায্য ছিলনা দু পক্ষের।তবে নাহিদের চোখের দিকে তাকালেই বুঝা যেত কী পরিমাণ খুশি হয়েছিল সে।এরপর থেকে আর কোনদিনই কেউ কাউকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবেনি।তাদের জুটিটা সত্যিকারভাবেই খুব সুন্দর ছিল।দুজনের মাঝে বোঝাপড়া ছিল চমৎকার।একবার নাহিদকে ঈর্ষান্বিত করতে রিমা তার এক ছেলেবন্ধুর সাথে অনেক্ষণ হেসে হেসে কথা বলল,নাহিদের সামনেই।বন্ধুটিকে বিদায় দিয়ে যখন নাহিদকে প্রশ্ন করল যে সে রাগ করেছে কিনা।নাহিদ অবাক হল।বলল এখানে রাগ করার কি আছে?
না মানে আমি এতক্ষণ তোমার সামনে ওর সাথে এত কথা বললাম,তাতে তোমার একটুও খারাপ লাগেনি? সন্দেহ জাগেনি মনে?
আরে না।তোমাকে সন্দেহ করব কেন?আমি তো জানি তুমি এমন না।এটুকু বিশ্বাস অন্তত তোমার উপর আছে।নাহিদের নির্লিপ্ত জবাব।
তারপর আর কোনদিন এসব বিষয় তাদের মধ্যে আলোচিত হয়নি।নিয়মিতই চলছিল ফুচকা খাওয়া,ঘুরতে যাওয়া আর পড়ালেখা।
তার মাঝে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল নাহিদের সাথে।ইউনিভার্সিটির কিছু ছাত্রনেতা নামধারী গুণ্ডারা এক মেয়েকে উত্যক্ত করছিল।নাহিদ প্রতিবাদ করল।এটাই কাল হল তার জন্যে।মার তো জুটলই,সেই সাথে চলল অকথ্য ভাষায় গালাগাল।ক্যাম্পাসের মানুষগুলো যেন স্রেফ তামাশা দেখার জন্যই জড়ো হয়েছিল।রিমা সেদিন ক্যাম্পাসে যায়নি।পরে ঘটনা শুনে নাহিদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল।কিন্তু পারেনি।ওর বন্ধুরাও কয়দিন ওর কোন খোঁজ পায়নি।হঠাৎ করেই একদিন ক্যাম্পাসে তার আগমন।উস্কো-খুস্কো চুল,মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি।একেবারেই যেন অন্য মানুষ।আগের মতই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে লাগল,রিমার সাথেও ঘোরাফেরা চলছে।তারপরও কি যেনো হারিয়ে গেছে ওর মধ্য থেকে।এর মাঝে উড়ো খবর শোনা যেতে লাগল যে ও রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে।একদিন চেপে ধরতেই অকপটে স্বীকার করল রিমার কাছে।সেদিন যে ছেলেগুলি তাকে লাঞ্ছিত করেছিল,তার প্রতিদ্বন্দি গ্রুপে যোগ দিয়েছে সে।প্রতিশোধের নেশায় যে এই পথ বেছে নিয়েছে,এই খবরটাও গোপন করলনা।রিমার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সে এই পথ থেকে ফিরে যাবার ব্যাপারে রাজি হলনা।প্রতিশোধের নেশায় এতই অন্ধ ছিল সে।ধীরে ধীরে কাছের মানুষগুলোর সাথে দুরত্ব সৃষ্টি হল।রিমার সাথেও।তার গ্রুপের লীডারের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠল সে কয়েকদিনেই।তার প্রতিশোধস্পৃহার সম্পূর্ণ ফায়দা উঠাল তারা।তাকে দিয়ে বিপক্ষের নেতার ডানহাতকে খুন করিয়ে ফেলল।রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় তার নিজেরও কিছু হলনা।২ দিনের মত থানায় থাকতে হয়েছিল।আসলে সেখানে রাজার হালেই ছিল সে।পুরো ব্যাপারটাই একটা আইওয়াশ ছিল।
একটা খুন করেই সে আণ্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের অবস্থান সংহত করে নিয়েছিল।ক্রমেই উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠছিল সে।এতকিছুর মাঝে তার জীবনে রিমার অবস্থান ছিলনা বললেই চলে।মাঝে মাঝে দেখা হত।তার সাথে সাঙ্গপাঙ্গ থাকত বিধায় রিমা তাকে পাশ কাটিয়ে যেত।
একদিন হঠাৎ করেই রিমা তার সাথে যোগাযোগ করল।কিছু জরুরি কথা আছে বলে লেকের পাড় আসতে বলল।সে দিনটিতেই রিমার সাথে নাহিদের শেষ দেখা হল।জরুরি কথা বলতে রিমার নিজের বিয়ের কথা জানালো নাহিদকে।শুনে তার মাঝে কোন ভাবান্তর হল না।বিষয়টা রিমাকে খুবই পীড়া দিল।কিন্তু কিছু বলল না সে।বিয়ের কার্ডটা নাহিদের দিকে বাড়িয়ে দিল।সাথে একটা প্যাকেট এ খুবই সুন্দর কারুকাজ করা একটা চাদর দিল।নীল রঙ্গের।নাহিদের প্রিয় রঙ।শেষ স্মৃতি হিসেবে এটা দিতে চাইল তাকে।ভাবলেশহীন মুখে এগুলো নিল সে।দুয়েকটা স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেই বিদায় চাইল নাহিদ।শেষবেলায় শেষবারের মত একটা অনুরোধ করল রিমা।স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার।নাহিদ কথা দিতে পারলনা।
আজ রিমার বিয়ের দিন।দিন না বলে রাত বলা ভালো।এতক্ষণে সম্ভবত বরের বাড়িতে পৌঁছে গেছে সে।ওর বরের বাড়ি এই শহরেই।রাত এখন প্রায় দশটা।এখন রওয়ানা দিলে আধ ঘন্টার মাঝেই ওই এলাকায় পৌঁছানো যাবে।রিমার দেয়া চাদরটা গায়ে দিয়ে নিল।শীত একটু একটু করে পড়তে শুরু করেছে।বিয়ের কার্ডটা থেকে ঠিকানাটা টুকে নিয়ে একাই রওনা করল সে।এখন যা অবস্থা তাতে একা চলাফেরা করাটা তার জন্য মোটেও নিরাপদ না।তারপরও আজ অনেকদিন পর নিজের মত করে চলার সাধ জাগছে মনে।হেঁটে হেঁটেই চলল সে।আধ ঘন্টার জায়গায় সোয়া এক ঘন্টা লাগল।রাতের নগরীর শোভা মনে হয় বেড়েছে।একদম নতুন একটা অনুভূতি হল।রিমার বরের বাড়ির গলিতে ঢুকতেই মনটা কেমন করে যেন উঠল।হাহাকার করছিল বুকটা।
হ্যাঁ,এটাই সেই বাড়ি।এখনো মরিচ বাতিতে ঢেকে আছে পুরো বাড়িটা।আশেপাশের অনেকগুলো বাড়িতেই আলো নেই।সব প্রাণ যেন শুধু এই একটি বাড়িতেই এসে জড়ো হয়েছে।অনেক্ষণ ধরেই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাহিদ।আচ্ছা,রিমাকে কি এক বারের মত দেখা যাবে?নাহ,এখন হয়ত সে তার স্বামীর সাথেই আছে।হয়ত নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন বুনছে।এরকম তো তারও স্বপ্ন ছিল।আজ তার জায়গাটা অন্য কেউ দখল করেছে।একে একে সবগুলো ঘরের লাইট নিভে যেতে লাগল।ফিরে যাবে,ঠিক এই সময়ে সে লক্ষ করল কয়েকজন মিলে তাকে ঘিরে ফেলেছে।অন্ধকারে কারো মুখ চেনা যাচ্ছেনা,তবুও তার বুঝতে অসুবিধা হলনা এরা কারা।হঠাৎ দুইজন মিলে পেছন থেকে তাকে জাপটে ধরল আর একজন মুখ চেপে ধরল।একজনের হাতে একটি চকচকে ছোরার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল।নাহিদ বুঝতে পারল তার আর সময় নেই।শেষবারের মত রিমার কথা ভাবতে চাইল।না,ভাবার সুযোগ পেলনা।তার আগেই তার পেটে উপুর্যুপুরী কয়েকবার ছুরিকাঘাত করল ছেলেগুলো।মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর পরই সকলে স্থান ত্যাগ করল।ভোরে কোন এক মুরুব্বী নামাযে যাবার পথে তার লাশের অস্তিত্ব টের পাবার আগ পর্যন্ত লাশটি মোড়েই পড়ে ছিল।
নাহ,ওর কথা আর ভাবব না।ও এখন অতীত।ভাবতে ভাবতে চেয়ার ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে রওনা দিল রিমা।দরজা আটকিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিল।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখোমুখি হল।না,নাহিদের সেই রিমা এখন মারা গেছে।ও এখন অন্য একজনের।সেই একজনকে নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হবে।অতীতকে ভেবে বর্তমানকে ঠকানো উচিত হবেনা।এমনটা হতে দেয়াও ঠিক না।ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।সম্পূর্ণ একজন অন্য মানুষ হয়ে।
(ভুল ত্রুটি থাকলে আগামীকাল সংশোধন করা হবে)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১২ বিকাল ৩:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


