somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সত্য ঘটনা

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ ভোর ৬:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিষণ্ন বেহুলা

প্রেম: দোলে হিয়া দোলে

বটগাছটা রিয়ার ভীষণ প্রিয়। এখানেই দাঁড়িয়ে আসছে সেই ক্লাশ ওয়ান থেকে স্কুলবাসের জন্য: ছয়টা পঁয়তালি্লশ শীত-গ্রীষ্ম সব সময়। শীতের দিনে কুয়াশা, গরমে রোদ আর বর্ষায় বৃষ্টির দেউলিয়া ছাঁট সবই রুখে দিচ্ছে এই গাছ। এমন দারণ প্রাকৃতিক যাত্রী ছাউনি রিয়া এই উলঙ্গ শহরে আর দেখেনি। বাম বেণীটা ডান বেণী থেকে সরু হয়েছে সূক্ষ্ম চোখে রিয়া তা বুঝতে পারে। ওর সাবধানী মন আবার গুণে নেয় বইপত্র রুটিন অনুযায়ী ঠিক আছে কি না। কারণ বেণী যেদিনই সমান হয় না সেদিনই কোন না কোন ঘটনা ঘটে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বাতাস ছাড়ে রিয়া। আয়াতুল কুরসী পড়ে বুকে ফুঁ দেয়। ফজরের নামায রিয়া কখনো বাদ দেয় না। আল্লাহ রক্ষা করবে ভাবতে ভাবতে বাস এসে পড়ে। জানালার পাশে বসে নিশ্চিন্ত বোধ করে রিয়া। যাত্রার ফাঁড়া মোটামুটি কাটলো। বাস চলতে শুরু করেছে, রিয়া স্বস্তিতে মাথাটা সিটে রাখতে পেরেছে কি পারেনি-জানালার পাশ দিয়ে ছুটন্ত হোন্ডা, কোলের উপর টুকরো কাগজ, চোখের কোণে কিশোরের উড়ন্ত চুল।

কোনকিছু না ভেবেই কাগজের টুকরোটা হাত দিয়ে আড়াল করে কায়দা করে ব্যাগের পকেটে চালান করে রিয়া। এই টুকরো কাগজের যে এত শক্তি থাকতে পারে ছোট্ট রিয়ার তা জানা ছিল না। সারাদিন বুক ধড়ফড়, পঞ্চাশবার করা অঙ্কও বোর্ডে ভুল কষে। হাইড্রোজেনের সংকেত বলতে পারে না বিজ্ঞান ক্লাশে। আরবী ক্লাশে 'কাইফা হালুকা'র মানে বলে 'তুমি কেমন আছেন?'। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! কাগজটা ব্যাগ থেকে বের করে পড়ে ফেললেই এত হাঁসফাঁস অবস্থার অবসান হয়ে যায়। কিন্তু ও তুষের আড়ালে রাখা জ্বলন্ত কয়লার মতো টুকরোটা রেখে ভজঘটের জন্ম দিয়ে আট পিরিয়ডের স্কুল শেষ করে দুপুর বারোটায়; গা ভর্তি জ্বর নিয়ে স্কুলের বাসে ওঠে। বাসে একদম শেষ সিটে একা বসে দুই বাই তিন ইঞ্চির কাগজটা খোলে - "আমার যে সর্বনাশ তোমার চোখে। সাড়া মিলবে কি? সায়েম।"

কম করে হলেও একশবার চিরকুটটা রিয়া পড়ে। তারপর কুটি কুটি করে জানালা দিয়ে ফেলে দেয়। পরের চারদিন গায়ে ফোস্কা পড়া জ্বর নিয়ে কুকড়ি মুকড়ি রিয়া পড়ে থাকে বাসায়। ওর সর্বনাশ কে ঠেকাবে? প্রেমজ্বর ছাড়ে পাঁচদিনের মাথায়। এ ক'দিনে সায়েম এসেছে দু'বেলা, রিয়ার বড় ভাই'র বন্ধু হওয়াতে তার এই নিঃশঙ্ক যাতায়াত। তাতেই জ্বর ছাড়তে এত দেরী হয়েছে বলে রিয়ার বিশ্বাস। নতুন হওয়া এই রোগের কথা ও কাউকে বলতে পারে না। এমন কী প্রাণের বন্ধু মাকেও না। পিপাসা পায় ঘনঘন, পড়ায় মন নেই বললেই চলে। বান্ধবীদের সঙ্গ বিষের মতো লাগে। দু'চোখের পাতায় শুধু উড়ন্ত কিশোরের চুল, আর সাড়া দেবার আকুলতা। বয়সটা এমনই যখন সবকিছু বিবেচনার আগে শুধু হিয়া দোলে, দুলেই যায় পেন্ডুলামের মতো, এমনকিছুর আশায় যার পরিণতি ঈশ্বর ভিন্ন আর কারও জানার কথা নয়।

-রোমিও মাস্ট ডাই

সায়েমদের বাসাটা রিয়াদের মুখোমুখি বলেই কি সহজিয়া নিবেদন? অথবা বন্ধুর ছোটবোন? যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই - টাইপ চান্স নেয়া? নিউটেনের না বালক, না কিশোর কি এতকিছু বুঝেছিলো সেই চন্দন সকালে? তার তো দু'চোখে কাজলটানার মতো ঢলোঢলো লাবণ্যমাখা মুখের কিশোরী দু'বেণী ঝুলিয়ে হাঁটছে। দুলছে- ক্রিকেট ব্যাটে হাত যেন সেই বেণী, ফুটবলে লাথি- অসহ্য। কৃষ্ণের বিষ শরীরে। আঁকুপাঁকু মন মোটামুটি বন্ধু জর্জের বাসায় যাবার জন্যে কেবলই উসিলা খোঁজে। পড়া মাসুদ রানা সিরিজের বই আবার ধার আনতে যায়। বিকেলে ডাক ছেড়ে দঙ্গলের সাথে খেলার চাইতে গলির এমাথা ওমাথা হাঁটতে বেশি ভালো লাগে। হাঁটতে হাঁটতে যে রিয়াকে বারান্দায় দাঁড়ানো দেখতে পাওয়া যায়! চিড়িয়াখানায় যাবার রাস্তায় রিয়ার স্কুল। সায়েম সেখানে একদিন বুকে মাদলের শব্দ নিয়ে দাঁড়ায়। আলতো করে বলে ফেলে - 'চলো বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাই।' রিয়া যায়। ইডেন গার্ডেনে আদম এবং ইভের যে সখ্যতা তারই টানে ছেলেটা মেয়েটা দৌড়ে দৌড়ে হাঁটে। গাছের আড়ালে মুখ লুকায়। 'ভালো রেজাল্ট করা চাই'- বিমানে লোডারের চাকুরী করে এমন একজনের ছেলেকে সেই গার্ডেনে রিয়া শব্দ ক'টা ছুঁড়ে দেয়। সায়েম আকাশের গায়ে পা রেখে হাঁটে। লেখাপড়া করে দারুণ মনোযোগে। স্বনামধন্য এক কলেজের প্রিন্সিপালের মেয়ে আদি ও অকৃত্রিম ধনী-গরীবের বৈষম্যের ফাঁকটুকুতে কিশোরী হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা গুঁজে দিয়ে বসে থাকে। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় এমন রোমিওদের বাঁচা নেই। আমরা ধরে নেই ঐতিহাসিক পথ অনুসরণ করে এখানেও রোমিও মাস্ট ডাই।
- জুলিয়েট, করে যায় সিন ক্রিয়েট

রিয়া কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে 'সায়েম ভাইয়া' ডাকের পেছনে নিজেকে লুকিয়ে তার নবলব্ধ অনুভূতির চর্চা তরাসেই করে যায়। ছেলের খেলাধূলার চাইতে পড়ালেখায় অধিকতর মনোনিবেশে সায়েমের বাবা-মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সায়েম ম্যাট্রিকে আর্টস থেকে ফোর্থ স্ট্যান্ড করে। রিয়া আনন্দে সায়েমের জন্যে পঞ্চাশ গোলাপের একটা বুকে পাঠায়। প্রেম পর্বের প্রথম পাতা পঠিত হয়ে যায় অভিভাবক মহলে। রিয়ার তখন ক্লাশ নাইনের প্রায় শেষের দিক। স্কুল টিচার মায়ের তত্ত্বাবধানে দিনগুলো ভাজা ভাজা হতে থাকে অকারণ তাপে। ক্বচিৎ চিঠিতে, হঠাৎ দেখাতে একে অন্যকে বলে যায় একটিই কথা - খুব ভালো করে পড়বে যেন কেউ বলতে না পারে আমাদের সম্পর্কই লেখাপড়ার তেরোটা বাজিয়ে দিয়েছে। রিয়া এসএসসি পাশ করে মেয়েদের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে প্রথম হয়ে। সায়েম ইন্টার দিয়ে রেজাল্টের আশায় বসে থাকে। রেজাল্ট হয়। তার কিছুদিনের মধ্যে স্কলারশিপও। রিয়ার দূরদশর্ী বাবা-মা সবধরনের সুসম্পর্ক বজায় রেখে সায়েমকে এয়ারপোর্টে সি-অফ করেন। রিয়ার ফর্সা গালে জল বয়েই চলে। রিয়ার ভাই মনে মনে বলে- শালা তুই করবি আমার বোনকে বিয়ে! দেখাবো মজা। এখানে ঘটনা পরম্পরায় ডাক বিভাগ খল চরিত্রে আবিভর্ূত হবে জর্জের টাকা খেয়ে। রিয়া সায়েমের অনেক চিঠিই পাবে না। রিয়ার চাচাতো ভাই গ্রাম থেকে আসবে ওদের বাসায় থেকে পড়তে। রিয়ার বাবা কথাচ্ছলে একদিন জানিয়ে দেবেন বাবলুর সাথে রিয়ার বিয়ে হবে, রিয়ার বাবা বাবলুর বাবাকে এমন কথাই দিয়েছিলেন। রিয়ার মা রওশন আরার ব্যাপারটা বিশেষ পছন্দ না হলেও তিনি তেমন জোরালো বক্তব্য রাখবেন না কারণ বাবলু আর যাই হোক বিমানের লোডারের ছেলে না।

- এক জোনাকী, দুই জোনাকী জ্বলে, জুলিয়েট ভাসে অভিমান জলে

সায়েমের কোন খবর রিয়া বহুদিন জানে না। সায়েমের বাবা রিটায়ারমেন্টের পর একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে গ্রামে চলে যাওয়াতে সেখান থেকে কোন খোঁজ নেয়ার পথও বন্ধ। ঢাকা ভার্সিটির টানা বারান্দাও মাঝে মাঝে রিয়ার দু'চোখে ম্যাচ বাঙ্রে মতো দমবন্ধ করা লাগে, বাবলু পাশে আঠার মতো, সেঁটে থাকাতে। রিয়া ইকনোমিঙ্ পেয়েছে, পড়ছে। বাবলু তার আগের বছর কোনমতে হিস্ট্রিতে ঢুকেছে। ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই রাজনীতিতে পাঠ নেয়াতে ইয়ার ফইনালে একটা সেকেন্ড ক্লাস নাম্বার ছাড়া আর কিছুই জোটাতে পারেনি। ক্যাম্পাসে রিয়া বাবলুকে একদিন ধাক্বা মেরে ফেলে দেয় সবার সামনে। বাবলু রিয়ার বন্ধু সাগরকে অকস্মাৎ ঘুষি মারাতে। সাগর রিয়ার হাত দেখছিলো। "আমার বউ এর হাত দেখার এত সাধ কেন তোর শালা, বাঞ্চোৎ?"

বাসায় এসে রিয়া খূব কাঁদে, সায়েমের উপর ভীষণ রাগ। রিয়া অনার্স ফাইনাল ইয়ারে থাকতেই বাহার সাহেব মানে রিয়ার বাবা স্ট্রোক করলেন এবং হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকেই জর্জকে বললেন রিয়া বাবলুর বিয়ের ব্যবস্থা করতে। অপরাপর বাংলা সিনেমার কাহিনীর মতো সায়েম - রিয়া প্রেমোপাখ্যান এখানেই শেষ হবে রিয়া-বাবলু'র বিয়ের মধ্য দিয়ে। শুধু বিয়ের দিন রিয়া কাঁদতে কাঁদতে ফিট্ হবে সায়েমের প্রতি জমা অভিমানে।

পাপ:
- আদি

অতঃপর হাওয়া শয়তানের প্ররোচনায় গন্ধম ফল খাইলো আদমসহ, তাঁহারা বিবস্ত্র অবস্থায় পৃথিবীতে আসিয়া উপস্থিত হইলো।
হাওয়ার পাপটাই এখানে মুখ্য, মানব সমপ্রদায় স্বর্গচু্যত হবার অন্যতম কারণ হাওয়ার লোভ, গন্ধম ভক্ষণ। এর পেছনে যে হাওয়ার আদমের প্রতি পরম ভালোবাসা কাজ করেছে তা কি কেউ অস্বীকার করতে পারে? একা খাওয়া যেত গন্ধম, সঙ্গীর প্রতি সুতীব্র মমত্ববোধে, প্রেমে হাওয়া তা করেননি। অপেক্ষা করেছেন আদমের। হাওয়াকে আদম এর জন্যে তিরস্কার করেছেন এমনটা ধর্মগ্রন্থের পরবতর্ী ধারাবাহিকতায় দেখা যায় না। মানব-মানবীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সেই জগতের আদি পর্ব থেকেই স্বীকৃত। যুগের বদলে আকর্ষণ প্রকাশের ভাষা কেবল পরিবর্তিত হয়েছে এই-ই যা নব্য সংযোজন। আদম হাওয়ার স্বর্গপতন যদি পাপ হয়, তাহলে আদি পাপ হয় আসলে হাওয়ার আদমের প্রতি কিংবা আদমের হাওয়ার প্রতি আকর্ষণ। এই চৌম্বক না থাকলে যৌথ পতন অনিবার্য ছিল না, আর যৌথপতন না হলে লক্ষ বছরের মানব ইতিহাস টানতে হতো না, এককে মানব প্রজনন বাহিত হয় না বলে।
সায়েমের পাপ কি সেই কুয়াশা ভোরে, উড়ন্ত চুলে রিয়ার কোলে ছোঁড়া চিরকুট? রিয়ার পাপ কি সায়েমের সর্বনাশে গাঁটছড়া বাঁধার অঙ্গীকার? না কি সামাজিক অবস্থানের বৈষম্য সব পাপের মূল উৎস? সায়েম ডায়রীটা বন্ধ করে। সায়েমের বোন চিঠি লিখেছে রিয়ার বিয়ের খবর জানিয়ে। সায়েম কাঁদতে ভুলে গেছে বহুদিন। যে সঙ্কল্পে এতকিছু সেই বাল্যপ্রেমই টাল খেলো। আসলে ওর নৈবেদ্যই ভুল ছিলো এমনটাও মনে হয় সায়েমের। বাবা-মা-বোন কারও জন্যে তো এত পরিশ্রম করেনি, শুধু এক মানবীকে পাওয়ার জন্যে এত ছোটাছুটি। কারও শুভেচ্ছা মনে হয় আসার সময় নিয়ে আসেনি, তাই এই পতন।

রিয়া কি দীপের সাথে অতিরিক্ত বাজে ব্যবহার করেছিলো? যে ছেলেটা চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলো এত খারাপ তো আমি না, এমন কেন করছো? দীপ রিয়ার ক্লাশে ভালো ছাত্র ছিলো। ব্যাচে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা। রিয়াকে ভালো লাগার কথা বলতেই রিয়া জ্বলে উঠে বলেছিলো নিজের দিকে তাকিয়েছো? কালো, বেঁটে এমন ছেলেকে আমি কোন দুঃখে বিয়ে করবো বলো তো! দীপ মাথা নীচু করেছিলো কষ্টে, শোনা যায় না এমন আস্তে বলেছিলো - আমার মনটা কালোও না, বেঁটেও না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি মনের মানুষের অভাবে সারাজীবন অপূর্ণ থাকবে দেখে নিও।

বাবালু'র সাথে পাতা অনিচ্ছার শয্যায় নিঘর্ুম রিয়া বহুদিন পর দীপের কথা ভাবে। কবেকার অভিমানী উচ্চারণ এক বালকের! হায়রে, আজ তা এমন করে সত্যি হবে? অবাক লাগে রিয়ার। রিয়া জোরদার চেষ্টা চালাচ্ছে চাকুরীর। বাবলুর সাথে বিয়ের প্রায় একবছর হতে চললো। কদিন পরেই রিয়ার মাস্টার্সের রেজাল্ট হবে অথচ বীরপুঙ্গব এখনো রাজনীতিতে ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় থাকবার আশায় ইয়ার ড্রপ দিয়েই যাচ্ছেন।

-মধ্য

বাবলু যখন ঢাকায় প্রথম এলো তখন প্যান্ট পরাটাও রপ্ত হয়নি। লালমনিরহাটের মানুষ কিভাবে জানবে অত প্যান্ট পরা? সেই বাবলু রিয়ার মতো মেয়েকে সামলাতে পারবে এমন বিশ্বাস রিয়ার বাবা-মা'র কেন ছিল তা আজও এক পরম বিস্ময়। আত্মসম্মান যতটা না তার চাইতে বেশি আত্মগরিমা বাবলুকে ভরিয়ে রাখতো প্রথম প্রথম। প্রেম করেছে, প্রেমিকের জন্যে যখন তখন কাঁদতে বসে তেমন মেয়েকে ও বিয়ে করেছে, এ তো সেই মেয়েকে, তার পরিবারকে বিশাল এক ফেভার করা। নিজের মহত্বে মাঝে মাঝে অজান্তেই বাবলুর বুক ফুলে যায়। বউ চাকুরী জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে, শ্বশুরবাড়ীতে বসে খাচ্ছে - এসব কোন বোধই বাবলুর মাঝে আলাদা করে খেলে না। ও ওর মতো করে রাজনীতি করে যায় মনোযোগ দিয়ে। রিয়া বিসিএসে কোয়ালিফাই করাতে বাবলু বেশ খুশি হয়। ভাবটা এমন 'হুঁ, হুঁ দেখতে হবে না কার বউ!'। আনন্দ কাটতে বেশি দেরী হয় না যখন রিয়ার পোস্টিং হয় টাঙ্গাঈলের এক সরকারী কলেজে।
রিয়া জয়েন করে। বাবলুকে বলে ওর কাছে চলে আসতে। এখানেই যা হোক একটা কিছু ব্যবসা-ট্যবসা করার জন্যে অনুরোধ জানায়। বাবলু হেসেই উড়িয়ে দেয়। রিয়াকে কলেজের পাশে বাসা ঠিক করে দেয়। সাথে রেখে আসে বাবলু নিজের দূর সম্পর্কের এক চাচাতো বোনকে। বাবলু প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে রিয়াকে দেখতে যায়। পাঁচ ছয়দিনের গ্যাপে দেখা হওয়াতে তেমন কথা কাটাকাটি আর হয় না। রিয়া ইনফ্লুয়েন্সিয়াল বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে বাবলুকে একটা ব্যবসাও ধরিয়ে দেয়। মোটামুটি সব গুছিয়ে রিয়া স্বস্তির শ্বাস ফেলে সেই ছেলেবেলার মতো। কখনো কখনো বুকটা খুব ফাঁকা লাগে। অভ্যাসের সম্পর্ক বয়ে যায় বাবলুর সাথে কিন্তু তাতে প্রাণ নেই. প্রেম নেই। আছে শুধু দায়বদ্ধতার অক্টোপাস আলিঙ্গন!
নতুন কাজ বাবলু তাই আর ঘনঘন ঢাকা ছেড়ে টাঙ্গাঈল আসতে পারে না। হয়তো পনেরো দিন পরে একবার। রিয়া মাসে একবার যায়। অবসরের সময় অপচয় না করে বাসায় ব্যাচ পড়ানো শুরু করে। ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রী মন্দ হয় না। পড়াতে পড়াতে রিয়ার হঠাৎই একদিন দম আটকে আসে। একটা ছেলে দেখতে হুবহু সায়েমের মতো। একদিন দু'দিন রিয়া লুকিয়ে, আড়চোখে শুধু রিফাতকে লক্ষ্যই করে যায়। এত কচি ছেলে, একে ঘায়েল করা কি রিয়ার জন্যে কোন ব্যাপার! রিফাতকে রিয়া আলাদা দেখা করতে বলে একদিন একটা নোটের রেফারেন্স টেনে। রিফাত আসে। এভাবে রিয়া রিফাতকে স্পেশাল কেয়ারে, মাঝে মাঝেই আলাদা পড়াতে থাকে। আদরের ছলে রিফাতের কপালে আলতো চুমু। সুতা আস্তে আস্তে ছাড়া শুরু হয় নাটাই থেকে। অসম প্রেমে রিফাত হাবুডুবু। বাবলুর অনিয়মিত যাতায়াতের ফোকর গলে রিয়া তাবৎ দুনিয়ার উপর শোধ নেয় নিজের চেয়ে দশ বছরের ছোট রিফাতকে দুমড়ে মুচড়ে চিবিয়ে খেয়ে। রিয়া রিফাতের দেখা না পেলে কখনো বুঝতো না সায়েমের জন্যে ওর মাঝে আসলে কি পরিমাণ হাহাকার সব সময় রয়ে গেছে। শরীরি ভালোবাসার সাথে প্রেমের আকর্ষণ যুক্ত হলে তা কতটা আশ্লেষের হতে পারে তা রিয়া মর্মে মর্মে বোঝে। একটা বছর রিয়া রিফাতকে নিয়ে ফুল শয্যা রচনা করে। স্বাক্ষী একমাত্র বাবলুর সেই বারো তের বছরের চাচাতো বোন।

ব্যবসা বাবলুর ভালোই চলে। রিয়ার কানেকশনগুলো বেশ ভালো। রিয়াকে নিয়ে জায়গা দেখে বাবলু একটা স্পেসও ভাড়া নিয়ে নেয় ব্যবসার কাজ করার জন্য। কর্মচারী বাড়ে, কাজ বাড়ে। আর ঠিকাদারীর ব্যবসায় উপরতলায় যোগাযোগ খুবই জরুরী। এটা বুঝে বাবলু তার রাজনীতির লিংকগুলোও ব্যবহার করা শুরু করে। সময় যায়। অনেককিছু থিতু হয়ে আসতে থাকে। রিয়া মোটামুটি শান্ত হয়। রিফাত এইচএসসি পাশ করে ঢাকা পড়তে চলে আসে। আবার রিয়ার নিজের সাথে নিজের থাকা শুরু হয়। কুলসুম কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের ঘরে ঢোকার তোড়জোড় করছে। রিয়া বাবলুর এই দূরসম্পর্কীয় বোনকে ঠিক কাজের মেয়ের মতো না দেখে আত্মীয়ের মতোই দেখে। কুলসুমকে কাজ চালানোর মতো লেখাপড়াও শেখায়। ভদ্রস্থ একটা চেহারা পেয়ে যায় কুলসুম রিয়ার বদৌলতে। রিয়া কুলসুমকে নিয়ে ঢাকায় ফেরে, ওর বদলী হয়েছে অবশেষে ঢাকায়। এবার নিজের একটা সংসার, সত্যিকারের সংসার। ভালোবাসার মানুষের সাথে নাই বা হলো, একটা সময় ভালোবাসার দাবী ফিকে হয়ে সেখানে দায়িত্ব, নির্ভরতা, প্রজনন ইত্যাদি গাঢ় হয়ে দেখা দেয়।

অন্ত-1

বাবলু-রিয়ার বাচ্চা হবে। দুজনেই মোটের উপর খুশি হয়। আমি তুমির পারমুটেশন কম্বিনেশনের দিন শেষ হবে দেখ। বাবলু রিয়ার যত্ন আত্তি করে যতটা সম্ভব। প্রথম তিন মাস রিয়া একদম বেড রেস্টে থাকে জটিলতা থাকাতে। এই সময়টা বাবল ু কাজ শেষে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে। কুলসুমের সহায়তায় রিয়ার জন্যে নানা খাবার বানানোর প্রোজেক্ট হাতে নেয়। সব পেরিয়ে রিয়াদের একটা ছেলে হয়। বাচ্চা চাকুরী সংসার নিয়ে রিয়ার ব্যস্ততা হয় উচ্চ পর্যায়ের। ব্যাচে ছাত্রপড়ানো তার সাথে যুক্ত হয়ে রিয়াকে মহা ব্যস্ততার নাগপাশে আবদ্ধ করে ফেলে। বেশিরভাগ দিনই রিয়া শোয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝরাতে আবার জাগতে হয় বাচ্চাকে খাওয়াতে। জীবন চলে একই নিয়মে। বাচ্চা এক বছর হয়।

এ্ এক ঝড়ের রাত। পানি খেতে রিয়া ওঠে। বাবলু বিছানায় নেই। কুলসুমের রুমের দিক থেকে শব্দ শুনে রিয়া আ্েত এগোয়। রিয়া সেই রুমের সামনেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে। বাবলু কুলসুমের সাথে চূড়ান্ত সঙ্গমে।

অন্ত-2

কুলসুম চল তোকে দিয়ে আসি। তোর তো একটা ভবিষ্যত আছে। তুই বাচ্চা মেয়ে। - রিয়া কুলসুমকে গ্রামে দিয়ে আসে পরের দিন।
আমি কত সতী নারীর পতি রে! বিয়ের আগে তুই লটরপটর করিসনি সায়েমের সাথে! আমি বিয়ের পরে করেছি এটা নিয়ে এত পাড়া মাথায় করার কি আছে? কুলসুমকে নিয়ে আসবি। না হয় তোকে আমি রাখবো না। আচ্ছা থাক তোর আনা লাগবে না। আমি নিয়ে আসবো। - বাবলু কথা শেষ করে শুয়ে পড়ে।
বাবলু রিয়ার ভঙ্গীতে বোঝার উপায় নেই এর মাঝে এমন সাংঘাতিক একটা কান্ড ঘটে গেছে। কুলসুম চলে আসে আবার রিয়ার সংসারে।

প্রহার/পতন

ভাবী তো টাঙ্গাঈল থাকতে পিচকি এক পোলার লগে রাতেও থাকছে। আপনাার বেলায় এত বাড়াবড়ি কেন? আমারে আপনি বিয়া না করেন কিন্তু তাড়ায়ে দিয়েন না। আমার ভালোবাসার দরকার নাই। গেরামে এখন ভাত খাইয়া ইজ্জতের লগে বাঁচার উপায় আমাগো নাই। আপনেই দেইখা শুইনা আমারে একটা বিয়া দিয়া দিয়েন। যদ্দিন বিয়া না হয় তদ্দিন আমি আপনার। - নানা নাটক, কান্নার সহযোগে নিজের আর্জি পেশ করে কুলসুম বীরদর্পে নিজের রুমে ঢুকে যায় রিয়ার সামনে দিয়ে।

তুই আরেক ব্যাটার সাথে বিয়ার পরেও শুইছস? কথা বল শালী, খানকি। ছিনাল। তোরে আমি বিশ্বাস কইরে রাইখা আসছি আর তুই পোলার বয়সী একটা বাচ্চারে নষ্ট করছস? বাবলুর হাত ব্যথা হয়ে গেলে রিয়াকে মারা ক্ষান্ত দেয়। গাড়ি নিয়ে সেই রাত দুটাতেই বাবলু বের হয়ে যায়। কুলসুম ফোন করে রিয়ার মাকে আনে। নাতিকে কোলে নিয়ে মেয়েসহ রওশন আরা অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন।
চারদিন আইসিইউতে থাকার পর রিয়া সাতদিনের দিন ক্লিনিক থেকে মায়ের বাসায় ফেরে।
মায়ের বাসায় থাকার দশম দিনে রিয়ার কোল থেকে বাবলু বাচ্চাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। দুধের বাচ্চাকে বাঁচাতে রিয়া নিজের বাসায় আসে। ফিরে আসে রিফাতের ব্যাপারটা জানাজানি হবার ভয়েও। বাবলু দুই পরিবারের সবাইকে রিয়ার কীর্তি জানানোর হুমকি দিতে থাকে ক্রমাগত।

অন্ত-3

ওদের সংসার আজও টিকে আছে। কুলসুম এখনো আছে। বাবলূ তার সাইনবোর্ড 'রিয়া' এত সহজে হাতছাড়া করবে না। এই নিয়ন সাইনের আড়ালে অনায়াসে কতকিছু করা যায়!
রিয়া ছেলেকে মন দিয়ে মানুষ করার চেষ্টা করে।

শেষের কবিতা

ঢাকা চিটাগাং রুটে একটা বাস অ্যাঙ্েিডন্ট হয়েছে। বাবলূ সেরিনা সহ আহত। সেরিনা বাবলুর সেক্রেটারী। রিয়া হাসপাতালে বসা। রোগী দুজনের কেউই আশংকামুক্ত নয়। রিয়ার গালে সেই আরেকদিনের মতো জল যেদিন সায়েমকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়েছিলো। আধুনিক বেহুলা স্বামীকে নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। আরেকটা চিরবিদায় সইবার শক্তি রিয়ার একদমই নেই। ওর পা ভেঙ্গে আসে, না কি মন?

সায়েম ডায়রী খোলে - সম্পর্ক কি চর্চার জিনিস? অচর্চায় কি যে কোন সম্পর্ক নষ্ট হয়? এখানেও কি নদীর মতো ড্রেজিং এর দরকার হয়? পরিণত বয়সের মানুষের জীবনে কি যৌনতা অনেক বড় কোন ভুমিকা পালন করে সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে? রাত ঠিক তিনটা। সায়েমের দেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম নির্ভরযোগ্য বাহন 'টেলিফোন' অশুভ সংকেতের মতো বাজতে থাকে, ক্রিং, ক্রিং... রিয়ার মোবাইলও বাজে 'অপারেশন সাকসেসফুল', বেহুলার ভেলা আবার ভাসতে থাকে মাধ্যাকর্ষণের সূত্রে।










সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্ষমতা ও সম্পদ বণ্টনের রাজনীতি এবং এলিট সমাজ - নির্বাচনের আগের প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:২১



ভোটের সময় এলেই একটি অতি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। নির্বাচনপ্রার্থী, যিনি অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি, সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইতে গিয়েছেন। গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠাকুর ঘরের কে? কলা আমি খাই নি ! :D

লিখেছেন অপু তানভীর, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:১০



''শেকল ভাঙার পদযাত্রার'' যাত্রা শুরু ২০২০ সাল থেকে। নারী বৈষম্য ধর্ষণের মত অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে তারা এই পদযাত্রা করে থাকে। নানান দাবী নিয়ে তারা এই পদযাত্র করে থাকে। এর আগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×