সবে ক্লাস ফোরে উঠেছি । দুষ্টুমির এমন কোনো ক্ষেত্র নাই যেখানে আমার বিচরণ নাই । ভালো ছাত্রদের সাথে তেমন একটা মিশি না । যারা আমার প্রকৃত বন্ধু যেমন সোহেল,রিপন,নান্টু,কাজল,সুবীর,রঞ্জন,সজল---তারা কেউ পড়ালেখার ধারেকাছে ঘেঁষে না । তাদের নিয়ে সারাদিন মাতামাতি করি । তারা মাঝে মাঝে দারুণ সব খবর দেয় । কার ক্ষেতের মুলা/টমেটো পেকেছে,কার বাড়ির আম-লিচু-বড়ই-পেয়ারা-গোলাপজাম-জাম্বুরা বড় হয়েছে,কলাগাছের ভেলা বানাবার জন্য কাদের বাড়ির কলাগাছ ভোরবেলায় কেটে আনতে সুবিধা হবে,গাঙে কে কোথায় 'বাইড়' (চাঁই) পেতেছে ইত্যাদি ইত্যাদি । বন্ধুদের মধ্যে দুই জন একদিন সিনেমা হলে অনেক বড় টিভিতে ছবি দেখে এসেছে এই তথ্য পাওয়ার পর থেকে আমার রাতের ঘুম হারাম হবার জোগাড় । তারা সারাক্ষণ সিনেমা হলের গল্প করে বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে । আমি কখনো দেখিনি বলে নিজেকে ছোট ছোট লাগে । এক সকালে আব্বার পকেট থেকে জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো ১০ টাকা চুরি করলাম । স্কুল ফাঁকি দিয়ে এক দোকানে বই রেখে আসলাম । বাজার থেকে বাসে উঠলে কেউ দেখে ফেলতে পারে বলে সামনের এক মোড়ে গিয়ে চার বন্ধু উঠলাম । গন্তব্য কেন্দুয়ার 'সাথী সিনেমা হল'---সেখানে চলছে সালমান শাহ্-অভিনীত 'স্বপ্নের ঠিকানা' । টিভিতে দেখেছি তিনি বিভিন্ন ছবিতে নায়িকার সাথে বেশ তাড়াতাড়ি ভাব জমিয়ে ফেলেন যা দেখতে ভালো লাগে,তাঁর স্টাইলও বেশ সুন্দর । তবে রুবেল তখন আমাদের স্বপ্নের নায়ক । বিভিন্ন ছবিতে তাঁর বিচিত্র ঢঙের মারামারি দেখে আমরা স্বর্গীয় সুখ পাই । আমাদের তখন কোনো সন্দেহ নাই যে রুবেল বিশ্বের সেরা নায়ক ।
যাহোক,আমরা ছোট মানুষ---এই অজুহাতে বাসে যাওয়া-আসায় আট আনা করে ভাড়া দিয়েছি । ছবি দেখতে ৭ টাকা লাগে । বাকি দুই টাকা দিয়ে পুরি খেয়ে সিনেমা হলে ঢুকলাম । এত বড় টিভি দেখে চোখ ছানাবড়া । এ কী দেখলাম ! এ আমি কী দেখলাম !! আমার খুশি তখন সপ্তম স্বর্গে । বিস্ময়চোখে ছবি দেখা শেষ করে স্কুল ছুটির ঘণ্টাদুয়েক পর বাড়ি ফিরে আসলাম । খেলাধুলা করে ফিরেছি ভেবে আম্মাও কিছু বলেননি । কিন্তু সন্ধ্যার পর কাহিনি অন্যদিকে গড়াতে শুরু করল । আব্বাকে শুনলাম চেঁচামেচি করতে করতে বাড়িতে আসতে । এসেই রাগী এক চেহারা নিয়ে আমার দু'হাত শক্ত করে ধরলেন,ভয়ে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল । এমন অবস্থা হবে জানলে দুঃস্বপ্নেও 'স্বপ্নের ঠিকানা' দেখতে যেতাম না । আব্বার কাছ থেকে সব শুনে আম্মা স্তব্ধ হয়ে বসে পড়লেন । আর আমি শুধু ভাবছি আব্বার কানে কী করে খবরটা গেল । চাচাতো ভাই,ভালো ছাত্র শহীদুলকে সন্দেহ করলাম,কেননা তাকে তো নিয়ে যাইনি । সত্যি এমনটা হলে ওর কপালে কী কী দুর্গতি আছে তাও একটু ভাবলাম । এদিকে আব্বা 'সহ্যের সীমা ছাড়ায়া গেসে' বলে রাগে গজগজ করে বেতের খোঁজ করতেই আপা পুলকমনে বেত এগিয়ে দিলো । আগে কোনোদিন আব্বা মারেননি ঠিক,কিন্তু আজ বোধহয় রক্ষা নাই । হাতে বেত নিয়ে আব্বা যেই মারতে উদ্যত হলেন,অমনি তাঁর হাতে টান পড়ল । তিনি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন , 'হাসি,আমার হাতটা ধরো,হাতটা ধরো !' হাসি মানে আম্মা তখন হাসতে হাসতে আব্বার হাতটা ধরলেন । আব্বার অবস্থা দেখে সবাই হাসতে লাগল । পরিস্থিতি যথেষ্ট অনুকূল ভেবে আমিও হাসতে লাগলাম । কিন্তু আব্বা করলেন কি,আমাদের যম রউফ ভাইয়াকে (চাচাতো ভাই----বর্তমানে পিজি হাসপাতালের ডাক্তার) খবর দিলেন তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য । বেত তখন আরও একটা যোগ হয়েছে । এর মধ্যে জেনে গেলাম আব্বার কানে শহীদুলই খবরটা দিয়েছে । যাহোক,দুইটা বেত দিয়ে হাতে-পিঠে ভাইয়া কী মার যে দিলো ! এই মারের ফল হলো,সিনেমা হলে পরের ছবিটা দেখতে ওই বছরের রোযার ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে । কাউকে সাথে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়নি । ছবির নাম 'আদরের সন্তান' ।
আব্বা কোনোদিন আমার গায়ে হাত তুলতে পারেননি । যে সুযোগটা একবার পেয়েছিলেন,সেটা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়াতে আমাকে দ্বিগুণ মার খেতে হলো । মনে মনে একটু পরপর 'শহীদুইল্লা'রে পানির নিচে চুবিয়ে মেরে ফেলছি । ভালো কথা,আমার শাস্তি কিন্তু তখনো শেষ হয়নি । বিভিন্ন কারণে আম্মার হাতে প্রায় প্রতিদিনই মার খেতে হয় এবং এটা আবার নিয়তি ভেবে ভুলে যেতেও সময় লাগে না । কিন্তু এটা তো যেই-সেই কিছু না,রীতিমতো সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মতো ভয়ংকর অপরাধ !!! তো এত বড় একটা উপলক্ষে আম্মা কোনো ধরনের শাস্তি দেবেন না,তা কি হয় কখনো ! আম্মার শাস্তি হলো গোসল করতে হবে । শীতের সেই রাতে গোসল ! সম্ভবত গোসল না করলে এই পাপ কিছুতেই মোচন হবে না । খুশিমনেই গোসল সারলাম,কারণ এর চেয়েও বড় শাস্তি হতে পারত ।
খাওয়ানোর বেলায় আম্মার আদর বরাবরই উপচে পড়ে । আমাকে ছাড়া তিনি ভাত খান না । খাওয়ার শেষে ঘুমিয়ে যেতে বলাতে আমার একটা লাভ হলো ---পড়তে হলো না !
আমি তখন আপার সাথে ঘুমাই । সে বিভিন্ন সিনেমার গল্প বলে আর আমি বিমোহিত হই । কিন্তু ওইদিন তো তার সাথে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না । স্পষ্ট দেখেছি,আব্বা চাইতে না চাইতেই সে বেত নিয়ে এসেছে । ঘুম আসি আসি করছে এমন সময় পিঠে মমতায় মাখামাখি একটা হাতের স্পর্শ ।
: কিরে,মাইর কি আইজ বেশি লাগসে ?
: তুই কথা কইবি না (তখন কান্না পাচ্ছে !)।
: তোর কী সাহস ! এই বয়সে সিনেমা হলে চলে যাস !! কোন্ সিনেমা দেখতে গেসিলি ?
: স্বপ্নের ঠিকানা ।
: অ্যাঁ !!! সালমান শাহ্র ছবি !! কাহিনি একটু ক' না ভাই ।
এত দিনে আমি আপাকে সিনেমার গল্প শোনাবার সুযোগ পেয়েছি । সুযোগটা ছাড়ি কী করে । সুতরাং সকল অভিমান মুহূর্তেই অবসান ।
: শোন্ আপা,সালমান শাহ্র বাপ হলো আবুল হায়াত । সে অনেক ধনী লোক । তারপর..................................
সকালে ঘুম থেকে উঠেই শহীদুলের খোঁজে গেলাম মেজো চাচার ঘরে । সে নাকি আগের দিন সন্ধ্যায় অদূরে তার মামাবাড়িতে বেড়াতে চলে গেছে তার এক কাজিনের সাথে । কয়েকদিন সেখানে থাকবে । শুনে মেজাজটা যারপরনাই খারাপ হলো । প্রতিশোধ নিতে আমার আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে । কিছুদিন পর স্কুলে অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হলো । বাংলা পরীক্ষার আগের দিন শহীদুলের বাংলা বই বড় চাচার ঘরে লুকিয়ে রেখে আসলাম । সে পড়ার টেবিলে বই না পেয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করল । কোথাও না পেয়ে শেষে আমাকে পাকড়াও করল । তার ধারণা আমি বই লুকিয়ে রেখেছি । কিন্তু আমি বেশ জোর দিয়ে অস্বীকার করলাম । একটু পর তার কান্নার আওয়াজ শোনা গেল । তাদের ঘরে গিয়ে দেখলাম,তার কান ধরে রেখে তার বড় বোন রোকসানা আপা ঘরের এদিক-ওদিক বই খোঁজাখুঁজি করছে । বই না পেয়ে একটু পরপর পিঠে দিচ্ছে কিল । রোকসানা আপা রাগে গজগজ করতে লাগল ।
: ক, বই কই হারায়া আইছস ?
শহীদুল জবাব না দিয়ে ফোঁপাতে লাগল । দেখে আমিতো বিরাট খুশি । তার কানের কাছে মৃদু গলায় বললাম, 'এইডাই তোর শাস্তি ।'
আজ সালমান শাহ অভিনীত ছবিগুলোর কথা ভীষণ মনে পড়ছে । টিভিতে প্রচারিত তাঁর যেকোনো ছবিই বিপুল আগ্রহ নিয়ে দেখেছি,এখনো দেখি । জীবন সংসার,আনন্দ অশ্রু,মায়ের অধিকার,মহামিলন,এই ঘর এই সংসার,তোমাকে চাই,বিচার হবে,দেনমোহর--- এই ছবিগুলো যে কত বার দেখেছি তার হিসাব নাই । 'বিক্ষোভ' ছবিটা দেখতে পুরো স্কুল চলে গিয়েছিল । 'প্রেম যুদ্ধ' ছবিতে সালমান শাহ্র মৃত্যু মেনে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছে । 'প্রিয়জন' ছবিতে রিয়াজও ছিল---সালমা
নের পাশে কী হাস্যকর লেগেছিল ! 'কন্যাদান' ছবিতে সালমান শাহ্র গোঁফ দেখে বড় বোনদের হতাশ-চেহারা দেখে দারুণ মজা পেয়েছিলাম । 'স্নেহ' ছবিতে হুমায়ূন ফরীদির সালমান শাহ্র মামারূপে অভিনয়টা এখনো মনে পড়ে । তাঁদের দুজনের একটা গান ছিল---পিঁপড়া খাবে বড়লোকের ধন (বলা বাহুল্য,আমরা বন্ধুরা দুষ্টুমি করে একটু অন্যভাবে গাইতাম !)। 'এই ঘর এই সংসার' নিখাদ বিনোদনে ভরপুর এক ছবি । 'বিচার হবে' ছবিতে সালমান শাহ্র একটা উক্তি ছিল 'গিট্টু লাগসে' যা আমাদের বন্ধুমহলে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল । 'শুধু তুমি' ছবিটি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি,ছবির শেষাংশে একটা আগুনের দৃশ্যে ফেরদৌসকে (তখন চিনতাম না) দেখে চমকে উঠেছিলাম এই বলে--'হায়,হায় ! সালমান শাহ্র এ কী চেহারা হইসে !' প্রতিটি ছবিতেই ছিল দারুণ সব গান ।
সালমান-শাবনূর জুটি আমার মতে বাংলা সিনেমার সর্বকালের সেরা রোমান্টিক জুটি । এই জুটির ১৪ টা ছবির প্রায় সবগুলোই পরবর্তীতে স্থানীয় হলে গিয়ে দেখেছি । এই জুটির কাছে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' ছবির মাধ্যমে গড়ে ওঠা অনবদ্য সালমান-মৌসুমী জুটিও টিকতে পারেনি । ভাবতে অবাক লাগে,মাত্র সাড়ে তিন বছরের চলচ্চিত্র-ক্যারিয়ার দিয়েই তিনি মেগাস্টার হয়েছেন ! এত অল্প বয়সে অমন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা বাংলা চলচ্চিত্রের অন্য কোনো নায়কের ভাগ্যে জোটেনি ।ঙ্গাকষর্ণীয় চেহারা,অভিনয়,স্টাইল,পোশাকের নিজস্বতা,রোমান্টিক ডায়ালগের অপূর্ব থ্রোয়িং----সম্পূর্ণ এক প্যাকেজ ছিলেন তিনি । কী অসাধারণ এক চলচ্চিত্র-নায়ক আমাদের ছিল !
বাংলা চলচ্চিত্রাকাশের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র সালমান শাহ । তিনি এই শিল্পের সর্বশেষ মধুর সত্য,এই সত্যের মৃত্যু নেই ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


