somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিষ্ঠুর স্বপি্নল

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ দুপুর ১:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আবেগঘন যাযাবর জীবনের সুন্দরতম একটা সময় রাখাল চিরতরে হারিয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনে শুধুমাত্র একটা সুন্দরই পরিপূর্ণ হিসাব সমাপ্ত করে না। বরং অনেকগুলো সুন্দরের সংমিশ্রণে জীবনের পূর্ণতা বহে এবং সব সুন্দরই এক এক রেখায় আবর্তিত না হয়ে তা জীবনের উত্থান পতনের বেলাভূমিতে এসে ধরা দেয়। কেউ ধরে রাখতে পারে, কেউ পারেনা। রাখাল নিজের ব্যাপারটা তেমন স্পষ্ট জানার চেষ্টা কখনো করেনা। সে বিভ্রান্ত পথিকের মত দিক দিশাহীন ছুটে চলে এদিক-সেদিক।

শেষ সময়ে সিদ্ধান্ত বদল করলো সে। সিলেট যাবার কথা ছিল। উঠেছে চট্টগ্রামের বাসে। সৌদিয়ায় টিকেট কেটেছে সে! মধ্য রাস্তায় সিদ্ধান্ত নেবে, চট্টগ্রাম যাবে নাকি কুমিল্লা! এটা একটা ছোট্ট রহস্যময় সিদ্ধান্ত। নিজেকে রহস্যের মধ্যে ফেলে রাখায় রোমহর্ষকতা আছে। বাস আস্তে আস্তে হাইওয়ে'র দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাখাল বসেছে ডি রোতে। জানলার পাশে। সাধারনত জানলার পাশেই সে টিকেট কাটে। এটা তার একটা হবি। পাশে বসেছে একটা বুড়ো চাচা। ওপাশে দুটো মেয়ে। সামনে কিংবা পিছনে কারা যাচ্ছে তা জানা আপাতত তার দরকার নাই। সে ব্যস্ত হলো বাইরের দৃশ্য দেখায়। সঙ্গী বলতে "সাত কাহন", এক্স-100 এবং ক্রিয়েটিভ প্লেয়ার।

যতদূরে দৃষ্টি যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। সরু পথে হঠাৎ হঠাৎ উদয় হয়ে হারিয়ে যাওয়া গাঁয়ের মানুষ। দেখা দিয়ে চলে যাওয়া...! তীব্র একটা আকাঙ্খা জাগিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মাঝে মানুষের কোনো হাত নেই। রাখালের মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে যায়। হু হু করে ওঠে পুরো শরীর। অজানা শিহরনে। তার মনে হলো, সব প্রাপ্তি'র সীমারেখা অতিক্রম করে সে প্রাপ্তিহীন পথে এসে পড়েছে। যেখানে মানব জমিনের প্রেম-ভালোবাসা, লালসা, কাম, চাহিদা, টিকে থাকার সংগ্রামের কোনো অস্তিত্ব নেই। এখানে প্রকৃতি'র কোলে মাথা রেখে সে হৃদয়ের পূনর্বাসন ঘটাতে পারে। মানব জীবনের গুপ্ত রহস্য উন্মোচন করায় মন দিতে পারে। নিজেকে হেঁয়ালীপনায় জাগিয়ে রেখে অস্তিত্ব নির্মাণের পাঠ চুকিয়ে চিরকালের জন্য হারিয়েও যেতে পারে...।

মানুষ... কত নিষ্ঠুর স্বপি্নল! যে অপেক্ষায় থাকে সে কষ্ট পায়... রাখাল তা জানে, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি অসহ্য কষ্ট তার নিজের ভেতরেও। আকর্ষিক ভিলেনের আগমন তাকে আবারও চিন্তিত করে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে। পৃথিবী ধ্বংসের তীব্র বাসনা তাকে হিংস্র হায়েনার চেয়ে নিষ্ঠুর করে তোলে। পৃথিবীর একমাত্র সেই বস্তু যা একান্ত রাখালের নিজস্ব ইচ্ছার বলে বলিষ্ঠ হয়ে সরল রেখায় অধিকার বিস্তার করবে, তাতে সামান্যতম বাতাসের স্পর্শও গ্রাহ্য করার দূর্বলতা তার নেই। যে প্রতিমা সে নিজের মতো করে লালন করেছে তার একমাত্র অধিকার কেবল তার-ই। সেখানে দ্বিতীয় শক্তির কোন উত্থান সে মানতে পারেনা। রাখালের শরীর হিংসা এবং আশংকায় কাঁপতে থাকে। যদিও সে জানে একমাত্র প্রেম এবং ভালবাসা সেই বস্তু যা স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিবেচ্য না হয়ে তা বরং আপেকিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং সেখানে প্রত্যেকে স্বাধীন এবং সম অধিকারে প্রতিষ্ঠিত। সে যুক্তি মানে। সে যুক্তি বুঝে। একারনেই কিছুটা হলেও সে অন্যদের চেয়ে আলাদা। নিজেকে কষ্ট দিবে ঠিকই কিন্তু কাউকে বুঝতে দেবে না।

পাশে বুড়ো চাচা মুখ হা করে ঘুমিয়ে আছে। মেয়ে দুটো বাইরের দৃশ্য দেখে মৃদু শব্দে উল্লাস করছে। "সেযে বসে আছে একা একা'র" তালে তালে মগ্ন রাখাল। কিছু না বলে প্রেয়সী 'এক্স-100' জেগে ওঠায় ও খুব চমকে ওঠে। অপরিচিত নাম্বার। রাখালের বর্তমান নাম্বারটা মানুষের জানার কথা না। উটকো ঝামেলা থেকে রেহাই পাবার জন্য সে মাঝে মাঝে পুরনো সিম পাল্টিয়ে এটা ব্যবহার করে। জনা ছয়েক ব্যক্তি এর খবর জানে। তারপরও এদের বাইরে কেউ কেউ এর ঠিকানা জেনে যায়। কিভাবে পায় কে জানে!

'হ্যালো'
'কেমন আছেন?' নারী কণ্ঠ! কান থেকে তারগুলো খুলে নিল সে।
'আছি নাতিশীতোষ্ণ'
'নাতিশীতোষ্ণ?'
'না শীত, না উষ্ণ। মাঝামাঝি। তো, কাকে চাচ্ছিলেন?'
'আপনাকেই!'
'আমি কে?' কাঠখোট্টা প্রশ্ন রাখালের।
'আপনি হচ্ছেন- ক,খ,গ। ক-তে কুদ্দুস, খ-তে খচ্চর, গ-তে গাধা... ঠিক আছে?'
উচিৎ শাস্তি। রাখাল এ নামটা বহুত ব্যবহার করেছে কোনো এক সময়। এখন এর জ্বালা সইতে হবে। সে ক্ষনিক চিন্তায় মগ্ন হলো, এই নাম সে কাকে কাকে বলেছিল? মনে করতে পারলো না।
'হুম, আমিই ক,খ,গ। আপনি?'
'আমি এ.বি.সি' বলেই হাসি আর থামেনা। অমনি বৃষ্টি। বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে গোটা দুনিয়া সয়লাব। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। গাড়ি ছুটে চলেছে বৃষ্টি কেটে। আহ কি বৃষ্টি। রাখাল মুক হয়ে থাকে দৃশ্য দেখে। কানের পাশে হ্যালো হ্যালো শব্দ ভেসে আসছে।
'কি যেন বললেন- এ.বি.সি? ভালো। সুন্দর নাম।'
'পরীক্ষাতো সামনেই, প্রস্তুতি কেমন?'
'ভালো, ভালো।'
'আপনার ওপাশে এত শব্দ কেন? আরেকটু জোরে বলেন, কিছুই শুনছি না'
'আমি একটা টাইম মেশিনের ভেতর বসে আছি। মুহুর্তে চারপাশের সব কিছু বদলে যাচ্ছে। একারনে কথা শুনতে আপনার কষ্ট হচ্ছে!'
'টাইম মেশিন? ফাজলামি! শৌ শৌ শব্দ শুনতে পারছি; হর্ণের শব্দও বার কয়েক শুনেছি, তারমানে আপনি কোনো বাসে?'
'বুদ্ধিমতি মেয়ে!'
'কোথায় যাচ্ছেন?'
'আপনাকে কেন বলবো?'
'কেন বলবেন না? আমি আপনার সব জানি, বুঝলেন? আর এখন কোথায় যাচ্ছেন সেটাও জানতে হবে আমাকে। এখন ঝটপট বলে ফেলুন, কোথায় যাচ্ছেন?'
'কুমিল্লা কিংবা চট্টগ্রাম'
'দেখলেন জেনে গেলাম! আমি যা জানি, আশা রাখি আপনার বউও এর চেয়ে বেশি জানবে না'
'তাই নাকি?'
'জি্ব ঠিক তাই'
'তারমানে আপনি আমার বউয়ের চেয়েও বেশি কিছু?'
'রাজি হলে কি দিতে পারবেন?'
'কিছু আলু সাইজ কবিতা!'
'হি হি হি হি, আর?'
আর কি দেয়া যায়? মনে আসছে না। বাইরের তুমুল বৃষ্টি। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা। কদম? কদম দেয়া যেতে পারে। '3 টা বৃষ্টিমাখা কদম ফুল!'
'কদম? ওয়্যাও আমার প্রিয় ফুল। কিন্তু 3টা কেনো?'
'আমার ইচ্ছা। আচ্ছা এ.বি.সি থাকেন কোথায়? আমার এই নাম্বার পেলেন কেমনে?'
'এ.বি.সি পৃথিবীতে থাকে। নাম্বার নিয়েছি কোথায় থেকে? বলবো না :)'
'আমি কি আপনাকে চিনি?'
'একটা গানের কয়েক লাইন বলছি... এটুকু বললে হয়তো চিনতে পারবেন, না চিনতে পারলে কিন্তু আর জিজ্ঞেস করতে পারবেন না; বলবো?'
'ঠিক আছে'
'এখন সকাল, এখানে সকাল, মাটি ভেজা ভেজা গন্ধ। তোমার আকাশে কত তারা ফোটে, তুমি দ্যাখোনাকো। তোমার জানালা বন্ধ...'
'এটা আবার কি গান?'
ওপার থেকে লাইন কেটে যাবার শব্দ ভেসে আসছে।

যাত্রাবিরতিতে বাস থেমেছে নুরজাহানে। খাওয়া সেরে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের বাস ত্যাগ করলো সে। বিশ্বরোডে এসে, মিনিবাস ধরতে হয়েছে । বলাকা ষ্ট্যান্ডে নেমে বলাকায় উঠলো। লক্কর-ঝক্কর করতে করতে বলাকা এগিয়ে যাচ্ছে বরুরার দিকে। কতদিন পর এ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে রাখাল...! ছোট্ট কয়েকটা পর্বত পাশ কাটিয়ে চলে গেল। বন্ধুদের সাথে কয়েক বছর পর আবার দেখা হবে। ওরা কে কেমন আছে? কি করছে? আগের মত আছে কিনা? এসব ভাবতে ভাবতে সে কৈশোরে হারিয়ে যায়...।


*** 26 আগষ্ট, 2006ইং।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ দুপুর ১:২১
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের যে বড় ক্ষতি হবে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৩২


জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের সমাজে যে বড় ক্ষতি ও ক্ষত তৈরি হবে, তার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম দিনেই সংবিধান ছিঁড়ে ফেলবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×