'তা আর বলছি কি!' মুখটা ছাইরঙি করে সে বললো।
'তা, কি দেখলি?'
'কি আর... সেই শ্যামলী'...'
'ওয়েট, চ্যাপ্টার কোজ কর। আর শুনার ইচ্ছা নাই; বহুত শুনেছি ঐ মেয়েটার কথা...'
'দোস্ত শুননা, প্লিজ...'
'ঠিক আছে, একটু সংক্ষেপে চালিয়ে যা'- রাখাল প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করে।
'দেখলাম, শ্যামলী আমাকে ফোন করেছে। বলছে- তার ভুল হয়ে গেছে। জীবনের সবচে' বড় ভুল! আমি যেন তার সাথে কালকেই ধানমন্ডি লেকে দেখা করি...। কথাগুলো শুনে আমার বুকে ড্রিমড্রিম শব্দ শুরু হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট সময়ে আমি দেখাও করতে গেলাম। ওকে আগের চেয়ে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। চোখ ফেরানো যায় না। আমাকে দেখে, এগিয়ে এসে হাত ধরলো। তারপর বিশ্বাস করবি না- জড়িয়ে ধরে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্না শুরু করে দিল...'
'ফুফিয়ে কান্নার শব্দও তুই স্বপ্নে দেখলি?'- রাখাল মুখ বাঁকিয়ে প্রশ্নটা করে। স্পষ্টত সে বিরক্ত। সেটা বাদল বুঝতেও পারছে।
'দোস্ত, আমি নিজের কথা তোকে ছাড়া আর কাকে বলি, বল? তুই পুরোটা শুন... না শুনতে চাইলে চলে যাই...' বিষাদমাখা চেহারাটা সে অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল।
'সরি দোস্ত', রাখাল বাদলের হাতে হাত রাখে; 'তুই বলে যা, শুনছি আমি'
'...বলছে সে নাকি বাবা মায়ের চাপাচাপিতে বিয়েটা করেছিল। তার হাজব্যান্ডটা ভালো না। নেশাখোর। রাতে বাড়ি ফিরে নানা উৎপাত করে... সে বাবার বাড়ি চলে গেলেও তাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এক সময় সে জানতে চাইলো আমি কেমন আছি। বললাম- তোমাকে ছাড়া কেমন থাকতে পারি? বিশ্বাস কর দোস্ত এ কথা বলতে চাইছিলাম না, তারপরও মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে। অনেকক্ষন পর সে আমাকে বলে- আমি তোমার কাছে চলে এলে তুমি আমাকে গ্রহণ করবে...?'
'তারপর তুই কি বললি?'
'কি আর? হঁ্যা বললাম'
'তারপর?'
'সে সত্যি সত্যি চলে এল! সন্ধ্যের শেষ আলোয় তাকে দেবীর মত মনে হলো। হতভম্ব আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে আমার অগোছালো ঘরটাকে ঠিক করলো। তারপর বিছানায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি প্রিয় গিটারটা হাতে নিয়ে নতুন দিনের গানের সুর তুললাম। ও খুব মৌন হয়ে তা শুনছে...'
'তারপর... তারপর....'
'তারপর দরজা ভাঙ্গার শব্দ শুনলাম; দেখলাম কয়েকজন লোক ঘরে ঢুকে গিটারটা দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দিল। তারপর নিচ থেকে আমাকে তুলে ইচ্ছামত কিলঘুসি দিচ্ছে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফোরে পড়ে গেলাম। জেগে দেখি গিটারটা'র টুকরো টুকরো হয়ে এককোনে পড়ে আছে। শ্যামলীকেও খুঁজে পেতে দেরি হলো না... বিছানায় পড়ে আছে ও। তার হাত, পা, মাথা শরীর থেকে আলাদা করা। পুরো ঘর লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে... আমি আবার জ্ঞান হারালাম।'
'তারপর?'
'জেগে উঠে দেখি সকাল হয়ে গেছে। পাশে তাকিয়ে দেখি গিটারটা আমার জায়গা মত বহাল তবিয়তেই আছে। বিশ্বাস করবি না দোস্ত এত্ত ভালো লাগছিল...।'
'গিটারটার জন্য, ঠিক না?'
'দোস্ত ঐটা আমার জান; আমার বাঁচার অবলম্বন...'
'তারপর'
'তারপর সারাদিন বাইরে কাটিয়ে সন্ধ্যেয় ফিরে দেখি আমার ঘরের তালা ভাঙ্গা! বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। মনে হলো কেউ গরম লোহা দাগিয়ে দিছে বুকে। ঘরে ঢুকে দেখি- আমার কাপড় চোপড় কিচ্ছু নাই; এমনকি আমার প্রিয় গিটারটাও নাই...'
'কি বলিস?'
'হ দোস্ত... আমার গিটারটা নাই। চোরে নিয়ে গেছে...' বাদলের কথা আটকে যায়।
'কি বলিস? এখন কি হবে?' রাখাল এতক্ষন উপরে উপরে মজা পেলেও, এখন বাদলের জন্য তার খুব মায়া লাগছে। আহা বেচারা... কত কষ্ট করে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে সখের গিটারটা কিনেছিল...!
--- 'কি আর হবে? ব্যাগাবন্ডের সখ বলতে কিছু থাকে না! চলি তোকে আরও একবার বোরড করলাম। কিছু মনে করিস না...'
--- 'দাঁড়া, আমিও তোর সাথে যাব। মজার ব্যাপার খেয়াল করেছিস? তোর স্বপ্নের সাথে কিন্তু মিলে গেছে ঘটনাটা?'
--- 'হু মিলেছে... তবে, বাস্তবে গিটার হারায় ঠিকই কিন্তু শ্যামলীরা কখনো ফিরে আসে না... হা হা হা... চল।'
পরিশিষ্টঃ রাখাল নিজের কলেজের টাকা থেকে কিছু টাকা মেরে, বন্ধু রাজিন এর কাছ থেকে কিছু নিয়ে একটা গিটার কিনেও ফেলেছে। পরশু বাদলের জন্মদিন। ওদের ইচ্ছে আছে, উল্টো বাদলকে একটা গান শুনিয়ে চমকে দেবে। সবার পক্ষ থেকে গিটারটা উপহার দিয়ে সারারাত বাদলের কণ্ঠে গান শুনবে...।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






