somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলামি মুভি দর্শন এবং আমাদের হালালি ভাবনা

২৮ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ৮:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রাসুলকে স. নিয়ে ইরানে সম্প্রতি একটা মুভি বানানো হয়েছে । এই মুভির নাম ‘মুহাম্মদ : দ্য মেসেঞ্জার অব গড’ ।

এর আগেও ‘আর রিসালা’ বা ‘দ্য মেসেজ’ নামে মোস্তফা আক্কাদের একটা ছবি আমরা দেখেছি । দ্য মেসেজ নিয়ে একসময় খুব আন্দোলন-ফান্দোলন হয়েছে । জার্মানিতে এই ছবি যখন মুক্তি পাবো পাবো করছে, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছে একশ্রেণির ‘শান্তিপ্রিয়’ মানুষ । কিন্তু মোস্তফা আক্কাদ মানুষের সামনে নিবেদন করে বলেছেন, “আপনারা ছবিটা দেখুন, এখানে ইতিহাসের কোনোরূপ বিকৃত প্রকাশ ঘটে নাই । রাসুলের স. কোনো চিত্র ব্যবহার হয় নাই ।”


বাস্তবেও আমরা সেই ছবির নিপুন কারিশমা দেখেছি । সেখানে চার খলিফাকে ক্যামেরার আড়ালে রেখে তাদের উপস্থিতি বোঝানোর প্রয়াস বেশ প্রশংসা পেয়েছে । ছবিটা অস্কারেও গেছে । হলিউডের অ্যান্থনি কুইন, আইরেন পাপেস, মাইকেল আনাসার মতো দু-তিনজন খ্যাতিমান অভিনেতাও সে ছবিতে ছিলেন । সেই ছবির সেট নির্মাণ করা হয়েছিলো লিবিয়ার মরুভূমিতে; সেটটি মুয়াম্মার গাদ্দাফি যত্ন করে সংরক্ষণ করেছিলেন ।

বলতে চাচ্ছিলাম, এই যে রাসুলকে নিয়ে একটা চলচ্চিত্র বানানো হলো, এ বিষয়ে কি আসলেই আপত্তি করার খুব কিছু আছে ? অর্থাৎ রাসুলকে নিয়ে ছবি করাটাই কি খুব বেশি দোষের ব্যাপার ? নাকি দোষের ব্যাপার কেবল তখনই হবে, যখন তাতে ‘অবমাননাকর’ কিছু থাকবে ? যেমনটা রয়েছে ‘ইনোসেন্ট অব মুসলিম’ ছবিতে । যদি ছবি করাটাই দোষের হয়, তাহলে আন্দোলনটা কেবল ‘ইনোসেন্ট অব মুসলিম’-এর বেলায়ই ফেনিয়ে উঠলো কেনো ? কেনো মোস্তফা আক্কাদের বিরুদ্ধেও ফতোয়া জারি হলো না ? কেনো মুগ্ধ চোখে আমাদের ছেলেরা ‘দ্য মেসেজ’ উপভোগ করে ? আর যদি ‘অবমাননাকর’ কিছু না থাকলে আর দোষ না হয়, তাহলে আমরাইবা এমন ছবি নির্মাণের কাজে পিছিয়ে আছি কেনো ?


আমরা না করলেও কাজ কিন্তু থেমে নেই । হজরত ইসা ও মুসা আ.-ও তো আমাদেরই নবি, তাই না ? তাদের নিয়ে কিন্তু হলিউডে বেশ ভালো ছবি তৈরি হয়েছে । Son Of God ও Exodus: Gods and Kings । কিন্তু যা হয়েছে, সেটা ছবির মানে ‘ভালো’ বলা গেলেও বিশ্বাসের মানে কিন্তু গড়মিল আছে । থাকাটাই তো স্বাভাবিক । গড়মিলটা তো আমাদের কাছে, ওদের কাছে তো আর না । আর আমরা গড়মিল ধরেই বা কী করবো, আমরা তো বানাই নি, বানানোর মুরাদ, তাগত, হিম্মত, হাললাত কোনোটাই তো আমাদের নেই । তাই যা হচ্ছে, তা-ই মানুষ খাচ্ছে এবং তাতে তাদের বিশ্বাস আরো পোক্ত হচ্ছে ।


‘মুহাম্মদ : দ্য মেসেঞ্জার অব গড’ ছায়াছবির অফিসিয়াল ট্রেইলার প্রকাশ করা হয়েছে এই আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে । ইরানের খ্যাতনামা চিত্রনির্মাতা ‘মাজিদ মাজিদি’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন । http://www.mohammadmovie.com ওয়েবসাইটে ইংরেজি, ফার্সি ও আরবি ভাষায় ৪টি ট্রেইলার আপলোড করা হয়েছে । গত পরশু (২৬ আগস্ট) ইরানে ছবিটি মুক্তিটি পেয়েছে এবং গতকাল (২৭ আগস্ট) কানাডার মন্ট্রিলে অনুষ্ঠেয় ৩৯তম বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার শোতে প্রদর্শিত হয়েছে । মুভির ফেসবুক পেজে দেখা যায়, ইরানের হলে মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে ছবিটি দেখার জন্যে । ছবির পরিচালক মাজিদ মাজিদি তেহরানে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, “ইসলামের সঠিক ভাবমর্যাদা বিশ্বে তুলে ধরা এবং ইসলাম নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ছবিটি নির্মাণ করা হয়েছে ।”

তিনপর্বে নির্মিত ছবির রিলিজ হয়েছে কেবল প্রথম পর্ব । ১৭১ মিনিটের এ ছবি নির্মাণে লেগেছে পাঁচ বছর আর ৫৫ কোটি ডলার । এতে কাজ করেছেন ইতালির অস্কারজয়ী সিনেমাটোগ্রাফার ভিত্তোরিও স্তোরারো, ফিল্ম এডিটর রোবাতো পেরপিগানি, মার্কিন শিল্পী স্কট ই অ্যান্ডারসন । সঙ্গীত সংযোজনে ছিলেন ভারতীয় প্রখ্যাত সুরকার এ আর রহমান ।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যে নির্মমতার সাথে ইহুদিদের নিধন করেছেন, তা নিয়ে আমরা যতই আপ্লুত হই, ইহুদিদের দু:খ কিন্তু ততটাই বাড়ে । যদিও বিচার-বহির্ভূত হত্যা ইসলাম সম্মত নয় । কিন্তু তারপরও আমরা কিন্তু হিটলারকে সাধুবাদ জানাতে ভুলি না । তবে পৃথিবীতে মেধাবী ইহুদির সংখ্যাও তো কম নয় । তারা ইহুদিদের প্রতি সিমপেথি জাগাতে বহু সাহিত্য রচনা করেছেন । তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০১৪ সালে নোবেলজয়ী গ্রন্থ ‘মিসিং পারসন’; কালের খেয়ায় ‘নিখোঁজ মানব’ নামে যার কিছুটা অনুবাদ ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিলো । তাদের আরেকটি কালজয়ী শিল্প হলো মুভি The Pianist । এভাবেই একটা সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে ইহুদিরা তো চলছে । এবং আমরাও যখন সেইসব শিল্পকর্ম দেখি, তখন তাদের ক্ষোভের জায়গাটা টের পাই ।


একসময় আমরা ছবি-ভাস্কর্যর বিরুদ্ধে তো কতকিছুই বলেছি আমরা । চাঁদে যাওয়া বিজ্ঞানীদের বলেছি ‘খোদাদ্রোহী’ । আবার চাঁদের প্রথম পদচিহ্ন আঁকা নীল আর্মস্ট্রংকে নিয়ে তো আমাদের ‘মোসলমানিত্বের’ কম জাহির হলো না । আজ আমাদের ইসলামি স্কলাররা বলছেন- ‍রিমুভাল পিকচার রাখা ও তোলা জায়েজ । কিন্তু মুভিকে এখনও তারা ‘হ্যাঁ’ বলেন নি । ওদিকেিআমরা, আমাদের কিছু ছেলেরা এমন একটা সময় এসে কলম ধরতে শিখেছি, যখন বিশ্ব এনিমেশন পিকচরের পথে এগিয়ে গেছে । আমরা লিখছি অথচ এখন প্রযুক্তি সচেতন মানুষ বই আর পড়ে না; শোনে কিংবা দেখে । এই বই থেকে কবে মুভি হবে, সেটার খোঁজ নেয় বারবার । কিন্তু একসময় মানুষ যখন সত্যিই বইপত্র পড়তো, তখন আমাদের এ জাতীয় ‘লেখাপড়া’ নিষিদ্ধ ছিলো । ভাবছি, কবে আমাদের আলেমগণ মুভি দেখার অনুমতি দেবেন; মানুষ কি ততদিনে মঙ্গলে পাড়ি জমাবে না ?


মুভি না দেখুক, না বানাক, অন্তত মুভির স্ক্রিপ্ট লেখাটাও কি দোষের কিছু হবে বলে মনে হয় ? সেটুকু করতে পারলেও মনে হচ্ছে, একটু আগানো যায় ।
নাকি তার আগে এই ‘মুহাম্মদ’ ছবির বিরুদ্ধেই আন্দোলন দাঁড়িয়ে যাবে, কে জানে ! বড় সংশয়ে ভুগছি আজকাল ।

তবে যে যা-ই বলুক, আমি যেমন ‘দ্য মেসেজ’ দেখেছি, দেখেছি ইনোসেন্ট অব মুসলিম, দেখেছি ফাতীহ, দেখেছি পিয়ানিস্ট; তেমনি এই ছবি দেখার অপেক্ষায়ও আছি । ট্রেইলার তো দেখা হলো.. মন্দ লাগবে মনে হচ্ছে না । খুব দোষের যে কিছু না হবে না, সেটা যাচাই করতে আপনারাও ‘নেট পরিব্রাজন’ করে দেখতে পারেন ।

দেখেন তো অনেকই, আমি না হয় একটু বললাম...

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ৮:৩৮
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জীবনের স্টেশনে

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৭

রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন দেখলেই আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়?... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের বিরুদ্ধে মরণোত্তর মামলা করা হোক।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫

আ ন ম সিরাজুর রহমান (১৯৩৪ – ১ জুন ২০১৫) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক, যিনি দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বিবিসি বাংলা বিভাগে অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করেছিলেন.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১-এ ৩ লক্ষ না ৩ মিলিয়ন নিহত হয়েছিলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫

১৯৭১-এ ৩ লক্ষ না ৩ মিলিয়ন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে অনেক অপরাজনীতি হয়েছে। সরকার এই অপরাজনীতি খুব সহজে বন্ধ করতে পারেন। যদি ১৯৭১-এ নিহতদের একটি ডাটাবেইজ তৈরী করা যায় তাহলেই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার কথা!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯


সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ অপ্রত্যাশিত উপহার

লিখেছেন সামিয়া, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪০




সৌদি আরবের রিয়াদের একটা পাঁচ তারকা হোটেলে আমার চাকরি। চাকরিটা খুব কঠিন কিছু না। প্রতিদিন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে নিয়ে হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। লবি, করিডোর, হলরুম, অতিথিদের বসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×