যশোর শহরের সার্কিট হাউস এলাকার মেয়ে ফারহানা আফরোজ ২০২০ সালের আগস্ট মাসের দিকে বেশ ভাইরাল হয়েছিলেন নিজ গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে বাইক চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

তিনি দীর্ঘদিন ঢাকাতে অবস্থান করার সুবাদে বাইক চালানো শিখেন এবং একজন লেডি বাইকার হিসেবে বন্ধুমহলে পরিচিত। তার কর্মকান্ড নিয়ে একদিকে যেমন প্রশংসার ঝড় বয়েছিল নারীবাদীদের পক্ষ থেকে, ঠিক তেমনি সমালোচনাও কম হয়নি। তিনি নিজে এতে বিরক্ত হয়ে "ভয়েস অব রাইটস" গ্রুপে নিজের অনূভুতিও তুলে ধরেন, যা পরবর্তীতে প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয় । যারা জানে না, তাদের জানিয়ে দিই, ফারহানা আফরোজ ২০১৭ সালেই পারিবারিক ভাবে বিয়ে করেন এবং তিন বছর পর বড় পরিসরে বিয়ের আয়োজন করেন, ইতিমধ্যেই তিনি এক সন্তানের জননীও হয়েছেন । তার এই বিষয়টি প্রথম ভাইরাল করেন "এসকে মিডিয়া" নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলের সত্ত্বাধিকারি টিপু নামক একজন । ছবি ও নিউজ সর্বপ্রথম ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়তেই হু হু করে বাড়তে থাকে ভিউ, ফলশ্রুতিতে ভাইরাল হয়ে পড়ে নিউজটি । এই নিউজ দেখে এক দল প্রশংসায় ভাসিয়েছেন এই সাহসী লেডি বাইকার কে আবার মুদ্রার অপর পিঠে এক দল কড়া সমালোচনাও করেছেন । কেন এই প্রশংসা কিংবা সমালোচনা, তা নিয়েই মূলত আজকে এই লেখাটি ।

আমি নিরপেক্ষভাবে নিজের মতামত তুলে ধরতে আসলাম, দুই পক্ষের হয়েই।
যারা শুধু প্রশংসা করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য -
ক) তার পরিবারের সমস্যা না থাকলে সাধারণ জনগণের এত সমস্যা হলো কেন !? ইত্যাদি বলার আগে আপনার ভাবা দরকার ছিল যে তিনি বাইক নিয়ে শো ডাউন সাধারণ জনগণকে দেখাতেই করেছিলেন, শুধু পরিবারকে দেখাতে নয়
খ) ২০-২৫ টি বাইক নিয়ে শো ডাউন প্লাস ভীড় করার জন্য সেই সময়কার আইন (করোনা ভাইরাস মহামারীতে লকডডাউন উদ্ভুত সময়ে প্রণয়নকৃত আইনে অহেতুক ভীড়ে জরিমানা আদায়ের বিধান ছিল) অনুযায়ী তাকে জরিমানা করা উচিত ছিল। তাছাড়া হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোর অপরাধে তার ট্রাফিক আইন অনুযায়ী জরিমানা করা উচিত ছিল। আর জরিমানার কথা তখনই আসে, যখন কেউ অপরাধ করে, তাই নয় কি ?
গ) তার এবং তার সাথে চালানো বাইকগুলোর কয়টার লাইসেন্স ছিল, এটাতে আমি সন্দেহ হয়েছিল। এক্ষেত্রে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট কিংবা পুলিশের অবহেলা ছিল বলেই আমার অভিমত
ঘ) তিনি প্রচলিত গায়ে হলুদ প্রথা ভাংতে চেয়েছিলেন। আমি এই প্রথা ভাংগার বিরুদ্ধে নই। আমি বিরুদ্ধে, সেই করোনা ভাইরাস মহামারী পরিস্থিতিতে এই শো ডাউনের। তিনি পথশিশুদের সাহায্য করে কিংবা নিন্মস্তরের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার মাধ্যমেও শো ডাউন করতে পারতেন।
ঙ) তার নাম দেখলেই বুঝা যায় তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী। আর ইসলাম ধর্ম তাকে এই স্ট্যান্টবাজিতে সমর্থন করে না। এখন তিনি ইসলামকে মানবেন কি মানবেন না, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাস্তায় নেমে সাধারণ জনগণের সামনে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধচারিতা করলে অবশ্যই সাধারণ জনগণ কিছু বলার বা সমালোচনা করার অধিকার রাখে।

এবার আসি, যারা শুধু সমালোচনা করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য -
ক) আপনি বা আমি জানি না, এই কাজটি করার সিদ্ধান্ত কি মেয়েটির একার নাকি পরিবারের। তাই অহেতুক পরিবারের নামে উল্টাপাল্টা কথা বা অপবাদ দেওয়া আপনার মোটেও উচিত হয়নি।
খ) ইসলাম যেমন মেয়েটিকে এই কাজের সমর্থন দেয়না, ঠিক তেমনি আপনাকেও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি, অশ্লীল বা কটু কথা বলার সমর্থন দেয়না। আপনি নিজে একটা অন্যায় করে আরেকটা অন্যায় কাজকে জাস্টিফাই করেন কিভাবে?!
গ) ট্রাফিক সার্জেন্ট কিংবা পুলিশের অবহেলার ভার শুধু এই মেয়েটির উপর বর্তায় না কিংবা তার সাথের বাইকারদের উপরও বর্তায় না
ঘ) একটি মেয়ে বাইক চালানো শিখবে, এটা ধর্মীয়, সামাজিক, জাতীয় ইত্যাদি কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই অপরাধ নয়। বর্তমান দেশে মেয়েদের ছেলেদের পাশাপাশিই চলতে হয়। তাই "কেন মেয়েটি বাইক চালালো" ইত্যাদি জাতীয় কথাবার্তা বলা বন্ধ করুন।
এই ধরনের ঘটনা যে আলোচনা তৈরির জন্যই করা হয়েছিল, এটা স্পষ্ট। এখন আলোচনা শুরু হলে, মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ দুই পিঠই দেখা হবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো মনে হতে পারে, এতদিন পর হঠাৎ এই প্রসঙ্গ আনা হলো কেন? হ্যা ঘটনাটা কিছুটা পুরনো কিন্তু আমাদের দেশীয় পরিস্থিতিতে মেয়ে কিংবা নারীদের উপর সমাজের অবহেলামিশ্রিত দৃষ্টিভঙ্গির একটি উৎকৃষ্ট উদাহারন এই ঘটনা । ফারহানা আফরোজ দের মত যারাই কিছুটা সাহস সঞ্চার করে নারীপুরুষ ভেদাভেদ ভুলে এই সমাজে কিছু করতে চায়, তখনই এই সমাজ সেই পদক্ষেপের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে । যেন নারীমাত্রই অবনমিত পর্যায়ে থাকতেই হবে, আর পুরুষরা থাকবে সিংহাসনের উপর । এরকম ভেদাভেদ ভুলতে না পারলে এই দেশ কখনই উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে যেতেই পারবে না, সম্ভবই না একেবারে
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


