somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ূন আহমেদ : সূর্যপ্রয়ানের সাথে দৃশ্য-অদৃশ্য স্মৃতি

২০ শে জুলাই, ২০১২ ভোর ৫:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রিয় স্যার,
কোনো কুশলজিজ্ঞাসা নয় । জানেন,আমি সিগারেট বড্ড ঘৃণা করি,জীবনে কোনোদিন এর স্বাদ নিইনি । টাকা আর স্বাস্থ্যের যুগপৎ অপচয় আমার কাছে বরাবরই ঘৃণ্য । এমনকি আমি কোনোদিন আমার কোনো বন্ধুর সিগারেট খাওয়ার বিলও দিইনি । কিন্তু প্রায়ই মনে হতো যদি কোনোদিন একান্তে আপনার সাথে দেখা হবার সুযোগ ঘটে সেদিন আপনার জন্য সিগারেটের প্যাকেট কিনে নিয়ে যাব । আপনি খাবেন আর আমি দেখব,ঠিক যেমনটা আপনি আপনার বিভিন্ন গল্পে বর্ণনা করেছেন । কী অদ্ভুত খেয়াল,তাই না ? আপনার সাথে দেখা হবার কথা ছিল । কীভাবে ? আরে,আমি সেই সিস্টেম করে রেখেছিলাম । আপনার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হেডমাস্টার আছে না যার নাম জামান,তিনি তো আমার কাজিন । জামান ভাই বলছিলেন যে আপনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে আপনার সাথে দেখা করতে আমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবেন 'দখিন হাওয়া'র বাসায় । 'দখিন হাওয়া'র কথা যখন তোললামই তখন একটা মজার ব্যাপার আপনাকে বলি । কিছুদিন আগে আমি আর শরীফ (আপনার ইউনিয়নেরই ছেলে) আরও অনেকের সাথে এমপির (যার কথা আপনি একটা লেখায় লিখেছিলেন) সাথে দেখা করতে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের অফিসে গিয়েছিলাম । অফিসটার সামনেই আপনার 'দখিন হাওয়া' বাড়িটা দেখে আমি আর শরীফ যারপরনাই উচ্ছ্বসিত । সে আমাকে নিয়ে বাড়ির মূল ফটকে গিয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করল, 'স্যারের বাসায় এখন কেউ কি আছে ?' দারোয়ান আমাদের দেখে কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকাল । আমি মুখ খুললাম, 'এভাবে তাকাচ্ছেন কেন ? আমরা স্যারের এলাকার লোক । তাঁর স্কুলের মাস্টার !' আপনার বাড়ির দারোয়ানটা বেশ বোকা । আমার কথা শুনে ভীষণ থতমত খেয়ে গেল ।
'স্যারের মেয়েরা আছে । আপনারা কি যাবেন উপরে ?'
আমি আরেকপ্রস্থ চাপা মারলাম, 'না,না,উপরে যাব না । ঢাকায় একটা কাজে এসেছিলাম তো তাই ভাবলাম......ঠিক আছে যাই,স্যার আসলে তো দেখা হবেই ।' এই বলে খুশিমনে কেটে পড়লাম ।
শরীফ আমার চেয়ে অনেক বেশি আপনাকে পড়েছে - সাহিত্য তো আছেই;এ ছাড়াও আপনার চিন্তা-চেতনা,দর্শন,ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি । সে আপনার সম্পর্কে প্রায়ই বলে ,'স্যার এ দেশের সবচেয়ে বড় দার্শনিক ।' বিশ্বাসে মেলায় বস্তু,তর্কে বহুদূর । আপনার সম্পর্কিত তথ্য যেহেতু তাই আমি বিশ্বাস করি । আমাদের কিছু পরিকল্পনা ছিল আপনাকে নিয়ে । আপনার সহযোগিতা নিয়ে এলাকায় বইপড়ার একটা বিপ্লব ঘটাব। অথচ আপনি কিনা মন ভেঙে দেবার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছেন । আপনি পারেনও বটে !
আপনি কুতুবপুরের ঐ জায়গায়টায় যখন স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেন তখন একটু মন খারাপ হয়েছিল । সেই জায়গাটায় কী সুন্দর একটা মাঠ ছিল ! পুরো বছরজুড়েই ক্রিকেট লিগ,ফুটবল লিগ হতো । সান্দিকোনা স্কুলে পড়ি তখন,ঐ মাঠে প্রায়ই খেলতে যেতাম । স্কুলটা হওয়ার কারণে সেই জমজমাট ক্রিকেট,ফুটবল বন্ধ হয়ে গেল । জামান ভাইয়ের আমন্ত্রণে অনেকদিন পর গত বছর গিয়েছিলাম আপনার স্কুলটা দেখতে । কী সুন্দর একটা স্কুল বানিয়েছেন আপনি ! পরিপাটি শ্রেণিকক্ষ,সুবিশাল লাইব্রেরি,সামনে সেই বিশাল মাঠ - গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর স্কুলটা যে রকম হওয়া উচিত ঠিক সে রকম । দারুণ লেগেছে । আমার কত বন্ধু যে আপনার স্কুলটা দেখতে চেয়েছে তার ঠিক নেই । আমি সবাইকেই বলেছি যে নিয়ে যাব সেই উর্বর মাটির কুতুবপুর গ্রামে যেখানে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য শিল্পীর শিকড় গেঁথে আছে । ভালো করিনি ?
আপনার কাছ থেকে অটোগ্রাফ পাওয়ার দিনটার কথা আপনার মনে না থাকাই স্বাভাবিক,কিন্তু আমার আছে । বইমেলায় সন্ধ্যার দিকে আপনি আসলেন অন্যপ্রকাশের স্টলে । অটোগ্রাফের জন্য সবাইকে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে । আমি একটু পেছনেই পড়ে গেলাম । কিন্তু আমার তো সবার আগে পাওয়া চাই । তাই 'স্যার,আমি আপনার পাশের বাড়ির ছেলে । আমাকে আগে দিবেন' বলে চিৎকার শুরু করে দিলাম । আশেপাশের মানুষ যারপরনাই বিরক্ত হলো। হোকগে,তাতে আমার কী ! আমার চাই অটোগ্রাফ । আপনি বললেন ,'এই ছেলেকে সামনে আসতে দাও।' একগাদা বই নিয়ে লাফিয়ে চলে গেলাম আপনার কাছে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হয়ে নিতান্তই শিশুতোষ আচরণ করলাম । এবার মনে পড়েছে আপনার ? আপনি এলাকার অনেককিছু জিজ্ঞেস করলেন অটোগ্রাফ দিতে দিতে আর আমি পটাপট বলে গেলাম । অনেকক্ষণ সময় নিয়ে আপনি অটোগ্রাফ দিলেন । জীবনে সেই প্রথম কারও কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিয়েছি ।
তারপর শান্তিনগরের পিবিএসের মুহূর্তটা। এটা আপনার মনে না থেকে পারেই না । বিডিআর-ট্রাজেডির আগের শুক্রবারে পত্রিকায় খবর পেলাম আপনি ঐদিন ওখানে সারা বিকেলজুড়ে অটোগ্রাফ দিবেন । আমি আমার কাজিনদের নিয়ে অজস্র বইসমেত উপস্থিত হলাম । একটার পর একটা বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন আর ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছেন । আমরা সবাই নেত্রকোনার ছেলে জেনে কী খুশিই না হয়েছিলেন ! আমরা আপনার পাশের বাড়ির এটা জেনে আপনি কেমন যেন ক্ষণিকের জন্য বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলেন । দেখে আমাদের খুব মজা লাগল । অটোগ্রাফের জন্য আমার বাড়িয়ে দেয়া 'অন্তরঙ্গ হুমায়ূন আহমেদ' দেখে আপনি মনে হয় আকাশ থেকে পড়লেন । জানতে চাইলেন ঐ বই আমি কোথা থেকে পেয়েছি । আমি 'সুবর্ণ প্রকাশনী'র কথা বলাতে আপনি যা বললেন তাতে আমি যে কী মজা পেলাম তা বলার না । আপনি বললেন , ' মজার ব্যাপার কি জানো,এই বইটা আমার কাছেও নাই !' আমিও ততোধিক মজা করে বললাম, 'তার মানে এই না যে আপনাকে ভালোবাসি বলে এই বইটা এখন আপনাকে দিয়ে দেব ! এই বই একান্তই আমার !' বেশ জোর দিয়ে বলায় আশেপাশের সবার সাথে আপনিও অনেকক্ষণ হাসলেন । একটা বইয়ের নম্বর দেখে কী জিজ্ঞেস করেছিলেন মনে আছে ? থাকার কথাও না । এই জীবনে আপনার মতো বড় সেলিব্রেটির সাথে কখনো পরিচয় হয়নি তাই আমার মনে আছে । আপনি বেশ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন আমার মোট বই কতগুলো । আমি কোনো উত্তর দিইনি,পালটা প্রশ্ন করেছি ।
'স্যার,আমার বয়সে আপনার কতগুলো ছিল ?'
'আমি তো বাবা তোমার বইয়ের সংখ্যাটা জানতে চেয়েছি ।'
'ষাটের কাছাকাছি ।'
'মাত্র এই কতগুলো !!!' আপনার শ্লেষাত্মক ভঙ্গির কথাটা শুনে একটু রাগ হলো । পালটা প্রশ্ন করলাম ।
'স্যার,আমার প্রশ্নের উত্তরটা...'
'আমার কমই ছিল । কিন্তু আমিতো দরিদ্র ছিলাম সেটা তোমার বুঝতে হবে ।'
'আমি হতদরিদ্র !'
আপনি কেমন করে যেন আমার দিকে তাকালেন । চাহনি সরিয়ে নিয়ে আমি তখন তাকিয়ে আছি আপনার ডান হাতের দিকে । হাতের চামড়া,আঙুলগুলোয় বয়সের ছাপ কী স্পষ্ট ! অথচ এগুলোকে ব্যবহার করেই আপনি কী দারুণ লেখাই না লিখেন ! আপনি ওখান থেকে বের হওয়া পর্যন্ত আমি পিবিএসে ছিলাম শুধু দেখার জন্য যে আপনি সময়টাকে কীভাবে উপভোগ করেন । বিশ্বাস করবেন কি না জানি না,এত চমৎকার বিকেল খুব কম এসেছে আমার জীবনে ।'
জানেনআমি ঠিক করে রেখেছিলাম জামান ভাইয়ের সাথে আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে একটা সমস্যার কথা বলব আর সেটার ব্যাখ্যা চাইব । অথচ আপনি কিনা...... ধুর ! আপনি বড্ড বেরসিক ! কোনো সময়জ্ঞান নেই । আমাকে অপছন্দ,তা না হয় বুঝলাম কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন দেশের কত মানুষ আপনাকে কী পরিমাণ পছন্দ করে ? কী গভীর ভালোবাসা আপনার জন্য ? আপনার সুস্থতার জন্য অনেকে নফল নামায পড়েছে পর্যন্ত । প্রিয় মাতৃভূমি,সারাদেশের মানুষ,দেশ-বিদেশের কোটি পাঠক,প্রিয় ছাত্রছাত্রী, আপনার প্রতিষ্ঠিত স্কুল,সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা,জোছনা,আকাশ,বৃষ্টি,বর্ষার ব্যাঙ ইত্যাদি আরও কত কী আপনাকে কী পরিমাণ মিস করবে সেই খেয়াল হয়নি বুঝি ? মিসির আলী,হিমু,শুভ্র,জরী,রূপা,মীরা প্রমুখ চরিত্রগুলোর কী হবে সেটা কি ভেবেছেন ?
সারাটা জীবন ভালোবাসা ভালোবাসা করেছেন,সারাদেশের মানুষের ভালোবাসার এই মূল্য দিলেন আপনি ? জোছনার ফুল ধরার আশৈশব লালিত স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে কি না তা জানানোর একটুও প্রয়োজনবোধ করলেন না আপনি !
আমার বুকটা কেন যেন কান্নার দমকে ফেটে যাচ্ছে । চোখটাও বড্ড পোড়াচ্ছে । আচ্ছা স্যার,এই চোখ-পোড়ানো ব্যাপারটার কি কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে আপনার কাছে ?
কী হলো,চুপ করে আছেন কেন ? শুনতে পাচ্ছেন স্যার? প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ ? কোন নক্ষত্রটি হয়ে এ দেশের আকাশে আপনি জ্বলবেন তা কি একটু বলে যাবেন স্যার ? প্লিজ বলুন না ।
কথা দিচ্ছি,নক্ষত্রের রাতে আকাশ দেখা মিস করব না ।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×