আআআআহ !!!
কোল থেকে বিকলাঙ্গ শিশুটিকে খাটের উপরে আছাড় মেরে চিৎকার করে উঠলো সুস্মিতা । তার চিৎকার ক্ষণিকের মধ্যেই বেশ আলোড়ন ফেললো । রান্নাঘর থেকে তার একমাত্র ননদ জুলেখা, আর পাশের ঘর থেকে তসবিহ্ জপে যাওয়া শাশুড়ি আম্মা মিসেস আসমা আনোয়ার দৌড়ে এলেন । তারা দুইজনেই এসে দেখলেন সুস্মিতা রেগে গিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে । দৃষ্টি একনাগাড়ে ছোট বাচ্চাটার দিকে । রাগে মেয়েটার মুখটাও পুরো লাল বর্ণ ধারন করেছে ।
ওদিকে ছোট বাচ্চাটা ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুক্ষণ মুখ বাকা করলেও এখন আবার শান্ত খুব । বয়স মাত্র ৩ মাস কিন্তু মনে হয় পরিস্থিতি ভালোই বুঝে গেছে সে । তাই তো এই যে আছাড়, মায়ের চিৎকার সবকিছুও অগ্রায্য করে, কান্নাকাটি না করে শুয়ে শুয়ে খেলা শুরু করলো ছোট্ট আকিব । যেন পৃথিবীর কোন কষ্টই তার কাছে কোন ব্যাপার না । ওদিকে জুলেখা আর মিসেস আসমা আনোয়ার দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতেই ঘটনা বুঝে ফেললেন । এমন ঘটনা এই মাসেই ঘটলো এই নিয়ে প্রায় ৯ বারের মত ।
- বউ মা, শান্ত হও
- না, মা, আমি এই বাচ্চাকে চাই না । একে আমার কাছ থেকে দূরে সরান
- আহ, এভাবে বললেই তো হয় না, হাজার হোক, তোমার নিজের পেটেরই তো বাচ্চা
- না, এটা আমার বাচ্চা না । আমার বাচ্চা বোবা আর দুই হাত ছাড়া পৃথিবীতে আসতে পারে না । এটা বাচ্চা না, শয়তান । মনে হয় আমার সারা জীবনের সকল পাপের শাস্তি এটা
- আহ, বউ মা, শান্ত হও । এই জুলেখা পানি নিয়ে আয় তো । পানি খাক একটু ও
জুলেখা পানি নিয়ে আসলো । সুস্মিতা কিছুটা খেলো আর হাতে কিছুটা নিয়ে মাথায় দিলো । তার কাছে সবকিছুই অস্বাভাবিক আর স্বপ্নের মত লাগছে । এতসব স্বপ্ন, এতসব প্ল্যানিং, ভবিষ্যতের সকল করণীয় ভাবনাগুলো এই ৩ মাসে আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেছে । হয়তো মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার ৬ মাসের মাথায় পুরোপুরি ফিকেই হয়ে যাবে । তবু তো আরও ৩ টা মাস !! গত ৩ মাসই ছিল সুস্মিতার কাছে জীবনের তীব্র শাস্তি, এত শাস্তি নিয়ে সে আরও ৩ টা মাস কিভাবে কাটাবে !!
অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না । তাদের সুখের সংসার, আসিফের সাথে ৫ বছরের প্রেমের পর সংসার জীবনের শুরু । বিসিএসে চান্স পেয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসা, স্বামী-শ্বশুর বাড়ি সব নিয়ে ভালোই তো ছিল সে । কিন্তু ঠিক প্রেগন্যান্সির ৭ মাসের মাথায় লং ড্রাইভে ঘুরে যাওয়ার সময় অপ্রত্যাশিত একটা এক্সিডেন্ট আর যেন জীবনের মোড়ই ঘুরে গেলো সুস্মিতার । আসিফও ইঞ্জুর্ড হয়েছিল কিন্তু ২ মাস হাসপাতালের ভর্তির পর ঠিক হয়েছে । ক্ষতি হয়েছে বেশি সুস্মিতার । শারীরিক ক্ষতি নয়, মানসিক আর আকিবের মত বিকলাংগ শিশু । ঐ একটি সড়ক দুর্ঘটনাই তাদের কাল হয়েছিল ।
আসিফ যদিও সুস্মিতাকে বুঝাতে চেয়েছে অনেকবার কিন্তু সুস্মিতার রাগের কাছে পেরে উঠেনি আর । লং ড্রাইভে গাড়ির একটু স্পিডে যাওয়া, হঠাৎ একটি ট্রাকের অতর্কিত আগমন । এরপর... আর মনে নেই তার । ঐদিনের সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারটা নিয়তির উপরই ছেড়ে দিয়েছে । নিয়তির সাথে পাল্লা দিয়ে কে কবে পেরে উঠেছে !!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ১:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



