somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্ল্যাকহোল-মহাবিশ্বের এক রহস্যময় বস্তু

২৮ শে অক্টোবর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যদি প্রশ্ন করা হয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু কোনটি? আমার মতে উত্তরটি হবে কৃষ্ণ গহ্বর। নামটা একটু অপরিচিত লাগতে পারে কারণ আমরা এখন বাংলা শব্দের চেয়ে তার ইংরেজি প্রতিশব্দ বেশি বুঝি এবং সেগুলো ব্যবহারে অধিক অভ্যস্ত ।এজন্যেই ব্ল্যাকহোল বললে সবাই বুঝব,অপরদিকে কৃষ্ণ গহ্বর বললে অনেকেই বুঝতে পারবনা। এটা মাতৃভাষার এক ধরনের সূক্ষ্ম অমর্যাদা। যাই হোক সেটা ভিন্ন ব্যাপার তাই সেদিকে না যাই।ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে জানতে হলে আগে নক্ষত্র সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।কারণ নক্ষত্রই একসময় ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়।
~
নক্ষত্রের সৃষ্টি ও ধ্বংস
-নক্ষত্র সৃষ্টির মূল ক্ষেত্র হল মহাজাগতিক মেঘ বা নেবুলা । নেবুলার অভ্যন্তরের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো ঘনীভূত অবস্থায় নিজেদের অভিকর্ষ বলের ওপর পতিত হয়ে সৃষ্টি করে নক্ষত্র। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়া হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলোকে বিভক্ত হয়ে হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়।এ প্রক্রিয়ায় বৃহৎ পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়ে থাকে যেটা তেজস্ক্রিয়তার রূপে নক্ষত্রের অভিকর্ষ বলের বিপরীতে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। ফলস্বরুপ নক্ষত্রের অভিকর্ষ শক্তি ও তেজস্ক্রিয়তার ভেতরে একধরনের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।কিন্তু বৃহৎ নক্ষত্রগুলোর আভ্যন্তরীণ চাপ এবং তাপ হিলিয়ামের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারী উপাদান সৃষ্টি করতে থাকে।যেমন:কার্বন,নিয়ন,সিলিকন, অক্সিজেন, লোহা। যখন এর অভ্যন্তরে লোহা উৎপন্ন হওয়া শুরু করে তখনই আসে অসামঞ্জস্যতা। কারণ যে ফিউশন প্রক্রিয়ায় লোহা উৎপন্ন হয় সেটা কোনো ধরনের শক্তির নিঃসরণ ঘটায় না।এভাবে যখন নক্ষত্রের অভ্যন্তরে লোহার পরিমাণ অত্যাধিক বেড়ে যায় তখন তেজস্ক্রিয়তা এবং অভিকর্ষ বলের সমতা বিনষ্ট হয়। ফলস্বরুপ নক্ষত্রের কোর ধ্বংস হয়ে যায়।ধ্বংস হবার ঠিক আগমূহুর্তে সেটা নক্ষত্রের সমস্ত ভর শোষণ করে নেয় এবং সৃষ্টি করে সকল ভারী উপাদানসমূহের।এর পরপরই ঘটে সুপারনোভা যার মাধ্যমে এসকল উপাদান সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।সুপারনোভা সংগঠিত হবার পর দুটির যেকোনো একটি ঘটনা ঘটবে:
১।নক্ষত্রটি নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হবে।
২।নক্ষত্রটি নিজের ভরের ওপর পতিত হয়ে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হবে।
~
ব্ল্যাকহোল কি ?
-এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে নক্ষত্রের সমস্ত ভর একটি বিন্দুতে একীভূত হয়।ফলস্বরুপ এর অভিকর্ষ বল এতোটাই বেশি হয়ে থাকে যে এমনকি আলো পর্যন্ত এটি অতিক্রম করতে পারেনা।আর আমরা যখন ব্ল্যাকহোলের দিকে তাকাই তখন আমরা আসলে ব্ল্যাকহোল দেখিনা।যেটা দেখি সেটাকে বলা হয় The Event Horizon। ব্ল্যাকহোলটা থাকে মূলত এর কেন্দ্রে। যার ভেতরে আছে সিঙ্গুলারিটি। সিঙ্গুলারিটি এক্ষেত্রে অসীম ঘনত্বের কোনো পৃষ্ঠ হতে পারে, কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু।সুতরাং গ্রহণযোগ্য উত্তরটি হবে,আমরা জানিনা।
~
ব্ল্যাকহোল হতে আলো বের হতে না পারলে অধিকাংশ ছবিতেই আমরা এর চারপাশে আলো দেখতে পাই কেন?
-ইভেন্ট হরাইজনের প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র রয়েছে যাকে বলা হয় The Photon Sphere। এ পর্যায়ে এসে আলো ব্ল্যাকহোলকে আবর্তন করতে থাকে।
~
ব্ল্যাকহোল কি মহাকাশের ভ্যাকুয়াম ক্লিনার?
-এটি একটি ভুল ধারণা।হ্যাঁ এটা ঠিক যে ব্ল্যাকহোল তার আশেপাশের সবকিছুই শোষণ করে নেয়। তবে এর একটি নির্দিষ্ট অভিকর্ষ বল বিদ্যমান।আপনি যদি সৌরজগতের মাঝখানে সূর্যের বদলে সেটার সমান কোনো ব্ল্যাকহোল স্থাপন করেন তাহলে গ্রহগুলোর কক্ষপথের কোনোরুপ পরিবর্তন হবেনা।কিন্তু তাপ না থাকার কারণে আমরা ঠান্ডায় মারা যাব।প্রতিটি গ্যালাক্সীর ভেতরেই একটি বিশাল ব্ল্যাকহোল রয়েছে।
~
ব্ল্যাকহোলে প্রবেশ করলে কি ঘটবে?
-সেটা নির্ভর করবে ব্ল্যাকহোলের প্রকৃতির ওপর। যদি স্টেলার ম্যাস ব্ল্যাকহোল বা ছোট ব্ল্যাকহোল হয় তাহলে ইভেন্ট হরাইজনে প্রবেশ করা মাত্রই তীব্র অভিকর্ষ বলের প্রভাবে আপনার দেহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।আর যারা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করবে তারা দেখতে পারবে আপনি ধীর গতিতে সেখানে প্রবেশ করছেন এবং আপনার দেহ ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে আলো প্রতিফলিত না হবার কারণে।আর সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে আপনি এর কিছুটা অংশ ভ্রমণ করতে পারবেন।এমতাবস্থায় আপনার চারপাশের সবকিছু প্রচন্ড গতিতে আপনাকে অতিক্রম করবে।দেখে মনে হবে আপনি যেন টাইমমেশিনে বসে আছেন আর পারিপার্শ্বিক সবকিছুকে অসীম গতিতে অতিক্রম করছেন। এরপর আপনি ডেথজোনে প্রবেশ করবেন এবং পূর্বের ঘটনাটি ঘটবে।
~
দুইটি ব্ল্যাকহোল একত্রিত হলে কি ঘটবে?
-তেমন কিছুই ঘটবেনা ।শুধু একটির ভর অপরটি শোষণপূর্বক তা আরো শক্তিশালী ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে।
~
এর কি কোনো ধ্বংস আছে?
-হ্যাঁ।তবে এটা অনেক সময়সাপেক্ষ। ব্ল্যাকহোল খুব ধীরগতিতে তার ভর হারাতে থাকে হকিং রেডিয়েশন নামক একটি প্রক্রিয়ায়।ধারণাটি দিয়েছেন ফিজিসিস্ট স্টিফেন হকিং।হকিং রেডিয়েশন বুঝতে হলে আপনাকে প্রথমে কোয়ান্টাম ফোম বুঝতে হবে।ব্যাপারটি খুব সিম্পল, "কিছুইনা মানে কোনোকিছু" ।বুঝতে পারছেন না?আসুন আপনাকে হাতেকলমে দেখাই।
~
ভ্যাকুয়াম বা শূণ্যস্থান আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ফাঁকা মনে হলেও আসলে তা নয়।আপনি যদি কোয়ান্টাম জুমিংয়ের সাহায্যে x10^35 এ ভ্যাকুয়ামে জুম করেন তাহলে মজার একটি ঘটনা দেখতে পারবেন।সেখানে গুড়োসাবানের বুদবুদের মতো অসংখ্য ম্যাটার ও এন্টিম্যাটার শূণ্য হতে সৃষ্টি হচ্ছে এবং একে অপরের সাথে সংঘর্ষের দ্বারা বিলীন হয়ে যাচ্ছে ।এসব পার্টিকেলকে বলা হয় ভার্চুয়াল পার্টিকেল। এই ঘটনাটি যখন ব্ল্যাকহোলের প্রান্তে ঘটে তখন পার্টিকেলের এক অংশ ব্ল্যাকহোল শোষণ করে নেয় এবং অপর অংশ সেখান হতে মুক্ত হয়ে বাস্তব পার্টিকেলে পরিণত হয়। এভাবে ব্ল্যাকহোল ক্রমশ ভর হারাতে থাকে এবং এক পর্যায়ে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায়।।তবে এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ।দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সর্ববৃহৎ ব্ল্যাকহোল হল S50014+81 যেটার ভর সূর্যের চেয়ে ৪০ বিলিয়ন গুণ বেশি এবং যার ব্যাস ২৩৬.৭ বিলিয়ন কিলোমিটার সেটা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হতে লাগবে গুগল বছর। যখন সেটার ভর একটি গ্রহাণুর সমান হবে তখন তার তাপমাত্রা হবে ২০° সেলসিয়াস। আর যখন তার ভর একটি পর্বতের সমান হবে তখন সেটা ৫৫০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় থাকবে।আর সম্পূর্ণ ভর হারানোর ঠিক আগমূহুর্তে সেটা কয়েক বিলিয়ন পরমাণবিক বোমার সমান বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিলীন হয়ে যাবে।
~
ঘূর্নায়মান ব্ল্যাকহোলকে বলা হয় ওয়ার্মহোল যেটা মহাবিশ্বে এক স্থান হতে অপরস্থানে ভ্রমণের সম্ভাব্য শর্টকাট। আর ব্ল্যাকহোলের বিপরীতে যেটা থাকে সেটাকে বলা হয় হোয়াইট হোল।এ দুটি নিয়ে আরেকদিন বিস্তারিত আলোচনা করব।এতক্ষণ ধরে কষ্ট করে পড়বার জন্য ধন্যবাদ।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:০২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত ইমাম হোসেনের (রা.) পরিবর্তে ইয়াজিদী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কেন?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৪৯



সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৫ ও ৬৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৫। হে নবি! মু’মিন দিগকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে কুড়িজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুইশতজনের উপর বিজয়ী হবে।তোমাদের মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ঢাকা দক্ষিণের নতুন সমীকরণ: রাজনৈতিক খেলায় ইশরাক কোথায়?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২

রাজনীতির মাঠে অতি-উৎসাহ কখনো কখনো যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে, দলবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবের প্রতি বাংলার মানুষের কেন এত ক্ষোভ?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা দূরীকরণে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটিতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। সৌদি আরবই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×