
একদম অজপাড়া গাঁ বলতে যা বোঝায় তেমনি একটি গ্রামের ছেলে নিরাপদ কাকা। সাদামাটা গ্রাম যেন সবসময় ফসলের হাসিতে মুখরিত থাকে। গ্রামের রাস্তাগুলো কাঁচা তাতে গরুর গাড়ি আর ঠেলাগাড়ি ছাড়া অন্য কিছু চলে না। বাস স্টেশন যেতে হলে এসব গাড়িতে ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট সময় লেগে যায়। নিরাপদ কাকা কিছু পড়ালেখার করার সুবাদে শহরে একটা ছোট চাকরী পেয়েছিল, কিন্তু শহরে থাকতে তার কিছুতেই ভালো লাগত না। গ্রামের কথা মনে পড়লেই কষ্টগুলো সম্প্রসারিত হয়ে যেত। তাই মাকে প্রতিনিয়ত চিঠি লিখত, তার মা ও ছেলের চিঠির উত্তর পাঠাতো। একদিন চিঠিতে মা লিখেছিল তার নাকি শরীর অসুস্থ হয়েছে। এমনিতেই দূরে থাকা নিরাপদ কাকার মন আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠল বাড়িতে যাওয়ার জন্য। সেবার ছিল বর্ষাকাল। বৃষ্টি বাদলের দিন। বৃহস্পতিবার বাড়িতে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু ওইদিন কাজের চাপ বেশি থাকায় রউনা দিতে রাত হয়ে গেল, অন্যসময় হলে সে কখনোই রাতে রউনা দিত না। যাই হোক অবশেষে সে বাসে উঠে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্য। এদিকে হালকা বৃষ্টিও হয়ে গেল। নিজেদের বাস স্টেশন এসে যখন পৌঁছালেন সে, তখন রাত কয়টা বাজে তা তিনি জানেন না, তবে আন্দাজ করতে পারছেন হয়তো রাত দুইটা কি তিনটা। এত রাতে কোনো ঠেলাগাড়ি পাওয়াও যাবে না। তাই হেঁটেই যেতে হবে বাড়ি পর্যন্ত। বুকে সাহস নিয়ে হাঁটতে থাকলেন। আমাবস্যার রাত চারিদিক হো হো করে বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ, ঝি ঝি পোকার ডাক, আর মাঝে মাঝে ডাহুক পাখির কুহ কুহ আওয়াজ যেন ভয়কে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি গ্রামের ছেলে এই বলে নিজেকে নিজে সাহস দিচ্ছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন ব্রিজের উপর একদল শিয়াল আড্ডা দিচ্ছে, কি করবেন ভেবে নিরাপদ কাকা পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা বিড়ি ধরালেন, তারপর রাস্তার পাশে থেকে একটা বাঁশের টুকরা ভাঙলেন, ভাঙার পর বুঝলেন এটা একটা পুরানো কবরের খোটা। তারপর তা নিয়েই সামনে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু শিয়ালদের ভাব চক্কর খুব একটা ভালো না, শিয়ালেরা আগুন দেখে ভয় পায় তাই চিন্তা করলেন আগুন জ্বালাই, খুঁজতে থাকলেন কোথাও কিছু পাওয়া যায় কিনা আগুন জ্বালানোর জন্য। অবশেষে রাস্তার পাশের এক বাড়ির উঠনে কিছু পাটখড়ি পেলেন, পাটখড়ি গুলো শুকিয়ে বান্ডিল করে দাড় করিয়ে রাখা হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় উপরের পাটখড়ি গুলো ভিজে আছে, তাই উপরের গুলো সরিয়ে ভিতরের গুলো বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তাতে এমন ঘটনাই ঘটল যে সব পাটখড়ির বান্ডিল নিচে পরে গেল, আর বাড়ির লোকজন চোর এসেছে ভেবে হারিকেন, লাইট, লাঠি-সোটা নিয়ে "চোর আইছে চোর আইছে ধর ধর" বলে চিৎকার করতে করতে বের হয়ে পড়ল, নিরাপদ কাকা ভয়ে বাড়ির বাহিরের দিকের অংশে চিপা বদ্ধ জায়গায় লুকিয়ে পড়ল, পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা হলে কাকা খেয়াল করল প্রচুর দুর্গন্ধ আসছে যেন কোথা থেকে, এমনিতেই বুক ধরপর ধরপর করতেছিল তখনই আবার একটা আলো নিয়ে কে যেন নিরাপদ কাকার দিকে আসতেছে, কাকা চুপ করে সেখানেই বসে রইলেন, তারপর খেয়াল করলেন একটা বুড়ো মহিলা হারিকেন নিয়ে কাকার ঠিক মাথার উপরের একটা টঙে বদনা হাতে প্রকৃতির কাজ করার জন্য বসে পরল। ঝুলন্ত উদ্যানের ঠিক পিছনেই যে কাকা লুকিয়েছেন তা ইত্যিমধ্যেই কাকা বুঝিতে পারিলেন। তবে আর একটু সামনে এগিয়ে বসলেই হয়তো জীবনে কি ঘটত তা কাকা কল্পনায়ও আনতে চাইবে না। পরিস্থিতি এমন যে কাকা না পারছে কোন শব্দ করতে, না পারছে সেখান হতে বের হতে, ধরা পরলে পরিচয় দেয়ার আগেই আধামরা করে ফেলবে। যেভাবে ছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন। বাড়ির লোকজন যখন কাউকে না পেয়ে শান্ত হয়ে ঘুমাতে গেলে পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ায় কাকা বের হলেন দেখলেন শিয়ালগুলোও ভয়ে পালিয়েছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কাকা হাটতে শুরু করলেন, হাটছেন আর হাসছেন জীবনে কত রকমের যে অভিজ্ঞতা হয়, কত রকমের ঘটনা ঘটে তা মানুষের পক্ষে আগে থেকে জানা ধারনার বাহিরে। অবশেষে নিরাপদ কাকা নিরাপদভাবেই বাড়ি ফিরলেন। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন এত রাত করে আর কোনদিনও বাড়ি ফিরবেন না।
ছবিসুত্র-গুগল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


