“সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। দেশের অবস্থাও ভালো না, আর... আর...” ভাষা যেন হারিয়ে ফেলল সে। একটু দম নিয়ে বলল, “সবটা হঠাৎই হয়ে গেল। আজ বিকেল চারটার ফ্লাইট। আমি চলে যাচ্ছি, নিউ ইয়র্কে। ঐ পত্রিকাটায় চাকরি হয়ে গেছে, আমি ভাবতেও পারিনি যে এভাবে...
আপনাকে অনেক জ্বালিয়েছি। মাফ করে দেবেন। ভালো থাকবেন।” গলা ধরে এল তার। একই সঙ্গে ফোনের লাইনটাও কেটে গেল। কিংবা হয়তো সে-ই কেটে দিল।
তিনি ফোনটা টেবিলের উপরে রাখলেন। তার কী খুশি হওয়া উচিত? নাকী দুঃখ পাওয়া উচিত? কে জানে!
চোখ থেকে চশমাটা খুলে সযত্নে মুছলেন তিনি। কাজটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু তিনি আনমনে চশমাটা ঘষতেই থাকলেন। কাজের চাপে বাক্সের ভেতর তালা মেরে রাখা অনেক স্মৃতি এসে জড়ো হচ্ছে মনের শহরে। তার মনের শহরে শুধু কাজই থাকে, কিন্তু সেগুলোকে আর রাখতে পারছেন না যেন। স্মৃতিগুলো তাদের হটিয়ে দিয়ে বাক্স পেটরা নিয়ে মনের শহরে বাসা বাঁধছে।
কর্মব্যস্ত দুপুর... তার সঙ্গে প্রথম দেখা... তার দেওয়া উপহার... হঠাৎ তার পাগলামিতে কাজের সম্পর্কের এই রূপ ধারণ... একাধিকবার মান-অভিমান... ভুল বোঝাবুঝি... এমনকী কান্নাকাটি...
সে আসলে তাকে অনেক বেশি কাছের একজন ভেবে ফেলেছিল, অনেক বেশি প্রিয়। তিনিও কি তাই করেছেন? এই মুহূর্তে বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি তার উপর বিরক্ত হয়েছে অনেক, হয়তো কখনো চেয়েছেন এই উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে। তবুও কি একটু অনুভূতি হৃদয়ের কোনো কোনায় তার জন্য লুকানো ছিল? যদি নাই থেকে থাকে, আজ এমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে কেন?
তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন তিনি। আসলে তিনি দেননি, দিতে চাননি, সে তাকে ভুল বুঝে কষ্ট পেয়েছে শুধু। এতদিনেও সে বোঝেনি... কিছুই বোঝেনি...
কতটা সময় কেটে গেছে তিনি জানেন না। ফোনটা আবার বেজে উঠল। তিনি হঠাৎ চমকে উঠলেন।
“হ্যালো।”
“হ্যাঁ, হ্যালো। শুনুন, এই কিছুক্ষণ আগে একটা বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিকেল চারটার ফ্লাইট। বিমানবন্দর ছেড়ে উঠেছিল মাত্র... আর তারপরই... যাত্রীরা সবাই স্পট ডেড। আপনি দ্রুত নিউজ করার...”
তিনি ফোনটা রেখে দিলেন। কিছু ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না। চারপাশটা শূন্য মনে হচ্ছে। কিন্তু কেন? এ কেমন শূন্যতা? সবকিছু এত নিস্তব্ধ কেন? আর তো ভালো লাগছে না। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন তিনি। অস্ফূটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল করুণ আর্তনাদ “না......!!!!”
তিনি জানেন সব শেষ হয়ে গেছে। এক মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও বিশ্বাস বলে একটা কথা আছে যে। তিনি কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিলেন। একটা নাম্বারে ডায়াল করলেন। খুব পরিচিত নাম্বার। পরিচিত নামটা ভেসে উঠল ফোনের স্ক্রিনে। বুক কাঁপছে তার।
ফোনটা বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে, এক্ষুণি কেটে যাবে... হ্যাঁ.. কেটেই গেল। ফোনটা রেখে ডেস্কে মাথা রেখে নিচু হয়ে থাকলেন তিনি। আসলে এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। তিনি কী তবে অন্য কিছু আশা করছিলেন?
ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল পরিচিত একটি নাম। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। মানে...?
কাঁপা হাতে কোনোভাবে ফোন ধরলেন। কাঁপা গলায়ই বললেন, হ্যা-অ্যা-লো...
ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ বলে উঠল, “হ্যালো, আস্লাম্লাইকুম।”
কণ্ঠটা খুব পরিচিত। কথাগুলোও খুব পরিচিত। নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেললেন তিনি।
ওপাশের কণ্ঠটি বলল, “কী ব্যাপার? কথা বলছেন না যে? ও, বুঝেছি। অবাক হয়েছেন। যাব বলেও যাইনি কেন... নাকী দুঃখ পেয়েছেন? এখন আমার মৃত থাকার কথা ছিল আর আমি... আমি সত্যিই দুঃখিত। এত তাড়াতাড়ি যে আপনাকে রেহাই দিতে পারি না। আরও অনেকদিন আমার যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে আপনাকে, অনেকদিন... যতদিন না আমি সত্যি সত্যি মরে যাই...”
খিলখিল করে হেসে উঠল সে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




