somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শৈশবঃ কিছু চিঠির গল্প

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৫:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রাইমারি স্কুলে থাকতে এলাকার বেশ কয়েকটা প্রেমিকজুটির ডাক-হরকরার কাজ করেছি । কোন কিছুতে সহজেই মুগ্ধ হয়ে যাবার প্রবণতা আমার সেই ছোটবেলা থেকে । তাই আমাকে পটানো সহজই ছিল । ভাইয়ারা কয়েকটা লজেন্স আর আপুরা কয়েকটা চুমু দিলেই খুশিতে গদগদ করতাম আমি । তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে পিঠা,ফলমূল তো ছিলই । টু-থ্রি পর্যন্ত বেশ বিশ্বস্তই ছিলাম । কিন্তু ফোরে উঠে যেই না পালিয়ে গিয়ে সিনেমা হলে 'স্বপ্নের ঠিকানা' দেখে আসলাম,অমনি আমি বদলে গেলাম । চিঠিতে কী লেখা থাকে তা দেখার তীব্র কৌতূহল তখন মাথা ঝেঁকে বসেছে । যেহেতু হাতচিঠি ছিল,শুধু পিন খুললেই হতো । চিঠি পড়ে আমি হতবাক ! কী সব সুন্দর সুন্দর কথা !! এক ভাইয়া লিখেছে(ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত করছি), ''তুমি যখন হাসো,তখন হৃদয়ের গহীন আধাঁরে খেলা করে সোনালি আলোর কিছু রোদ্দুর ।'' কথার মাথামুন্ডু কিছু বুজি না কিন্তু আমার আনন্দ আর ধরে না ! আপুদের চিঠিগুলো বেশি মজা লাগতো । ছোট ছোট কথা,কিন্তু চমৎকার লাগতো পড়তে । এক আপু লিখেছে, ''আপনি আমার দিকে যেভাবে তাকান তাতে ভীষণ লজ্জা লাগে । পিচ্চির বাম গালে চুমু দিয়ে দিলাম । আর কিছু বলতে পারছি না ।'' এগুলো পড়ে আমি উদাস হয়ে যেতাম । অনেক প্রশ্ন মাথায় খেলা করতো । তাকালে লজ্জা লাগবে কেন ? আমাকে চুমু দেয়ার কথাটা চিঠিতে বলার কী দরকার ? এরা চিঠি পেলেই খিলখিল করে হাসে কেন ? চিঠি আড়াল করে পড়ার স্বভাব কেন ? ওদিকে প্রাপক চিঠিটা পেয়েই বাম গালে চুমু দেয় । এ কী কান্ড ! তখন নিজেকে মোটামুটি বড়ই মনে হতো । ছোট যে না,তা আমি 'সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখে আসা একজন' বলে বেশ সগর্বে বুঝিয়ে দিতাম । তো নিজেকে বড় ভাবার কারণে ছেলেদের চুমু তখন ভীষণ বাজে লাগতো । কিন্তু তাদের নায়কোচিত ভাবটা খুব মনে ধরতো । এর মধ্যেই বুঝে গেলাম,ওইসব চিঠি হলো 'প্রেমের চিঠি' এবং যদি ছেলে হয় তবে সে প্রেমিক আর মেয়ে হলে প্রেমিকা । তখন এরা আমার কাছে রীতিমত স্বপ্নের নায়ক । এদের সবকিছুই ভালো লাগে । আমার ব্যস্ত সময় কাটে এদের চিঠি পড়ে পড়ে । কৌতূহল খুব বেশি হলে মানুষ বোধহয় কিছুটা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে । আমার তখন ধারণা,চিঠি মানেই বোধহয় এইসব । তাই খামের চিঠি দেখার কৌতূহলবশত ডাকঘরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম । কিন্তু পিয়ন চাচাকে কী করে বলি যে আমি ওইসব চিঠি পড়তে চাই ! অগত্যা চিঠির বাক্স থেকে চিঠি বের করার কৌশল আবিষ্কার করতে হলো । সেই চিঠি আগুনের উপরে একটু ধরলেই খুলে যেত । মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগতো ছেলের কাছে বাবার কিংবা বাবার কাছে ছেলের চিঠি দেখে । ভাবতাম,এগুলোর দরকারটা কী ! একদিকে বাংলা রোমান্টিক সিনেমা আর অন্যদিকে প্রচুর প্রেমের চিঠি পড়ে পড়ে হাতে তখন বেশ জোর পাচ্ছি । এর মধ্যেই আবার বাড়ির বড় আপাদের কাছ থেকে চুরি করে একটা গল্পের বই পড়ে ফেললাম (আসলে এটা ছিল একটা উপন্যাস,প্রণব ভট্টের লেখা 'প্রেয়সী')। স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম,আমিও চিঠিও লিখবো । কিন্তু আমার তো কোন প্রেমিকা নাই । মনে মনে ক্লাসের একজনকে প্রেমিকা ঠিক করলাম । প্রেমপত্র পড়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে সেই কল্পিত প্রেমিকার (নামটা বলা যাচ্ছে না) উদ্দেশে লিখে ফেললাম এক দীর্ঘ প্রেমের চিঠি ! এক পর্যায়ে বড়বোনের কাছে হাতেনাতে ধরা খেলাম । সে দেখি চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছে । তারপর অবধারিত চপেটাঘাত । কিন্তু ততদিনে বুঝে গেছি প্রেমে এ ধরনের কিছু বাধা আসে ! তাই পুরোপুরি দমে গেলাম না । গোপনে প্রেমবিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যেতে লাগলাম । বিশেষ করে এলাকার বড় ভাইদের কে কোন স্টাইলে মেয়েদেরকে দেখে,মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় কী ভাবভঙ্গি করে,হাত প্যান্টের পকেটে না বাইরে থাকে ইত্যাদি । কিন্তু ওরা সবাই ফুলপ্যান্ট পরে,অথচ আমি হাফপ্যান্ট পরি । হাফপ্যান্ট পরে যে প্রেম হবে না তখন এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । কিন্তু আব্বাকে কী করে বলি,কারণ আমার চেয়ে দু'বছরের বড়রাও তখন হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায় । চিন্তায় পড়ে গেলাম । ওদিকে বাড়িতে আপার কড়া নজরদারিতে পড়ে আমার প্রেমপত্র রচনায় বারোটা বাজতে লাগলো । স্কুলেও লেখা যায় না পাছে বন্ধুরা দেখে ফেলে । দেখে ফেলাটা বড় কথা নয়,কিন্তু দেখে যদি ওরাই আগে চিঠি দিয়ে দেয় আমার তখন সেই ভয় । বাড়িতে আনমনা ঘুরে বেড়াই,খেলতেও যাই না ।আমার ভাবগতি সুবিধার নয় ধরে আপা এক কড়া ওষুধ দিলো । আম্মাকে বলে দেয়ার হুমকি ! আব্বাকে কখনো ভয় পেতাম না । কিন্তু আম্মাকে !!! আম্মা শুনলে বেতের বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না । অত্যধিক দুষ্টুমি করতাম বলে আম্মার কাছে সবসময় অতিরিক্ত বেত থাকতো । মেরে যে একেবারে তক্তা বানিয়ে ফেলবে - এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ রইলো না । এমনিতেই প্রায় রোজ মার খেতে হয় পড়া ঠিকমত করতে পারি না বলে । শেষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ক্রিকেট আর মার্বেল খেলায় মনোনিবেশ করলাম । ওদের মতো বড় হয়ে প্রেমের চিঠি লিখবো - এই আশা ভবিষ্যতের উপর ছেড়ে দিয়ে খেলাধুলার এক আশ্চর্য আনন্দময় জগতে প্রবেশ করলাম । পড়াশোনা আর খেলাধুলা - এই দুই-ই তখন থেকে আমার ধ্যানজ্ঞান ।



প্রেমের চিঠি লিখবো বলে যে স্বপ্ন ছোটবেলায় দেখেছিলাম,এই বড়বেলায় এসে দেখি সেই চিঠিপ্রথা একরকম ব্রাত্য হয়ে গেছে । চিঠির জায়গা মোবাইল দখল করে নিয়েছে । আধুনিক প্রেমিকারা চিঠি পছন্দ করে না । কিন্তু আমার লিখতে তো বাধা নেই । তাই প্রচুর লিখি । চোখ বুজেই বুঝতে পারি,আমি চিঠি লিখতে সব থেকে বেশি ভালোবাসি ।



পুনশ্চঃ ছোটবেলার আদর্শ সেইসব প্রেমিকজুটির সবাই ভিন্নজনদের বিয়ে করেছে । কখনো যদি আমার সামনে তারা পরস্পরের মুখোমুখি হতো - দেখতাম,তাদের অভিব্যক্তি কেমন হয় !
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×