somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুরোনো ধর্মের সমালোচনা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেই নতুন ধর্মের জন্ম

১৬ ই মে, ২০২৪ সকাল ৭:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইসলামের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিথি সরকারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে এক বছরের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে প্রবেশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে নিজেকে সংশোধন করে নিলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে না। একই অভিযোগে ২০২০ সালের ২৬ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় তিথি সরকারকে বহিষ্কার করে। সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং কেন তলানির দিকে, তা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়। বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এইসব শিক্ষকদের চিন্তাধারা মাদ্রাসার মাওলানাদের থেকে খুব বেশি উন্নত নয়, আদর্শগত কোনো অমিল নেই। আমাদের আদালত এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাহ্যিক রূপ পাশ্চাত্যের মতো হলেও, ভেতরটা মধ্যপ্রাচ্যের অন্ধকারে ঠাসা! অনেক লেখক-কবিরাও দেখি বলছেন- ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কিংবা ধর্ম ও ধর্ম প্রবর্তকের সমালোচনা করা অপরাধ! কলসীতে আবদ্ধ চিন্তার লেখক-কবিদের পক্ষেই কেবল এমনটা ভাবা সম্ভব, যাদের লেখা মানুষকে কোনো দিশা দেয় না, সভ্যতাকে সামনে এগিয়ে দেয় না।

একসময় এই উপমহাদেশের মানুষ উন্মুক্ত চিন্তার মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারত, কবি ও পুরাণকারগণ যেমন ইচ্ছে লিখতে পারতেন, কোনো বাধা ছিল না। তাই কালে কালে এক দেবতার সঙ্গে আরেক দেবতাকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে, যেমন রুদ্র ও শিবকে একীভূত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শিব একটি পদ, বিভিন্নকালে বিভিন্নজন সেই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। আবার একই দেবপদে অধিষ্ঠিত বিভিন্নকালের দু-চারজন দেবতা হয়ত ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছেন, কিন্তু পরবর্তীকালে ওই পদটিকেই একজন দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করে ব্যভিচারী আখ্যা দিয়েছেন পুরাণকারগণ। যেমন ইন্দ্র ও বিষ্ণু। বিভিন্নকালে ইন্দ্র ও বিষ্ণুপদে অধিষ্ঠিত সকলেই নিশ্চয় ব্যভিচার করতেন না। কবি কল্পনার আতিশ্যয্যে ঈশ্বর এবং দেবতাদের বারবার পৃথিবীতে মনুষ্যগর্ভে অবতাররূপে জন্ম দেওয়া হয়েছে। বস্তুত ঈশ্বর কাল্পনিক; আর দেবতারা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন কেউ নন, তারা মানুষই ছিলেন। বিভিন্নকালে রামায়ণ-মহাভারতের মধ্যে প্রক্ষিপ্ত আখ্যান ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মধ্যযুগের কবিগণ তো শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে কাল্পনিক রাধাকে জুড়ে দিয়ে কৃষ্ণকে রীতিমতো দুঃশ্চরিত্রের মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! অথচ ভাগবত, মহাভারত এবং হরিবংশের কোথাও রাধার কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রাচীন শাস্ত্রে শিবকে সংযমী দেবতা বলা হলেও, কবিগণ তাকে কোচপাড়ার কুচনীদের সঙ্গে প্রেম করিয়েছেন! আবার শিবপদে অধিষ্ঠিত সকলেই যে সংযমী ছিলেন, এমনটা নাও হতে পারে।

বিভিন্ন কালের কবি-লেখকগণ দেবতাদের নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছেন, যাত্রা ও পালাগানের মাধ্যমে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
না, এজন্য কোনো পুরাণকারকে, কবি-লেখককে কারাভোগ করতে হয়নি, কাউকে খুনও হতে হয়নি। মানুষ নির্মল আনন্দলাভ করেছে। কিন্তু ইসলাম এই উপমহাদেশের এই চিরায়ত প্রথায় ছেদ ঘটিয়েছে। কোনো কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে প্রেম নয়, স্ত্রী ও দাসীগণের সঙ্গে মুহাম্মদের সম্পর্কের রসায়ণ নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করলেও বদরকাণ্ড ঘটে যাবে!

পৃথিবীতে কোনো ধর্ম বা মতবাদ, কোনো দর্শন, কোনো কবিতা বা সাহিত্য, কোনো কিছুই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় কোনো ধর্মপ্রবর্তক, দার্শনিক, কবি বা যে-কোনো ব্যক্তি। সকল ধর্ম, মতবাদ ও সৃষ্টির যেমনি সমালোচনা হবে; তেমনি ব্যক্তির কর্মেরও সমালোচনা হবে। এটাই পৃথিবীর চিরায়ত প্রথা।

বৈদিকযুগে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বহু ঋষি ও চিন্তাবিদ বৈদিক ধর্মের সমালোচনা করেছেন। বৈদিক ধর্মের শোষণ-শাসনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বেদকে অস্বীকার পূর্বক বস্তুকে চরম সত্য জ্ঞান করে বস্তুবাদী দর্শনের প্রচার করেন বৃহস্পতি লৌক্য। যুক্তি-তর্ক হয়েছে, কিন্তু তার কণ্ঠ কেউ রোধ করেনি।
এই যুগেই বেদের অনুসারী ব্রা‏‏হ্মণ, ঋষি আর পুরোহিতদের চিন্তা এবং আধিপত্যে প্রবলভাবে ধাক্কা মারে চার্বাক দর্শন। যে যুগে প্রবল প্রতাপশালী ব্রাহ্মণরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ ও অন্যান্য বর্ণের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে ‘কর্মফলবাদ’ ও ‘জন্মান্তরবাদ’ নামে নতুন এক আধ্যাত্মিক তত্ত্বের উন্মেষ ঘটায় এবং এই তত্ত্বের প্রচার করে মানুষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় পরকালের ভয়। সেই যুগে দাঁড়িয়ে চার্বাকরা উচ্চারণ করেন বিশ্ব সৃষ্টিতে প্রকৃতির ভূমিকাই মূখ্য; ঈশ্বর, পরলোক, পুনর্জন্ম বা জন্মান্তর বলে কিছু নেই; মৃত্যুর পর মানুষের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। বেদবিশ্বাসী মানুষের মাঝে তারা এই নাস্তিক দর্শন প্রচার করেন। মুলত চার্বাকরাও বৃহস্পতি লৌক্য’র মতানুসারী, বৃহস্পতি লৌক্য-ই চার্বাক মতের আদি প্রবর্তক। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে চার্বাকদের মতবিরোধ ছিল, কিন্তু শাসককে প্ররোচিত করে ব্রাহ্মণরা যেমনি চার্বাকদের ওপর গণহত্যা চালায়নি, যেমনি চার্বাকরাও তাদের দর্শন প্রচারের ক্ষেত্রে সহিংসতার পথ অবলম্বন করে হাতে তরবারি তুলে নেননি, নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্রাহ্মণদের হত্যা করেননি।

বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ভারতবর্ষে জন্ম নেয় বৌদ্ধ, জৈন, আজীবিক, বৈষ্ণব, শৈব প্রভৃতি ধর্ম।

রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বৈদিক ধর্ম ও ব্রাহ্মণদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন, বেদ তার অন্তরের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারেনি। তাই তিনি গৃহত্যাগ করে নতুন পথের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। পুরাতন বৈদিক ধর্মের সমালোচনা করেই তিনি নতুন দর্শনের জন্ম দিয়েছেন। যেখানে ব্রা‏‏হ্মণরা ঈশ্বরের নামে বিবিধ যাগযজ্ঞে ব্যস্ত; সেখানে বুদ্ধ ঈশ্বরকে অস্বীকার করার কথা বলেন, অন্যথায় ‘মানুষ স্বয়ং নিজের প্রভু’ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়। যেখানে ব্রা‏‏হ্মণরা আত্মা-জন্মান্তর ইত্যাদি জুজুর ভয় দেখিয়ে স্বার্থসিদ্ধিতে রত; সেখানে বুদ্ধ আত্মাকে নিত্য অস্বীকার করার কথা বলেন, নইলে নিত্য একরস মানলে তার পরিশুদ্ধি বা মুক্তির প্রশ্নই ওঠে না। যেখানে ব্রা‏হ্মণদের কাছে জীবনাচার-ধর্মাচারের ক্ষেত্রে বেদ-ই একমাত্র প্রমাণ্য গ্রন্থ এবং বেদ বাক্যই শেষ কথা; সেখানে বুদ্ধ কোনো গ্রন্থকে স্বতঃ প্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করার উপদেশ দেন, অন্যথায় বোধবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তিনি যে সাহসী বাণী উচ্চারণ করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে বৌদ্ধধর্ম। যদি বৈদিক ধর্মের সমালোচনা ও নতুন দর্শন সৃষ্টিকে অপরাধজ্ঞান করে যদি তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হতো বা হত্যা করা হতো, তাহলে পৃথিবী বঞ্চিত হতো এক অহিংস দর্শন থেকে।

সিদ্ধার্থের মতোই পার্শ্বনাথও বৈদিক ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নতুন দর্শনের সৃষ্টি করেছিলেন, যা জৈন ধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। পার্শ্বনাথকে জৈনধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর বলা হলেও তার পূর্বের বাইশজন ঐতিহাসিক চরিত্র নন, পার্শ্বনাথকেই জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। পার্শ্বনাথ ছিলেন বেনারসের রাজা অশ্বসেনের পুত্র, তিনি বিবাহিত ছিলেন। ত্রিশ বছর গৃহে থাকার পর তিনি কঠোর তপস্যার পথ বেছে নেন। জৈন ধর্মের প্রসারে তিনি খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেননি। বাংলার সম্মেত পর্বতে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর আড়াইশো বছর পর জৈন ধর্মের চব্বিশতম এবং শেষ তীর্থঙ্কর হিসেবে আবির্ভাব হয় মহাবীরের, তার হাতেই জৈনধর্মের প্রসার ঘটে। মহাবীর যেমনি ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সহিংস পথ বেছে নেননি, তেমনি পুরনো ধর্মের মানুষেরা তাকে উৎখাতও করেনি।

একইভাবে বৈষ্ণব, শৈব ধর্ম ও অন্যান্য উপ-ধর্মের প্রসার ঘটেছে।

আঠারো শতকের শেষদিকে পুরনো ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ অনেক উপধর্ম জেগে ওঠে। যেমন-কর্তাভজা, দরবেশ, সাঁই, গোপ বৈষ্ণব, চামার বৈষ্ণব, টহলিয়া বৈষ্ণব, গুরুদাসী বৈষ্ণব, বৈরাগী, ফকিরদাসী, সাহেবধনী, কবীরপন্থী, কুড়াপন্থী, বলরামী, চরণদাসী প্রভৃতি এধরনের আরো অনেক উপধর্ম। এইসব উপ-ধর্মও যুক্তি-তর্কে পুরনো ধর্মকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। পুরনো ধর্ম থেকে বাধা এসেছে, কিন্তু তা খুব বেশি ধ্বংসাত্মক ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যেও ইহুদি কিংবা পৌত্তলিকদের আচার অনুষ্ঠান আর রীতি-পদ্ধতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে, সমাজব্যবস্থা ও জীবনাচারে সত্য এবং নৈতিকতার ঘাটতি দেখে, সমাজ এবং ধর্ম সংস্কারে উদ্যোগী হন যীশু। যীশুর দর্শনই খ্রিষ্টান ধর্ম হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

মুহাম্মদও বহুশ্বরবাদী কোরাইশদের পৌত্তলিকতা এবং সনাতন সংস্কৃতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং উপলব্ধি করেন মূর্তিপূজার অসারতা সম্পর্কে। আরব সমাজে আগে থেকেই পৌত্তলিকতা বিরোধী বা একেশ্বরবাদের ধারণা ছিল। ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্ম তো ছিলই, এছাড়াও আদ গোত্রের হুদ নবী, মিদিয়ান গোত্রের শুয়েব নবীও পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিলেন। আরবের অনেক কবি ছিলেন; যেমন-কবি কাসা বিন সায়িদা আল ইয়াদি, কবি আমর বিন ফজল, কবি লবীদ; এরা সকলেই পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিলেন, মূর্তিপূজার কুসংস্কার থেকে মানুষকে বের করে আনার জন্য পৌত্তলিকতা বিরোধী কবিতা লিখতেন এবং সে-সব কবিতা ওকাজের মেলার কবিতা সম্মেলনে আবৃত্তিও করতেন। কিন্তু এজন্য পৌত্তলিকরা তাদেরকে হত্যা করেনি, আবার তারাও মূর্তি পূজার অপরাধে পৌত্তলিকদেরকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করেননি।

মুহাম্মদ মূর্তিপূজার মতো সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কুসংস্কার জীর্ণ পোশাকের মতো পরিত্যাগ করে নতুন পথের অনুসন্ধানে নামেন। সিরিয়া ভ্রমণকালে তিনি বিভিন্ন ধর্মের এবং মতের মানুষের সংস্পর্শে আসেন। মক্কাতেও তিনি দূর-দূরান্ত থেকে আগত সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যলাভ করেন। ইহুদিদের সিনাগগ এবং খ্রিষ্টানদের গীর্জায় গিয়ে যাজকদের সঙ্গে ধর্মীয় আলোচনা করেন। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এসময়েই তার মধ্যে পৌত্তলিকতার বিরোধীতা এবং একেশ্বরবাদের ধারণা দৃঢ় হয় ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং আরবের অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্ম ও ব্যক্তির প্রভাবে।

তিনি মক্কা থেকে রুক্ষ-শিলাময় তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় যেতেন একাকী ধ্যান করার জন্য, অনেক একেশ্বরবাদী বা হানিফ মতাদর্শীও তখন হেরা পর্বতে ধ্যান করতে যেতো। গুহায় ধ্যানের কালেই তার ভেতরে ইসলামের ধারনার জন্ম হয়। হেরা পর্বত থেকে লোকালয়ে ফিরে এসে নিজেকে আল্লাহ’র নবী দাবী করে কোরাইশদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। কোরাইশদের ধর্মকে মিথ্যা ও পাপ আখ্যা দিয়ে, তাদের ধর্মের সমালোচনা ও কটুক্তি করে নিজের ইসলাম ধর্মকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন এবং নিজের ধর্মের প্রচার চালান।

কোরাইশদের ধর্মকে মিথ্যা ও পাপ আখ্যা দিলেও কোরাইশরা মুহাম্মদকে বন্দী করে রাখেনি বা হত্যা করেনি।

যুগে যুগে নতুন ধর্ম বা মতবাদের জন্মই হয়েছে পুরাতন ধর্ম বা মতবাদের সমালোচনা করে এবং পুরাতন ধর্মের অনুসারীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে। কিন্তু নতুন ধর্ম বা মতবাদের প্রবর্তক তার অনুসারীদের নিয়ে পুরাতন ধর্ম বা মতবাদকে ধ্বংসের প্রয়াস চালায়নি।

কোনো একটি দর্শন বা তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষ যদি তাদের দর্শনকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান করে পৃথিবীর বাকি সব দর্শন এবং দর্শনের মানুষকে ধ্বংসের প্রয়াস চালায়, তাহলে একদিকে যেমনি পৃথিবী তার বৈচিত্র্য হারাবে অন্যদিকে লঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার। ওই একটি দর্শন তখন আর দর্শন থাকে না, হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী মতবাদ, আর সন্ত্রাসী মতবাদের কাছে হেরে যায় মানবতা। কিন্তু কোনো মতবাদ বা দর্শন নয়, মানুষই শ্রেষ্ঠ; দর্শনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই দর্শন।

অতীতে ইসলামী সাম্রাজ্যে এবং বর্তমান পৃথিবীর ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বহু মানুষকে কারাদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো- ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া ব্যাপারটা কী? ধর্মীয় অনুভূতি কি ধর্ম ভেদে পৃথক হয়ে থাকে, নাকি কম-বেশি হয়ে থাকে? নাকি কোনো জাতি-গোষ্ঠীর একেবারেই ধর্মীয় অনুভূতি থাকে না, এমনকি তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা দখল করলেও?

ধর্মীয় অনুভূতির ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমি একটা ঘটনার উল্লেখ করে প্রশ্ন রাখবো।

৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে দশ হাজার সৈন্য দিয়ে ইসলামের নবী মুহাম্মদ মক্কা আক্রমণ করেছিলেন। মক্কা আক্রমণের পূর্বে মুহাম্মদ কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে বাধ্য করেন ইসলাম গ্রহণ করে তাকে নবী হিসেবে মেনে নিতে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হতো। আর মক্কার অন্যান্য কোরাইশদের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘যে আবু সুফিয়ানে বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে সে নিরাপদ এবং যে কাবাঘরে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।’

আবু সুফিয়ান নগরে এসে এই সংবাদ জানান কোরাইশদের, আর সবাইকে উপদেশ দেন যুদ্ধ না করতে, কেননা তিনি মুহাম্মদের যে বাহিনী দেখে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করা অসম্ভব ছিল।
ফলে কোরাইশদের সামনে তিনটি পথ খোলা ছিল।
এক. ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদকে নবী হিসেবে মেনে নেওয়া
দুই. মুহাম্মদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা
তিন. পালিয়ে যাওয়া

তিনটি ঘটনাই ঘটেছিল পরদিন মুহাম্মদ তার বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করলে। কোরাইশদের একটি দল মুহাম্মদের বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুহাম্মদের যোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারেনি, তাদের অনেকে প্রাণ হারায়, অনেকে পালিয়ে যায়। আবার অনেকে মক্কা আক্রমণের আগেই পালিয়েছিল। যেমন- মুহাম্মদের চাচাতো বোন উম্মেহানির স্বামী হুবায়রা। হুবায়রার পালানো এক বিস্ময়, সে আলোচনা থাকুক।

প্রাণ বাঁচাতে সেদিন কোরাইশরা মুহাম্মদের আনুগত্য স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারপরও মুহাম্মদের নির্দেশে চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মক্কা বিজয়ের পরপরই মুহাম্মদের নির্দেশে কাবাঘরে রক্ষিত ৩৬০ টি মূর্তি ধ্বংস করা হয়, এর মধ্যে কাঠের একটি ঘুঘু মুহাম্মদ নিজে ধ্বংস করেন। এই মূর্তিগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী বংশ পরম্পরায় কোরাইশরা পূজা করে আসছিল। এরপর মুহাম্মদের নির্দেশে খালেদ বিন ওয়ালিদ নাখলার আল-উজ্জা মন্দিরে রক্ষিত মূর্তি ধ্বংস করে। হুদেইল গোত্রের পূজিত সুওয়ার নামের মূর্তি ভেঙে ফেলে মুহাম্মদের শিষ্য আমর। মুহাম্মদের অন্য একদল অনুসারী কোদেইদ গোত্রের আল-মানাত মন্দির ধ্বংস করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে কোরাইশ, হুদেইল, কোদেইদ এবং আরও অন্যান্য যে-সব গোত্রের মন্দির এবং মূর্তি মুহাম্মদ ধ্বংস করেন, তা কি ওইসব গোত্রে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া নয়? এতগুলো মূর্তি এবং মন্দির যে ব্যক্তি ধ্বংস করেন, যিনি মানুষকে হত্যার নির্দেশ দেন, সেই ব্যক্তির সমালোচনা করা যাবে না? নাকি কথা ওইটাই যে ধর্ম ও ব্যক্তিভেদে অনুভূতি আলাদা?



মে, ২০২৪
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২৪ রাত ১:০৭
২১টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইহকালে আল্লাহর ইবাদত না করলে পরকালে আল্লাহর ইবাদত করতেই হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৭:২৭



সূরাঃ ৫১ যারিয়াত, ৫৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৫৬। আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।

* আল্লাহ মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা

রমজান মাসের ফরজ সিয়াম ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। তবে সাম্প্রতিক দশকে এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মচর্চা ও সংস্কৃতিচর্চাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার বিপদ

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫



গত একবছর দেশের প্রবাদপ্রতীম এক থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নাট্যাচার্য নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সেলিম আল দীনের হাতে গড়া এই নাট্যদলটির সিনিয়র সব সদস্যদের মুখে একই কথা বারবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১৬



প্রিয় কন্যা আমার-
আজ তোমার জন্মদিন। হ্যা আজ ৩১ ডিসেম্বর তোমার জন্মদিন। আজ বিশেষ একটি দিন! এবার জন্মদিনে তুমি আছো তোমার নানা বাড়ি। আমি আজ ভীষন ব্যস্ত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ হায়েনাদের দখলে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪৪



আমাদের দেশটা অনেক ছোট। কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি।
এই বিশাল জনশক্তি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। ১৯৫২ তে হলো ভাষা আন্দোলন। আর ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×