
আমাদের বাড়িতে যে ঘরটায় আমার শৈশব, কৈশর কেটেছে সেখানে দুটো বিশাল জানালা ছিল। দুটি জানালার এক বিশেষ সুবিধা হলো সন্ধ্যার পর থেকে প্রায় রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত দখিনের জানালা দিয়ে আমার ঘরের প্রতিটি কোণা থেকে চাঁদ দেখা যেত। আর বাকী রাতটুকুজুড়ে চাঁদটা যেন পাহাড়াদারের মত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতো আমার পশ্চিমের জানালায়। এভাবেই হয়ত: চাঁদের সাথে আমার আজীবন সখ্যতার শুরু। স্মাইলির মত ছোট্ট চিকন চাঁদটিকে হাসতে হাসতে একটু থেকে আরেকটু বড় হওয়া, মাঝারি থেকে পূর্ণ চাঁদে রুপান্তরিত হতে দেখতাম। সেই সাথে দেখা হতো আবছা, হালকা থেকে তীব্র আলোর ঝলকানির মত প্রতিটি পরিবর্তিত রূপ।প্রতিটা রূপেই চাঁদ ছিল আমার ভীষণ প্রিয়। প্রতিদিন আলাদাভাবে একটু হলেও আমি খবর নিতাম চাঁদটার। আর অমাবস্যার রাতগুলোতে প্রিয়তমার মত কত যে প্রতিক্ষা করতাম আমার জানালার আকাশে চাঁদের পদচারণার, সে হিসাব মেলানোর সাধ্য কারো নেই।
একা একা ঘুমাতে পারতামনা কখনো। ছোট বোন জুঁথীকে প্রায়ই খুব করে পটাতে হতো আমার সাথে ঘুমানোর জন্য। ভরা পূর্ণিমার রাতগুলোতে আমি ইচ্ছা করেই জানালার পর্দা সরিয়ে রাখতাম। মাঝরাতে চাঁদের তীব্র আলো এসে সরাসরি মুখে পড়ত। ঘুম ভেঙ্গে যেত আমাদের দুই বোনের। কত হাসাহাসি আর আনন্দ নিয়ে কত রাত জেগে কাটিয়েছি। মাঝে মাঝে জুঁথী বিরক্ত হয়ে জানালার পর্দা টেনে আবার ঘুমিয়ে যাবার আগে হুমকি দিত,পর্দা টেনে না দিলে ওর ঘরে গিয়ে ঘুমাবে। 'লক্ষি-সোনা' পর্দা দিয়ে দিচ্ছি এসব কত কিছু বলে ওকে ঘুম পাড়িয়ে আবার পর্দাটা একটু ফাঁকা করে আবার চাঁদকে সাথে নিয়ে ঘুমাতাম।
আরেকটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। মাঝে মাঝে মাঝরাতে আম্মুকে ঘুম থেকে টেনে তুলে চাঁদ দেখাতাম। জুঁথীর সাথে মাঝে মধ্যে ঝগড়া হলে যখন আম্মুকে নিয়ে ঘুমাতে হত, আম্মু আগেই বলে রাখত, খবরদার! চাঁদ দেখাতে মাঝরাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলবা না। তাহলে তোমার সাথে ঘুমাবো না। ব্যতিক্রম ছিল শুধু বাবা। মাঝে মাঝে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে পূর্ণিমার রাতে আব্বু নিজ থেকে আমাদের দুই বোনকে ছাদে নিয়ে যেত। তিনজন মিলে গান গেয়ে, হাঁটাহাটি করে অথবা পাটি বিছিয়ে শুয়ে বসে সময় কাটাতাম।
একবার আব্বু আমাদের সারপ্রাইজ দেবার জন্য হুট করে স্টীমার(রকেট) ট্রিপে বেড়াতে নিয়ে গেল। অদ্ভুত সুন্দর এক জার্নি। ভরা পূর্নিমার এক রাত। কেবিন ছেড়ে সবাই ডেকে বসে জোছনা উপভোগ করল। তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে ডেক খালি হয়ে গেল।আমাকে হাজার টানাটানি করেও আমার বোন কেবিনে নিতে পারল না। শেষমেশ আব্বুকে ডেকে রেখে গেল আমার কাছে। বাবা-মেয়ে মিলে গান, গল্প আর আড্ডায় খুব সুন্দর সময় কাটালাম। চারদিকে বিশাল জলরাশি, আকাশে সুন্দর চাঁদ, সুসজ্জিত নির্জন ডেকের ভেতর মধ্যরাতে বাবার পাশে আমি, এমন সব সুন্দর মুহূর্তে আব্বু খেয়াল করল আমার চোখে পানি। কেন কেঁদেছি, কার জন্য কেঁদেছি সেটা আমার নিজের কাছেও রহস্য আর আব্বুও কিছুই জানতে চাইল না শুধু হো হো করে হেসে বলল, আল্লাহ্ রে! কি করব আমি এই মেয়ে নিয়ে!!! এই কান্দুনিবুড়ির জন্য এমন মানুষ কই পাবো যার সাথে চাঁদ দেখে আমার মেয়ে ফ্যাৎ ফ্যাৎ করে কাঁদবে!!
সেদিন আব্বু আর আমি সারারাত কাটিয়ে একদম ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত ডেকে বসেছিলাম এবং সত্যিকার অর্থেই সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
মানুষের বিভিন্ন অদ্ভুত শখ থাকে। আমারও তেমন একটি শখ ছিল যে আমি যখন বড় হব আর আমার যখন অনেক টাকা হবে, আমি আমার নিজের জন্য একটা ছইওয়ালা নৌকা কিনবো। ভাবনাটা এমন ছিল যে, নৌকাটা কোন এক মাঝিকে এমনি এমনি দিয়ে দেব। আমাকে কোন ভাড়া বা কিছু দিতে হবে না। শুধুমাত্র পূর্ণিমার কোন কোন রাতে আমি আমার প্রিয়জনকে নিয়ে সারারাত ঐ নৌকাটি দিয়ে নদীতে ঘুরবো।
স্বপ্ন, স্মৃতি সবকিছুকে পাশকাটিয়ে সবাইকে বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়। নৌকা কেনার এই শখটি কখনোই পূরণ করা হয়নি আমার। আমার বিয়ের কিছুদিন পরের একটা ঘটনার কথা বলি। একদিন একটু রাত করেই আমি আর আমার বর বাসায় ফিরছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম আকাশে বিশাল বড়, অদ্ভুত সুন্দর এক চাঁদ। আলতো করে বরের হাত ঝাঁকি দিয়ে আমি বললাম, এই দ্যাখো! আকাশে কত্ত বড় চাঁদ!
হা হা করে হেসে (খানিকটা টিজ করে) আমার বর বলল, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ একটু বড় দেখা যায়,এটা তো স্বাভাবিক। এটা নিয়ে লাফালাফির কি আছে?
কাহিনী এখানেই শেষ হতে পারতো।
তারপরও হিন্দি মুভির জনপ্রিয় ডায়লগ 'পিকচার আভি ভি বাকী হ্যায় মেরে দোস্ত' -এর মত কিছু কিছু টুইস্ট জীবনে থেকেই যায়।
কয়েক বছর পরের ঘটনা।
একদিন মাঝরাতে আমার তিন বছরের মেয়ের ডাকাডাকিতে আমি আর ওর বাবা দুজনেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি মেয়ে মশারীর ভেতর থেকে জানালার বাইরে তাকিয়ে চিৎকার করছে আর আমাদের বলছে, 'মাম্মিন- বাবা, দ্যাখো আকাশে কত্ত বড় চাঁদা মামা'!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



