somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার ০২

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৪:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের সাইক্লোন শেল্টার
কিউবার ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেলটায় অবস্থিত বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে। ভূমির গঠন, ভৌগোলিক অবস্থান সব মিলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে বেশ ঝুকির মধ্যে রয়েছে। এখানে নিয়মিতভাবে বন্যা, টর্নেডো, সাইকোন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদী ভাঙন, ভূমিকম্পসহ নানা দুর্যোগ বিভিন্ন চেহারা নিয়ে হাজির হয়। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো, ১৫ নভেম্বর ২০০৭ উপকূলসহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইকোন সিডর।
ক্যাটেগরি ফোরভুক্ত সাইকোন সিডরের উৎপত্তি বঙ্গোপসাগর থেকে। সিডর শব্দের অর্থ চোখ। এই সাইকোনের চোখ বা মূল কেন্দ্রটি ছিল ৭৪ কিলোমিটার। আর এর কেন্দ্রকে ঘিরে ৫০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ব্যাসার্ধ ধরে একটি বৃত্ত তৈরি করে চলমান তা-ব চালিয়েছে সিডর। বাগেরহাটে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরকে প্রথম আঘাত করে এবং বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ২২০ থেকে ২৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত। রেড ক্রিসেন্টের হিসাব অনুসারে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক হত্যাকারীর মধ্যে সাইকোন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে তিন লাখ মানুষ মারা যায়। ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক হিসাব এক বিলিয়ন ডলার। ২৯ এপ্রিল ১৯৯১-এ সাইকোনে মারা যায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি হয় দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ১৮৭৬, ১৯১৯, ১৯৬১, ১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৮৫ ও ১৯৮৮ সালে এ অঞ্চলের ওপর ভয়ঙ্কর সাইকোন আঘাত করেছে।
বন্যা এখন নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের বন্যায় দেশের ৫২টি জেলার ৮৯,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবে যায়। মারা যায় ১ হাজার ৫১৭ জন। ১৯৯৮-এর বন্যা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ৬৫ দিনের এ বন্যা ছড়িয়ে পড়ে ৫৩ জেলার ১০০,০০০ বর্গকিলোমিটারে। ৯১৮ জন মারা যায়। এছাড়া ১০০ বছরের ইতিহাসে ১৯২২, ১৯৫৫, ১৯৭৪, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৭-এর বন্যা ছিল ভয়াবহ।
সাইকোন ও বন্যার পাশাপাশি বাংলাদেশ ঢুকে পড়েছে ভূমিকম্প জোনে। বাংলাদেশের পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর অংশ ভূমিকম্প ঝুকিতে আছে। ভৌগোলিক হিসাবে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এ জোনভুক্ত। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু বড় ভূমিকম্প হওয়ায় ঝুকি এখন বেড়ে গেছে।
এসব ছাড়াও নদী ভাঙন, খরা, টর্নেডোতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের অবস্থান বেশ দুর্বল। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।
এ প্রসঙ্গে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট শশাঙ্ক সাদী বলেন, নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বলতে মূলত বোঝানো হতো ইমার্জেন্সি রেসপন্স অর্থাৎ যে কোনো দুর্যোগে সাড়া দেয়া। সেখানে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী পৌছানো। মানুষকে সহায়তা করা। তাদের যে ক্ষতি হলো সেখানে পুননির্মাণে সহায়তা করা। নব্বই দশকের শেষে এসে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ধারণা বদলে যেতে থাকে। কারণ দেখা যায়, আমরা বারবারই ইমার্জেন্সি রেসপন্স করছি। কিন্তু মানুষের পূর্ব প্রস্তুতি ঠিকমতো হচ্ছে না। পূর্ব প্রস্তুতি দুই রকমের হতে পারে। প্রথমত. ইমার্জেন্সি রেসপন্স করার জন্য দল তৈরি করা। এ রকম ভলান্টিয়ার তৈরি করে দুর্গতদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসা যায়। তবে পূর্ব প্রস্তুতির একটি বড় অংশ হলো, দুর্যোগের ঝুকিগুলো কিভাবে কমানো যায়। যেমনÑ বন্যা ঝুকি কমাতে ঘর উচু করা, সাইকোনের ঝুকি কমাতে সাইকোন উপযোগী বাড়িঘর তৈরি করা, শেল্টার তৈরি করে অন্যান্য ব্যবস্থা রাখা, যা মানুষের পাশাপাশি গরু-বাছুরসহ বিভিন্ন প্রাণীকে রক্ষা করবে। এতে সম্পদের ক্ষতি কম হয় এবং প্রাণহানি যতোটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়। এসবের ফলে ডিজাস্টার ইমপেক্ট অনেক কমে যায়। এখন এ দুভাবেই ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টকে দেখা হচ্ছে।মূলত এখন বলা হয়, ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনÑ দুর্যোগ ঝুকি ব্যবস্থাপনা অথবা দুর্যোগ ঝুকি হ্রাস। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আলাদা না রেখে ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে এক করে ফেলা। যেমনÑ বাংলাদেশে রাস্তাঘাট তৈরি করার সময় যদি নদী বা খালসহ পানির সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত করা যায় তবে বন্যার ঝুকি কমে যায়। বন্যার স্থায়িত্বের পেছনে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ বা নগরায়ন বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। বন্যার সময় কৃষি জমি ডুবে যায়। এসব ক্ষেত্রে আগে থেকেই বীজতলা তৈরি করতে হবে। কিভাবে একটা ফসল নষ্ট হলে নতুন বীজ পৌছে দেয়া যায় এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং যখনই করা হবে তখন ডিজাস্টারের কথা মাথায় রাখতে হবে। যেহেতু এ দেশে নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে।
ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে শেল্টার বা আশ্রয় কেন্দ্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে আছে। সাইকোন বা বন্যায় মানুষ ছুটে যায় শেল্টারে। সাইকোনের হাত থেকে বাচতে কখনো কখনো ১০ মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ১০ মিনিটেই যদি আশ্রয় না মেলে তবে তা জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করে। দুর্গত অঞ্চলে শেল্টার এ কারণে সবচেয়ে জরুরি। যেমনÑ এবার প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৭০-এর সাইকোনের সময় এ দেশে তেমন কোনো শেল্টার ছিল না। পাকিস্তানি সরকার সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষকে অবজ্ঞা করেছে। যার ফলে স্বাধীনতার আগে শেল্টার নির্মাণ কখনোই গুরুত্ব পায়নি। ১৯৭২-এর পর ১৫টি উপকূলীয় জেলায় কিছু শেল্টার তৈরি হয়। এ দেশের শেল্টারের বড় অংশই নির্মিত হয় ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছর আগে।
দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮৪১টি শেল্টার আছে। এর কিছু এনজিওরা দেখাশোনা করলেও বেশির ভাগই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। এসব আশ্রয় কেন্দ্র কতোটুকু আশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এক্সপার্টরা মনে করেন, অর্ধেকের বেশি শেল্টারই ব্যবহার উপযোগী নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শেল্টার ম্যানেজমেন্ট বা আশ্রয় কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি গাইডলাইন নেই। যদিও বলা হয়, ইউনিয়ন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটি এগুলো দেখবে; কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।
দুই বছর আগে নভেম্বর ২০০৫ সালে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের উদ্যোগে একটি মাঠ পর্যায়ের কাজ হয়েছিল সাইকোন শেল্টার ইন কোস্টাল বেল্ট অফ বাংলাদেশ : কমপ্লায়েন্স উইথ রাইট টু লাইফ শিরোনামে।
এতে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করা হয় শেল্টার ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা নির্দেশ করে। এর মধ্যে আছে :
এক. দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাজে সম্পৃক্ত থাকেন না;
দুই. যেখানে শেল্টার দরকার নেই সেখানে তা তৈরি করা;
তিন. সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না রাখা;
চার. ব্যবহারের কোনো গাইডলাইন না থাকা;
পাচ. মেইনটেইনে সমস্যা;
ছয়. চুরি ও দুর্নীতি।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শেল্টারগুলোর ডিজাইন এবং ফিজিকাল স্ট্রাকচার ঠিক নেই। অনেক পুরনো বিল্ডিংয়ের ছাদ, মেঝে, পিলার বহু কিছুই ভেঙে পড়ছে বা ফাটল ধরেছে। শেল্টার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ইউনিয়ন পরিষদ কমিটির কোন ব্যক্তি দায়িত্বপ্রাপ্ত এটাও অনেকে জানেন না। যেসব শেল্টার স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেখানে কিছুটা রক্ষণাবেক্ষণ হয়। অনেক জায়গায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা জোর খাটিয়ে শেল্টার তৈরি করেন, যার হয়তো প্রয়োজন নেই। আবার কেউ কেউ এগুলো দখল নিয়ে স্টোর রুম বানান কিংবা অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন। টেনিস গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করার রেকর্ডও আছে। কিছু শেল্টারে টয়লেট ও টিউবওয়েল রাখা হয়েছে বাইরে, যা প্রয়োজনে কোনো কাজেই লাগে না। দুর্নীতি করে নিম্নমানের জিনিসপত্র দিয়ে শেল্টার বানানোর অভিযোগ আছে অনেক। শেল্টারগুলোতে সতর্কতামূলক পতাকাও তোলা হয় না।
স্থানীয় লোকজন শেল্টার সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে জানেনই না। ঝড়ের সময় শেল্টারে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে মারা গেছেন কেউ কেউ। আশ্রয় কেন্দ্রের দেয়াল ভেঙে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকে সাইকোনের সময় নিজের বাড়ি ফেলে শেল্টারে যেতে রাজি হন না। সব সম্পদ হারানোর পাশাপাশি তাদের ভয়, শেল্টার ভেঙে পড়তে পারে। কনক্রিটের চাপায় মারা পড়ার চেয়ে নিজের বাড়িতে মারা যাওয়া বরং বেশি কাক্সিক্ষত তাদের কাছে।
বাংলাদেশের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের যে সাংগঠনিক কাঠামো দাড় করানো হয়েছে তা বেশ ভালো। বিশেষ করে স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার নামে যে অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ আছে তাতে করে যে কোনো বিপর্যয়ের পর নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সরকারপ্রধানকে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল বা এনডিএমসির কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে কাজ শুরু করে। এ কাউন্সিলকে সহায়তা করে ইন্টার-মিনিস্ট্রিয়াল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটি বা আইএমডিএমসিসি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে ইউনিয়ন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটির মাধ্যমে সাংগঠনিক অবস্থানটি ভালোভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ক মন্ত্রণালয়টির প্রথমে নাম ছিল ত্রাণ ও পুনর্বাসন, ২০০৩ সালে তা হয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরে আবার নাম বদলে হয় খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। ১৯৯১-এর সাইকোনের পর ১৯৯২-এ গঠন করা হয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বুরো বা ডিএমবি। ১৯৯৩-এ শুরু হয় কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের বা সিডিএমপির কাজ। সরকারের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে আছে লোকাল ডিজাস্টার অ্যাকশন প্ল্যান বা এলডিএপি, ডিরেক্টরেট অফ রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন-ডিআরআর, ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার-ইওসি, সাইকোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম-সিপিপি।
কাগজপত্রে সাংগঠনিক অবস্থা ভালো হলেও সঠিক সমন্বয়, পরিচালনা, দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া ও প্রয়োগের অভাবে কাঠামোটি কখনোই খুব বেশি কার্যকর হয়ে ওঠেনি। যেমনÑ আমরা ইমার্জেন্সি বা জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করতে অনেক সময় দেরি করে ফেলি। বাংলাদেশে সাধারণত মানুষের মৃত্যু সংখ্যা দিয়ে সব কিছু বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সারা পৃথিবীতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। এ দেশে এ বিষয়টি নিয়ে সব সময়ই দোটানার মধ্যে থাকতে হয়। মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি মৃত্যুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এটার ওপরই অন্যান্য দেশে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়।
সাইকোনে জীবন ও সম্পদ বাচাতে জনসচেতনতা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা সংকেত পাওয়া মাত্র কিভাবে খাবার, পানি ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষা করা হবে সে বিষয়ে এবার তেমন কোনো প্রচারণা চালানো হয়নি; বরং আবহাওয়া অফিস যখন ৪ নাম্বার থেকে হঠাৎ করেই ১০ নাম্বার মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করে তখন অনেকের পক্ষে প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয়নি। এসব সাইকোনের সময় সাধারণ মানুষকে অন্যান্য সহায়তার পাশাপাশি সাইকো-সোশাল সাপোর্ট বা মানসিক ও সামাজিক সহযোগিতা করার প্রয়োজন আছে। কেননা সাধারণ মানুষই প্রথম উদ্ধারকারী হিসেবে কাজ করে যে কোনো দুর্যোগে। সারা বিশ্ব জুড়েই স্ট্যাটিসটিকস বলে, উদ্ধারের ৮৫ ভাগ সাধারণ মানুষই করে। অনেক টিম পৌছানোর আগে প্রাথমিক উদ্ধারের কাজটি স্থানীয়রাই করেন।
এক্সপার্টদের মতে, এবারের সাইকোনে বড় শিক্ষা দেশের বর্তমান ওয়ার্নিং সিস্টেম। আমাদের যে ওয়ার্নিং সিস্টেম আছে, বিশেষ করে ফাড, সাইকোন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ ওয়ার্নিং সিস্টেম কতোটা যুগোপযোগী, কতোটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে সেটা গভীরভাবে বিবেচনার সময় এসেছে। কারণ গত কয়েক বছর ধরে সাইকোন ওয়ার্নিং সিস্টেম আধুনিক করার কথা শোনা গেলেও তা হয়নি। আমরা পুরনো সিস্টেমেই কাজ করছি। এ সিস্টেম নদী ও সমুদ্র বন্দর তথা উপকূলের মানুষের জন্য। এবারের ঝড়ের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অর্থাৎ ভূখ-ের ভেতর দিয়ে যাবে। সাইকোনকে ততোক্ষণই সাইকোন বলা হয় যখন সেটা উপকূলে ভূখ-ের কিছুটা ভেতরে আঘাত হানে। যখন এটা মূল ভূখ-ে ঢোকে তখন এটা স্থলঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সে ওয়ার্নিংটা ছিল না। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষকে প্রপার ইনফরমেশন দিতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত. যে জায়গাগুলো বেশি ঝুকিপূর্ণ সেসব জায়গায় কতো মানুষ বাস করে, শিশু বা নারীর সংখ্যা কতো সে বিষয়ে কোনো ডেটা না থাকায় আমাদের অপেক্ষা করতে হয় দুর্গত এলাকার মূল্যায়নের ওপর। কারণ আমাদের ধারণা নেই কতো সংখ্যক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কোন কোন জায়গায় সহায়তা প্রয়োজন। সঠিক ম্যাপিং থাকলে সহজেই সাহায্য পাঠানো সম্ভব হতো।
দুর্যোগ পীড়িতদের চোখে দুর্যোগ দেখা না হলে সমাধান আসবে না। অনেকে মনে করেন, প্রচুর অর্থ না থাকলে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সম্ভব নয়। এটা কিছু ক্ষেত্রে সত্য হলেও সব ক্ষেত্রে নয়। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি যে দেশটি অসাধারণ সাফল্য দেখাচ্ছে সেটি হলো কিউবা। আটলান্টিক মহাসাগর, ক্যারিবিয়ান সাগর ও গালফ অফ মেক্সিকো বেষ্টিত দ্বীপ দেশ কিউবাকে ভৌগোলিক কারণেই নানা ঝড় ও হারিকেনের মুখে নিয়মিত পড়তে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাটরিনা, রিটা, ডেনিস, মিচ, ইভান, উইলমাসহ বেশ কিছু বড় হারিকেন এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।
ক্যাটেগরি ফাইভভুক্ত হারিকেন উইলমা (ডরষসধ) আঘাত হানে ২৩ অক্টোবর ২০০৫-এ। এ সময়ে কিউবার উপকূলে ২০ ফিট উচু জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে। বলা হয়ে থাকে, অল্প সময়ে সৃষ্ট সবচেয়ে দ্রুতগতির হারিকেন এটি। অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য যে, এ হারিকেনে একজন মানুষও মারা যায়নি। কোনো অবস্থাতেই মানুষকে মরতে দেয়া যাবে নাÑ এ ধরনের মানসিকতা নিয়েই কিউবান সরকার কাজ করে।
কিউবার ন্যাশনাল ফোরকাস্ট সেন্টার ঝড়ের অনেক আগে থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করে দেয়। বিশ্বের খুব কম দেশেই কিউবার মতো আরলি অ্যাডভাইজরি কাজ করে। এটি কাজ শুরু করে ৯৬ ঘণ্টা আগে থেকে। এর পরবর্তী ধাপে হলো ইনফরমেশন ফেইজ। এ সময় মিডিয়ায় বিরামহীনভাবে সতর্ক করা হয়। ৪৮ ঘণ্টা আগে হারিকেন ওয়াচ-এর মাধ্যমে এর গতি সম্পর্কে জানানো হয় এবং ২৪ ঘণ্টা আগে হারিকেন ওয়ার্নিং দেয়া হয়। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ পানি, খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে আসে। হারিকেনের প্রস্তুতি সম্পর্কে সারা বছর ধরে ব্যাপক ক্যাম্পেইন হয় বলে সাধারণ মানুষ এ বিষয়গুলোতে খুবই সচেতন থাকে। কিউবানদের ভলান্টিয়াররা খুবই তৎপর। দি হ্যানরি রিভ ইন্টারন্যাশনাল টিম অফ মেডিকাল স্পেশালিস্টস ইন ডিজাস্টার্স অ্যান্ড এপিডেমিকস নামে একটি কোর টিমে ১ হাজার ৬০০ এক্সপার্ট ডাক্তার আছেন। যারা প্রয়োজনে দেশের বাইরে গিয়েও দুর্যোগে কাজ করেন। কিউবার এ অসাধারণ সাফল্য অনেকের সিরিয়াস গবেষণার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েও সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দিয়ে কিভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষ, গবাদি পশু ও সম্পদ রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য বড় উদাহরণ হতে পারে কিউবা।
......................................................
নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার -এ প্রকাশিত। ২২ নভেম্বর ২০০৭ , যায়যায়দিন




০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×